ক্যাটেগরিঃ প্রকৃতি-পরিবেশ

 

রামপাল বিদ্যুৎ প্রকল্প বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি আলোচিত, সমালোচিত এবং বিতর্কিত প্রকল্প। সরকার ও পরিবেশবাদীদের যুক্তি ও পাল্টা যুক্তি-তর্কে রমাপাল নাম টি দেশের প্রত্যেকটি মানুষের মনে একটি নেতিবাচক শব্দতে পরিনিত হয়েছে। সরকারে পক্ষ থেকে মোটা দাগে একটি কথা উচ্চারিত হয় শুধু মাত্র ভারত বিরোধিতার কারনে রামপাল প্রকল্পের বিরোধিতা করছে পরিবেশবাদীরা, সরকারের এই যুক্তি একটি অবিবেচকের উক্তি বলে মনে করি। প্রথম দিকে শুধু পরিবেশবাদীরা এর বিরোধিতা শুরু করেছিল এখন দেশের বেশিভাগ মানুষই এই প্রকল্পের বিরোধী, তাহলে কি দেশের সকল মানুষই ভারত বিরোধী? ১৯৭১ সালের আগে যারা পাকিস্থানের বিবেকহীন সিদ্ধান্তের বিরোধিতাকারীদের ইসলাম বিরোধী বলে মনে করত তার আর এখন যারা রামপাল প্রকল্পের বিরোধিতাকারীদের ভারত বিরোধী বলে মনে করে এই দুই পক্ষের মধ্যে কোন পার্থক্য পরিলক্ষিত হয় না। দেশের প্রতিটি নাগরিকের অধিকার আছে তার চিন্তা, যুক্তি, মত, তার মস্তিষ্ক প্রসূত কল্পনা সব কিছুই প্রচার এবং প্রসার করার। একদিকে চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতার পথ সংকুচিত হয়ে আসছে অন্যদিকে দেশে উগ্রবাদ ও ধর্মান্ধতা মাথা চাড়া দিয়ে উঠছে।

Rash+Mela+Sundarbans_0010

মানুষ কেন এর বিরোধিতা করছে? সুন্দরবনের প্রচলিত সীমানা থেকে ১৪ কিলোমিটার আর ইউনেস্কো ঘোষিত ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ লোকেশন থেকে ৭০-৮০ কিলোমিটার উত্তরে ১৮৩০ একর কৃষি জমিতে নির্মিত হচ্ছে এই বিদ্যুৎ কেন্দ্র। ৬৬০ মেগাওয়াট ক্ষমতা সম্পন্ন দুটি, মোট ১৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতা সম্পন্ন এই কেন্দ্রের জমি অধিগ্রহনে বাস্তুচুত্য হয়েছে ২২০০ টি পরিবার। বেশিভাগ পরিবারের কাছে এই প্রকল্পের কথা গোপন করেই জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে(সুত্রঃ বিবিসি বাংলা ৬ অক্টোবর ২০১৩)। বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য বছরে ৪৭ লাখ ২০ হাজার টন কয়লা পুড়ানো যার সব কয়লা ই বিদেশ থেকে আমদানি করা হবে। এই কয়লা মাদার ভেসেল থেকে সুন্দরবনের আকরাম পয়েন্টে আনলোড করা হবে এবং বছরে ৪০০০ লাইটার জাহাজ পুশুর নদী দিয়ে যাতায়াত করবে। শুধু এই কয়লা পরিহনের কারনে পশুর নদী সংলগ্ন বাদাবনের জীববৈচিত্র হুমকির মুখে পড়বে। কারন এই সব জাহাজ চলালের সময় আলো, শব্দের কারনে বিভিন্ন জীবের প্রজননের সময়ের পরিবর্তন ঘটবে ফলে ওই সব প্রাণীর বংশবৃদ্ধি সহ বিভিন্ন ধরনের পরিবর্তন ঘটবে। ৪৭ লাখ ২০ হাজার টন কয়লা পুড়লে ৯ লাখ ৫০ হাজার টন বাইপ্রোডাক্ট বের হবে যা সঠিক ভাবে সংরক্ষণ করাটা বিপদজনক, কয়লাতে প্রচুর পরিমানে বিষাক্ত আর্সেনিক, ক্যডমিয়াম, লেড সহ আরও খনিজ পদার্থ নির্গত হয়। বড় পুকুরিয়া থেকে নির্গত আর্সেনিক এবং অন্যান খনিজ দ্রব্য পানিতে মিশে গিয়ে মারত্বক পরিবেশ বিপর্যয় হচ্ছে, যার আমাদের চোখে অঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে এই ধরনের প্রকল্প গুলি পরিবেশের কি পরিবর্তন করে। অন্যদিকে সুপার-ক্রিটিক্যেল টেকনোলোজিতে ফিল্টারিং সিস্টেমে ব্যাবহার করা হবে পানি সেই পানির ভিতর দিয়ে বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে উৎপন্ন কালো ধোঁয়াকে চালনা করা হবে আর সেই পানি দ্বারা শোষিত হবে সব বিষাক্ত গ্যস সমুহ। এই গ্যস সমূহ পানিতে মিশে গিয়ে পানির আমলত্ব পরিবর্তন করবে এবং ওই সব ফ্লাইএষ পানি দ্বারা পরিবাহিত হয়ে আবার সেই পশুর নদীতে পড়বে। পশুর নদী সেই পানি বহন করে নিয়ে যাবে সুন্দর বনে আর এই পানিতে থাকা ক্ষুদ্র কয়লার কনা মাটির ভিতর অক্সিজেন চলচল বাধাগ্রস্থ করবে ফলে মাটির নিচে বসবাস করা জীবদের স্বাভাবিক জীবন রীতিতে পরিবর্তন আসবে। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে সুন্দরীর শ্বাসমূলের শ্বাস নেওয়া বন্ধ হয়ে যাবে ফলশ্রুতিতে সুন্দরবনের শ্বাস নেওয়াই কষ্টকর হবে। যে আমাদের শ্বাস যোগাচ্ছে আমরা তারই শ্বাস বন্ধ করে দিচ্ছি? ক্ষতির আরও দিক আছে যেগুলো নাই বললাম।

