ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

তৎকালীন বিএনপি সরকারের একগুয়েমী ও আওয়ামলীগের লগি-বৈঠার তান্ডব আমাদেরকে একটি ‘ওয়ান ইলেভেন’ এনে দিয়েছিল।

দেশের এক চরম নৈরাজ্যকর অবস্থায় সেনা সমর্থিত জরুরী অবস্থার সরকার আসার পর জনমনে সাময়িক স্বস্তি এসেছিল। কিন্ত পরবর্তীতে ওই সরকারের রাজনৈতিক এজেন্ডা মানুষের সামনে পরিস্কার হয়ে যাওয়ায় তখন সেই সরকার দ্রুত জনপ্রিয়তা হারায়। মাইনাস টু ফরমুলা, কিং পার্টি, ক্যাংগারো কোর্ট, দুদক – তখনকার পরিচিতি ও বহুল আলোচিত কিছু নাম ও পরিভাষা । সেই সরকারের বহুদিন ক্ষমতায় থাকার স্বপ্ন ছিল কারো। শুনা যায় মইন উ আহমদের রাষ্ট্রপতি হওয়ারও খায়েশ জমেছিল। তবে দেশের মানুষ ঘুরে দাঁড়ানোর কারনে সেটা আর সম্ভব হয়নি। দুই বছরের মাথায় একটি নির্বাচন নিয়ে আতরক্ষার ব্যবস্থা করতে বাধ্য হন সরকারের কুশীলবরা।

ওয়ান ইলেভেন সরকারের প্রকাশ কৃতিত্ব দাবি করেছিল আওয়ামীলীগ। ওই সরকার আসার পরপরই আওয়ামীলীগের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল সেই সরকার তাদের আন্দোলনের ফসল। আর শেষ পর্যন্ত ফসল দিয়ে ফসল ঘরে তুলেই আওয়ামলীগ ক্ষমতায় এসেছে ।

আওয়ামলীগের সেই দাবি ছিল পুরোপুরি সত্য। ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর রাজপথে লগি-বৈঠকার তান্ডবের পরই রাজনৈতিক দৃশ্যপট দ্রুত পাল্টায়। সেই ২৮ অক্টোবরের ঘটনা ঘটেছিল আওয়ামীলীগ ও চারদলীয় জোটের শরীক জামায়াতের মধ্যে।

বর্তমানেও রাজনীতি সংঘাতের মধ্যেই পড়েছে। সোমাবার রাজধানীসহ সারাদেশে যে ঘটনা ঘটেছে তাতে রাজনীতি কতটুকু সহিংসতা ও ভয়াবহতার মধ্যে এসে গেছে বা যাচ্ছে তা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এবারও কিন্তু ঘটনা আওয়ামীলীগ ও জাময়াতের মধ্যে এবং ঘটনার ভয়াবহতায় ভিন্নতা থাকলেও মাত্রা ও ধরণ অনেকটাই একই রকম।

(বৃহস্পতিবারের হরতালের সময়ে পুলিশের এ্যাকশন- বাংলানিউজ২৪)

আওয়ামীলীগ ক্ষমতায় আসার পর থেকে জামায়াতকে কঠোরভাবে দমনের মানসিকতা দেখিয়ে আসছে। প্রকাশ্য মিছিল মিটিং করতে দিচ্ছিল না। সোমবারও একই ধরনের আচরণ সরকার জামায়াতের সাথে করছিল। তবে জামায়াত বোধহয় ঘুরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে ঘুরে দাঁড়ায়। ফলে যা হবার তা হয়।

সোমবার রাজপথের চিত্র:এই কান্ড ঘটিয়েছে জামায়াত

রাজপথে আগুন, ভাংচুর নতুন কিছু নয়। যারা বর্তমানে তারাও এমন আচরণ করেছে অতীতে বহুবার। কিন্তু সরকার জামায়াতের কেন্দ্রীয় ও মহানগর অফিসে হানা দিয়ে কর্মচারি থেকে শুরু করে কেন্দ্রীয নেতাদের যে কায়দায় গ্রেফতার করে আদালতে নিয়ে রিমান্ডে নিয়েছে যাকে স্বাভাবিক নয় বলা যায় না। সরকারী দলের কোন কর্মসূচী থেকে কোন অপরাধমুলক ঘটনার সুত্রপাত হলে বা ঘটলে তার জন্য দলের প্রধান শেখ হাসিনা বা সৈয়দ আশরাফকে নিশ্চয় গ্রেফতার করে নিয়ে গিয়ে রিমান্ডে দেবেনা। এমনটি অতীতে কখনো হয়নি। ঘটনার সাথে যারা জড়িত তাদেরকেই চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেয়া হয়। ডা। ইকবালের মিছিল থেকে গুলি করে মানুষ মারা হয়েছিল। তাররজন্য কিন্ত দলীয় নেতাদের গণহারে গ্রেফতার করে নিয়ে যায়নি।

