ক্যাটেগরিঃ প্রকৃতি-পরিবেশ

 

subdarbans
সুন্দরবন শুধু একটি বন নয় এটি ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, বিশ্বাস ও জীবন-ধারার অংশ| এটি বিশ্বে প্রথম ম্যানগ্রোভ বন হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে ও পরবর্তিতে ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্যের অন্তভুক্ত করে।১০ হাজার বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই বন বাংলাদেশ অংশে পড়েছে প্রায় ৬০% যা সমগ্র বাংলাদেশের আয়তনের ৪.০৭%। সাধারণ ভাবে সুন্দরবন কে দ্বি-মাত্রিক দেখালেও এটি আসলে ত্রি-মাত্রিক বন কারন এই সুন্দর বনের নিচে আরও কয়েকটি সুন্দরবনের সন্ধান পাওয়া গিয়েছে, ১০-১২ হাজার বছর পূর্বে ঐ সব বনের অস্তিত্ব ছিল। সুন্দর বন শুধু পুর্ব-পশিচম বা উত্তর দক্ষিণ বরাবর ই অবস্থান পরিবর্তন করে না এটি উপর-নিচ বরাবর অবস্থান পরিবর্তন করে। সমুদ্রপৃষ্টের উচ্চতা বৃদ্ধি পেলে এই বন ডাঙ্গার দিকে অগ্রসর হয় আর সমুদ্রপৃষ্ট নিম্নগামী হলে এই বন সমুদ্রের দিকে অগ্রসর হয়। সধারন দৃষ্টিতে সুন্দরবন কে স্থির মনে হলেও দীর্ঘ সময়ের ব্যাবধানে এটি সব দিকে চলমান।আর আজ যে সুন্দরবন গড়ে ওঠেছে এর বয়স প্রায় ২০০০ বছর। ১২ হাজার বছর আগে বনের অবস্থান ছিল ৪৬ মিটার নিচে এরপর ১০২০০,৭০০০,৬৫০০,৩০০০ বছর আগে যথাক্রমে ২৮,২০,১৩,৩ মিটার নিচে ছিল। ১৮৫৮ থেকে ২০১৫ এই সময় পযন্ত একেক সময়ে এর আয়তন একেক রকম ছিল, ১৮৫৮ সালে আয়তন ছিল প্রায় ১৪০০০, ১৯১৪ এ ছিল ২০৭২০, এবং এখন ১০০০০ বর্গ কিমি। বর্তমান বাগেরহাট, খুলনা সদর এলাকা গুলো একসময় এই সুন্দর বনের অংশ ছিল। সুন্দর বন প্রতিবছর ৪.৮ বর্গকিলোমিটার হারে হ্রাস পাচ্ছে অপরদিকে বাংলাদেশের অংশে হ্রাস পাচ্ছে প্রায় ৩ বর্গকিলোমি্টার করে। বাংলাদেশের সুন্দরবন প্রাকৃতিক ও অপ্রাকৃতিক এই দুই কারণে হ্রাসের সমুক্ষীণ হচছে।আমার গবেষণা থেকে বলতে পারি সুন্দর বন প্রতিবছর ৩ বর্গ কিলোমি্টার হারে হ্রাস পাচ্ছে অপরদিকে সুন্দরবনের পুর্ব থেকে মেঘনা মোহনা পযন্ত ১ বর্গকিলোমিটার হারে ভুমি বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা গত মাসে ফ্রান্সের তালুস এ আন্তর্জাতিক দুরঅনুধাবন সম্মেলনে উপস্থাপন করেছিলাম।মুলত সুন্দরবনে পানির প্রবাহ কমে যাওয়া এবং দক্ষিনের নদীগুলো দখল হওয়ায় পলির পরিমান কমে যাওয়া সুন্দরবনের ক্ষয়ের পরিমান বৃদ্ধি পেয়েছে। এই অবস্থার জন্য দ্বায়ী নদী গুলোতে বাঁধ ,পোল্ডার, অসংখ্য স্লুইসগেট কালভাট এবং ভারতে সৃষ্ট ফারাক্কা বাধ যা পানি প্রবাহের হার কমিয়েছে ও পলিপরিবহন কে করেছে বাঁধাগ্রস্ত। পাঁক শাসন আমলে লোনা পানির হাত থেকে প্লাবন ও জলাভুমি কে রক্ষা করার জন্য যশোর ও খুলনায় ৪০ টি পোল্ডার নির্মান করা হয়েছিল এর ফলে নদীর পানি বিশেষ করে জোয়ারের পানি এই সব এলাকার প্লাবন ভুমি তে প্রবেশ করতে পারছেনা। পানি প্লাবন ভুমিত প্রবেশ না করতে পারায় একদিকে পলি নদীর বুকে জমা হছে অন্যদিকে প্লাবন ভুমি উচু হতে পারছেনা এই সব কারণে যশোর খুলনা অঞ্চলে জলাবদ্ধতা লেগেই আছে। এই সব কারণে সুন্দর বন প্রাপ্য পানি ও পলির থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এই পানি ও পলির অভাবে সুন্দরবনের বেঙ্গল টাইগার আজ অস্তিত্ব সংকটে ভুগছে কারন বাঘ তার আবাস্থল গড়েতুলে অপেক্ষাকৃত উচু স্থানে। আর এই সব উচু স্থান তৈরি হয় নদী ও খাল দিয়ে বয়ে নিয়ে যাওয়া পলির দ্বারা। যেহেতু প্রাকৃতিক এই সব ভুমি ক্রমান্বয়ে দেবে যাচছে তাই বাঘ আবাস্থল ও সুপেয় পানির সঙ্কটে ভুগছে। এছাড়া চোরা শিকারি ও বনদস্যুদের উৎপাত লেগেই আছে। এসব কারণে বাঘের সংখ্যা এখন মাত্র ১০০শ তে ঠেকেছে যদিও কেউ কেউ বলে বাঘমামা নাকি ওপারে বেড়াতে গেছে আবার ওপার থেকে উত্তর আসে বাঘমামারা কেউ বেড়াতে আসেনি।
