ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

১১ ও ১৪ জুলাই অনেক বছর পর যুবলীগ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগের সম্মেলন হতে যাচ্ছে। পার্টি অফিসে, নেতাদের বাসায় দারুন ভিড়। কারা আসছে নেতৃত্বে? সাবেক ছাত্রলীগের কারা আসবে? মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর সবচেয়ে সমালোচিত হয়েছে ছাত্রলীগের অপকর্ম ও নিয়ন্ত্রণহীনতা নিয়ে। সারাদেশে ব্যবসা বাণিজ্য টেন্ডার চাঁদাবাজি ও আধিপত্য বিস্তারে অভ্যন্তরীন কোন্দলের কারনে প্রায় ১৬০টি সংঘর্ষ ও প্রাণহানিও ঘটেছে। ছাত্রলীগের সদ্য গঠিত কমিটির আগে অনেকে ২ জন সাবেক ছাত্রনেতাকে গ্রেফতারের পরামর্শও দিয়েছিল বলে শোনা গিয়েছিল। নতুন কমিটি ছাত্রলীগের ভাবমূর্তি ফিরিয়ে আনতে তুলনামুলকভাবে সফল। কিন্তু সেই চিহ্নিত সাবেক ছাত্রলীগ নেতারাই এখন যুবলীগসহ বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনে স্থান পাবে। প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক ছাত্রলীগের ভুত কি এখন যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগে সওয়ার হবে? হলে এদের বিশৃঙ্খলার ফলে কি যুবলীগ বা স্বেচ্ছাসেবক লীগকেও কি আওয়ামী লীগ অঙ্গসংগঠন হিসাবে অস্বীকৃতি জানাবে?

ছাত্রলীগের ব্যর্থ নেতৃত্ব ও সিন্ডিকেটের কারনে সৃষ্ট অচলাবস্থার কারনে বহিষ্কার হয়েছে ২৬৪ জন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে বহিষ্কার হয়েছে ৮৭ জন, আটক ও গ্রেফতার হয়েছে ২৪১ জন, মামলা দায়ের হয়েছে ছাত্রলীগের ২১৫ নেতাকর্মীর নামে। এমনকি ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রীর ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশও কার্যকর হয়নি। কিন্তু মদদদাতারা বহাল তবিয়তে ছিল। জনকন্ঠের ১৪ জুলাই ২০১০ এর প্রতিবেদনে লেখা হয়, ‘ সর্বশেষ বিদায়ী কমিটির এক শীর্ষনেতার সমন্বয়ে গড়ে ওঠা সিন্ডিকেটই ছাত্রলীগকে বিপর্যয়ের দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। অঢেল টাকা আর সহায়সম্পত্তির পাহাড় গড়েছেন তিনি। বিপুল অর্থের বিনিময়ে নিজামীয় পরিকল্পনায় ছাত্রলীগে একের পর এক ছাত্রদল-শিবিরের অনুপ্রবেশ ঘটানো হচ্ছে। ময়মনসিংহ কমিটি নিয়ে তৃণমূলের নেতাকর্মিরা টাকার লেনদেনের অভিযোগ এনে শীর্ষ দুই নেতাকে লাঞ্ছিত করে এবং ‘রিপন-রোটন ও লিয়াকতের দুই গালে জুতা মার তালে তালে’ শ্লোগানও দিয়েছিল। মোটা অংকের লেনদেনের অভিযোগ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গিরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কমিটি নিয়েও উঠেছিল। এগুলো সংবাদ মাধ্যমে আসার কারনে জানা গিয়েছে। গত কমিটির বিরুদ্ধে অসন্তোষ এমন পর্যায়ে যায় যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল নেতাকর্মিরা একজোট হয়ে রিপন-রোটনকে অবাঞ্ছিত করার পরিকল্পনা করেছিল, তিনজনকে জনপ্রিয় মুখকে গ্রেফতারও করা হয়।

