ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

দাদু আমার একটা কথা রাখবে। মিষ্টি করে আহ্লাদী ঢঙে দাদুকে উদ্দেশ্য করে বলছিল জায়মা রহমান। লন্ডন থেকে মা জোবাইদা রহমানের সাথে দীর্ঘদিন পর বিজয় দিবসের আগে দাদুর সাথে দেখা করতে দেশে এসেছে কিশোরী জায়মা। শোবার ঘরে রাতের খাবার শেষে আয়েশী ভঙ্গিতে পান চিবুচ্ছিলেন বয়সী দেশনেত্রী খালেদা জিয়া।
নাতনীর কথা রাখবার বায়নায় সাড়া দিয়ে তিনি বললেন, বলো কী তোমার কথা।
বলছিলাম কি, দাদা ভাইতো মহান স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন, তার ওপর তিনি মহান মুক্তিযুদ্ধে সেক্টর কমান্ডার হিসেবে জেড ফোর্সের অধিনায়কও ছিলেন।
-তো কি হয়েছে? ইতিহাসে সবই তার লেখা আছে। তোমার কি কথা সেটা আগে বলো। সত্বর নাতনীর বায়নাটা জানবার ইচ্ছায় বললেন খালেদা।
-সেই মহান স্বাধীনতার বিরোধীদেরকে এবার একটু পর করলে হয় না দাদু। আবদারী গলায় কিশোরী জায়মার বায়না।
-তুমি বাচ্চা মেয়ে, এসব কি বলছ। দেখো রাজনীতি তুমি বুঝবে না। এটা একটা কৌশলের খেলা। পাকা খেলোয়াড় না হলে মাঠে জায়গা হয় না। আর খেলায় জিততে হলে শত্রুর সাথেও কমপ্রোমাইজ করতে হয়, বুঝেছো পিচ্চি বুড়ি। খালেদার বিরক্তিভরা আদুরে উত্তর।
-দাদু।
-বল।
-স্বাধীনতার শত্রুদের সাথে কম্প্রোমাইজ না করে আমরা কী একবারের জন্য স্বাধীনতার স্বপক্ষের প্রতি ভেনেভোলেন্ট হতে পারি না। বলল জায়মা।
-লন্ডনে থেকে ভালোই ইংরেজি রপ্ত করেছো দেখছি। কিন্তু ইংরেজরাতো মোটেও কারো প্রতি ভেনেভোলেন্ট বা সদাশয় ছিল না। যুক্তি দিয়ে নাতনী জায়মাকে বোঝানোর চেষ্টা করলেন দেশনেত্রী। যাহোক, এখন ঘুমোতে যাও। কাল আবার সরকার বিরোধী সমাবেশ আছে। আমাকে প্রিপারেশন নিতে হবে। জায়মাকে বাই বললেন খালেদা।

এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম খ্যাত একাত্তরের ৭ মার্চের ভাষণ কিংবা ১৬ ডিসেম্বরে পরাজিত পাকিস্তানীদের আত্মসমর্পণের স্মৃতি বিজরিত ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ১৮ দলীয় নেতাকর্মীদের ভীড়ে কানায় কানায় পূর্ণ। সরকার বিরোধী বিশাল সমাবেশ চলছে।

নারায়ে তাকবীর ধ্বনির কাছে বাংলাদেশ জিন্দাবাদ একদম ম্রিয়মান। অনেকটা বাঁশের চেয়ে কঞ্চি বড় বা অজগরটা গিলে খেয়েছে বিশালায়তনের হস্তির মতো জামায়াতের ভিতরে ঢুকে গেছে জাতীয়তাবাদী দল। ইতোমধ্যে মঞ্চের সামনে বসা নিয়ে ছাত্রদল ও শিবিরের মধ্যে কয়েক দফা বচসা ও হাতাহাতি হয়েছে এবং যথানিয়মে শিবির বিজয়ী হয়েছে এবং ছাত্রদল পিছনে বসাকেই তাদের ভাগ্য বলে মেনে নিয়েছে। সাড়ে চারটার দিকে ১৮ দলীয় জোট নেত্রী দেশনেত্রী বেগম খালেদা মঞ্চে আসলেন। চোখ বুলালেন সমাবেশে উপস্থিতি ও মঞ্চে উপবিষ্টদের দিকে। মঞ্চে সফেদ দাঁড়ি টুপিওয়ালাদের ভীড়ে নিজ দলের নীতি নির্ধারকদের খুঁজে পেতে কষ্ট হলো তাঁর।

