ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

বর্তমান সমাজ ব্যবস্থায় নারী ও পুরুষের সমান অধিকারের বিষয়টি একট আলোচিত বিষয়। মানুষের বিবর্তনের ধারায় বিষটি তার গুরুত্ব হারিয়ে ফেলবে এটি আমার ধারনা। মানুষের মস্তিষ্ক(নারী,পুরুষ নির্বিশেষে) নারীকে মানুষ হিসেবে ভাবার মত সৎ ভাবে বিকশিত হয় নি। পুরুষ চেয়েছে নারীকে তার নিজের নিয়ন্ত্রনে রাখতে। এজন্য সে ধর্মীয় আর সামাজিক ভাবে নারীর উপর চাপিয়ে দিয়েছে বিভিন্ন বিধি নিষেধ। তাই একটি মেয়ে শিশু জন্মের পর থেকে পরিবারের দায়িত্ব থাকে শিশুটিকে ঐ পূর্ব নির্ধারিত বিধি নিষেধ অনুযায়ী গড়ে তোলা। তাকে শিক্ষাদেওয়া হয় পুরুষের কর্তৃত্ব মেনে নেওয়ার। এই প্রচেষ্টা গত দুই হাজার বছর যাবত প্রবল ভাবে পরিলক্ষিত হচ্ছে সামাজিকভাবে বিভিন্ন ধর্মীয় অনুশাসনের লেবাসে। যদিও নারীর জন্য ন্যায় বিচারের কোন ঘাটতি ওখানে নেই বলে বলা হয়, তবে বাস্তবতা হচ্ছে ওখানে নারীকে দূর্বল হিসেবে উপস্হাপন করে তাকে বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিশেষ সুযোগ সুবিধা দেওয়ার কথা আগ্রহ এবং অহংকারের সাথে বলা হয়েছে। কিন্তু নারীকে দূর্বল হিসেবে উপস্হাপন এবং সেই কারনে বিশেষ সুবিধা প্রদান প্রকারান্তরে নারীর যে অবমূল্যায়ন তা যেকোন বিবেকবান মানুষই অনুধাবন করতে পারে, যদিও ঐ গোত্রটির যথেষ্ট অভাব রয়েছে।

আদিম এই ধর্মীয় ও সামাজিক অনুশাসন বর্তমান পৃথিবীর নারী-পুরুষের জীবন যাপনকে জটিল করে তুলছে। বর্তমান এই যুগেও ধর্মীয় অনুশাসনে নারীকে বেঁধে রাখা হচ্ছে যা দুই হাজার বছর বা তার চেয়েও পুরোনো। অন্য দিকে বিশ্বায়ন নারীকে প্ররোচিত করছে সর্বোচ্চ উৎপাদনের ক্রমবর্ধমান প্রতিযোগিতায়। এই পরস্পর বিপরীতমুখী ধর্মীয় ও অর্থনৈতিক ব্যবস্হায় নারী হারিয়ে ফেলছে তার নিজস্ব জীবন, বিভ্রান্ত হয়ে পরছে তার প্রতিটি পদক্ষেপ। এর রেশ এসে আছড়ে পরছে তার পারিবারিক জীবনে। সৃষ্টি হচ্ছে বিভিন্ন পারিবারিক এবং সামাজিক সমস্যা। সম অধিকারের নামে তাকে ভোগ করতে হচ্ছে বিচিত্র সব বৈষম্য। নারীকে বাধ্য করা হচ্ছে বিচিত্র এক জীবন যাপন করতে। যদিও পুরুষের জীবনও খুব ভিন্ন নয়। ভালো আছে মুষ্টিমেয় কয়েক জন পুরুষ ও তার পত্নি-উপপত্নিরা যারা নারী অধিকারের নামে নারীকে করে তুলেছেন হাস্যকর এক প্রজাতিতে।

আপেক্ষিকভাবে নারীকে দূর্বল হিসেবে উপস্হাপন করার রীতি সমাজে প্রচলিত আছে। যদিও নারীর এই দূর্বলতার বাস্তব কোন ভিত্তি নেই। একটি বিশেষ ধরনের সমাজ প্রতিষ্ঠা করাই এর একমাত্র উদ্দেশ্য তা সহজেই অনুমেয় হলেও এর ফলাফল পুরুষের মাঝে এমন ভাবে বন্টিত হয়েছে যে এই ব্যবস্হার ছিটে ফোঁটার মাদকতায় সমাজের অধিকাংশ মানুষই একে ভাবছে শ্রেষ্ট ব্যবস্হা হিসেবে। এর থেকে উন্নত ব্যবস্হা ভেবে বের করার সব মেধাকে ধ্বংস করে দিয়েছে এই স্বার্থ। ফলে দিনে দিনই প্রতিষ্ঠা পাচ্ছে এই ব্যবস্হা।