যুবলীগের সাধারন সম্পাদক প্রার্থীদের মধ্যে নুরুন্নবী শাওন যুবলীগের ইব্রাহিম হত্যাকাণ্ডের কারণে বিতর্কিত। সাবেক ছাত্রলীগ নেতাদের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের সভাপতি দেলোয়ার হোসেন শুধু উগ্র মেজাজের কারনেই নয় হেমায়েতউল্লাহ আওরঙের লোক হিসাবে অনেকে অন্য দৃষ্টিতে দেখে। ক্যাডার পিচ্চি শামিমের ডানহাত হবার কারনে আবদুল আলীম ছাত্রলীগে পদবঞ্চিত হয় তাছাড়া সে জনপ্রিয় নয়। মহিউদ্দিন মহির জনপ্রিয়তা নেই বললে ভুল হবেনা।

বিএনপি শিবির কানেকশন
আওয়ামী লীগের সাধারন সম্পাদক ছাত্রলীগে অনুপ্রবেশের যে অভিযোগ আনে তা মোটেও অমুলক ছিলনা। ছাত্রলীগের সাধারন সম্পাদক মাহফুজ হায়দার রোটন তৎকালীন ছাত্রদলনেতা আবুল খায়েরের স্নেহভাজন ছিল এবং তেজগাও কলেজ ছাত্রদলের সাহিত্য সম্পাদক ছিল। সভাপতি মাহমুদ হাসান রিপন সম্পর্কে হাওয়া ভবনের যোগাযোগের অভিযোগ আছে। বিএনপি বিরোধী আন্দোলনে তার সক্রিয় ভূমিকা ছিলনা। তার শ্বশুরও বিএনপিপন্থী ব্যবসায়ী বলে জানা যায়, যার ব্যবসার প্রসার ঘটাতে রিপন তার প্রভাব খাটাতো।

কথিত আছে, গত কমিটি আজিজ সুপার মার্কেটে টাকা বিলিয়ে হাওয়া ভবনের নির্দেশে রিপন-রোটনকে নির্বাচিত করা হয়। (লিংক) দৈনিক জনকন্ঠ, সমকাল ও সাপ্তাহিকসহ অনেক পত্রিকা ছাত্রলীগের আগের কমিটি অর্থাৎ ‘রিপন-রোটন কমিটি শেখ হাসিনাকে বিভ্রান্ত করে একটি মহলের কূটচালের ফসল’ হিসেবে চিহ্নিত করে অনেক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল।

জনকন্ঠে আরও রিপোর্টে প্রকাশ হয় রাস টেনে ধরা হচ্ছে না ছাত্রলীগের (লিংক) ‘ছাত্রলীগের প্রকৃত নেতাকর্মীরা সরকারী দলের মধ্যেই অনুপ্রবেশকারীদের চতুরতায় কোণঠাসা হয়ে পড়ছে’ এরকম বহু প্রতিবেদন ছাপা হয় যেখানে বলা হয়েছে শীর্ষনেতৃত্বের কাছে এসব সংবাদ পৌছানো হয় নাই। এভাবে ঝরে গেছে বহু নিবেদিতপ্রান নেতাকর্মী।

জাহাঙ্গীরনগরের সাধারণ সম্পাদকের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদ দেয়া হয়েছে ছাত্রদলের এক নেতাকে। ছাত্রদলের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক সম্পাদক আজগর আলীকে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের কমিটির যুগ্ম সম্পাদক করা হয়। বিনা কারণে সাংগঠনিক বিধানবহির্ভূতভাবে সহ-সভাপতি শাহাদাৎ হোসেন সুজনকে বহিষ্কার করার কারন সংবাদপত্রে জানা যায় জামায়াতী এ্যাসাইনমেন্ট বাস্তবায়ন।

জামায়াতের এজেন্ডা বাস্তবায়নে অর্থের বিনিময়ে চিহ্নিত ছাত্রদল ক্যাডার বঙ্গবন্ধু হলের ছাত্রদল সহ-সম্পাদক সোহেল মৃধাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংগঠনিক সম্পাদক করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের ত্রাণ ও দুর্যোগ বিষয়ক সম্পাদক করা হয় তামিরুল মিল্লাত মাদ্রাসার শিবিরের সাবেক সাথী লিটন মিয়াকে। জিয়া হলের ছাত্রদল ক্যাডার রাকিবকে বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ-সভাপতি করা হয়েছে। জিয়া হলে কামাল, আরমানসহ ৭ জনের মতো চিহ্নিত ছাত্রদল ক্যাডার ও শিবিরের কর্মী ছাত্রলীগের রাজনীতিতে অনুপ্রবেশ করে।

