ক্যাটেগরিঃ ভ্রমণ

অভিযাত্রী কলম্বাস অজানাকে আবিষ্কারের নেশায় সাগরের বুকে পাড়ি দিয়েছিলেন কাদিজ বন্দরের অদূর থেকে। নতুন পৃথিবী জয় করে সান্তা মারিয়া বন্দরে ফিরে প্রথম অবতরণ করেছিলেন বার্সেলোনাতেই।

ইতিহাস আর ঐতিহ্যের অপূর্ব মেলবন্ধন বার্সেলোনা। ভূমধ্যসাগরের রানি বলা হয় বার্সেলোনাকে।  এখন অবশ্য গোটা বিশ্বই বার্সেলোনা বলতেই বোঝে ফুটবল।

দুপুরের খাবারটা হোটেলেই শেষ করলাম। তখন প্রায় চারটা বেজে গিয়েছিল। সবাই মিলে ঠিক করলাম খানিক বিশ্রাম নিয়ে সন্ধ্যায় বের হবো। কিন্তু যদি তখনও বৃষ্টি হয়? হোক না!

সন্ধ্যা হতেই রওনা হলাম লা রাম্বলার উদ্দেশ্যে। হোটেল থেকে বেশি দূরে নয়।  পাশ ঘেঁষা গাছের সারি পূর্ণ অত্যন্ত ব্যস্ততম একটি রাস্তা লা রাম্বলা। রাস্তায় দু’ধারে বিভিন্ন দোকানও রয়েছে। ট্যুরিস্টরা সেখানে দরদাম করে বিভিন্ন জিনিস কিনছেন। লা রাম্বলার পর্যটকদের স্রোত সেদিন যেন একটি দীর্ঘ মিছিলের রূপ নিয়েছিল।

বের হবার আগেই আমরা সাবধান হলাম নিজেদের ব্যাগ নিয়ে। কেন? পকেট কাটা নাকি এখানে খুবই স্বাভাবিক ঘটনা।

মৃদু হাওয়ায় হাঁটতে খুব ভাল লাগছিল। ইবাদা আর লিওনেল দৌড়াচ্ছিল। রাস্তায় কেউ গান করছে, কেউ বা গল্প করছে, কেউ কেউ  বন্ধুদের সঙ্গে গান গেয়ে গেয়ে নাচছে। দেখলাম একজন বৃদ্ধাও তাদের দেখে দেখে নাচছে। আমারও যে ইচ্ছে করছিল না তা বলবো না।

বেশ রাত হয়ে যাচ্ছে দেখে রাতের খাবারের উদ্দেশ্যে ফিরে চললাম। রোমেল ভাইয়া সাবধান করে বলছিলেন, কিছু মানুষকে আমার কিন্তু সুবিধের লাগছে না। বলতে বলতেই একজন মহিলার চিৎকার; সবার চোখের সামনে দিয়েই এক ছেলে এক ট্যুরিস্টের হ্যান্ডব্যাগ টান দিয়ে অলিম্পিক স্টাইলে দৌড়।

এই ঘটনার পরে যাকে দেখি, তাকে দেখেই মনে হয়, নিশ্চয়ই ব্যাটা চোর। ট্রেন স্টেশনেও ১২টায় সব বন্ধ করে দেওয়া হয় নিরাপত্তার জন্য। আমদের একদিন ঘুরতে ঘুরতে রাত পৌনে বারোটা বেজে গিয়েছিল। সেদিন দেখলাম সব দরজা বন্ধ করার জন্য নিরাপত্তারক্ষীরা দাঁড়িয়ে আছে।

লা রাম্বলাতে বিশাল বড় মার্কেট রয়েছে যেখানে নানা ধরনের খাবার পাওয়া যায়। মানুষের ভিড় লেগেই থাকে এখানে। কাঁচা মাংস, মাছ, ফল, চকলেট, রান্না করা খাবার; কী নেই যে সেখানে সেটাই বলা মশকিল।

পরের দিন সকালে রওনা হলাম ক্যাম্প নু এর উদ্দেশ্যে। আমরা সবাই উত্তেজিত। ঢোকার মুখেই টিকেট কাউন্টার। তারপর বেশ বড় পথ পার করে স্টেডিয়ামের দোকান। সেখানে জার্সি, বলসহ নানা খেলার সামগ্রী পাওয়া যায়। দোকানের ডিজাইনটিও বেশ সুন্দর। সেখান থেকে বের হয়ে ন্যু ক্যাম্প মিউজিয়াম। সারি করে রাখা রয়েছে কাপ, ছবি, জার্সিসহ আরো অনেক কিছু।   যে একবার যেখানে দেখার জন্য দাঁড়াচ্ছে, সে আর সরতেই চায় না।  মুগ্ধ হয়ে তাকিয়েই থাকে।

