ক্যাটেগরিঃ চিন্তা-দর্শন

প্রিয় লেখক,
আপনার ওপর হামলা হয়েছিল  নাস্তিক্যের অপরাধে। সেদিন থেকে শুরু করে আজ যখন আপনি সুস্থ হয়ে ফিরে এসেছেন আমাদের মাঝে, এখন পর্যন্ত আপনার ধর্মীয় বিশ্বাস ও অবিশ্বাস প্রসঙ্গে পক্ষে-বিপক্ষে আলোচনার যেন শেষ নেই। কলামিস্টরা তড়িঘড়ি করে কলাম লিখতে শুরু করলেন। কিছু ব্যক্তিরা মুহূর্তেই আপনাকে নিজেদের ‘গোত্রভুক্ত‘ করে ফেললেন। কেন? কারণ আপনার ওপর নাস্তিক্যের অপবাদ দিয়ে হামলা করা হয়েছিল। তাই সমাজে কিছু ‘ঈশ্বরে অবিশ্বাসী‘ ব্যক্তিরা, ধর্মান্ধদের ওপর, এমন কি  বিশ্বাসীদের ওপরও তীব্র ঘৃণা আর নিন্দা ছুড়ে দিয়ে তর্কে-লেখায়-ষ্ট্যাটাসে মেতে উঠেছিলেন। তেমনি নামাজ-কোরআন পড়া বা না পরা মুসলিমরাও নিজেদেরকে মুমিন বান্দা হিসেবে প্রমানে অপরপক্ষের ওপর চড়াও হয়েছিল। আর সেই সময়ে আমরা বিহ্বল আপনাকে যদি হারিয়ে ফেলতে হয় সেই ভয়ে, তখন আমরা ব্যস্ত কিছুক্ষণ পরপর আপনার স্বাস্থ্যের আপডেট নেয়ায়।
তখন সুশীল সমাজের অনেক বিখ্যাত কিংবা অখ্যাত  ব্যক্তি যারা কিনা নিজেদের মুক্তচিন্তক হিসেবে মনে-প্রাণে বিশ্বাস করেন অাপনার জন্য ব্যাকুল হয়ে পরেছিলেন। আজ যখন আপনি সুস্থ হবার পথে, তখন তারাই এবার আপনার বিপক্ষে ব্যঙ্গ করছে! বলুন তো এবার কেন এই ব্যঙ্গ ও সমালোচনা? এবার তারা আর আপনাকে নিজেদের ‘গোত্রের‘ বলে মনে করছেন না বরং আপনাকে নিয়ে বিশেষভাবে লজ্জিত ও বিব্রত! কেন? কারণ আপনি ও আপনার পরিবার বলেছেন, আল্লাহর অশেষ রহমতে অাপনি বেঁচে আছেন এবং সুস্থ হবার আশাও করছেন।  হায় হায়, জাত গেল জাত গেল বলে, একি আজব কারখানা! অাপনি তো ঈশ্বরের কথা বলে নিজের ‘জাত‘ মেরে দিলেন! বিজ্ঞানে ও যুক্তিবাদে আপনার বিশ্বাস ও জ্ঞানের অপরিসীমতা নিয়ে যারা আপনার পক্ষে সাইবার জগতে ঝড় তুলে দিলেন, তাদের আপনি এভাবে অপদস্থ করে দিলেন! কি সর্বনাশের কথা। এবার তো আপনি এদেরকেও নিজের বিরোধী পক্ষ বানিয়ে দিলেন!  তারা কিন্তু এমনও বলেছেন যে, ডাক্তারদের ধর্মঘট করা উচিৎ কারণ আপনি বলেছেন যে, অাপনাকে সারিয়ে তুলেছেন আল্লাহ! কী উপায় হবে এখন?
অাপনি বিশ্বাস করুন আর নাই করুন, আপনার ভক্তরা এটুকু পড়েই আমাকে গালি দিতে শুরু করবে। আবার যারা আপনার ভক্ত নয় তারাও গালি দিতে থাকবে। তবে আমি বলছি কি, আপনি আসলে কাদেরকে পথ দেখাবেন? আপনি বলেছেন বিভ্রান্তদের সাথে কথা বলতে ইচ্ছুক। কারা সেই বিভ্রান্ত? অাপনি কি দেখতে পাচ্ছেন না যে, কোরআন পড়ে না বুঝে  কিংবা না পড়ে যারা বিভ্রান্ত, তারা ধর্মান্ধ, তাদের চিন্তা পরিধি শিকলে বন্দী। আবার যারা নিজেদেরকে নাস্তিক বলে মুক্তচিন্তক বলে দাবি করছেন, তারা মুক্তচিন্তার দোহাই দিয়ে যে বিশ্বাসে নিজেদের আবদ্ধ করছেন যা কিনা তাদেরকেও অন্ধ করে রেখেছে, নয় কি?