নারীকে দূর্বল বলে তার সমঅধিকার অাদায়ের জন্য সোচ্চার একটি শ্রেনীর উচ্চ কলোরব সমাজে ব্যপকভাবে লক্ষ্য করা যায় আজকাল। বিভিন্ন সভা-সমাবেশ আর সেমিনারে তাদের কলোরব দূষণের পর্যায়াও ছাড়িয়ে গেছে। নারীর সমঅধিকারের নামে বিভিন্ন নারী সংগঠন প্রায় পৃথিবী জুড়েই দেশে দেশে নারীদের সুরক্ষা দেওয়ার জন্য কথিত নারী বাদ্ধব আইন প্রণয়নে সরকারকে পরামর্শ প্রদান ও প্রয়োজনে চাপ সৃষ্টি করে থাকে। আর এই সব আইন প্রণয়ন করে সরকারও প্রশংসা পাওয়ার জন্য গলা বাড়িয়ে দেয়। বুঝে না বুঝে তা করার চেষ্টাও করেছে কেউ কেউ। কিন্তু এই আইন যে প্রকারন্তরে নারীকে হেয় করছে এবং নারীকে দূর্বল হিসেবে উপস্হাপন করে বিশেষ একটি গোত্রে শ্রেনীভূক্ত করছে তা তার ভেবে দেখার প্রয়োজন বোধ করেনি। যেমন বাংলাদেশে নারীকে সুরক্ষা দেওয়ার জন্য প্রচলিত আইনের নাম “নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন”- নামটিই আপত্তিকর! কারন এখানে নারীর বিকাশকেই অস্বীকার করা হয়েছে। প্রাপ্ত বয়স্ক একজন নারীর অভিযোগের বিচার করা হচ্ছে শিশুর সমকক্ষ বিবেচনা করে। কিন্তু একজন মানুষ নির্যাতিত বোধ করলে আইনের দ্বারা সুরক্ষা পাওয়ার অধিকার মানবিক ভাবই রাখে। সেই মানবিকতাকে এই আইন তৈরীর সময় বিবেচনায় আনা হয়নি। অসম শ্রেনীর এই পুঁজিবাদী সমাজে নারীকে সুরক্ষা দেওয়ার নামে তৈরী করা হয়েছে নতুন এক শ্রেনী। এখানে একজন মানুষ আইনগত ভাবে সুরক্ষা পাওয়ার জায়গায় বৈশম্যের শিকর হচ্ছে। যদিও পেশাদার বুদ্ধিজীবিরা এই কথার বিপক্ষে হাজারটা কথার ফাঁদ পেতে প্রমান করার জন্য বিকশিত হয়ে আছে যে ‘না এই আইনের প্রয়োজন আছে’ কিন্তু এগুলো নিতান্তই তাদের কলমের ভাষা। কারন আইনের দ্বারা কখনও নারী-পুরুষের বৈশম্য সৃষ্টি করা স্বাভাবিক নয়। কারন আইন প্রণয়নের অন্যতম ভিত্তিই হওয়া উচিত সমতা। যে আইন মানুষকে মানুষ হিসেবে বিবেচনা না করে বিবেচনা করে সে নারী না পুরুষ তা কোন ন্যায্য আইন হতে পারেনা।