মঞ্চের সামনে তার প্রিয় ছাত্রদলের তরুণ তুর্কীদেরও তেমন একটা দেখা পেলেন না। মঞ্চের চারপাশেই বড় বড় ব্যনার, ফেস্টুন, বেলুন ও প্ল্যাকার্ড। তত্ত্বাবধায়ক সরকার চাই বা সরকারের পতন চাই এমন লেখা কোথাও দেখতে পেলেন না। দেখতে পেলেন কেবল যুদ্ধাপরাধীদের বিশালাকার ছবি এবং তাদের মুক্তির শ্লোগান। অবাক হলেন জোটনেত্রী। খানিক ভেবে দেশনেত্রী পার্টির ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে কানে মুখে বললেন, সমাবেশটা আসলে কি নিয়ে? ম্যাডাম বিষয়টা জানেন। তারপরও এমন প্রশ্নের মুখে কি কহতব্য ভেবে কুল কিনারা না পেয়ে চুপ থাকলেন মির্জা ফখরুল। কিছুক্ষন পর মাইকে ঘোষণা করলেন ফখরুল, ম্যাডাম অসুস্থ্য বোধ করছেন। তাই তিনি আজকের নির্ধারিত ভাষণ দিতে পারছেন না। তবে সমাবেশ চলবে।

ম্যাডাম খালেদা জিয়া গুলশানের বাসায় পৌছেই ফ্রেশ হলেন। নাতনী জায়মাকে কাছে ডেকে নিলেন।
-আমি একটু মানসিক অস্বস্তিতে আছি। তোমার কাছে রিফ্রেশমেন্টের কোন পদ্ধতি জানা আছে দাদু ভাই। জায়মাকে বললেন ম্যাডাম।
-মাথায় ভালো করে পানি ঢালো, কিছুক্ষন চোখ বন্ধ করে থাকো আর দাদা ভাইকে নিয়ে সুখস্মৃতি ভাবতে থাকো। বলল জায়মা।
নাতনীর পাকামোটা ভালোভাবেই উপভোগই করলেন প্রিয় দেশনেত্রী।
-বাংলাদেশকে ভালোবেসে এই বিজয় দিবসের প্রাক্কালে আমি স্বাধীনতার স্বপক্ষদের প্রতি ভেনেভোলেন্ট হবো জায়মা। প্রায় ১০ মিনিট চোখ বন্ধ করে থাকার পর জায়মাকে উদ্দেশ্য করে বললেন দেশনেত্রী।
-ইয়াহু! সহাস্যে হাতদুটো উপর থেকে নীচে নামিয়ে জয়োল্লাশ করল জায়মা রহমান।

দেশের ৩২ টি টেলিভিশনে লাল হেডে রাতভর ব্রেকিং নিউজ চলল। পরদিন সকল জাতীয় পত্রিকায় লাল ব্যানার হেড। জাতীয়তাবাদীরা ছুড়ে ফেলেছে একাত্তরের পরাজিত শক্তি জামায়াতকে। পেছনে কাজ করেছে কিশোরী জায়মা।

এবার বিজয় দিবসের আগে কানাডা থেকে মায়ের সাথে দেখা করতে এসেছেন সায়মা ওয়াজেদ পুতুল। স্বাধীনতার ৪২ বছরে এসে বিজয় দিবসের আগে কিশোরী জায়মা রহমান কান্ডের খবরে পুতুলের বড় কন্যা মানে জননেত্রী শেখ হাসিনার নাতনী তার মুখটি খুলল।
-নানু, এবার এরশাদকে নিয়ে ম্যারাথন নাটকের ইতি টানা যায় না। জননেত্রীকে উদ্দেশ্য করে বলল পুতুল কন্যা।
-তোমার জায়মা হওয়ার স্বপ্ন পূরণ হবে না নানু। রাজনীতির ছলাকলা বোঝবার বয়স তোমার হয়নি। নাতনীকে উদ্দেশ্য করে বললেন জননেত্রী।
-ইচ্ছে থাকলেই হয়। এই যে দেখো, এবার দেশে আসার আগেই লন্ডন থেকে জায়মা আমাকে একটা ইমেইল করেছিল। ও ওর দাদুকে বোঝাবে। আর আমি আমার নানুকে। আমি চুপ করে ছিলাম। দেখছিলাম জায়মা আসলে কি করে। জায়মা কথা রেখেছে নানু। তুমি আমার কথাটা রাখো।

