ক্যাটেগরিঃ ভ্রমণ

অনেকদিন থেকেই ভাবছিলাম কাতালোনিয়ার রাজধানীটা একবার ঢুঁ মেরেই আসি। আমরা লিওনেল মেসির এমনই ভক্ত যে, আমাদের পুত্রের নামও তাই লিওনেল রেখেছি। তাই একবার ঘুরে না আসলেই নয়।

যেমন ভাবা, তেমনিই কাজ। আমাদের খুব প্রিয় ভাই ও ভাবী আর তাদের ছোট্ট রাজকন্যাকে নিয়েই ভ্রমণ পরিকল্পনা শুরু করলাম।  আমাদের দলে এবার দুজন  ছোট্ট এবং গুরুত্বপূর্ণ সদস্য লিওনেল আর ইবাদা।

স্কাইপে বসে আমরা দুই পরিবার হোটেল পছন্দ করলাম। এমনকি হোটেলের বুকিং, এয়ার টিকেট সবই অনলাইনে একসঙ্গেই কিনে ফেললাম। ‍

তুমুল উত্তেজনা বাসায়। এতদিন শুধু টিভির স্ক্রিনে বার্সার মাঠ দেখা হয়েছে। আর এবার একদম মাঠেই উপস্থিত হব আমরা।

গোছগাছ চলছে; রওনা দেওয়ার একদিন আগে সন্ধ্যায় হঠাৎ ইমেইল আসলো;  আমাদের ফ্লাইট নাকি বাতিল হয়েছে এবং তারা দুঃখিত।

মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়লো। যেতে না পারা মানে মে মাসের পিক সিজনে হোটেল বুকিং বাতিল করা। আর এর অর্থ হচ্ছে পুরো টাকা গচ্চা। এখন উপায়?

এদিকে আবার ইবাদাকে নিয়ে ভাইয়া আর ভাবী হাসপাতালে। ছোট্ট রাজকন্যা অসুস্থ হয়ে পড়েছে।  বাসায় নতুন করে আবার উত্তেজনা। যাওয়া আদৌ হবে কি? কীভাবে সম্ভব হবে? ইবাদা কি যাওয়ার আগে সুস্থ হবে? অসুস্থ ছোট্ট মানুষটাকে নিয়ে গেলে ওর শরীর আরও খারাপ হবে না তো? 

আমার বর অবশ্য বসে না থেকে সময়টা কাজে লাগালো। ফ্লাইট কোম্পানির সাইটে গিয়ে অনলাইনে যোগাযোগ করলো। আবার নিজেও একই দিনে অন্য কোনো ফ্লাইট আছে কিনা সেটাও খুঁজতে লাগলো।

আমাদের ফ্লাইট ধরার কথা ছিল ফ্রাঙ্কফুর্ট মেইন এয়ারপোর্ট থেকে। এটিই আমাদের বাসার কাছে। দেখা গেল ফ্রাঙ্কফুর্ট থেকে আর কোনো ফ্লাইট নেই সেদিন। কি বিপত্তি!

তবে অনলাইনেই সমস্যার সমাধান করে দিল ওরা। আমরা  একই দিন সকালে অন্য ফ্লাইটের টিকেট পেলাম।

এই ফ্লাইট ধরতে হলে আমাদেরকে বেশ খানিকটা দূরে বাসে করে যেতে হবে এবং বার্সেলোনাতেও মেইন এয়ারপোর্টে ল্যান্ড করবে না। সেই এয়ারপোর্ট নাকি শহর থেকে বেশ দূরেই। প্লেন থেকে নেমে আবার বাসে করেই যেতে হবে মূল শহরে। মেজাজ খুবই খারাপ হলো। খরচ তো বেড়েই চলছে।

বাবাই (আমার বর) ওদের বললো, তোমাদের কারণে যে আমরা এত সমস্যায় পড়েছি তার কী হবে? দুইবার বাস নিতে হবে। এখন সেই বাসের টিকেট পাবো কিনা তারও নেই ঠিক। তোমাদের কারণেই ঝামেলা।

ওরা জানালো, তোমাদের এয়ারপোর্টে আসার জন্য এবং বার্সেলোনাতে গিয়ে বাসে মূল শহরে যেতে যে বাড়তি খরচ হবে সেটা আমরা দিয়ে দিবো। তোমরা শুধু তোমাদের  বাসের টিকেটগুলোর স্ক্যানড কপি ইমেইল করে দিও।

এবার একটু নিশ্চিন্ত। তবে এদের যা মতিগতি, প্লেনে না ওঠা পর্যন্ত কিছুই বলা যায় না।

যাত্রা শুরুর দিন খুব ভোরে বাসা থেকে বের হলাম। বাসে ফ্রাঙ্কফুর্টে  গিয়ে ভাই-ভাবীর সঙ্গে একত্র হলাম।

হান এয়ারপোর্টটা আমার পছন্দই হয়না। এরা গতবার আমাদের সঙ্গে থাকা কসমেটিকস মানে লিকুইড সব আইটেম ফেলে দিয়েছিল। এবার তাই কিছুই নেইনি। ঠিক করেছি সব ঐখানে গিয়েই কিনবো; অন্তত এয়ারপোর্টে ঝামেলা তো হবে না।

কিন্তু এবার বিপত্তি বাঁধালো আমার হিজাব। আমাকে পাশে নিয়ে হিজাব ভাল করে চেক করলো ওরা। জুতোও খুলিয়ে ছাড়লো। 

