ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

 

ঈশ্বরের অনিন্দ্য রাজ্য স্বর্গের লাল পদ্ম সুশোভিত ও সুমিষ্ট জলবাহিত নহরের পাশ দিয়ে সবুজাভ পথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে প্রশান্তির হাওয়া ছুঁয়ে যাচ্ছিল মহান একাত্তরের শেরপুর কলেজের অধ্যক্ষ সৈয়দ আব্দুল হান্নানের পবিত্র গায়ে। মনোবীণায় চুয়াল্লিশ বছরের জমানো পুঞ্জীভূত মেঘের সঞ্চরণ। অপেক্ষা যন্ত্রণার সেই তিক্ত মেঘ দূরীভূত করতেই ক্ষীণলয়ে কবিগুরুর সুর সাধনা।

ক্লান্তি আমার ক্ষমা করো প্রভু,
পথে যদি পিছিয়ে পড়ি কভু।

এরই মধ্যে স্বর্গদূত মারফত তিনি খবর পেয়েছেন ১১ এপ্রিল ২০১৫ তারিখ সন্ধ্যায় পৃথিবী নামের নীল গ্রহটির বাংলা ভূ-খন্ডে আবারও মানবতার জয় হয়েছে। সর্বোচ্চ আদালতের আদেশে জাতিসংঘ বা তথাকথিত মানবাধিকার সংস্থার চোখ রাঙানি পায়ে দলে দুর্ধর্ষ আলবদর নেতা ও তৎকালীন বৃহত্তর ময়মনসিংহ জেলার ইসলামী ছাত্রসংঘের সভাপতি মুহম্মদ কামারুজ্জামানের মৃত্যদন্ড কার্যকর করা হয়েছে। তাঁর স্মরণের দ্বারে ১৯৭১ এর কষ্টকর করাঘাত! সেসময় বাংলাদেশে পাকিস্তানিরা এবং তাদের দোসর রাজাকার, আল-বদর, আল-সামছ’রা পরিকল্পিত গণহত্যা চালিয়েছিল। বুদ্ধিজীবিদের হত্যা, ৩০ লাখ নিরস্ত্র বাঙালীকে হত্যা, লক্ষ লক্ষ মা-বোনের সম্ভ্রম হরণ, হাজার হাজার বাড়িঘর জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছারখার করা, সংখ্যালঘু হিন্দুদের জোরপূর্বক ধর্মান্তরিত করা, এক কোটি মানুষকে দেশ থেকে বিতারণ করাসহ রোমহর্ষক ভয়াবহ অত্যাচারের দুঃখগাঁথা মনে পড়ে তাঁর। জামায়াতে ইসলামী ও মুসলিমলীগের মত ধর্মব্যবসায়ী রাজনৈতিক দলগুলো তাদের দলীয় রাজনৈতিক সিদ্ধান্তেই বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিল এবং মুক্তিযুদ্ধের সময় ওই সব মানবতাবিরোধী যুদ্ধাপরাধ করেছিল।
সেসময় মুক্তিযুদ্ধের পক্ষাবলম্বনের জন্য একজন নিষ্ঠাবান শিক্ষক ও কলেজ অধ্যক্ষ এই সৈয়দ আব্দুল হান্নানকে প্রায় নগ্ন করে শহরের রাস্তায় হাঁটাতে হাঁটাতে চাবুক পেটা করেছিল এই কামারুজ্জামান ও তাদের দোসর আলবদর রাজাকাররা। সেই আব্দুল হান্নানের মন থেকে কী করে যেন বিষন্নতার মেঘ কেটে যায়। চক্ষুজুড়ে আনন্দাশ্রুর বাঁধ ভাঙ্গা জোয়ার। অপেক্ষার ক্লান্তি থেকে ক্ষমা প্রার্থনা চাওয়া মহান সেই ঈশ্বরকে কৃতজ্ঞতা জানাতে মুখটা উর্ধ্বে তুলে ধরেন তিনি। চোখ আটকে যায় দিগন্তে লেপ্টে থাকা আগুন রেখায়। মহাবিস্ময়ের ঘোর জাগে তাঁর চোখে ও মুখাবয়বে। নরকের অগ্নি দারোয়ান মৃত কামারুজ্জামানের নোংরা আত্মাকে একদম নগ্ন করে চাবুক পেটা করতে করতে অগ্নিকুন্ডের দিকে ধাবিত করছে। বিচারহীনতা বা বিচার মরে যাওয়ার আক্ষেপটা নিমিষেই মস্তিষ্কছাড়া করতে পারলেন আব্দুল হান্নান। চিত্তবৃত্তিতে আনন্দ আর হল্লা খেলে গেল যেন। শ্বাসতন্ত্রের গভীর থেকে গগনবিদারী চিৎকার, দুঃখ তুমি দূর হও।
ওহে স্বর্গদূত কামারুজ্জামানের জিঘাংসার শিকার হওয়া আমার মুক্তিযোদ্ধা ভাইদের ডেকে পাঠাও। এই স্বর্গ ছায়াবীথিতলে আজ তাদের সাথে সুধি সম্মেলনে প্রশান্তি বিনিময় করি। ডেকে পাঠাও রামনগর গ্রামের তরুণ মুক্তিযোদ্ধা বদিউজ্জামানকে। এখনও বেয়নেটের ভীবৎস ক্ষত তাঁর অন্তরাত্মা জুড়ে। ডাকো পিয়ারপুরের হিন্দু বস্তির সুশীলকে। কামারু আলবদররা যাকে জোর করে মুসলমান মহিউদ্দিন বানিয়েও ক্ষান্ত হয়নি। নিঃশেষে প্রাণ দান করেছিল সুশীল। সেই যে খড়খড়িয়া গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা গোলাম মোস্তফা। ক্ষিপ্রতা আর কৌশলে যে বিচ্ছু উপাধি পেয়েছিল। এই বিচ্ছু মোস্তফাকে খুন করে প্রত্যক্ষ কলঙ্ক যাত্রা শুরু করেছিল কামারুজ্জামান। টর্চার সেলের দারোয়ান মোহন মুন্সীর সামনে সতীর্থ পাক হানাদার, রাজাকার ও আলবদরদের ঘৃণ্য উল্লাস, স্যারের হাত এখন সই হইছে, এখন সাহস হইছে, বন্দুক চালাইতে পারে। আহা সেই বিচ্ছুকে ডাকো। শান্তির খবরটা সবার আগে আমি তাঁকে দিতে চাই। সর্বোপরি মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয়স্থল নালিতাবাড়ির সোহাগপুর গ্রামে একাত্তরের ২৫ জুলাই কামারুজ্জামানের নেতৃত্বে আলবদর, রাজাকার, পাকি মিলিটারিদের নির্বিচারে হত্যার শিকার হওয়া দেশপ্রেমীদের সান্নিধ্য চান আব্দুল হান্নান। বাংলা মায়ের জন্য আত্মদান করা এমন মুক্তিযোদ্ধাদের স্বর্গ সম্মেলন থেকে সোহাগপুরের বিধবা পল্লীর স্বামীহারা ধর্ষিতা বীরাঙ্গনাদের সাহস যোগানোর মন্ত্রটাই পাঠানো হোক, পাঠানো হোক দুঃখ ঘুচানিয়া পরম প্রশান্তি, ন্যায় ও সত্য প্রতিষ্ঠার দৃঢ় প্রত্যয় পাঠানো হোক। সদাসর্বদা জেগে থাকুন, আমাদের শত সহস্র দুঃখিনী বিধবা মা ও বোনেরা।
মুক্তিযোদ্ধাদের স্বর্গ সম্মেলনে অধ্যক্ষ আব্দুল হান্নানের কথাগুলো বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের প্রভাব্বিস্তারী ভাষণের মতো শোনা যায় যেন। হিটলারীয় নাৎসিদের নির্মম হলোকাস্টের মতোই ঘৃণ্যতায় পর্যবশিত হোক কামারুজ্জামানদের মানবতাবিরোধী অপরাধ। এমন করেই একে একে শেষ সর্বনাশটা হোক দেশদ্রোহীর, যুদ্ধাপরাধীর ও মানবতাবিরোধীর। ধ্বংস হোক অপরাধী অমানুষ।

