ক্যাটেগরিঃ মতামত-বিশ্লেষণ

 

অবশেষে পড়ে শেষ করলাম “Against our will:Men,Women and Rape”,Susan Brownmiller এর লেখা। গতকাল সচলায়তনে শুভাশীষ দাসের লেখা পড়েই বইটি পড়ার ইচ্ছে জাগে। পড়তে পড়তে মাঝে মাঝে আমার শরীরটা অসাড় হয়ে উঠছিল। বারবার মনে হচ্ছিল, এ আমি কী পড়ছি? চোখের সামনে এনিমাল প্লানেট চ্যানেলের বাঘ কিভাবে হরিণ শিকার করে তার দৃশ্য দেখছিলাম!

The Reverend Kentaro Buma reported that more than [sb]200000[/sb] Bengali womn had been raped by Pakistani soldier during the nine month conflict, a figure that had been suplied to him by Bangladesh authorities in Dacca[sb].Thousands [/sb]of women became pregnant……………….. (পৃ:৭৯)

সম্প্রতি বহুল আলোচিত “মেহেরজান”সিনেমার পরিচালক রুবাইয়াৎ হোসেনের প্রথম আলোতে লেখা আর্টিকেলটা পড়ার পরে রাগে দুঃখে মরে যেতে ইচ্ছে করছিল। নির্লজ্জতারও সীমা থাকে একটা! সে (তিনি বলবার মত যোগ্য সে না) লিখেছে ৭১’এ “ধর্ষিত নারীর সংখ্যা ৪০ হাজার থেকে আড়াই লাখ,” তার রেফারেন্সের মধ্যে সুসান ব্রাউনমিলের কথাও উল্লেখ আছে। আসুন দেখি সুসান ব্রাউনমিলারের বইয়ে কী উল্লেখ আছে..।
200000,300000, or possibly 400000 women (three sets of statistics have been variously quoted)were raped…………(পৃ:৮০)

‘মেহেরজান’ যা বলতে চেয়েছে তে রুবাইয়াত হোসেন বলে

“মেহেরজান একাত্তরের নারীপ্রধান একটি আখ্যান। এই আখ্যানে রয়েছে সেই নারীদের গল্প, যাঁরা নিজেদের মতো করে যুদ্ধ করেছেন—কখনো হয়তো বন্দুক ছাড়াই; অহিংসার পথে রক্ষা করেছেন আত্মসম্মান। তাঁদের পাশাপাশি রয়েছে নানাজানের একটি কেন্দ্রীয় চরিত্র, যিনি বাঙালির সংগ্রামকে বরাবর সম্মান করেন, সবশেষে জীবন দেন পাকিস্তানি সেনাদের হাতে।

কোথায় নারীপ্রধান আখ্যান??? তবে যদি সেটা নারীর উপস্থিতির সংখ্যা হিসেবে হয় তবে আমার কিছু বলার নাই। সমাজে নারীকে দেখা হয় সেক্স-মেশিন হিসেবে। যেখানে ভোগবাদী পুরুষ শ্রেনী নারীকে শুধু ভোগের বস্তু মনে করে। রুবাইয়াৎ হোসেন কি তাই করেনি? নারীর রিপ্রেজেনটেশন কতখানি নারীর পক্ষে ছিল তার তথাকথিত নারীপ্রধান আখ্যানে?!! নারীর মুক্তি কি সে “নীলা”র সাদা রঙের জর্জেট শাড়ি আর স্লিভলেস ব্লাউজের মধ্যেই খুঁজে পেয়েছেন? নাকি কামুক নারী যে লম্বা পুরুষ দেখলেই কাম বাসনা অনুভব করে তার মধ্যে? শুধুমাত্র যৌনজীবনের স্বাধীনতা থাকলে যদি নারীর প্রকৃতার্থে উত্তরণ ঘটত তাহলে ঘরে ঘরে পতিতালয় তৈরি হত।তখন রুবাইয়াৎ হোসেনও বাদ যেত না তার থেকে। নারীর পক্ষে কথা বলতে চান ভাল কথা। মুক্তিযুদ্ধে নারীর পক্ষে কথা বলার অনেক ইস্যু আছে।সেসব নিয়ে বলুন। স্বাধীনতা যুদ্ধের কোন ফ্যান্টাসিতেই মুক্তিযোদ্ধারা কামুক, লম্পট, বিয়ে পাগলা, ব্যক্তি স্বার্থে মশগুল এমন কোন আভাস আসতেই পারেনা। না না না!