অামি হতাশ! এই আস্তিক্য-নাস্তিকের প্রোপাগান্ডায় নিজেকে কুলষিত মনে হচ্ছে, ক্লান্ত বোধ করছি। অাপনিই বলেন মুক্তচিন্তা কী? আপনিই বলেন, মুক্তচিন্তায়ও যদি গোঁড়ামিই চর্চিত হবে, তবে অার বিশ্বাসী-অবিশ্বাসীদের অথবা গোঁড়া-মুক্তচিন্তকদের মাঝে পার্থক্য কোথায়? মুক্তচিন্তকরা যদি অন্যের চিন্তা বা বিশ্বাসকে সম্মানই দিতে না শেখে, মেনেই নিতে না পারে, ব্যঙ্গ করে অন্যান্য ধর্মীয় বিশ্বাসীদের মতোই, তবে তারা কিভাবে এই সমাজের চিন্তাকে বদলানোর আশা করেন? যখন কেউ ধর্মে  বিশ্বাস দেখে ব্যঙ্গ করে দৃঢ় প্রত্যয়ে জানতে চান যে, ইসলামে আল্লাহ একটি কাল্পনিক চরিত্র নয় সেটি প্রমান করতে পারবো কিনা, তখন অাপনি কি তার এই বিভ্রান্তি দূর করতে পারবেন যে, আল্লাহ যে কাল্পনিক কোন চরিত্র, সেটি তিনি প্রমাণ করতে পারবেন কিনা?
কেন কেউ এটা বুঝতে পরে না যে, আস্তিক্য ও নাস্তিক্যর অবস্থান অাসলে একই দড়ির ওপরে? কেন তারা বোঝে না যে, দু’দলই এমন কিছু বিশ্বাস করছে যেটা তাদের অজানা, যেটা শুধুমাত্র বিশ্বাসের ওপরেই ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে রয়েছে? কেন তাঁরা বোঝে না যে, তাদের কোন পক্ষেরই এই ক্ষমতা নেই তাদের নিজেদের বিশ্বাসকে প্রমাণ করার? কেন যার যার বিশ্বাস, তার তার কাছে এই সত্যটিকে আমরা সম্মান করতে পারি না? অাপনি কিসে বিশ্বাস করেন কী করেন না, সেটি কি একান্তই আপনার ব্যক্তিগত বিষয় নয়?
প্রিয় স্যার,
আপনি এমন এক সমাজের পরিবর্তন করার জন্য নিজের জীবন সঁপে দিয়েছেন, যেখানে কিনা আপনার ব্যক্তিগত বিশ্বাস কিংবা অবিশ্বাস নিয়ে ভরা সভাতে কৈফিয়ত দিতে হয়। সেই সমাজ যেখানে অন্য অনেকের মতোই আপনার বিশ্বাস কিংবা অবিশ্বাসের ওপর নির্ধারিত হয়, আপনাকে বাঁচিয়ে রাখা হবে কি মেরে ফেলা হবে! সেই সমাজ যেখানে ‘প্রগতিশীলরা‘ ধরেই নেন যে, আপনি ইসলাম ধর্মে কতটা বিশ্বাস করেন সেটির প্রমাণ দেবার জন্য আপনার কোরআন পঠনের প্রসঙ্গেও অালোচনা করতে হয়। কেন এবং কোন প্রসঙ্গে আপনি এই মন্তব্য করেছেন যে ‘প্রগতিশীল‘রা এটাই বুঝতে পারেন না, তারা কিভাবে বিপ্লব ঘটাবে ঘুনে ধরা মানসিক কাঠামোতে এটা নিয়ে আমি বিভ্রান্তিতে আছি! সেই সমাজ যেখানে অন্যায়, জামাতি সংগঠন আর যুদ্ধাপরাধীদের নিয়ে কথা বললেই অনেকের মতো আপনাকেও নাস্তিক বলে প্রচার করা হয়, সেই সমাজ যেখানে ক্ষমতার কর্ণধাররাই বলেন যে, হামলাকারীরা জাহান্নামে যাবে! অথচ কবে সে জাহান্নামে যাবে এই অপেক্ষায় না থেকে এ ধরনের সকল হামলা এবং হত্যা মামলাগুলো সুরাহার ও অপরাধীদের শাস্তি দেবার কোন আভাস আদৌ দেখা যায় না!
স্যার, এটি সেই সমাজ যেখানে আপনি আস্তিক কিংবা নাস্তিক, যাই হোন না কেন বিরোধী পক্ষ তৈরী হবেই আপনার। কারণ আপনি বদল চাইছেন, সেটা শুধু কলমে নয়, স্বশরীরে মাঠে নেমে। অন্য আর দশজন মুক্তচিন্তকদের মতো রোমান্টিসিজমের বশে নয়, বরং বাস্তবতাকে উপলব্ধি করে। সমাজের মাথাগুলোই যখন গভীর বিভ্রান্তিতে তখন অাপনি কাকে রেখে কার বিভ্রান্তি দূর করবেন? কাকে রেখে কাকে নিজের শত্রুর তালিকা থেকে ছাঁটাই করবেন? পিঠ বাঁচিয়ে চলা আপনার অভ্যাস নয়, তাও বলি, যা কিছুই করবেন, শুধু মনে রাখবেন আপনাকে এই দেশের খুব প্রয়োজন। অামাদের জন্য,আমাদের সন্তানদের জন্য আরও অনেক বছর আপনাকে বেঁচে থাকতে হবে।