অন্যদিকে, “এক্সিম ব্যাংকের দেওয়া শর্ত অনুযায়ী, ১৬০ কোটি ডলারের ঋণ পরিশোধ করতে হবে ২০ বছরে। সাত বছর পর থেকে ঋণের নিয়মিত কিস্তি পরিশোধ শুরু হবে। ২৭টি অর্ধবার্ষিক কিস্তিতে এক্সিম ব্যাংককে ঋণ পরিশোধ করতে হবে। ঋণের সুদের হার হবে লন্ডন আন্তব্যাংক হারের (লাইবর) সঙ্গে ১ শতাংশ সুদ যোগ করে। গত জুন মাসের হিসাবে লাইবর দশমিক ৯৩ শতাংশ।এ ছাড়া ঋণের অব্যবহৃত বা ছাড় না করা অর্থের ওপর বার্ষিক দশমিক ৫ শতাংশ হারে সুদ দিতে হবে। ঋণ প্রক্রিয়াকরণের জন্য ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানের পরামর্শক মাশুল ২ লাখ ডলারও দিতে হবে বিআইএফপিসিএলকে।বাংলাদেশের স্বার্থেই প্রকল্পটি নেওয়া হয়েছে। উৎপাদিত বিদ্যুৎ বাংলাদেশই পাবে তাই এ ঋণের জামিনদার বাংলাদেশ সরকার” (সুত্রঃ প্রথম আলো আগস্ট ২৪, ২০১৬) মোর্দ্দাকথা হচ্ছে প্রকল্প হোক না হোক ঋনের দায়ভার আমাদের কেই বহন করতে হবে।

এটা অস্বীকার কিছু নেই, এই কেন্দ্রে উৎপাদিত বিদ্যুৎ দেশের অর্থিনিতিতে আবদান রাখবে কিন্তু এত কিছু বিসর্জন দিয়ে এই বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হচ্ছে কার স্বার্থে? এই প্রকল্পের আই আর আর বা ইন্টারনাল রেট অফ রিটার্ন যাই হোক না কেন, প্রজেক্ট ম্যনেজমেন্টের সব শেষ কথা হচ্ছে যেই প্রকল্প মানুষের অন্তরে আঘাত করে আর সিনিক ভ্যলুকে ক্ষতি করে সেই প্রজেক্টে লাভ ক্ষতি যাই যোক তা বস্তবায়ন করা যায় না।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শুনেছি স্বয়ং ঈশ্বরও নাকি মানুষের আত্বার আকুতি শুনে তাতে সায় দেন, আপনি তো মানুষ, তবে কি এই ১৬ কোটি মানুষের আত্বার আকুতিকে এক বারের জন্য হলেও সায় দেবেন না?

ফেইসবুকে আমি https://www.facebook.com/ershad.pahlowan