ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস, ফিচার পোস্ট আর্কাইভ

 
20_Medical+admission_041013

Perception এবং Reality দুটো আলাদা জিনিস. Perception অনুযায়ী আপনার দৃষ্টিতে অনেক কিছুই সত্য বলে মনে হতে পারে কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন৷ Public perception অনুযায়ী জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া সব ছেলের একটি করে গার্লফ্রেন্ড আছে কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন, আদতে শতকরা ১টি ছেলের ভাগে গার্লফ্রেন্ড পড়ে কিনা সেটা গবেষণার বিষয়৷ খালেদা জিয়ার perception অনুযায়ী জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সব ছেলে সেনচুরি মানিক কিন্তু আসলে মানিক সেনচুরি করতে পেরেছিল কি না সেটা তদন্তের বিষয়৷ইনু সাহেবের perception অনুযায়ী বাংলাদেশের এক মাত্র সমস্যা জামাত-বিএনপি, কিন্তু এটা আসলে এক মাত্র সমস্যা কিনা সেটি জরিপের বিষয়৷ আবার শেখ হাসিনার perception অনুযায়ী দেশের সকল মানুষ সুখে আছে, আসলে এটা দেখার বিষয় সবাই সুখে আছে কি না ৷ আমেরিকার perception পৃথিবির একমাত্র সমস্যা মুসলিম উগ্রবাদী ও আলকায়েদা, মনে হয় যেন এটা ছাড়া পৃথিবীতে আর কোন সমস্যা নেই, আসলে এটা রাজনৈ্তিক বিবেচনার বিষয়৷ মার্ক্সবাদীদের perception অনুযায়ী class difference না থাকলে পৃথিবীতে আর কোন সমস্যাই থাকতো না, কালমার্ক্স এর মতবাদ খুব আদর্শ বলে মনে হলেও বাস্তবায়ন যোগ্য কিনা তা হিসাবনিকাশের বিষয়৷ সমাজতন্ত্রের মতে পৃথিবীর যাবতীয় সসস্যার মুলে গনতন্ত্র কিন্তু সমাজতন্ত্র হলে কি পৃথিবীর সকল সসস্যার সমাধান হয়ে যেত, এটি বিবেচনার বিষয়৷আর আমাদের দেশের ছেলে-মেয়েদের perception অনুযায়ী সকল পাবলিক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়, সকল মেধাবিরাই মুর্খ বাকিরা সব জ্ঞানী৷

গত ১৮ সেপ্টেমবর অনুষ্ঠিত এম.বি.বি.এস পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগ তুলে আন্দোলন চলমান, আজও হচ্ছে ৷ প্রশ্নফাঁস এখন একটি ব্যধি ও বদ্ধমুল ধারণা হয়েছে “পরীক্ষা মানে প্রশ্নফাঁস” কিন্তু এটার আসল চিত্র ভিন্ন। গত অগাস্ট মাসে ৩৪ তম বি.সি.এস পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর দেখা গেল বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী প্রথম স্থান অধিকার করেছে। ব্যাস! সাথে সাথেই নানা রকম আক্রমনাত্বক মন্তব্য করা শুরু হল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। অনেকের সহ্যই হচ্ছিল না যে কেমন করে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী পরীক্ষায় প্রথম স্থান অধিকার করে। অনেকের মন্তব্য ছিল “ কোটার জোরে বি.সি.এস বা দুর্নীতি করে বি.সি.এস অথবা টাকার জোড়ে বি.সি.এস ইত্যাদি”। মূল কথা হল সে পড়াশুনা করেই বি.সি.এস পরীক্ষায় প্রথম হতে পেরেছিল কারও জোড়ে না।

আমার বোন কে ঢাকা মেডিকেল কলেজে এম.বি.বি.এস এ ভর্তি করানোর জন্য গিয়েছিলাম সেখানে ভেবেছিলাম সবাই হয়তো ঢাকার টাকাওয়ালা লোকের ছেলে মেয়ে হবে কিন্তু গিয়ে দেখলাম উল্টো চিত্র সবাই এসেছে ঢাকার বাইরে থেকে অনেকের আবার এই প্রথম ঢাকায় ১৯৭ জন শিক্ষার্থীর ১০-১৫ জন ঢাকার বাকি সব দেশের অন্যপ্রান্ত হতে আগত। এক বাবা এসেছেন গাইবান্ধার পলাশবাড়ি থেকে তার মেয়েকে ভর্তি করানোর জন্য, কিন্তু যা দেখে কষ্ট পেলাম তা হল তিনি তার মেয়ের দুপুরের খাবারের জন্য শুধু একটি ছোট বন রুটি আর দুইটি কলা জোগাড় করতে পেরেছিলেন কোন বার্গার বা জুস বা চিকেন নয়। আর এক জন বারার সাথে কথা হল তিনি তার মেয়ের ভর্তি করারনোর জন্য গ্রামীণ ব্যাংক থেকে টাকা উঠিয়েছে এবং গ্রামীণ ব্যাংকের কাছে দুই লাখ টাকার জন্য আবেদন করেছেন মেয়ের পড়াশুনার খরচ চালানোর জন্য৷ আর এক মেয়ে এসেছে পাবনা থেকে যার সারা জীবন পড়াশুনার কোন খরচ লাগেনি শিক্ষক, কোচিং সবাই তাকে ফ্রি পড়িয়েছেন কারন তার পরিবাররে তেমন কোন সামর্থ্য ছিল না পড়াশুনার খরচ চালানোর জন্য৷ আর এক জন ছেলের বাবা পেনশনের টাকা উঠিয়ে তার ছেলেকে ভর্তি করানোর জন্য এসেছিলেন । এই রকম শত উদাহারণ দেওয়া যাবে যাদের ভর্তির টাকা দিতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে, তারা নাকি টাকা দিয়ে প্রশ্ন কিনে ছেলে-মেয়েকে পরীক্ষা দেওয়াবেন! আমার কথা বিশ্বাস না হলে ঢাকা মেডিকেল কলেজে যারা ভর্তি হয়েছেন তাদের পরিবারের অর্থনৈতিক অবস্থা খোঁজ নিয়ে দেখতে পারেন।