ঐতিহাসিক সত্যও কখনো কখনো প্রস্তরীভূত হয়ে পড়ে। খুঁড়ে তুললে আমাদের মধ্যে অস্বস্তি জাগায়। এই মর্মে পাঠকের কাছে দু-একটি দৃষ্টান্ত পেশ করি।
নীলিমা ইব্রাহিম তাঁর আমি বীরাঙ্গনা বলছি’র ভূমিকায় ৩০-৪০ জন মেয়ের উল্লেখ করেছেন, যাঁরা আত্মসমর্পণকারী বা বন্দী পাকিস্তানি সৈন্যদের সঙ্গে ভারতে চলে গিয়েছিলেন (আমি বীরাঙ্গনা বলছি, নীলিমা ইব্রাহিম, জাগৃতি, ১৯৯৮)।

এই সহজ জিনিসটা বোঝাতে একটা আস্ত সিনেমা বানানোর কোন দরকার ছিলনা। এখনও এমন দৃষ্টান্ত ভুরি ভুরি।যে মেয়েটাকে ছোট থাকতেই শেখানো হয় তোমার এখন মাত্র অস্ত্র হল তোমার ইজ্জত সে তাই রক্ষা করতে করতে পুরো জীবন কাটিয়ে দেয়। ৪০বছর আগে তো ব্যাপারটা আরো ভয়াবহ ছিল। তাই এখনও দেখা যায় ধর্ষিত মেয়েটি ধর্ষককে বিয়ে করছে কিংবা করতে বাধ্য হচ্ছে। ৭১’এ আপনার পাকিস্তানি সৈন্যদের সাথে চলে যাওয়া মেয়েরাও যে তাই করেছে এটা আপনার জ্ঞানী মস্তিস্কে কেন ঢুকলো না? আর শুধু মাত্র ঐতোহাসিক সত্য উদঘাটনে আমাদের কোন আপত্তি ছিল না।সত্যিই ছিলনা। কিন্তু মুক্তিযোদ্ধাদের চিত্রায়ণটাও কী ঐতিহাসিক সত্যের মধ্যেই পড়ে? ঘরে নববধু ফেলে যুদ্ধে চলে যেত যে মানুষগুলো তাদের কথা বোধ হয় শোনেননি কোনদিন। নাহলে “যুদ্ধ ভাল্লাগেনা, চল পালিয়ে যাই”টাইপ ডায়ালগ আপনার মাথা থেকে বের হত না। মুক্তিযোদ্ধাদের আপনার ভালবাসার ফাকিং পাকিস্তানিদের মত এত শরীরের জ্বালা ছিল না, তাদের সময়ও ছিলনা। এত বড় দুঃসাহস দেখালেন কেমন করে? আর তাছাড়া প্রথম আলো তে “‘মেহেরজান’ যা বলতে চেয়েছে” আর্টিকেলে আপনি নারীদের পক্ষে যা বলেছেন তার ছিটেফোঁটাও ছবিতে প্রতিফলিত হয়নি।

তাই যুদ্ধংদেহী পৃথিবীতে ‘অপর’কে ভালোবাসার গল্প শোনাতেই মেহেরজান ছবির জন্ম।

রুবাইয়াৎ হোসেন সম্ভবত ভুলে গেছেন ৭১’এর মুক্তিযুদ্ধ আর বিশ্বযুদ্ধের মধ্যে কিছু পার্থক্য আছে। বিশ্বযুদ্ধে অনেক সৈন্যকে অনিচ্ছা সত্বেও যুদ্ধে যোগ দিতে হত কিন্তু মুক্তিযোদ্ধারা স্বতস্ফুর্তভাবেই যোগ দিয়েছিলেন। অল কোয়ায়েট অন দ্যা ওয়েস্টার্ন ফ্রন্ট পড়ে এসে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে চলচিত্র বানাতে বসলে এমন ফ্যান্টাসি হওয়াটা অসম্ভব না। উনি সম্ভবত self and other (নিজ এবং অপর) আইডিওলজির ব্যাখ্যাটা বুঝেন নাই কিংবা ইচ্ছে করে এমন করেছেন অথবা বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষকেই বোকা ভেবেছেন। আমার স্বল্প জ্ঞানে এই যুক্তিটা কিছুতেই মানতে পারছেনা যে আমাকে কিংবা আমার কোন বোনকে কেউ ধর্ষণ করবে আমার বাবাকে হত্যা করবে আর আমি “অপর” কে ভালবাসার গল্প শোনাব! আর ভালবাসা অনেক হয়েছে। তারা এদেশে আসছে, ব্যবসা করছে। তাদের পণ্যে আমাদের বাজার ছেয়ে গেছে। বিশ্বাস না হলে দেখে আসতে পারেন গাউছিয়া থেকে বসুন্ধরা সিটি পর্যন্ত পাকিস্তানি ড্রেস জুতা বোরখায় ছয়লাব। এর বেশি ভালবাসার দরকার নাই!

