ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

 

স্বাধীনতা যুদ্ধকাল ১৯৭১ সালে কতো রকমারি দালালের মাধ‍্যমে অামাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশ জন্ম নেয় তাদের ইতিহাস অামাদের কম বেশি সবারই জানা। কিন্ত অামি অাজ সবাইকে জানাবো এক ভিন্নধর্মী মজার এক মহান ব‍্যক্তির বিচিত্র রকমের কারসাজি। তাই অামার এই গল্পের নামকরণ করেছি বিচিত্র রাজাকার।

একাত্তরে যখন চারপাশে পাক হানাদারের হিংস্র বেহায়াপনা চলছে তখন অামাদের এলাকায় সিদ্দিক মৌলবি নামক একজন বিশিষ্ট অালেম ছিলেন। তিনি যদিও সেখানকার স্থায়ী বাসিন্দা ছিলেন না তথাপি উনার অাদশ জীবন প্রণালী, অাচার ব‍্যবহার, সব কিছুতেই হিন্দু মুসমান সবাই মুগ্ধ। একটি প্রসঙ্গ বলে রাখি অামার জন্মস্থান ঠাকুরগাঁও জেলাতে হিন্দু মুসলিমের মাঝে এমন নিবিড় সুসম্পর্ক যে অাপনি ইচ্ছা করলেই বুঝতে পারবেন না, একই সাথে অাড্ডা দেয়া মানুষ দুটি কোন ধর্মের অনুসারী- যদি না অাপনি সাখা-সিঁদুর দেখতে পান।

তারা মুসলমান হিন্দুর ঘরে অাবার হিন্দু মুসলমানের ঘরে জন খাটে (শ্রম দেওয়া)। ধর্মীয় ব‍্যবস্থাপনা করা হয়। ঈদ অানন্দে হিন্দুরা নিমন্ত্রণ পায়, অাবার পুজোতে কিংবা হালখাতা অনুষ্ঠানে মুসলমান দাওয়াত পায়। কেউ কারো দাম নিয়ে টানা ছেচরা করেনা। এ দিক থেকে অামরা সুখী!

জনাব সিদ্দিক সাহেব সেই এলাকাবাসী সুতরাং প্রতি হিংসার বালাই নেই বল্লেই চলে। যুদ্ব চলাকালীন সময়ে বেছে বেছে হিন্দু প্রধান এলাকাতেই পাক হানাদারের বেশি পদচারণ ছিলো। কিছু সম্ভ্রান্ত হিন্দু ব‍্যতীত সবাই নিকট বত্তি বালিয়া ডাংগী উপজেলা দিয়ে ভারতে অাত্মগোপন করেন। যারা ছিলো তারা অতি ভয়ে অাত্মগোপনে থাকতো। অার জনাব সিদ্দিক সাহেব গোয়েন্দা ভিত্তিক খবর দিতো রোজ রোজ। উনি সু্ন্দর ভাবে উর্দু, অারবী ভাষায় কথা বলতে পারতেন, ঠিক মতো সুন্নত তরীকায় জীবন যাপন করতেন বিধায় পাক বাহিনীদের নজর কাড়েন। সেই সুবাদে পাক বাহিনী কোন দিন এলাকায় নিঃশংসতা চালাবে মৌলবি সাহেব অাবহাওয়া বার্তার ন‍্যায় অাগাম খবর দিতেন সবাই সাবধান থাকতো। মৌলবি সাহেবের নির্দেশে পাক বাহিনীদের অাগমন বার্তা এলাকাবাসী শুনতো এক বিচিত্র কায়দায়।

কিছু লোক ভোর রাত হতেই বড় বড় পুরাতন গাছে চড়ে বসে থাকতো অার পাক বাহিনীদের গাড়ির শব্দ শুনে ডাক ঢোল পেটাতে এলাকাবাসী অাগমন বার্তা বুঝতে পেরে লুকিয়ে পরতো নিজ নিজ অাস্তানায়। এদের সাথে গাড়িতে থাকতেন সেই মৌলবি সাহেব। (অামার বাবার মুখে শুনা একাত্তরের কাহিনী) পাক বাহিনীরা হিন্দু পাড়ার বড় বড় খাসি, মোরগ, স্থানীয় ছোট ছোট ছেলে মেয়েদের দ্বারা ধরতো এবং রান্না করে খেতো। মৌলবি সাহেব চাটুকারের মতো পিছু ঘুরতো এবং চামচা হিসাবে ব‍্যবহৃত হতো। কিন্ত সম্পর্ক ছিলো মধু-মিছরির মতো। পাক বাহিনীরা দু-চার ঘন্টা ভন্ডামী শেষে অাবার যখন ক‍্যম্পে চলে যেতো যে যার মতো অাবার ফিরে অাসতো।

বাবার মুখে শুনতে পাই, অামাদের এলাকাতে কোন বিশেষ কোন অঘটন ঘটেনি এই বিচিত্র রাজাকারের সহযোগীতার জন‍্য। অাজ পর্যন্ত হিন্দু-মুসলিম সবার শ্রদ্ধার পাত্র হিসেবে উনাকে সবাই স‍্যালুট করেন। উনাকে অামি ব‍্যক্তিগত ভাবে দেখেছি, উনার সদা হাস‍্যমুখ এটায় প্রমাণ দেয়, উনি চিরাচরিত এক মহান আদর্শের প্রতীক। দেশের মানুষের স্বার্থে পাক বাহিনীদের সাথে হাতে মিলিয়েছেন কিন্ত বিবেক বিসর্জন দেননি। শুনা যায় ওনার বিরুদ্ধে ওয়ারেন্ট জারি হয়েছিলো রাজাকার অভিযোগে, কিন্ত এলাকা বাসী বেঁচে থাকতে ওনার হাতে হাত কড়া পরাবার দুঃসাহস কার?