ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

মুখে খোঁচা খোঁচা সাদাকালো দাড়ি সম্বলিত জামাল সাহেব দাঁড়িয়ে আছেন পল্লবী বাসস্টপেজে। এই শীতেও বিন্দু বিন্দু ঘাম জমা হয়েছে কপালে। সকাল দশটায় অফিস, এখন বাজে নয়টা বিশ। কিন্তু কোন বাস নেই। বাস বন্ধ,সরকারী অবরোধ চলছে। মতিঝিলে অফিস, সিএনজি নিয়ে গেলে জ্যামহীন রাস্তায় হয়ত পৌঁছা যেত,কিন্তু সে সামর্থ্য নেই।যে বেতন পান তা দিয়ে মাসের পঁচিশ দিন কোনমতে চলে,বাকী পাঁচ দিন আল্লাহ্‌র উপর ভরসা করে চলতে হয়।
জামাল সাহেবের কপালের বিন্দু বিন্দু ঘাম যখন ফোঁটাতে রূপান্তরিত হচ্ছিলো তখনই কোথা থেকে একটি পিকআপ সামনে এসে দাঁড়াল। ড্রাইভার “মতিঝিল” বলা মাত্রই তিনি তাতে উঠে পড়লেন।তার মনে হল তিনি এইমাত্র বিশ্বজয় করলেন।সমস্ত টেনশন নীচে নেমে গেল।মুহূর্তেই পিকআপ যাত্রী বোঝাই করে মতিঝিলের উদ্দেশ্যে রওনা দিল।
টেনশন থেকে মুক্ত হয়ে পিকআপের মৃদু ঝাঁকুনিতে জামাল সাহেবের চোখে তন্দ্রা মত এসেছিল, হঠাৎ পিকআপটা ব্রেক করায় সেই তন্দ্রা কেটে গেল।তিনি তাকিয়ে দেখলেন সরকারী দলের এক গ্রুপ ওটা থামিয়েছে এবং যাত্রীদেরকে নেমে যেতে বলছে।যাত্রীরা বলল”বাস চলছে না তাই এতে করে অফিসে যাচ্ছি “, দল থেকে উত্তর এল”–এটা কি অফিসের গাড়ী?এটা করে অফিসে যাবেন?”।
বাধ্য হয়ে জামাল সাহেব যখন পিকআপ থেকে নামতে যাবেন তখন বাধাদানকারী দল থেকে একজন তরুণ তার পাশে এসে দাঁড়াল এবং সেলফি তুলতে লাগল। মোবাইলের পর্দায় জামাল সাহেবের চোখ পড়তেই তিনি হতভম্ব হয়ে পড়লেন। পর্দায় তরুণের প্রতিকৃতির পরিবর্তে দেশের বর্তমান রাজনীতির সেলফি দেখতে পেলেন।
সারাবিশ্বে তুমুল জনপ্রিয় সদ্য যে শব্দগুলো চালু হয়েছে তার মধ্যে আত্মপ্রতিকৃতি বা সেলফ পোট্রেটের সংক্ষিপ্তরূপ “সেলফি” অন্যতম। পাশাপাশি বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের সবচাইতে আলোচিত,সমালোচিত,ঘৃণিত কিংবা ন্যক্কারজনক বহুল ব্যবহৃত শব্দ হল”রাজনীতি”। সকল নৈতিকতা বিসর্জন দিয়ে, দেশের স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে হলেও ক্ষমতা চিরস্থায়ী করা এবং বিরোধী মতকে দমনের প্রচেষ্টা করা রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। এখন বর্ষীয়ান নেতাদের মুখ থেকে বের হয়”খালেদা জিয়া আপনি রাগ করবেননা, বয়স হলেও আপনাকে দেখতে খুব সুন্দর লাগে”-জাতীয় উক্তি। আবার বিরোধীরা পুলিশের রাইফেল কেড়ে নিয়ে তা দিয়ে সেই পুলিশকে পেটাচ্ছে। স্বাধীনতা,গণতন্ত্র, মানবাধিকার বাংলাদেশে কেবল আক্ষরিক অর্থেই এসেছে,প্রকৃতপক্ষে তা অধরাই রয়ে গেছে। বর্তমানে কাউকে প্রগতিশীল এবং মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কোন কাজ কর্মে অংশ নিতে দেখা যায় না যদি তা তাদের দলের স্বার্থের অনুকূলে না হয়।
দেশ-জাতি এবং সমাজকে রক্ষা করতে হলে রাজনীতিকদের এই ধারা থেকে বের হয়ে আসতে হবে। রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করতে বা ধরে রাখতে যে কোন পদক্ষেপ গ্রহণের পূর্বে দেশ-জাতি ও নতুন প্রজন্মের ভবিষ্যৎ চিন্তা করতে হবে।