ক্যাটেগরিঃ দিনলিপি

২০০৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে হঠাৎ অামার বাবা ব্রেইন স্টোক করেন! অামাদের ছিলো কৃষি প্রধান পরিবার। বাবার হঠাৎ অসুস্থতায় ফ্যামেলিতে নেমে অাসে পাহাড় ভাঙ্গা ধস! বড় দু’বোন স্বামী-সংসার নিয়ে ব্যস্ত। মাঝে মধ্যে পাঁচ-দশ দিনের জন্য দেখতে অাসতো কিন্ত এর বেশি সময় দিতে পারতো না। বাবা যে দিন স্ট্রোক করেন সে দিন চায়না অাবাদের জন্য জমিতে সেচ দেওয়া হচ্ছিলো। সেই অবস্থায় বাবা অসুস্থ হয়ে পড়েন! বিকট এক বিশৃঙ্খলার সম্মুখীন হতে হয়েছিলো অামাকে। এক দিকে বাবাকে নিয়ে ভালো চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া, অন্যদিকে অাধো ভাংগা কৃষি অাবাদ সামাল দেওয়া। যদিও বড় চাচা, দুই মামা,দুলাভাই অনেক সাহায্য করছিলেন তবুও একটা পরিবারের সম্পূর্ণ দায়িত্ব অামার কাঁধে ছিলো।

বাবা অসুস্থ হওয়ার পর থেকে মা মানসিক ভাবে অনেক অাপসেট হয়ে পড়েন। মা অনেক বিচক্ষণ থাকা সত্বেও হঠাৎ হাবা বনে গেলেন। কোন জমিতে কয় বস্তা সার, কী পরিমান কীটনাশক দিতে হবে তা শ্রমিক করে দিলেও নিজের বেসিক অাইডিয়া দিতে হয়। কিন্ত মা যেন সব ভুলে গেলেন! অামাকে পুরো দায়িত্ব বহন করতে হয়। সব চাইতে সমস্যায় পড়তে হয় গরু নিয়ে। ছোট বড় বাছুরসহ তিনটা  দুধের গাভি নিয়ে মোট তেরটা গরু ছিলো। এদের দেখাশোনা করার জন্য হায়দার নামের এক অাদম নিযুক্ত করা হয়ে ছিলো! কিন্ত সে যদি ঘাস কাটতে যেতো সকাল দশটায় কোন দিন ফিরতো মাগরিব পার করে! মাঝে মধ্যে খুঁজতে গেলে দেখতাম পুরাতন ব্রাক স্কুলে শুয়ে অাছে।

বাবা অসুস্থ হওয়ার মাস দেড়েক অাগে একমাত্র ভাই ট্রান্সফার নিয়ে রাঙামাটির লুলুং ছড়ি ক্যাম্পে যোগ দিয়েছে। তাকে নিয়ে পড়লাম বিরাট সমস্যায়। রাঙামাটি-কাপ্তাই এলাকার ক্যাম্পসমূহে সরকারি ভাবে নেটওয়ার্ক স্থাপনের অনুমোদন না থাকায় সেখানে চিঠিই ছিলো যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম। লোকাল চিঠি অাসতো ২০-২২ দিনে অার বেয়ারিং অাসতো ১৫-১৬ দিনে। বাবার অসুস্থতার খবর দিয়েছিলাম চিটাগাং রিয়ার থেকে। কর্পোরাল মনির ভাইয়ের নিকট অামি অামৃত্যু চির কৃতজ্ঞ। তিনি অামাকে অনেক সাহায্য করছিলেন।

ভাইয়া পনের দিনের ছুটি কাটিয়ে যাওয়ার পর বাবার শারীরিক অসুস্থতার জন্য অনেক টেনশান করতো! অার সপ্তাহে চিঠি লিখতো সাতটা। তার দৃঢ় বিশ্বাস দুয়েকটা চিঠি তো অনন্ত পোঁছবে। কিন্ত চিঠি অনেক দেরিতে পেতাম অার অামার চিঠি মনে হয় মাসে দুয়েকটাও লুলুং ছড়ি পযর্ন্ত পৌঁছতো কিনা সন্দেহ! তাই ভাইয়া এক চিঠিতে অভিমান করে লিখলো ’অামি জানি তুই লেখতে জানিস তবে অামার চিঠির উত্তর দিস না কেন? অামার সমস্ত অস্তিত্ব জুড়ে মা,বাবা, অার তুই! চিঠির উত্তর পাই না বলে ভাতের প্লেট নিয়ে বসলে চোখের জলে অামার প্লেট ভরে যায়! ডিফেন্সে চাকরি করাই কি অামার অপরাধ?’

অাসলে সপ্তাহে একটা-দুটো চিঠি অামিও লেখতাম। কিন্তু ভাইয়ার হাতে পৌঁছতো অনেক দেরিতে। অামি কর্পোরাল মনির ভাইকে ফোন দিয়ে রিকোয়েস্ট করলাম, ’ভাইয়া, অামাকে একটা চিঠি লিখে হেল্প করবেন?’ তিনি হেসে দিয়ে রাজি হলেন, বল্লেন ঠিক অাছে কী লিখবো বলো অামি কপি করছি।

এক চিঠিতে জানতে পারলাম ভাইয়ার ম্যালেরিয়া জ্বর হয়েছিলো। এতে মা ভীষন কান্নাকাটি শুরু করছিলেন। অামার সেই চিঠি প্রিয় ভাইয়া,

’পত্রের প্রথমে সালাম নিবা। অাশা রাখি খোদার কৃপায় ভালো অাছো? পর সমাচার এই যে, গত ১৬/৬/২০০৬ তারিখে এক সাথে তোমার তিনটে চিঠি পেয়েছি, তোমার জ্বরের কথা শুনে মা অাল্লাহর কাছে মান্নত করছেন। যে গরুটার অসুখ ছিলো সেটা ভালো হয়েছে। অার যেটা বিক্রি করার কথা ছিলো সেটা এখনো করিনি। অাব্বার চিকিৎসা চালিয়ে যাচ্ছি। তুমি অতিরিক্ত টেনশান করিওনা। অাব্বা এখন কথা বলতে পারেন! অাশা করি দু’তিন মাসের মধ্যে সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে যাবেন। বড় অাপা পনের দিনের মাঝে রংপুরে চলে অাসবে।অাবাদ ভালোই হয়েছে। তুমি ভালো থাকো এই প্রত্যশায় ইতি টানছি, তোমার ছোট বোন ফাহিম।’

বি:দ্র: অাব্বা এখন তোমার নাম ডাকতে পারে! যে বাবা দীর্ঘ তিন মাস অসহায়ের মতো মুখ পানে তাকিয়ে থাকতো, অাজ তিনি কথা বলতে পারেন। এ যে অামাদের জীবনের এক পরম পাওয়া।

মনির সাহেব পত্র দেওয়ার তিনদিন পর ভাইয়ার হাতে পৌঁছেছিল। এ শুধু একটা চিঠিই নয় এক স্নেহ কাঙাল হৃদয়ের বাঁচার উৎস!