নারীকে সুরক্ষা দেওয়ার নামে দেশে প্রচলিত আইনসমূহ ব্যপকভাবে নারীর পারিবারিক জীবনকে প্রভাবিত করছে। পরিবার নামক আপাত ব্যার্থ একটি সামাজিক সংগঠনকে আরো বেশি জটিল করে তুলছে এই আইন। এই আইনের প্রভাবে বিবাহিত নারী-পুরুষরা নিজেরা পরস্পরকে একে অন্যের পরিপূরক হিসেবে ভাবতে পারছেনা, কারন সামাজিক ভাবে সুরক্ষা পাওয়ার ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের অবস্হান সমান নয়। তাই এক পক্ষ নিজেকে বেশি শক্তিশালী ভাবতে গিয়ে সৃষ্টি হচ্ছে অসম ভালোবাসার বদ্ধন। তাই পত্র-পত্রিকায় প্রতিদিন দেখা যায় নারী পুরুষ দ্বারা অথবা পুরুষ নারী দারা নির্যাতিত হচ্ছে অভিনব সব কৌশলে-বিচিত্র সব পরিস্হিতিতে। এর জন্য ঐ নির্যাতিত ও নির্যাতনকারীকে যতটা সহানুভূতি ও ঘৃনার দৃষ্টিতে দেখা হয় তার চেয়ে বেশি ঘৃনার দৃষ্টিতে দেখা উচিত ঐসব মানুষদের যারা এর জন্য দায়ী। আমি মনে করি এর জন্য ঐসব আইন প্রণেতাদের দায়ী করা উচিত, যারা আইন প্রণয়ন করলেও নিজেরা সব সময় আইনের উর্দ্ধেথাকতে সাচ্ছন্দ বোধ করে।

কোন দেশে প্রচলিত আইন কানুন ঐ দেশের মানুষের জীবন যাপনের উপর ব্যপক প্রভার বিস্তার করে, শুধু জীবন নয় জীবন সৃষ্টির পথে যে বিকাশ তাকেই প্রভাবিত করে। তাই বলা যায় প্রচলিত আইন মানুষের চিন্তার রাজ্যকেও প্রভাবিত করতে পারে(যদিও প্রতিভাবানেরা এই প্রভাবকে অতিক্রম করতে পারে, আর এজন্যই তার অসাধারন) আইনের নামে প্রচলিত নারী সুরক্ষা ব্যবস্হা বিবাহিত নারী-পুরুষের সুস্হ ভালোবাসার বদ্ধন সৃষ্টির প্রধানতম অন্তরায়।

আমাদের দেশ এর কুপ্রভার দ্রুত বিস্তার করার জন্য উর্বর স্হান। কারন এদেশে অধিকাংশ ক্ষেত্রে এমন নারী-পুরুষের মাঝে বিয়ে হয় যার পরস্পরের কাছে অপরিচিত। একে অপরকে চিনে নেওয়ার আগেই অসাম্য এই আইন নারী-পুরুষকে নির্যাতিত আর নির্যাতনকারীর কাতারে এনে দার করায়। ব্যহত হয় পরস্পরকে চিনে নেওয়ার প্রক্রিয়া, যেখানে আইনের অবদান রাখার কথা ছিলো সামাজিক ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা।

আমাদের দেশের আইন শৃঙ্খলা পরিস্হিতির অজুহাতে নারীর জন্য এই বিশেষ ধরনের আইনই সুবিধাকে অনেকেই ন্যায্য বলে মনে করে কিন্তু ভেতরের অন্তঃসার শূন্যতার কথা চিন্তা করেনা। আইনের দ্বারা সকলের জন্য ন্যায় বিচারের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করলেই মানুষের অপরাধ প্রবণতা কমে যাবে। সেখানে মানুষে মানুষে ভেদা ভেদ সৃষ্টির মাধ্যমে কাউকে সুরক্ষা দেওয়ার চেষ্টার সবচেয়ে বড় কারণ – মানবিকতার ভিত্তিতে সামাজিক ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা করলে ক্ষমতাবানদের বর্তমান আইনের দ্বারা রক্ষিত ভন্ডামোর আর সুযোগ থাকবেনা। তাই তারা নিজেদের স্বার্থে মানুষকে বোকা বানানো এই সব আইন তৈরি করে।

বিগত যেকোন সময়ের চেয়ে মানুষ এখন স্বাধীন জীবন যাপন করছে। এই স্বাধীনতা মানুষ নিজেরাই অর্জন করেছে কিন্তু যুগে যুগে এই পথকে কন্টকাকীর্ন করে তুলেছে ক্ষমতাবানেরা। এই প্রচেষ্টা এখনও বর্তমান তবুও বিকাশ ঘটছে মানুষের। সেই প্রক্রিয়াতেই এই সব আইনই অসাম্যকে দূর করার জন্য মেধা ও মননের সংগ্রাম গড়ে তুলতে হবে। আর তা আমাদেরই করতে হবে, তা না হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আমাদের প্রজন্মকে চিহ্নিত করবে এমন প্রজন্ম হিসেবে যারা মানুষকে মানুষ হিসেবে না ভেবে ভেবেছে নারী অথবা পুরুষ হিসেবে।