এবার আসি ঢাকার কথায়, ঢাকায় গুটি কয়েক স্কুল কলেজের ছাত্র-ছাত্রী স্থান পেয়েছে ঢাকা মেডিকেলে যাদের সংখ্যা ১০-১৫ জন হবে৷ এই সংখ্যার মধ্যে রয়েছে ঢাকা কলেজ, আজিমপুর গার্লস স্কুল এন্ড কলেজ, ভিকারুন নেসা নুন, মাইলষ্টোন স্কুলএন্ড কলেজ, মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল এন্ড কলেজ এর শিক্ষার্থী৷ ১৯৭ জনের মধ্যে এই সংখ্যায় নেহায়েত কম, ঢাকার কম করে হলেও ৫০ শতাংশ থাকা উচিৎ ছিল৷ প্রশ্নপত্র টাকাদিয়ে কিনলে এদের মধ্যে একজনের প্রথম হওয়া উচিৎ ছিল কিন্তু তা হয়নি। ঢাকা মেডিকেলের সর্বোচচ মার্ক ৯৫ আর সর্ব নিম্ন ৮৪, প্রশ্ন পত্র ফাঁস হলে এই রেঞ্জের মধ্যে মাত্র ১৯৭ জনের স্থান হওয়ার কথা না, সংখ্যাটা আরও বেশি হওয়া ছিল যুক্তিসঙ্গত৷ প্রশ্ন পেয়ে ৯০ টির উপর এম.সি.কিউ পূরণ করবে না এমন বোকারা কি প্রশ্ন কিনবে ? বেশি ভাগ শিক্ষার্থীই দেশের আনাচে কানচের কলেজে থেকে পাশ করা, যারা ঢাকায় কোচিং করেননি ৷ কোচিং সেন্টার গুলো বুকফুলিয়ে বিজ্ঞাপন দিতেও পারছে না ঢাকা মেডিকেলের প্রথম ৪০ জন “ম” কোচিং সেন্টারের বা ৫০ জন “র” কোচিং সেন্টারের ইত্যাদি।

এই পরীক্ষার মাধ্যমে মূলত কোচিং সেন্টারের দুর্বলতাই প্রকাশ পেল যার কারণে ঢাকার বেশি ভাগ কোচিং সেন্টার মালিক হতাশ। এই মালিকরাই চলমান আন্দোলনের পেছনে অর্থনৈতিক ও সাংগঠনিক সহায়তা প্রদান করছে। ইউজিসির যে ব্যাক্তি কে র‍্যাব প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগে গ্রেফতার করেছিল, দুঃজনক ভাবে র‍্যাবের হেফাজতে মৃত্যু হয়েছে; সেই ব্যাক্তি জুডিশিয়াল সারভিস কমিশনের লিখিত পরীক্ষার খাতা সরিয়েছিলেন৷ ছাত্র ছাত্রীদের এই আন্দোলনে ঘুরে ফিরে অনেক পরিচত মূখের দেখা মেলে যাদের সব আন্দোলেই আগে পিছে দেখা যায়, যারা অন্যের আন্দোলন হাইজ্যাক করতে দারুন পটু, যারা ঢাক-ঢোল পিটাতে পিটাতে আপনার পেছনে থেকে সামনে চলে আসে, যারা তিল কে তাল বানাতে ১ সেকেন্ড সময় নেন না তারাই এখন এই আন্দোলনে সেনা নায়কের ভূমিকা পালনে ব্যাস্ত৷ যে সব ছেলে মেয়ে জটিল দুনিয়ার কুটিলপ্যাচ বোঝার ক্ষমতা নেই তাদের কে সামনে নিয়ে কতিপয় লোভাতুর ব্যাক্তির নিজ সার্থে ব্যাবহার করা এই আন্দোলন এই সব শিক্ষার্থীর ভবিষ্যত জীবনে কি প্রভাব ফেলবে তা এখন চিন্তার বিষয়৷ এই সব ছেলে মেয়েরা নিজেদের ইমোশনের জায়গা থেকেই এই আন্দোলনে সূত্রপাত করেছিল কিন্তু বিধিবাম এরা ভূল লোকজনের ফাঁদে পা দিয়েছে, এরা যখন এই সকল ছল চাতুরি বুঝতে পারবে ততক্ষণে এই সব ব্যাক্তির ফায়দা হাসিল করা শেষ হয়ে যাবে। এভাবেই এদেশের এক এক টি আন্দোলন বা বিপ্লবের সূত্রপাত বিনাশ হয়৷ এভাবেই শত তরুণে টগবগে রক্তের উচ্ছাস্ব নিমিষেই বিলীন হয়ে যায় হতাশায়, ফলে এই সব তরুণরা আগামীদিনে আর কোন আন্দোলন বা সংগ্রামে এগিয়ে আসবে না, ভবিষ্যতের আন্দোলন অঙ্কুরেই বিনাশ৷ Perception খুব রোমাঞ্চকর, ফ্যান্টাসি বা অনুভূতির হতে পারে কিন্তু Reality নির্মম নিষ্ঠুর৷
ফেইসবুকে আমি https://www.facebook.com/ershad.pahlowan