অপরদিকে মংলা পোর্টটি তৈরি করা হয়েছে সুন্দরবনের কোল ঘেঁষে যা সুন্দরবনের স্বাভাবিক বৃদ্ধি কে সংকুচিত করেছে। এই পোর্টে আসা হাজার হাজার জাহাজ থেকে নির্গত তেল ও বর্জ্য সুন্দর বনের পশুর নদীতেই ফেলা হচছে যা ওপেন সিক্রেট। এই সব জাহাজ রাতে ফ্লাড লাইটের কারণে সুন্দরবনের বাদাবনে বসবাসকারী প্রাণীকুল হারাচছে তাদের জীবন ধারা বিশেষ করে এই সব প্রানীর বংশবৃদ্ধি প্রক্রিয়া ক্ষতিগ্রস্থ হচছে। আবার এই মংলা পোর্টের প্রায় ২০০ শত একর জায়গা নিয়ে গড়ে তোলা হচ্ছে ইপিজেড যা প্রাকৃতিক পরিবেশের হুমকি স্বরূপ। এছাড়া জাহাজ নির্মান শিল্প, সিমেন্ট তৈরির কারখানা ও নানা রকম স্থাপনা তৈরি করা হয়েছে সুন্দরবন এর উত্তর প্রান্ত ঘেঁষে। এর মানে এই নয় আমি শিল্পায়নের বিরুদ্ধে, দেশের উন্নয়নের জন্য শিল্পায়ান অতিব জরুরি কিন্তু এই শিল্পায়ন করতে হবে সঠিক পরিবেশ গত প্রভাব সমীক্ষার মাধ্যমে। আমাদের দেশের EIA এর নামে যা করা হয় তা প্রকৃতপক্ষে প্রহসন ছাড়া কিছু নয় । এই ধরনের EIA ফিল্ড ভিজিট ছাড়াও ঘরে বসে করে দেওয়া সম্ভব। বাংলাদেশের EIA নিজেই জিম্মি হয়ে আছে একদল সিভিল ইঞ্জিনিয়ারদের হাতে। দুই একটা পানি ও সয়েল সেমপল নিয়ে প্রতিবেদন জমা দিলেই EIA হয় না, যাদের বাস্তুবিদ্যা ও প্রানীবৈচিত্র সম্পর্কে ধারনে নেই তারই তৈরি করে EIA।
এবার আসি রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মান প্রসঙ্গে, বাংলাদেশ ও ভারতের যৌথ বিনিয়োগে বাস্তবায়নাধীন এই প্রকল্প নিয়ে সরকার এবং পরিবেশবাদী ও কয়েকটি বাম সংগঠন মধ্যে বিতর্ক এখন তুঙ্গে।সরকার এখন মরিয়া এই প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য কারন যেকোন মুল্যেই হোক সরকার কে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে হবেই।কারন বিদ্যুৎ ছাড়া দেশের শিল্প উন্নয়ন বাধাগ্রস্থ হবে এটা কারও কাম্য নয়। সরকার কে এই প্রকল্প নিয়ে চিন্তা করতে হত না যদি তেল গ্যাস বন্দর ও বিদ্যুৎ রক্ষা কমিটি বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি নিয়ে নোংরা রাজনীতি না করত। বড় পুকুরিয়ার কয়লা কে যদি উন্মুক্ত খনন পদ্ধুতিতে তোলা হত তাহলে সেই কয়লা দিয়ে এই রকম ১৩৫০ মেগাওয়াটের কয়েকটি বিদ্যুৎ কেন্দ্র চালানো যেত। ভূগর্ভস্থ খনন পদ্ধুতিতে মাত্র ৩৫% কয়লা তোলা সমভব বাকি কয়লা আজীবন মাটির নিচেই থেকে যাবে। কোন খনি আন্ডারগ্রাউন্ড না ওপেন পিট মাইনিং এর মাধ্যমে তোলা হবে তা কোন দেশের প্রধানমন্ত্রী বা এই ধরণের তেল গ্যাস বন্দর ও বিদ্যুৎ রক্ষা কমিটির ইচছার উপর নির্ভর করে না। এটা নির্ভর করে ওই কয়লা খনির বৈশিষ্টের উপর এবং এর সাথে আরও অনেক প্যারামিটার আছে যেমন কয়লার মার্কেট ভ্যলুর উপর। ভুমি নষ্ট হবার যে অজুহাত দেখানো হয় তা বিভ্রান্তিকর কেননা এখন আন্ডারগ্রাউন্ড মাইনিং এর ফলে ভুমি দেবে যাবার ঘটনা দেখা যাচছে এবং পুরো মাইনিং শেষ হবার সাথে সাথে এই খনি এলাকা একটি বিলে পরিণত হবে তখন ক্ষতিপূরণ আদায় করেও কোন ফায়দা হবে না। ক্ষতি যা হবার তাই হবে কিন্তু ওই এলাকার মানুষ তার প্রাপ্য অধিকার থেকে বন্চিত হল আর দেশ হারাল তার প্রাকৃতিক সমপদ।

