ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

 

স্বাধীনতাকে আজাদি, স্বাধিকার, স্ববশতা, স্বনির্ভরতা, স্বয়ম্ভরতা, নিরপেক্ষতা বা অনপেক্ষতা যে নামেই ডাকি না কেন, স্বাধীনতা মানে যে সীমাহীন, স্বতঃস্ফূর্ত ও শর্তহীনভাবে নিজের ইচ্ছা বা মরজি মতো থাকা বা অনির্ভর আত্মবিশ্বাসী হয়ে নিজেরটা নিজেই সামলানো, তা বুঝি ইদানিং কালের বাঙালি মাত্রই খুব ভালো জানেন ও বুঝেন।
আমরা এও জানি, মহান একাত্তরের পর থেকে আমরা আর কারও পারবশ্য বা পদাশ্রয়ী নই। আমাদের কাধে কারো রক্তচক্ষু জোয়াল আটসাটো করে চাপানো থাকে না। আমরা কারও দাসত্ব গোলামী করি না, দাসখত দেই না কিংবা কারও কথায় নাকে খতও দেই না। আমরা কিছুতে তোয়াক্কা বা পরোয়া করি না। কারও তাবেদারি করি না বা কারও ফাদেও পড়ি না। আমরা কোন দুষ্টু চক্রের হাতের পুতুল বা ক্রীড়নক নই। আমাদেরকে কেউ আর দলিত মর্দিত বা পিষ্ট করতে পারে না। আমাদেরকে পোধরা, লেজধরা, ধামাধরা বা দাসানুদাস বলবে কার এতো বুকের পাটা। পরপ্রেষ্য পরাধীন বা এটোখেকো বলতেই পারবে না। কারণ এখনকার বাঙালি অতিশয় স্বাধীনচেতা স্বাধীন।

স্বাধীনতা, এই শব্দটি কীভাবে আমাদের হলো- কবি নির্মলেন্দু গুণের মতো আমরা সবাই জানি। জানিনা কেবল মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের তেতাল্লিশ বছর পার হয়ে এসে কী করে এতোটা বেশি, এতোটা দুর্নিবার স্বাধীন হয়ে গেলাম আমরা। আমাদের সংবিধানের ৩১(১) মোতাবেক প্রতিটি মনুষ্য প্রাণির ‘চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে।’ আমাদের আর পায় কে? হৈ হৈ রৈ রৈ করে চিন্তা ও বিবেক দিয়ে অতি স্বাধীনতাকেই আমরা যারপর নাই ব্রত করেছি।

স্বাধীনতা তুমি
রবি ঠাকুরের অজর কবিতা, অবিনাশী গান।
স্বাধীনতা তুমি
কাজী নজরুলের ঝাকড়া চুলের বাবরি দোলানো মহান পুরুষ,
সৃষ্টি সুখে উল্লাসে কাপা। শামসুর রাহমানের এই কাব্যকলার মতো করে আমরা এই সময়ে বলতে পারি।
স্বাধীনচেতা স্বাধীন আমি
গোপালী তোমার নাম নিশানা মুছে দেব, চুপ বেয়াদব।
স্বাধীনচেতা স্বাধীন আমি
গোলাপীরে গোলাপী তুই ট্রেন মিস করলি, গোপালিরা কপালীও হয়।
অতি স্বাধীনতা আমাদেরকে এতোটাই বেপথো করেছে যে, আমরা কথায়, কাজে ও আচরণে ন্যূনতম রুচিবোধটুকুও হারিয়ে ফেলেছি। আমাদের বিবেকবোধকেই বুঝি পরাধীন করে বসে আছি।

মাইকেল মধুসূদন দত্ত দেশপ্রেমে উদ্দীপ্ত হয়ে অনুশোচনা করে যতই বলুন,
হে বঙ্গ, ভান্ডারে তব বিবিধ রতন;
তা সবে (অবোধ আমি) অবহেলা করি।

