ক্যাটেগরিঃ প্রকৃতি-পরিবেশ

 
59de409207d23e2657ad90c55d1df61f-01

হিমালয় কন্যা নেপালে গেল ২৫ এপ্রিল শনিবার বিগত আট দশকের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানে। রিখটার স্কেলে ৭ দশমিক ৯ মাত্রার ওই ব্যাপক বিধ্বংসী ভূমিকম্পে হতাহত ব্যক্তিদের জন্য আমাদের গভীর সমবেদনা। প্রতিবেশী দেশগুলোসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহযোগিতায় নেপালের জনগণ তাদের ক্ষয়ক্ষতি ও শোক হয়ত কাটিয়ে উঠবে একসময়। তবে নেপালে প্রচুর ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনাসহ ঘরবাড়ি, দালানকোঠার যে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে, তা পূরণ হবার নয়। শনিবারের ভূমিকম্প একই সঙ্গে অনুভূত হয়েছে পার্শ্ববর্তী ভারত, বাংলাদেশ, পাকিস্তান, ভুটান ও তিব্বতে। ভূমিকম্প-পরবর্তী ভূকম্পন অনুভূত হয়েছে আরও অনেকবার। নেপালের জনগণ একটি বড় ধরনের প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের মধ্যে পড়ায় নেপাল সরকার দেশটিতে জাতীয় শোক ঘোষণা করেছে।

ভূতাত্ত্বিক গবেষকদের মতে, আজ থেকে ২৫ মিলিয়ন বছর আগে ভারতের ভূখণ্ড এশিয়া মহাদেশে আছড়ে পড়ে, তার আগে ভারত দ্রুত অপস্রিয়মান শক্ত ভূখণ্ডের ওপর এক পৃথক দ্বীপ ছিল। এই দুটি ল্যান্ড মাসের মধ্যে এখনো সংঘর্ষ হচ্ছে, বছরে দেড় থেকে দুই ইঞ্চি গতিতে এরা ধাক্কা খাচ্ছে। এই শক্তির কারণেই দুনিয়ার সর্বোচ্চ পর্বতমালা হিমালয়ের জন্ম হয়েছে এবং ভয়াবহ ভূমিকম্পের সৃষ্টি হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা কাঠমান্ডুকে এ বিষয়ে অনেক বছর ধরে সতর্ক করে আসছে। টেকটোনিক ও স্থানীয় ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যের কারণে শনিবারের এই ভূমিকম্পের ক্ষয়ক্ষতি এড়ানো সম্ভব ছিল না। নেপালের ভৌগোলিক অবস্থার কারণে কম্পন তীব্র আকার ধারণ করে, আর ভবনগুলোর দুর্বল নির্মাণ প্রকৌশলের কারণে সেগুলো এই কম্পন সহ্য করতে পারেনি। যার ফলশ্রুতিতে ঘটল এমন প্রাকৃতিক ও মানবিক বিপর্যয়।
অলাভজনক সংগঠন জিওহ্যাজার্ড ইন্টারন্যাশনালের পর্যবেক্ষণ অনুসারে, ‘কাঠমান্ডু শহরের জনসংখ্যার ঘনত্ব দুনিয়ায় সর্বোচ্চ, এই শহরের বার্ষিক জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ৬ দশমিক ৫ শতাংশ। এর ফলে এই শহরের ১৫ লাখ মানুষ ভূমিকম্পের ক্রমবর্ধমান ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।’
এবারের ভূমিকম্প অনুভূত হওয়ার মাত্র এক সপ্তাহ আগে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ৫০ জন ভূমিকম্প ও সমাজবিদ এসেছিলেন নেপালের কাঠমান্ডুতে। উদ্দেশ্য—দরিদ্র, জনাকীর্ণ এবং অপরিকল্পিত উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের শিকার এই নগরকে কীভাবে আরেকটি বড় মাত্রার ভূমিকম্প মোকাবিলার জন্য প্রস্তুত করে তোলা যায়।
বিশেষজ্ঞদের মাথায় ছিল ১৯৩৪ সালের কথা, যখন শক্তিশালী এক ভূমিকম্প সমান করে দিয়েছিল পুরো কাঠমান্ডুকে। তাঁরা জানতেন, আরেকটা বড় বিপদ আসছেই। তা জেনে তাঁরা ঘড়ির কাঁটার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ছুটছেন। তবে জানতেন না, বিপদটা ঠিক কখন হানা দেবে।
ভূকম্পনবিদ জেমস জ্যাকসন বলেন, ‘এটা অনেকটা একটা দুঃস্বপ্নের মতোই, দুরু দুরু বুকে যা ঘটার অপেক্ষায় ছিল সবাই।’ কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থ সায়েন্স বিভাগের প্রধান জ্যাকসন আরও বলেন, ‘বাস্তবে এবং ভূতাত্ত্বিকভাবে একেবারে তাই-ই ঘটল, যা ঘটবে বলে আমরা ধারণা করেছিলাম।’
তবে ‘এত তাড়াতাড়ি’ যে অতটা শক্তিশালী ভূমিকম্প ঘটে যাবে, তা প্রত্যাশা করেননি বিশেষজ্ঞ জ্যাকসন। ‘যে স্থানে শনিবারের ভূমিকম্পের উৎপত্তি হয়েছে, ঠিক সেই এলাকা দিয়ে আমি হেঁটে এসেছি। মনে হয়েছিল, এই এলাকাটি বিপদের পথে হাঁটছে,’ বলেন, ভূমিকম্পবিষয়ক বৈশ্বিক সংগঠন আর্থকোয়েক উইদাউট ফ্রন্টিয়ার্সের নেতৃস্থানীয় এই বিজ্ঞানী। সংগঠনটি এ ধরনের বিপর্যয় থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর বিষয়ে এশিয়ার সক্ষমতা বাড়াতে কাজ করে থাকে।
কাঠমান্ডু আবার বড় ভূমিকম্পের কবলে পড়তে যাচ্ছে, দীর্ঘদিন ধরেই এমন আশঙ্কা করা হচ্ছিল। একই মাত্রার ভূমিকম্প বিশ্বের বিভিন্ন অংশে বিভিন্ন মাত্রায় বিপর্যয় ঘটাতে পারে বলে যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থার (ইউএসজিএস) ভাষ্য। ভবন নির্মাণের অবস্থা এবং জনসংখ্যার পার্থক্যই এ বিভিন্নতার কারণ। একই মাত্রার ভূমিকম্পে যেখানে উন্নত যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় প্রতি ১০ লাখে ১০ থেকে ৩০ জন মারা যাবে, সেখানে নেপালে হয়তো প্রাণ হারাবে ১০ হাজার বা তার চেয়েও বেশি। কাঠমান্ডু যে ঝুঁকির মুখে রয়েছে, সে বিষয়ে বারবার সতর্কবাণী এসেছে। এবারেরটা নিয়ে সেখানে গত ২০৫ বছরে অন্তত পাঁচটি বড় ধরনের ভূমিকম্প আঘাত হেনেছে। এর মধ্যে ১৯৩৪ সালের আঘাত ছিল সবচেয়ে ভয়ানক।

