ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

ইয়াবা একটি থাই শব্দ। এর অর্থ পাগলা ঔষধ। ইয়াবা মূলত মেথ অ্যাম্ফিটামিন ও ক্যাফেইন এর সহ মিশ্রণ। মিয়ানমারের ওয়া এবং কোকাং অাধিবাসীদের হাতে ইয়াবার জন্ম। বাংলাদেশে সর্বপ্রথম ১৯৯৭ সালে ইয়াবা অামদানি শুরু হয়। পরবর্তীতে ২০০০ সাল থেকে নিয়মিতভাবে বাংলাদেশে অাসার সুবর্ণ সুযোগ পায়। এবার অাসা যাক ইয়াবা সেবনকারীদের পারিবারিক গল্প প্রসঙ্গে।

ইয়াবা কতটা মারাত্মক, তার প্রমাণ বিভিন্ন সংবাদপত্রে মাঝে মধ্যে দেখতে পেতাম। কিন্ত এর নির্মম ভয়াবহতা স্বচক্ষে গাজীপুর শহরে অাসার পরে জানতে পারলাম। অামি যে বাড়িতে ভাড়া থাকি তাদের পরিবারের চার সন্তানের মধ্যে তিনজনই ছেলে। যাদের মাসিক অায় ২০০৫ সাল পর্যন্ত হাজার তিনেক ছিলো। সৌভাগ্যক্রমে ২০০৬ সাল থেকে বাড়ির অতি নিকটে পরপর দুটি গার্মেন্টস এবং তিনটি টেক্সটাইল মিল গড়ে ওঠে। যে পরিবারের মাসিক অায় এতটা সংকীর্ণ ছিলো, এখন তাদের বর্তমান মাসিক অায় তিন লক্ষের বেশি! (শুধু মাত্র রুম ভাড়া)।

অামাদের সমাজে অতি প্রচলিত একটি বাক্য এক্ষেত্রে প্রযোজ্য- “অল্প পানির মাছ বেশি পানিতে পড়লে খায় হাবু ডুবু।” এই পরিবারের হয়েছে ঠিক সে অবস্থা। ছেলের হাত খরচা যদি লাগতো ২৫ টাকা মা অতি দাপটে দিতো ৫০০ টাকা। ব্যস যা ঘটার তাই। পরপর চার সন্তানই বিভিন্ন অঘটন করার পর নিজ নিজ মতে জীবনসাথী পছন্দ করে বাড়িতে উঠলো। শুরু হলো পারিবারিক জীবন। অতিরিক্ত পরিমাণে ইয়াবা সেবন এবং সাথে ইয়াবার জমজমাট ব্যবসায় ছেলেদের হাতে খড়ি। মা নাজেরা বেগম এবং বাবা জসীম সব কিছু স্পষ্ট জানতেন। বেশ কয়েকবার পুলিশ ইয়াবা সেবনকারী পাঁচ-সাতটা ভাড়াটে সহ গ্রেফতার করছে তাদের! কিন্তু ‘অাইনের হাতের চেয়ে ঘুষের হাত অনেক লম্বা’ হওয়ায় বার বার তারা ছাড় পেয়ে যায়।

কিন্তু বোকা অভিভাবক বুঝতে পারে নি, ‘স্নেহের অাধিক্যে সন্তানের বিপদ ডেকে অানে।’ এক পর্যায়ে মা এবং বাবা উভয়ের হাতে পড়ে হাত কড়া! সন্তানকে মাদক সেবন এবং মাদক ব্যবসায় সহয়তা করার অপরাধে। সে অবস্থায় তাদের টনক নড়ে। কিন্তু ততদিনে বেলা অনেক গড়িয়েছে। সে অবস্থায় যখন ছেলেদের ইয়াবা থেকে দূরে থাকতে অাদেশ করা হয়, তখন তারা হাতে লম্বা রাম দা-ছোড়া তুলে তেড়ে অাসে মা-বাবা কে মারতে। চলে প্রতি সপ্তাহে অস্ত্র মহড়ার রিহার্সেল। তাদের অত্যচারে অতিষ্ঠ ভাড়াটে এবং অন্য পরিবারগুলোও।

মুক্তির পথ একমাত্র ছিলো নিরাময় কেন্দ্র। তিন মাস পর সেখান থেকে ছোট ছেলেকে বাড়িতে অানে। মা খুশিতে অাটখানা। কিন্ত বিধি বাম, যেই লাউ সেই কদু। কথায় বলে, কয়লা ধুলে ময়লা যায় না; কোন পরিবর্তন হয়নি তার। তিন-চার দিন পর অাবার যেই সেই! সবচেয়ে বেশি সমস্যা অামাকে ফেস করতে হয়। কারণ অামি তাদের খুব কাছের রুমে থাকি। তাদের জোরপূর্বক প্রেমের দোহাই দিয়ে বিয়ে করা ভালোবাসার স্ত্রীদের উপর নিমর্ম নিযার্তন দেখলে অামার রাতের ঘুম হারাম হয়ে যায়। এরা প্রকৃতপক্ষে স্ত্রী দের প্রতি কোন প্রকার বিতৃষ্ণা বা অবহেলা করে না। মূলত যখন নেশার প্রকটতা বৃদ্ধি পায় সে অবস্থায় এরা কমনসেন্স হারিয়ে ফেলে।

যেকোন ইয়াবা সেবনকারী মূলত তিনটি স্টেজ অতিক্রম করে। টার্সিয়ারি পর্যায়ে গেলে এরা সব সময় ভুল দেখে, ভুল শোনে, ভুল বোঝে। একটি সাজানো পরিবার ধংস করতে যা প্রয়োজন, একজন ইয়াবা সেবনকারীর মাঝে সে সকল বৈশিষ্ট্যই বিদ্যমান। কে এদের বাঁচাবে? পরিবার ব্যর্থ, ভালোবাসার প্রিয়তমা ব্যর্থ, মা-বাবা ব্যর্থ, পুলিশ প্রসাশন ব্যর্থ, নিরাময় কেন্দ্রও ব্যর্থ! পুলিশ হয়তো ব্যর্থ হতো না, কিন্তু পুলিশ অপারগ! কারণ, ‘ তারা নেতার ভাইস্তা’, সুতরাং…।

সিজোফ্রেনিয়ার পেশেন্ট (মাদকাসক্ত রোগী) হিসেবে সুইসাইডের পথ বেছে নিতে কে এদের বাধ্য করছে- স্নেহের অাধিক্য, নাকি বিদ্যমান সমাজ?