ভারতের ন্যাশনাল থারমাল পাওয়ার কর্পোরেশন (এনটিপিসি) ও বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড যৌথ বিনিয়োগে এই প্রকল্প কে বলা হছে সুপার ক্রিটিক্যাল বা আল্ট্রা সুপার ক্রিটিক্যাল কোল পাওয়ার জেনারেশন। যাই বলা হোক না কেন মুলত এটি এনটিপিসি এর একটি টেষ্ট কেস, যদি এনটিপিসি এই প্রকল্পে সফল হতে পারে তাহলে তারা বিশ্বব্যাপী তাদের সক্ষমতা প্রদর্শনের সুযোগ পাবে। এখানে সুন্দরবন একটি গিনিপিগের ভুমিকায় আর রামপাল বিদ্যুৎ প্রকল্প ঔষধ / বিষের ভুমিকায় অবতীর্ন । প্রশ্ন হল রামপাল কেন এই প্রকল্পের জন্য বিবেচতি হল? উত্তর টা সধারন হিসেবে দিলে “এটা সমপুর্ন্য ভাবে প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্ট এর ব্যাপার” কিন্তু গভীরে গেলে উত্তর টা হবে “নিজেদের মার্কেটিং পলিসির একটা অংশ” কারন সুন্দরবনের আশে পাশে এই ধরনের প্রকল্প করলে তা বিশ্বব্যাপী আলোড়িত হবে। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে এই প্রকল্পে পরিবেশ তথা সুন্দরবনের উপর কোন বিরুপ প্রভাব পড়বে না কিন্তু যে কোন স্থাপনা পরিবেশের উপর প্রভাব বিস্তার করে এটি চিরন্তন সত্য। এখন এই প্রকল্প পরিবেশের উপর কি প্রভাব ফেলবে আর পরিবেশ এর কতুটূকো সহ্য কররা ক্ষমতা রাখে তা পরিষ্কার করা উচিৎ। এই প্রকল্পের Economic IRR (internal Rate of Return) ১১.৯%, সাধারনত আমাদের দেশে Economic IRR ১১% এর আশে পাশে থাকলেই তার অনুমোদন দেয় সরকার। এই প্রকল্প যে খুব উচচ মাত্রার অর্থনৈতিক প্রভাব ফেলবে তা নয় কিন্তু দেশের সামগ্রিক অবস্থা বিবেচনায় গুরুত্ব বহন করে।