সেখান থেকে বের হয়ে দেখলাম তাদের ম্যাসাজের জায়গা, প্রেস ব্রিফ্রিং হলরুম।  কাপসহ ছবি তোলারও ব্যবস্থা রয়েছে। ছবি তোলার পরে আপনার পছন্দ হলে আপনাকে কিনে নিতে হবে ছবিগুলো।

এরপর সেই সিঁড়িগুলোতে পৌঁছলাম যেগুলো খেলোয়ারদের ড্রেসিং রুম থেকে বের হয়ে খেলার মাঠে প্রবেশ করে।

স্টেডিয়ামটি এত বড় যে আমাদের ঘুরে শেষ করতে করতে প্রায় ৩টা বেজে গিয়েছিল। ইবাদা আর লিওনেল তো বটেই, আমরা বড়রাও ক্ষুধায় কাতর ছিলাম তখন।

বের হতে গিয়ে জানা গেল লিফট বন্ধ। দুটো বাচ্চা দেখে তাদের মনে কিছুটা মায়ার সঞ্চার হলো অবশ্য। তাই আমাদের লিফটে করে নিচে নিয়ে গেল।  নইলে এখান থেকে বের হতে হতে আরো এক ঘন্টা লেগে যেতো।

 

খেয়েদেয়ে রওনা দিলাম সমুদ্র সৈকতের দিকে। বার্সেলোনা সমুদ্র তীরবর্তী হওয়ায় শহরে থেকেও এক পা বাড়ালেই চোখে পড়ে দিগন্ত বিস্তৃত  জলরাশি। অনেক পর্যটকই আসেন নিজেদের নাগরিক জীবন থেকে ছুটি নিয়ে পরিবার বা প্রিয়জনের সাথে বার্সেলোনার সমুদ্র সৈকতে নির্জন মুহূর্ত কাটাতে। আর প্রিয়জনের সঙ্গে উপভোগ করতে চান ঐতিহাসিক শহরের আনাচ-কানাচ।

পুরো বার্সেলোনা শহরকে কেন্দ্র করে আছে সাতটি সমুদ্র সৈকত। এসব সৈকতে সূর্যস্নান উপভোগের জন্য পর্যটকদের মন ব্যাকুল হয়ে ওঠে।  বেলাভূমিতে পৃথিবীর নানা দেশ থেকে আসা শত শত নারী-পুরুষ ও শিশু-কিশোরদের নিয়ে সৈকতটি যেন পর্যটক মেলায় পরিণত হয়। কেউ স্বল্প বসনে প্রখর রোদে শুয়ে আছে, কেউ ব্যায়াম করছে, কেউ সাগর জলে শরীর ভেজাচ্ছে, কেউ ছুটোছুটিতে মগ্ন। দূরে  ভেসে বেড়াচ্ছে কিছু ছোট-বড় জাহাজ।

তীরের কাছাকাছি রয়েছে রয়েছে অনেক খাবার দোকান। কোনটিই ফাঁকা নয়। তাও একটিতে ঢুকে পড়লাম আমরা। সেখানের প্রায় সবাই বাংলাদেশ থেকে এসেছে। তারাও দেশি মানুষের দেখা পেয়ে খুশিই হলো।

দোকানে নানা রকমের সি ফুড।  ডিপফ্রাই, বয়েলড, আবার কোনোটি রান্না করা। আমি একজন ভোজন রসিক। ইন্ডিয়ান ফুডের পর এই একটি দেশ পেলাম যার খাবার আমার বেশ পছন্দ হয়েছে।

পার্ক গুয়েলের ভেতরে এক অংশ দেখার জন্য আমরা টিকেট পাইনি। তবে পুরো পার্কটি ঘুরে দেখার সুযোগ হয়েছে। পার্ক থেকে পুরো বার্সেলোনা শহর, এমনকি শহর পেরিয়ে নীল সমুদ্র আর নীল আকাশের এক হয়ে মিশে যাওয়ার দৃশ্যটিও এখান থেকে দেখা যায়।

তবে গরমের ভেতর আমাদের ওপরে ওঠা এবং নিচে নামা বেশ ধকল যাচ্ছিল।  মনে হচ্ছিল রোদের মাঝে মাথা ঘুরে পড়ে না যাই আবার।

 

 

এবার গেলাম  লা সাগরাডা ফামিলিয়া। আন্টনিও গাওডির সবচেয়ে বিখ্যাত কাজ।  শুনতাম তাজমহল করতে ২২ হাজার শ্রমিকের ২০ বছর লেগেছিল, তাতেই মোঘল রাজকোষ আর জনগণের ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা। আর সেইখানে যদি ২০০ বছর লাগে কোনো স্থাপত্য গড়তে তাহলে কী অবস্থা হবে?