আজকের স্বাধীন বাঙালি এদেশের রতনের ভান্ডার চিনতে ভুল করে নাই। ঘুষ খাওয়া, সুদ খাওয়া, দেশ খাওয়া, মাটি খাওয়া, কিল খাওয়া, ঘুষি খাওয়া, মনুষ্য ফ্রাই খাওয়াসহ নিজের নীতি, আদর্শ বা মূল্যবোধ পুরোটা লুটেপুটে খেতে বাঙালির জুড়ি মেলা ভার। আমাদের স্বাধীনতা এতোটা ম্যাজিক্যাল যে, বিশাল বড় বুঝদার নেতা হয়েও পৌনে তিনমাস ধরে গুলশানের কার্যগৃহে না খেয়ে স্বেচ্ছাবন্দী থাকতে পারি। আবার সেই নেতার হুকুমে দু’শ জন আদমসন্তান পেট্রোলবোমায় পুড়ে বার্ণ ইউনিটে কাতরাতে কাতরাতে শেষ ঠিকানায় পা রাখতে পারে।

আমাদের লজ্জাহীনতার স্বাধীনতা এতোটা নাককাটা যে, অবৈধ সরকারের পদত্যাগে দাবি করা হরতাল অবরোধ নামের গণতান্ত্রিক আন্দোলন অধিকারকে অতি ও অপ্রয়োজনীয় ব্যবহারে ভোঁতা করেও আবার ঐ সরকারের অধীনেই সিটি নির্বাচনে অংশ নিতে পারি। এসব কান্ডকীর্তির নিগূঢ় অর্জন নাকি জনসমর্থন। আমরা এতোটাই হাস্যকর স্বাধীন!

আমাদের স্বাধীনতা বড় উদারনৈতিক। সেখানে স্থান কাল পাত্র বা হিতাহিত জ্ঞান সেই কবেই উবে গেছে। আমরা এতোটাই স্বাধীন যে, তেলে জলে মিশিয়ে দিতে পারি। খালি কলসি হয়েও দমদমাদম বাজতে পারি। আমাদের স্বাধীনতা আমাদের মন থেকে জাতির স্থপতি ও অবিসংবাদিত নেতাকেও ভুলিয়ে দিতে পারে। চোখে আমরা ভয়ঙ্কর ঠুলি পরতে পারি। জেনে বুঝেই কে ঘোষক বা কে পিতা তা নিয়ে ধুম্রজাল সৃষ্টি করতে পারি।

আমরা এতো স্বাধীন যে, বিশ্ব বেহায়াকে কূলে তুলে নাচতে পারি। অন্যদিকে বিশ্ব পাকিপ্রেমি আলবদর রাজাকারদের সঙ্গে পিতলা খাতিরও রাখতে পারি। হাটহাজারি নিবাসি মৌলভীরা সকল মা বোনকে এক পাল্লায় মেপে তেঁতুল ঠাওরে তাদের কুৎসিত লালা ঝড়াতে পারেন। ধর্ম বাঁচানোর নামে বিরোধী পক্ষের ষাট লাখ বা সরকার পক্ষের কয়েক কোটি টাকা অনুদানের নামে ঘুষ খেতে পারেন বা কোটি টাকার রেলের জমিও খেতে পারেন। তারা লাঠিয়াল, ওয়াজ ফরমানেওয়ালা চাঁপাবাজ ও বিরাটকায় রহস্যবিদ প্রভুর রাস্তায় বিষম স্বাধীন। আমাদের প্রভূত স্বাধীনতা এই শিক্ষা দেয় যে, ইসলামী ব্যাংক রাজাকারদের তবে তাদের তিনকোটি টাকা কেবলই রাষ্ট্রের। তাই ওই ব্যাংকের টাকায় লাখো কন্ঠে জাতীয় সঙ্গীত গাইতে পারি। মহান স্বাধীনতার দিনে ঢাকঢোল পেটানো রেকর্ড দিয়েই দেশপ্রেম মাপতে পারি। আমরা স্বাধীন তাই চাছাছোলা উদ্ভট যা কিছু তাই বলতে পারি। নিজের মরজি মতো চলি, তাই যাকে খুশি যখন তখন নাকানি চুবানি খাওয়াতেও পারি। চারপাশে গগনবিদারি চিৎকার ও সোরগোলে লোক দেখানো দেশপ্রেম এখন বদমাশদের শেষ আশ্রয়। স্বাধীনতার বলে বলিয়ান হয়ে মেকি দেশপ্রেম এইসময় এতোটাই উত্যুঙ্গে পৌছে গেছে যে, প্রেম নয়, শরীরে ও মননে তা কেবল লুটপাট ও দখলদারিত্বেই পর্যবশিত হচ্ছে।