বেঁচে থাকুক মানুষ ও মানবিকতা।
শ্রেয়বোধের অগ্নিস্নানে পৃথিবীকে শুচি করতে ধর্ম ব্যবসায়ীদের হীন মানবতাবিরোধী অপরাধের চুয়াল্লিশ বছরের পুঁতিগন্ধময় আবর্জনা ধুয়ে ফেলতেই হবে। তারপর সৃষ্টি হবে জাতি, ধর্ম, বর্ণ বৈষম্য বিরোধী পুরো মানবিক ও অসাম্প্রদায়িক এক নতুন বাংলাদেশ। সেই সুবর্ণ সময় ও স্বপ্নীল বাংলাদেশের আশায় স্বর্গবাসী শিক্ষক আব্দুল হান্নানের মতো করে তাঁর অনুসারী আমাদের কন্ঠেও বাজুক কাজী নজরুল ইসলামের অগ্নিবীণার প্রলয়োল্লাস…

তোরা সব জয়ধ্বনি কর্!
তোরা সব জয়ধ্বনি কর্!!
ঐ নূতনের কেতন ওড়ে কাল্-বোশেখির ঝড়।
তোরা সব জয়ধ্বনি কর্!
তোরা সব জয়ধ্বনি কর্!!
ভেঙে আবার গড়তে জানে সে চির-সুন্দর!
তোরা সব জয়ধ্বনি কর্!
তোরা সব জয়ধ্বনি কর্!!

ফারদিন ফেরদৌসঃ লেখক ও সাংবাদিক
১১ এপ্রিল ২০১৫।
facebook/fardeen.ferdous
twitter/fardeenferdous