প্রথম আলোর খবরে দেখলাম পুলিশ জামায়াত-শিবিরকে আর রাজপথে নামতে দেবেনা। বিএনপি জ্বালানী তেলের দাম বৃদ্ধির অন্তরালে এই ঘটনার প্রতিবাদে বৃহস্পতিবার হরতাল ডেকেছে। আওয়ামীলীগ হরতাল প্রতিরোধে মাঠে নামার ঘোষণা দিয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন অযৌক্তিক হরতাল কঠোরভাবে দমন করা হবে।

তার মানে একদিকে পুলিশ আরেক দিয়ে সরকার দলীয় লোক হরতাল দমনে মাঠে নামবে। ফলে হরতালকারিরা মাঠে নামলে সংঘাত অনিবার্য। সংঘাত কখনো শান্তিপূর্ন বা নিয়ন্ত্রিত মাত্রায় হয়ন। এভাবে সংঘাত হলে পরিস্থিতি কোথায় গিয়ে ঠেকবে ?

সরকারি দলে যারা থাকেন তাদের দায়িত্ব কিছুটা বেশী থাকে। তাদের হাতে শক্তি ও ক্ষমতাও বেশী থাকে। শক্তি আছে বলেই বিরোধী দল বা প্রতিবাদকারিদের ওপর তা প্রয়োগ করলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রন করা কঠিন হয়ে পড়ে। বিগত বিএনটি জোট কে এম হাসান, আজিজকে নিয়ে একগুয়েমী করলেও বর্তমান সরকারের মতো এভাবে বিরোধী দলকে নানাভাবে দমনের চেস্টা করেনি বলে আমার মনে হয় না। বিরোধী দল ছাড়াও শেয়ার বাজারে ুদ্র বিনিয়োগকারিদের ফটকাবাজ বলার পাশাপাশি দমনের চেষ্টা করছে এই সরকার। এসব কাজ সরকারের জন্য ক্ষতিই বয়ে আনছে।

বর্তমান সরকার কতটুকু ভালো কাজ করেছে তার চেয়েও কতটুকু ব্যর্থ হচ্ছে সেটাই এখন সামনে এসেছে যাচ্ছে বিশেষকরে শেয়ার বাজারের অবস্থা, রাস্তাঘাট, পদ্মা সেতু নিয়ে দুর্নীতির অভিযোগ, জিনিসপত্রের দাম বৃদ্ধি, গ্যাস বিদ্যুৎ পানি সংকট, দফায় দফায় জ্বালানী তেল গ্যাসের দাম বৃদ্ধির মতো ঘটনাগুলো সরকারের ব্যর্থতার দিককে সামনে নিয়ে আসছে।

এই অবস্থায় সংঘাতময় রাজনীতি দেশকে এ চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলছে। আরেকটি ওয়ান ইলেভেনের পরিস্থিতি তৈরী হচ্ছে কিনা এ প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। এক ওয়ান ইলেভেন থেকে রাজনীতিতে গুনগত যে পরিবর্তন আসছে বলে আশা করা হয়েছিল তাতো আসেইনি বরং আরো বেশী খারাপ রূপ লাভ করছে বলেই মনে হচ্ছে।

দুর্বল ও ভঙ্গুর বিরোধী দলের বিরুদ্ধে সরকারের কঠোর- আগ্রাসী ভুমিকা এবং সরকারের দেশ পরিচালনায় অনেকগুলো ব্যর্থতার সমীকরনেই ক্ষোভ এবং তার বহিপ্রকাশের খন্ডচিত্র দু’য়েকটি করে লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এভাবে আগের মতোই দেশ ওয়ান ইলেভেন বা তার চেয়েও ভয়াবহ কোন পরিস্থিতির দিকে এগুচ্ছে এমন আশংকা অনেকে এখন করতে শুরু করেছেন।