কতিপয় সুশিল আবার সাফাই গাইতে গাইতে ফেনা তুলে ফেলছেন।তাদের উদ্দেশ্যেই বলছি, আমি নিতান্তই কম বুঝদার মানুষ। বিদেশে অবৈধ ভাবে থাকছিনা, আমার চৌদ্দ গোষ্ঠীর মধ্যে কোন মোল্লা নাই। আমার যে কারনে “লাফালাফি” তার কারন আমার মুক্তিযোদ্ধা বাবা। তিনি পাকিসৈন্যের কাছ থেকে আত্মগোপন করতে একটা হীন্দু বাড়িতে গিয়ে ওঠেন। সেই পরিবারে শয্যাশায়ী পিতা আর এক কন্যা ছাড়া কেউ ছিলনা।ঘরের পেছনে থাকা গাছে বাবাকে লুকিয়ে থাকতে বলে মেয়েটি নিজেকে বিলিয়ে দিয়েছিল, সাথে বেয়নেটের খোঁচায় রক্তাক্ত হয়ে মরেছিল বুড়ো মানুষটাও। এই ঘটনা বলতে গিয়ে বাবার চোখে অসংখ্যবার আমি বাণের জল দেখেছি। তাই মুক্তিযোদ্ধাদের কামুক চিত্রায়ণ আমি সইতে পারিনা। ভাবছেন “ডিসকোর্স” গ্রান্ড ন্যারেটিভ, হেজিমনির মত কিছু ইংরেজী শব্দের ব্যবহার হলেই আমরা এক কথায় মেনে নেব সব।ভুল! ফাহমিদুল হক(এখন কেন জানি স্যার বলতে ইচ্ছে করছেনা) এর পোষ্টে প্রথম কমেন্টে আমার স্যাটায়ার টা উনি ধরতে পারেননি। ডিকনস্ট্রাকশন নামক শব্দটি এখন অধিকাংশ মানুষই বোঝে। শুধু মাত্র বাঙালী মেয়ের সাথে পাকি সৈন্যের প্রেমের কাহিনী হলে হয়ত এত কথার জায়গা থাকতনা। কিন্তু সেখানে লক্ষ লক্ষ মুক্তিযোদ্ধাদের অপমান করা হয়েছে। সেখানেই মূল আপত্তি। ফাহমিদুল হক কেন এমন করলেন সে প্রশ্ন অবান্তর। কিন্তু আমার ছোট ভাইটি এমন ছবি দেখে যখন মুক্তিযুদ্ধের পবিত্রতা নিয়ে প্রশ্ন তুলবে তখন কি আমি তাকে ফাহমিদুল হকের কাছে পাঠাব তার ডি……………কনস্ট্রাকশন বোঝাতে?!!! আর যুদ্ধাপরাধিদের বিচার দরকার নেই, কারন সেটাও সেলফ আদার ফ্রেমের মধ্যে নিয়ে আসা যায়, আবার সেটাও এক প্রকার ডি…………কনস্ট্রাকশন! বেদনাদায়ক সত্যের দিকে আঙ্গুল তুলে তাকে মিথ্যে প্রমাণের চেষ্টায় যে ফ্যান্টাসি তার মধ্যে ডিকনস্ট্রাকশনটা কোথায় পেলেন তিনি?

অতিআবেগ নামক শব্দের ব্যবহার করে নিজেদের যতই উত্তরাধুনিক প্রমাণের চেষ্টা করেন না কেন। আপনারাও তার বাইরে নন। কোন ব্যক্তি মানুষই আবেগের উর্ধে নয়। ভালবাসাও আবেগের একটা অংশ। আর এই ভালবাসা নামক আবেগের ব্যবহার না থাকলে মানুষ জীবন বাজী রেখে যুদ্ধে যেত না,আপনারাও সুশিলগিরি ফলাতে পারতেন না স্বাধীন দেশে বসে।

মেহেরজান চলুক। আমি চাই। মানুষ মেহেরজান দেখুক, ছবির সাথে সংশ্লিষ্টদের গনধর্ষন করুক। তারপর তারা ভালবাসুক “আদার” কে!

সূত্র সমূহ:
১ শুভাশীষ দাসের লিংক: http://www.sachalayatan.com/subasish/37375
২. ফাহমিদুল হকের লিংক: http://www.somewhereinblog.net/blog/fahmidulhaqblog/29317284 (মন্তব্য সহ)
৩. রুবাইয়াৎ হোসেনের লেখা: http://www.prothom-alo.com/detail/date/2011-01-26/news/126435
পুনশ্চ: লেখাটি পরে আরও ইনফরমেটিভ করার ইচ্ছে আছে যা এখন সময়ের অভাবে হল না।