দুইশ বছরে রাজা তো রাজা, রাজত্ব পর্যন্ত বিলীন হয়ে যায় কালের গর্ভে, আর কোথাকার কোন স্থাপত্য! কিন্তু আসলেই এমন একাধিক অবিশ্বাস্য কীর্তি আছে মানুষের, যা গড়তে লেগেছে কয়েকশ বছর, প্রজন্মের পর প্রজন্ম।

মূল স্থপতি অ্যান্তোনি গাউডি না ফেরার দেশে চলে গেছেন ১৯২৬ সালেই, কিন্তু বিপুল কর্মযজ্ঞ থেমে নেই, কাজ এখনো চলছে তার দিয়ে যাওয়া নকশাতেই। সত্তর বছর বয়সে ট্রাম চাপা পড়ে তিনি মারা গেলে  দুদিন পর তাকে এর মধ্যেই সমাহিত করা হয়।

খেলাপাগলদের বার্সেলোনার ন্যু ক্যাম্প আর অলিম্পিক ভিলেজ, রৌদ্র প্রত্যাশীদের জন্য উষ্ণ বেলাভূমি, ভোজনরসিকদের জন্য ফোর ক্যাটসসহ হাজার জাত-বেজাতের রেস্তোরাঁ, শিল্পবোদ্ধাদের জন্য পিকাসো জাদুঘরসহ নানা শিল্প সংগ্রহ থাকলেও বার্সেলোনায় প্রায় প্রতিদিন সবচেয়ে বেশি মানুষের জমায়েত ঘটে ল্য সাগ্রাদা ফ্যামিলিয়ার মূল ফটকে; যেখানে দাঁড়ালেই হয়ত সেই মূল্যবান দিনটির দুই-দুই ঘণ্টা টিকেটের অপেক্ষায় ব্যয় হবে অতি মন্থরভাবে। আর যদি লিফট বেয়ে উপরের অংশে দাঁড়িয়ে গির্জা এবং তিলোত্তমা নগরীর দিকে মুগ্ধ দৃষ্টি বোলাতে চান সেখানেও খরচ হবে বিস্তর সময় ও সামান্য অর্থ।

 

টিকেট পেলাম না। দরজা বন্ধ করে দিয়েছে। তাই বিকেলের টিকেট কিনতে হলো।  দেখলাম আধুনিক প্রযুক্তির দান আকাশ ছোঁয়া ক্রেন এবং অন্যান্য নানা সরঞ্জামের সাহায্য নিয়েও নির্মাণযজ্ঞ চলছেই দশকের পর দশক।

মাঝে বলা হচ্ছিল গাউডির মৃত্যু শতবার্ষিকীতে ২০২৬ সালে শেষ করা হবে নির্মাণ কাজ এবং তাতে প্রতিফলিত হবে গাউডির স্বপ্ন।

স্থানীয় অনেক মানুষই এই মন্দার বাজারে এমন ব্যয়বহুল নির্মাণ কাজ চালিয়ে যাওয়ার বিরুদ্ধে; যদিও সেই কারণেই ফি বছর আসছে মিলিয়ন পর্যটক।

নির্মাণ শেষ হলে এটি হবে বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু চার্চ। মূল ফটক আসলে তিনটি, যার প্রতিটিতে খোদাই করা আছে বাইবেলের নানা বিষয়ভিত্তিক কাহিনী।

দৃষ্টিনন্দন সব শিল্পকর্ম তৈরি করা হয়েছে জানালার রঙিন কাঁচ দিয়ে, তার গ্রহণযোগ্যতা শত গুণে বাড়িয়ে দেয় সগৌরবে প্রবেশ করা সূর্যকিরণ।

মানুষের সৃষ্টির প্রতি মুগ্ধতায়, মানুষের কল্পনাশক্তির অপরিমেয় ক্ষমতায় শ্রদ্ধা ফিরিয়ে নিয়ে আসে এমন অমর কীর্তি, হোক না তা নির্মাণাধীন, হোক না তা কোনো কল্পিত দেবতার উদ্দেশ্যে নির্মিত।

 

সময়-সুযোগ বুঝে বার্সেলোনা অ্যাকুরিয়াম দেখতেও গিয়েছিলাম আমরা। আমাদের দুই ক্ষুদে সদস্য তো বেজায় মজা পেয়ে গিয়েছিল।  অতি আনন্দের ক্লান্তিতে এক সময় ঘুমিয়েও পড়ে ওরা।

পোর্টের ধারে দেখলাম অনেক দোকান। দোকানের প্রায় বেশিরভাগই বাংলাদেশি এবং আফ্রিকান। বাংলাদেশিরা অনেকেই অনেক বছর ধরে দেশে যেতে পারছেন না বৈধ কাগজ না থাকায়। তাদের কাছ থেকেই অনেক কিছু কেনাকাটা করলাম।

এদিকে রাত নেমে এলো। রাস্তায় আলো জ্বলে উঠতে শুরু করলো। পরের দিন ফিরতে হবে আমাদের। হয়তো অন্য আরেকটি জায়গায় যাবো। কিন্তু কবে যাবো? সেই দিনটির অপেক্ষা করতে করতেই বার্সেলোনা ছাড়লাম।