তৃণমূলের দাবি উপেক্ষা করে কট্টর জামায়াত পরিবারের আবু বকর সিদ্দিকের ছেলে বাদলকে পঞ্চগড় জেলা কমিটির সভাপতি করা হয়। এর প্রতিবাদে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নেতাদের সম্মেলনস্থলে ভোর রাত পর্যন্ত আটকেও রাখা হয়।

হুমায়ুন আজাদ হামলায় আটক ছাত্রদলের জন্য বোমা প্রস্তুতকারি বোমা আব্বাসকে টাকার বিনিময়ে নেতা আবু আব্বাস বানানো হয় যে শিবিরকর্মি ছিল বলে অভিযোগ আছে।
মূলত ছাত্রলীগের বিদায়ী কমিটিকে ছাপোষা বানিয়ে টেন্ডারবাজি ও নানা ব্যবসাবাণিজ্য করাই ডাকসাইট নেতার সিন্ডিকেটের মূল লক্ষ্য ছিল। রিপন-রোটনের আজ্ঞাবাহি সহসভাপতি লিটন, রাসেলসহ গুটি কয়েকজনের বিরুদ্ধে ত্যাগী নেতাকর্মিদের ক্ষোভ সামলাতে অনুপ্রবেশকারীরা ভুমিকা রাখে।

টেন্ডারবাজ
সম্প্রতি স্বেচ্ছাসেবক লীগের প্রচার সম্পাদক শাহরিয়ার শামিম টেন্ডারবানিজ্য নিয়ে গুলিতে আহত হয়। সড়কভবনের টেন্ডারে সক্রিয়ভাবে জড়িতদের মধ্যে সাদা সেন্টু, শফিক, শিমুল, হেমায়েত, তুহিন অন্যতম। তারা নিজেদের এখন যুবলীগ নেতা হিসাবে পরিচয় দেয়।

সাবেক ছাত্রনেতাদের অনেকেই এ সাড়ে তিন বছরে তদবির বানিজ্য করে ফুলেফেপে উঠেছে। তাই সম্মেলনকে কেন্দ্র করে চলছে টাকার খেলা। আয় করা টাকা এখন বিনিয়োগ হচ্ছে পদের জন্য। পদ পাওয়ার পর আবার তার বহুগুন টাকা ফেরত আসবে।

যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগের সম্মেলনকে কেন্দ্র করে তৃনমূল ও নিবেদিত নেতাকর্মীরা বিশেষত আওয়ামী লীগ নির্বাচনকে লক্ষ রেখে সংগঠনকে গতিশীল করার যে স্বপ্ন দেখছে তা আদৌ কি বাস্তবায়িত হবে? অনেকে নবীন প্রবীনের যে সমন্বয়ের স্বপ্ন দেখছে তাতে ছাত্রলীগের মতো যুবলীগ যদি সিন্ডিকেট বন্দি হয়ে যায় তাতে অবাক হবার কিছু থাকবেনা কারন ক্ষেত্র প্রস্তুতের কাজ চলেছে আরও আগে থেকে। বিভিন্ন ঠিকাদার এমনকি আদম ব্যবসায়ীরাও তাদের প্রার্থীর জন্য টাকা দিচ্ছে বলে শোনা যাচ্ছে। শেখ হাসিনা ভাল ইমেজের নেতৃত্ব চান তাতে কারও সন্দেহ নেই কিন্তু যেহেতু মাঠের প্রকৃত চিত্র সেন্সর হয় বলে কথিত আছে এবং যেহেতু নেতৃত্ব নির্বাচনের ভার গুটি কয়েকজনের হাতে তাই ছাত্রলীগের ভুত আবার যুবলীগ স্বেচ্ছাসেবক লীগে সওয়ার হবে কিনা তা বিবেচনার দাবী রাখে। ১১ ও ১৪ তারিখ সম্মেলন হলেও পূর্নাঙ্গ কমিটি হবেনা শুধু দুটি পদ ঘোষিত হবে। তাই ছাত্রলীগের কমিটির মত ঘটনা ঘটবে বলেও অনুমান করা যায়। প্রশ্ন হল যদি তাই হয় আওয়ামী লীগ কি যুবলীগ বা স্বেচ্ছাসেবক লীগকেও অঙ্গ সংগঠন হিসাবে অস্বীকার করবে?