ক্যাটেগরিঃ নাগরিক সমস্যা

 

শুরুতেই একটি জোক। জোক না কৌতুক। এক ব্যক্তি কোনো এক কাজে এক মাঠে গেল। সে যে জমিতে দাঁড়ানো ছিল, সেটি তার ছিল না। তো জমির মালিক হাঁক দিলেন, এই আপনি আমার জমিতে কেন? ওই ব্যক্তি উত্তর দিল, তাহলে ডান দিক দিয়ে চলে যাচ্ছি। জমির মালিকের উত্তর, সেদিক দিয়ে যাওয়া যাবে না। কারণ, সেটাও তো আমার জমি। বিপদে পড়া লোকটি বলল, তাহলে আমি বাম দিক দিয়ে চলে যাচ্ছি। জমির মালিক এবার বলল, না। কারণ সেটাও তো আমার। এভাবে উধঃ অধঃ ছাড়া আট দিকের কথাই বলা হল। কিন্তু জমির মালিকের একই উত্তর, ওটাও তো আমার। ওদিক দিয়েও যেতে পারবে না। শেষ পর্যন্ত ওই লোক বলল, তাহলে আমি কী করব? জমির মালিক বলল, কী-ও করা যাবে না।

এবার ফিরে আসি নিজেদের দুনিয়ায়। বাংলাদেশে গাড়ি নিয়ে অনেক আইন আছে। সিটবেল্ট বাঁধতে হবে, গাড়ি চালানোর সময় মোবাইলে কথা বলা যাবে না, রাস্তার বাম লেন বন্ধ করা যাবে না, যেখানে সেখানে গাড়ি পার্ক করা যাবে না ইত্যাদি আরো কত কী? কিন্তু যারাই রাস্তায় বের হন, তারা বেশ ভাল করেই জানেন, এ ধরনের আইনগুলোর প্রয়োগ কতটুকু হচ্ছে।

বড় ধরনের কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে অথবা ছোট কোনো দুর্ঘটনায় বড় কোনো ব্যক্তি নিহত হলে শুরু হয় এসব আইন নিয়ে ব্যবচ্ছেদ। আর নৌমন্ত্রী আমাদের এসব গাড়ি-স্টাফকে জাতির সেবক, জাতির জন্য প্রাণপাত করা কর্মী হিসেবে ঘোষণা দেন। আবার চলতে থাকে আগের মতোই।

বাংলাদেশ হওয়ার পর থেকে সড়ক, রেল ও নৌপথে দুর্ঘটনা কম ঘটেনি। প্রতিবারই শোর উঠে সম্মিলিত গলায়। তারপর আবারও সব নিরব। হিসেব করলে দেখা যাবে, নতুন কিছু কাগুজে নীতিমালা তৈরি ছাড়া আসলেই এ পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হয়নি। বাস্তবতা এটাই। তাই আমরা সয়ে নেই ধীরে ধীরে।

কিন্তু পরশু রাতে যা দেখলাম, তা হজম করতে আমার একটু বেশিই সময় লাগছে। গাজীপুর টু সাইনবোর্ড রুটের বাস অনাবিল সুপার। সাইনবোর্ড থেকে প্রায় আধা কিলোমিটার রাস্তার দু’পাশ, রাস্তার পাশের দুটি ফিলিং পাম্পসহ প্রায় পুরো এলাকাই তাদের স্ট্যান্ড। তিন রাস্তার মুখে সবসময়ই তাদের তিন-চারটি গাড়ি এমনভাবে রাখা থাকে যে, নারায়ণগঞ্জ থেকে আসা ঢাকাগামী বাসগুলো বিপদেই পড়ে যায়। সেখানে থেমে থাকা অন্য গাড়িও দেখা যায় না অনাবিল বাসের কারণে। এভাবেই চলছে দীর্ঘদিন ধরে।

এদিকে আবার গাজীপুর থেকে আসার পথে রায়েরবাগ পার হলেই অনাবিলের একচেটিয়া রাজত্ব। যাত্রীদের হয়রানি করা, অস্বাভাবিক গতিতে গাড়ি চালানো, পাশে চলতে থাকা বাসসহ অন্য যানবাহনকে চমকে দেয়া, বাসে স্টাফদের হৈ চৈ ইত্যাদি দেখলেই বুঝা যায়, এটা অনাবিলের নিজস্ব সাম্রাজ্য। এগুলোও সয়ে গেছে যাত্রীরা। কিন্তু ওইদিন দেখলাম আরেক নতুন কাণ্ড। বাসটি তখন রায়েরবাগ বাসস্ট্যান্ড পার হয়ে এসেছে। পরদিন হরতাল হবার কারণে রাস্তায় যানবাহন ছিল তুলনামূলক কম। ফলে অনাবিলের আনন্দ দেখে কে। এমন সময় মাতুয়াইল মেডিক্যাল বাসস্ট্যান্ডের আরো কিছু সামনে থেকে চলতি অবস্থাতেই উঠল এক যুবক। উঠেই সে ড্রাইভারের সাথে ঘষাঘষি করতে লাগল। কয়েকজন নিষেধও করল, এতে ড্রাইভারের মনোযোগ ছুটে যেতে পারে। কিন্তু অবাক করা ব্যবহার হলো, সদ্য আসা যুবক ড্রাইভারের সিটে বসে পড়ল, আর আগের ড্রাইভার সরে গেল ড্রাইভিং সিট থেকে। বাস তখন চলছে ঘণ্টায় অন্তত ৪০ মাইল বেগে। গতি একটুও না কমিয়েই সম্পাদন করা হলো এ কাজ। রাস্তার পাশে গভীর খাল। পড়লে উঠাতে দিন পার হয়ে যাবে। যাত্রীরা আতঙ্কে চিৎকার করে উঠল। কিন্তু পরে যখন মনে হল তারা ছুটছে অনাবিলের আস্তানার দিকে, তখন নিজেদের বোধ-বিবেচনাতেই চুপ হয়ে গেল।

হয়ত তারা এমনটা অনেক আগে থেকেই করে থাকে। অথবা হয়তো পরশুই প্রথম ট্রায়াল দিল। কিন্তু কাজটি যে কত বিপজ্জনক তা আমাদের যোগাযোগ মন্ত্রীর বুঝতেও অনেকটা সময় লেগে যাবে। বড় একটা দুর্ঘটনা ঘটার আগে তাদের বোঝার সুযোগটাও তাদের অবশ্য কম। আর নৌমন্ত্রী তো এটাকে বিশাল একটা গৌরবের কাজ বলে মেডেলও দিয়ে দিতে পারেন তাদের।

সব মিলিয়ে আমরা যে অবস্থায় আছি, তাতে ওই আগের কৌতুকের মতোই অবস্থা। ‘কী’-ও করার উপায় নেই।