ক্যাটেগরিঃ খেলাধূলা

 

কারসাজির ভূত মাথায় নিয়ে কলের পুতুল পাকিস্তানী আলিমদার ও ক্রীড়নক ব্রিটিশ ইয়ান গোল্ড নামের আম্পায়াররূপী ভ্যাম্পায়াররা যে বাংলাদেশের কোয়ার্টার ফাইনাল গিলে খেয়েছে তা কেবল আমরা বলছি না। একসময়ের ভারত ও অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেট ট্যালেন্ট ভিভিএস লক্ষ্মন বা শেন ওয়ার্নরাই টুইটে গলা ফাটিয়ে বলেছেন। একাত্তরের পরাজিত শক্তি পাকিস্তান ও এসময়ের হার খাওয়া ইংল্যান্ড সুযোগ পেলেই যে আমাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পরে তাদের ঝাল মেটাবে এর বড় উদাহরণ সৃজন করলেন পাকি ও ব্রিটিশ ভ্যাম্পায়ারদ্বয়।

এবারের ক্রিকেট বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে নো বল, ওয়াইড বল, সুইং, ইন সুই্ং, আউট সুইং, গুগলি, ইয়র্কার, স্কোর কার্ড, আইন বা কানুন বলে কিছু ছিল না। ছলে বলে কলে কৌশলে স্বঘোষিত ক্রিকেট মোড়ল ভারতকে রক্ষা করবার নির্লজ্জ ফন্দি ফিকিরই চর্চিত হয়েছে কেবল। একে আর যাই হোক দুর্মুখোরাও আর ভদ্রলোকের খেলা বলবার সাহস পাবে না।
মানসিকতায় ক্ষুদ্রকায় হলেও ভাবসাবে বড় রাষ্ট্র ভারতকে জেতাতে কেন এমন রাখঢাকবিহীন নির্লজ্জ পক্ষপাতদুষ্ট নাট্যকর্ম করতে হলো? এর প্রধান ও আদিমতম কারণ খুঁজতে হলে আমাদেরকে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পদ্মা নদীর মাঝিতে চোখ বুলাতে হবে। ‘ঈশ্বর থাকেন ঐ গ্রামে ভদ্র পল্লীতে, এখানে তাহাকে খুঁজিয়া পাওয়া যাবে না।‘ এই চরম সত্য ঈশ্বর মহাশয় আমাদের সাথে সঠিক প্রমাণ করে টস ভাগ্যবান করলেন ধোনিদের। ঈশ্বরের দেয়া সুযোগটা কী চমৎকারভাবেই না কার্যকরণে পরিণত করলেন, মহান ইশ্বরপুত্র আইসিসি সিইও ডেভিড রিচার্ডসন, পাকি আলিমদার বা ব্রিটিশ ইয়ান গোল্ডরা। আমাদের ছক্কাগুলো সীমানায় তালুবন্দী হয় আর ক্যাচ আউটগুলো হয়ে যায় কোমড় ওপর নো বল। সবই ঈশ্বরের খাম খেয়ালীপনা আর কী।