ইতিমধ্যে সুন্দরবনের উপর প্রভাবের কথা বিবেচনা করে ফ্রান্সের তিনটি ব্যাংক এই প্রকল্প থেকে অর্থায়নের প্রস্তাব ফিরিয়ে নিয়েছে এবং ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্যের মর্যাদা কেড়ে নেওয়ার হুমকি দিয়েছে। সরকার বার বার অস্বীকার করে বলছে এই প্রকল্প কোন প্রভাব ফেলবে না কারন এটি সুন্দরবন হতে ৬৫-৭০ কিলোমিটার দূরে কিন্তু সত্য হচছে প্রকল্প সুন্দর বন থেকে ১৪ কিলোমি্টার দূরে আর সুন্দরবন রিজার্ভ ফরেষ্ট যা বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ তা থেকে ৬৫ কিলোমিটার দূরে।

সবাই যখন বায়ুদূষণ নিয়ে চিন্তিত তখন আমি উপলব্ধি করি এই প্রকল্প সবচেয়ে বেশি দূষিত করেব পানিকে। এই প্রকল্পে কয়লা থেকে উৎপন্ন কালোধোঁয়া দুরীকরনে যে পানি ও রাসায়নিক ব্যাবহার করা হবে তা নদীর পানি ও ভূগর্ভস্থ পানিকে বিষাক্ত করে তুলবে। ঘণ্টায় ৫১০০ ঘনমিটার দুষিত পানি গিয়ে মিশে যাবে পশুর নদীতে এবং সবার শেষে এই পানির ঠিকানা হবে সুন্দরবন।সুতরাং এই পানি সুন্দরবনের পরিবেশের উপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলবে তা সুনিশ্চিত ভাবেই বলা যায়।

ফারক্কার পানি প্রত্যাহার, পলি ও জলের প্রবাহ কমে যাওয়া, মংলা বন্দরগামী জাহাজ চলাচল, ইপিজেড, জাহাজ নির্মান, কারখানা সিমেন্ট কারখানা, বন্যভুমি দখল, এনটিপিসির ক্ষমতা প্রদর্শন ও সর্বশেষ রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মান এসব কিছুর বিবেচনায় সুন্দরবনের অবস্থা এখন সুপার ক্রিটিক্যাল ।।।।

ফেইসবুকে আমি https://www.facebook.com/ershad.pahlowan