-তুমি বাচ্চা মেয়ে এসব কি বলছ। তুমি নিজেকে কি মনে করো হ্যাঁ। আমার এতো এতো উপদেষ্টা আছে, তারা আমার কাছে কোনদিন এমন আবদার করতে পারেনি।
-নানু ভাই। ওরা করেনি বলেইতো আমি করলাম। তোমরা দুইজন মানে জননেত্রী ও দেশনেত্রী এক থাকলে সব অপশক্তি বিনাশ হয়ে যাবে।

দেশে ম্যাজিক্যাল কিছু ঘটতে চলেছে। আম জনতা, ব্যবসায়ী, পেশাজীবি, আমলা, সাংবাদিক, সুশীল কিছুই ভেবে উঠতে পারছেন না। বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে পড়েছেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক ডা: সামন্ত লাল সেন ও রাজনীতির আগুনে পোড় খাওয়া গীতা সেন। লন্ডন নিবাসী ভবিষ্যত প্রধানমন্ত্রী তারেক জিয়ার মাথা খারাপ হওয়ার যোগার, দেশে এসব কি হচ্ছে। হায়, পাকিস্তানকে কি জবাব দেব আমি। অন্যদিকে আমেরিকা নিবাসী সজীব ওয়াজেদ জয়েরও পাগল হতে বাকী নেই। হায়, ভারতকে কি করে বোঝাই আমি। আবারও ৩২টি টেলিভিশনে ও পত্রপত্রিকায় লাল হেড ব্রেকিং। ৯০ এর স্বৈরাচার এরশাদের সাথে জোট ভাঙলেন শেখ হাসিনা। এখানেও কিশোরী এক নাতনীর অনুপ্রেরণা।

স্বাধীনতার ৪২ তম বার্ষিকীতে এবারকার ১৬ ডিসেম্বর মহান বিজয় দিবস অভাবনীয় বার্তা নিয়ে এলো। স্বাধীনতার ৪২ বছরের ইতিহাসে প্রথম সেনাবাহিনীর বিশেষ হেলিকপ্টারে সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধে ফুল দিতে গেলেন শেখ হাসিনা ও বেগম খালেদা জিয়া একসাথে। জাতীয় দিবসের সকালে স্মৃতিসৌধে রাষ্ট্রপতির সম্মান জানানোর পরপরই দেশের সরকার ও বিরোধীদলীয় দুই নেত্রী একসাথে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে স্বাধীনতার বীর সেনানীদের ফুলেল শ্রদ্ধা জানালেন। এই বিরল দৃশ্য টেলিভিশনে লাইভ প্রচার করতে গিয়ে কথার ফুলঝুড়িতে লালসবুজ পাঞ্জাবি বা সালোয়ার কামিজ পরা সাংবাদিকরা খেই হারিয়ে ফেললেন যেন।
একই হেলিকপ্টারে ঢাকায় ফিরতি পথে দুই নেত্রীই তাদের ভবিষ্যত পরিকল্পনা ও দেশ নিয়ে নানা স্বপ্নকথা বিনিময় করলেন। কথা হলো, ২০১৪ সালের ১৫ আগষ্ট সকালে জাতীয় শোক দিবসে দেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধুর মাজারে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানাবেন একসাথে দুই নেত্রী। ওই দিন রাতেই গুলশানে খালেদার জিয়ার বাসায় শেখ হাসিনা তার সভাসদদের নিয়ে ম্যাডামের জন্মদিন উৎসবে যোগ দেবেন।
বঙ্গবন্ধু কনভেনশন সেন্টারে ওইদিনই বিজয় দিবসের পার্টিতে প্রথম দেখা হলো ডা: জোবাইদা কন্যা জায়মার সাথে সায়মা ওয়াজেদ পুতুলের বড় কন্যার।
-জানো, আমার খুব মন খারাপ ছিল। রাজনীতির মাঠে এত্তো ঝগড়াঝাটিতে আমার নানু বা তোমার দাদুকে দেশবাসী মেয়ে মানুষ বলে গালাগাল দিত! মনোকষ্ট নিয়ে জায়মাকে বলল পুতুল কন্যা।
-এবার কি তবে সত্যিকার অর্থেই বাংলাদেশের ভালোবাসায় পড়েছেন আমার দাদু ও তোমার নানু? বেশ উচ্ছ্বাসের সাথে পুতুল কন্যাকে প্রশ্ন করল জায়মা।

ফারদিন ফেরদৌস : লেখক ও সাংবাদিক
১৬ ডিসেম্বর ২০১৩
facebook/fardeen.ferdous
twitter/fardeenferdous