তবে একজন স্বেচ্ছাচারি জাতীয় বীরের কন্ঠে কেবল, স্বাধীনতাহীনতায় কে বাঁচিতে চায় হে? তিনি সময়ে সময়ে রাষ্ট্রীয় প্রয়োজনে কুর্মিটোলায় গলফ খেলতে বাধ্য হন। সেসময় নাকি চাপাচাপিতে তিনি প্রেমের কবিতা লিখতেও ভুলে যান। তিনি আমাদের প্রিয় দেবদূত বিশ্বপ্রেমিক ও সংসদে বিরোধী নেতা গিন্নী’র সাথে প্রায়শ গোস্যা করা বুড়ো হাবড়া।

১৫৮৭ সালের ব্রিটিশ কবি জন লিলি’র ‘ইউফুয়েজ’ কাব্যগ্রন্থের একটি কবিতার নির্যাসটা এমন – ‘অল ইজ ফেয়ার ইন লাভ এন্ড ওয়ার’ প্রেম ও যুদ্ধে জেতার জন্য সবকিছু ঠিক। একাত্তরে ৯ মাসের মহান মুক্তিযুদ্ধে ৩০ লাখ শহিদের প্রাণ ও ২ লাখ মা বোনের সম্ভ্রম হারানোর মধ্য দিয়ে যে স্বাধীনতা আমরা পেয়েছি। সেই স্বাধীনতা রক্ষা করাটাও একটা চলমান যুদ্ধ বটে। আর এই যুদ্ধে নিজের জিত বজায় রাখতে যা যা হচ্ছে তার সবটাই নাকি খুবই যথার্থ ও তাতপর্যমন্ডিত – আমাদের গৃহপালিত পন্ডিতরা তাই মনে করেন।

আজ মহান স্বাধীনতা দিবসে আমাদের আম জনতাকে কেউ বলবে না, তুমি কত কষ্ট পাও রোদ বৃষ্টি ঝড়ে। কারণ এই বঙ্গভূমে উপরওয়ালারা হাজার বছর ধরেই বড়াই করে মহা সুখে থাকছেন অট্টালিকা ’পরে। কবি রজনীকান্ত সেনের অমর অক্ষয় ভাবনার মতো করে কুড়ে ঘরে থেকে শিল্পের বড়াই না করে মহাসুখে অট্টালিকায় থেকেই আমরা স্বাধীনচেতারা স্বাধীনতার সুখ খুঁজে ফিরছি।

তোমাকে পাওয়ার জন্য হে স্বাধীনতা,
তোমাকে পাওয়ার জন্যে
আর কতবার ভাসতে হবে রক্ত গঙ্গায়?
আর কতবার দেখতে হবে খান্ডবদাহন?
এই বাংলায়…
তোমাকে আসতেই হবে হে স্বাধীনতা।
প্রিয় কবি শামসুর রাহমান তোমাকে নিষ্ঠাভরে স্মরণ করি…
আজ মহান স্বাধীনতা দিবসে।

ফারদিন ফেরদৌসঃ লেখক ও সাংবাদিক
www.facebook.com/fardeen.ferdous

২৬ মার্চ ২০১৫।