সবাই এমনভাবে তাকালো যেন, এই তো পেয়েছি মুসলিম টেররিস্ট। 

আমি হয়ে চেকিং নিয়ে বিপর্যস্ত। ঐদিকে ভাবীকেও নাজেহাল করে ফেলেছে ডেকে নিয়ে।  তারা নাকি বাচ্চার খাবারের স্ক্যান করবে। এরকম অভিজ্ঞতা আমাদের এর আগে কোনোদিনও হয়নি এয়ারপোর্টে। 

 

একসময় উড়োজাহাজটি আমাদের নিয়ে উড়াল দিলো এবং ল্যান্ডিং এর সময়ও অত্যন্ত বাজে অভিজ্ঞতার শিকার হলাম আমরা। দুর্ভোগ কেন শেষ হচ্ছে না ভাবতে ভাবতেই বার্সেলোনার মাটিতে পা রাখলাম। 

এখানে বাতাস যেন আমাদের গোবরের গন্ধ দিয়ে স্বাগতম জানালো। প্রায় ক্ষেতের ভেতরেই মোটামুটি বড় একটা এয়ারপোর্ট। এয়ারপোর্ট থেকে বের হয়েই বাস রয়েছে। এই বাসে করেই রওনা দিলাম। প্রায় এক ঘন্টার যাত্রা। সবাই ক্লান্ত এবং ক্ষুধায় বিপর্যস্ত  আর আমি খুঁজছি গোবরের গন্ধের উৎস। পাওয়া গেল অবশেষে; বিশাল বড় একটা ফার্ম।

অবশেষে যাত্রা আংশিক শেষ করলাম। বার্সেলোনার বাস টার্মিনালে নামলাম। এবার পাতাল ট্রেনে করে হোটেলের পথে যেতে হবে।

গুগল ম্যাপ আমাদের পথ দেখিয়ে নিয়ে চলেছে। বার্সেলোনার পাতাল ট্রেনের ব্যবস্থাপনার সঙ্গে জামার্নির মিল নেই।  ট্রেনের সময়সূচি অনলাইনে পাওয়া গেলেও কোন ট্রেনটি আমাদের নির্দিষ্ট গন্তব্যের কাছাকাছি নিয়ে যাবে সেটি বুঝতে  বেগ পেতে হচ্ছিল।

আন্ডারগ্রাউন্ড প্লাটফর্মে নামার পর মনে হলো বাতাসও কম, প্রচণ্ড গরম বাইরের তুলনায়। ভেতরের ভেন্টিলেশন সিস্টেম খুব একটা অাধুনিক নয়। বাচ্চাদের স্ট্রলার বা ভেগেন আর বৃদ্ধদের হুইল চেয়ার নামানোর জন্য  কোনো সুবিধা নেই।  লিফটের ব্যবস্থা  ভাল নয়। কোথাও লিফট আছে, আবার কোথাও নেই। যেখানে নেই সেখানে দুর্ভোগের  শেষ নেই;  সিঁড়ি দিয়ে বাচ্চাসমেত ভেগেন নিয়ে নামার যে পরিশ্রম, সেটি আসলে একসময় আমাদের আক্ষেপ আর রাগের কারণ হয়ে দাঁড়ালো। যদিও অনেকেই আমাদের ভেগেন নিয়ে নামতে সাহায্য করতে এগিয়ে এসেছিল অনেকবারই। মানুষগুলো তাহলে নেহায়েত খারাপ নয়।

বেলা বাড়ছে আর  বাড়ছে ক্ষুধা। এরমাঝে অবশেষে পৌঁছে গেলাম বার্সেলোনার মূল বানহফে ( ট্রেন স্টেশন)।  বার্সেলোনার মূল টার্মিনালটা পুরোদস্তুর আধুনিক; ঝকঝকে টাইলসের মেঝে। ঝকঝকে দোকানপাট। সেখান থেকে আমাদের হোটেল পায়ে হেঁটে মিনিট পাঁচেকের পথ।

পুরো রাস্তা জুড়েই প্রচুর খাবার দোকান। নাকে এসে লাগলো স্প্যানিশ খাবারের গন্ধ। হোটেলে যেতে যেতে আলোচনা করলাম, এখনই খেয়ে যাবো নাকি ফ্রেশ হয়ে তারপর এসে খাবো?

আমি আর ভাবী এত বেশি ক্লান্ত যে  ঠিক করলাম ভাইয়া আর বাবাই বরং খাবার রুমে নিয়ে আসুক। আমরা নিজেরা ফ্রেশ হই আর বাচ্চাদের ফ্রেশ করাই। 

হোটেল রুমে ঢুকে জানালার পর্দা সরিয়ে বাইরে তাকালাম, অনেক দূর পর্যন্ত দেখা যায়। আহ! বার্সেলোনা, স্প্যানিশ খাবার, ন্যু ক্যাম্প, বিচ, সবকিছু যেন হাতছানি দিয়ে ডাকছে। 

এমনকি আকাশে মেঘের ঘনঘটাও যেন  মনকে ছুঁয়ে গেল। ভাবলাম এই বৃষ্টিতে বের হতে পারবো তো? বৃষ্টি কি কমবে?  নাকি হোটেলের জানালা দিয়েই বার্সেলোনা দেখে কাটিয়ে দিতে হবে? দেখা যাক…।