কিন্তু হামবড়া এসব মুরুব্বী ঈশ্বররা আসলেই কী প্রভুসদৃশ? না, বরং আমরা বুক ফুলিয়ে কাজী নজরুল ইসলামের ভাষায় বলতে পারি ‘উঠিয়াছি চির-বিস্ময় আমি বিশ্ববিধাতৃর! মম ললাটে রুদ্র ভগবান জ্বলে রাজ-রাজটীকা দীপ্ত জয়শ্রীর!’
সম্প্রতি নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন ‘বাংলাদেশের উন্নয়ন ও মানবিক প্রগতি’ বিষয়ে একক বক্তৃতা দিয়েছেন ঢাকায়। অত্যন্ত স্পষ্টভাবে তিনি দেখিয়ে দিয়েছেন বাংলাদেশের স্বাধীনতা লাভের পর থেকে দেশটি কিভাবে ধাপে ধাপে উন্নয়নের পথে এগিয়ে এসেছে। বিশেষ করে দেশের অর্ধেক জনসংখ্যার নারীর ক্ষমতায়ন ও অর্থনীতিতে তাদের অংশগ্রহণ অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে সক্ষম হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেছেন। তিনি বাংলাদেশের এই উন্নয়নকে ভারতের উন্নয়নের সঙ্গে তুলনা করতে গিয়ে বলেছেন, বাংলাদেশ থেকে ভারতেরও শিক্ষণীয় আছে। তার মানে দাঁড়ালো সমস্ত প্রগতি বা অগ্রগতির সূচকে আমরা হলাম ভারতের গুরু বা মুরুব্বী। কিন্তু ভিন্নতর বেপথো ক্রীড়ামোদী নরেন্দ্র মোদিরা নাক সিটকিয়ে এসব বিষয় অবজ্ঞা করেন। আমাদের যমুনা তিস্তায় পানি শূণ্য রাখেন, সীমান্তে স্বেচ্ছাচারে মানব হত্যা করেন বা ছিটমহলের নামে মানুষকে গিনিপিগ বানিয়ে রাখেন। কারণ দাবায়ে রাখতে না পারলে যে, ভবিষ্যতে আর মুখ দেখানোর পথ থাকছে না এসব মুরুব্বীদের।
অবশ্য এখনো যে তারা খুব সাফ সুরতে মুখ দেখাতে পারেন এমন নয়। ভারতে এখনো সত্তরোর্ধ বয়সী নারী গণ ধর্ষণের শিকার হন। এমন কী কবর থেকে মুসলমান নারীদের তুলে এনে ধর্ষণ করার নির্দেশ দেন ক্ষমতাসীন বজরঙ উগ্রবাদী হিন্দু নেতারা। অধিকাংশ মানুষ শৌচালয় ছাড়া বসবাস করেন। সোজা কথা হলো, যেখানে খান সেখানেই হাগেন আর কী। কথায় কথায় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় মনুষ্য মুন্ডুপাত করেন। সেই তারা কিনা নিজেদের মোড়ল ঠাওরান। এসব কারণেই জাতে উঠতে গিয়েই ওদের সাথে সকল মানদণ্ডেই তুলনাহীন দুর্দান্ত বাংলাদেশকে হারাতে হয়, তাড়াতে হয়। তবে তা নিয়মনিষ্ঠার ধার না ধেরেই। নিয়ম মানতে গেলে যে, বেঙ্গল টাইগাররা ভারতীয়দের গুড়িয়ে দেবে এটা ওরা খুব ভালো জানে বলেই কুলাঙ্গার আলিমদার বা ইয়ান গোল্ডদের ইতরপনার সাহায্য সহযোগিতা লাগে আর কী।
কিন্তু মজাটা হলো আধুনিক মিডিয়ার কল্যাণে তৎক্ষনাত বিশ্ব জেনে গেছে ১৯ মার্চে অস্ট্রেলিয়ান মেলবোর্ণ ক্রিকেট গ্রাউন্ডে ভারতীয় বা আইসিসির অপেশাদার অক্রিকেটীয় মহাজোচ্চরী। টীম বাংলাদেশ তাঁর শির উঁচু করে চিরদুর্দম, দূর্বিনীতই আছে। সরকার তাদের রাজনীতির স্বার্থে ভারতে নতজানু হতে পারে, কিন্তু পাপন লোটাসরা ম্যাচ ছিনতাইয়ের ঘটনায় লিখে প্রতিবাদ জানাবেন এমন কথা দিয়েছেন।
বোধ, নিয়ম-নিষ্ঠা, সততা বা শ্রমে আমরাই জিতেছি। তাই অভিনন্দনের পুষ্পশোভা মাশরাফি বাহিনীর জন্যই নিরন্তর তোলা থাকবে। সাথে কলকাতার প্রিয় শিল্পী বাংলাদেশি জামাই কবির সুমনের ফেসবুকিং চুমু বাড়তি পাওনা। ম্যাচ শেষে তিনি তার স্ট্যাটাসে লিখেছেন, ‘স্বাধীন বাংলাদেশের বিবর্তনের পথ ধরে আজ ভারতের খেলোয়াড় ও খেলাপ্রেমীরা কল্পনাও করতে পারেন না এমন অবস্থায় (ক্রিকেট খেলার নিরিখে) বাংলাদেশের জাতীয় দল যে খেলা দেখালেন, ভারতের তথা বিশ্বের নির্বাচিত কিছু তুখোড় খেলোয়াড়ের সামনে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে নানান চ্যালেঞ্জের মোকাবেলা করতে যেভাবে সচেষ্ট হলেন তাতে আমি বাঙালি না হলেও তাঁদেরই আলিঙ্গন করতাম, গালে চুমু খেতাম। যদিও তিনি চুমু খাওয়ার আগে বিজয়ী ভারতীয় দলকে শাবাস জানিয়েছেন। ঈশ্বরের রাজ্যে বাস করে পুরোমাত্রায় ঈশ্বর বিরোধীতা কঠিন নীতিবাগিশেরও জন্যও সাজে না হয়ত।
মানি বা বিসনেসের কাছে টোটাল বিক্রিত হয়ে ক্রিকেট নীতি নৈতিকতায় পরাজিত আইসিসি লজ্জা পাক না পাক, আমার যোদ্ধা বাংলাদেশের সবুজাভ লালিমা অক্ষয় অটুটই থাকবে।
সুন্দর ক্রিকেটের জয়গানে দ্রোহের কবি কাজী নজরুল ইসলামের ভাষ্যেই আমরা সুর মিলাব
বল বীর-
বল উন্নত মম শির!
শির নেহারী’ আমারি নতশির ওই শিখর হিমাদ্রীর!

ফারদিন ফেরদৌসঃ সাংবাদিক ও লেখক
fardeen.ferdous@yahoo.com
www.facebook.com/fardeen.ferdous
২৩ মার্চ ২০১৫।