বড় ধরনের ভূমিকম্প হলে ভারতের দিল্লির দশাও নেপালের কাঠমাণ্ডুর মতো হবে। সেরকম সজোরে ঝাঁকুনি হলে দিল্লির ৮০ ভাগ ভবন ধসে যাবে বলে মত দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। টাইমস অব ইন্ডিয়া অনলাইনের প্রতিবেদনে জানানো হয়, দিল্লি ভূমিকম্প প্রবণ এলাকায় অবস্থিত। সেখানে ভূমিকম্পের উচ্চ মাত্রার ঝুঁকি রয়েছে। তা মোকাবিলায় শহরটির দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতি নেই।

নেপাল বা দিল্লীর ভূমিকম্প ঝাঁকুনির প্রতিক্রিয়া কেমন হতে পারে তা বিশেষজ্ঞদের জানা ছিল বা আছে। কিন্তু আমরা বাংলাদেশিরা কী নেপাল বা দিল্লীর বাইরে? গবেষকদের মতে ভূকম্পন এলাকাভিত্তিক মানচিত্র অনুযায়ী বাংলাদেশের মোট ভূমির ৪১% নিয়ে মধ্যম জোনে থাকা ঢাকা থেকে ৬০ কি:মি: দূরে মধুপুর অঞ্চলে ৭ থেকে ৭.৫ মাত্রার ভুমিকম্প হবার মতো ভূতাত্ত্বিক ফাটল রেখা বা ফন্টলাইন রয়েছে। বৃহত্তর ঢাকা অঞ্চল এর অভ্যন্তরে বলেই এর রয়েছে মারাত্মক ভুমিকম্প ঝুঁকি। তার উপর অপরিকল্পিতভাবে বিল্ডিং কোড না মেনে যত্রতত্র দুর্বলভাবে হাউজিং সোসাইটি ও বাণিজ্যিক ভবনের নামে পাকা স্থাপনা তৈরী করায় এ ঝুঁকির মাত্রাকে বাড়িয়ে দিচ্ছে বহুগুন। ব্যক্তি সচেতনতা না থাকা ও ভূমিকম্প প্রতিরোধী অবকাঠামো তৈরী না হওয়ায় এ অঞ্চলের ভূমিকম্প পরবর্তী বিপর্যয় মারাত্মক আকার ধারণ করতে পারে। ইমারত নির্মাণ বিধিমালা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সরকারি কর্তৃপক্ষের নজরদারির যথেষ্ট অভাব রয়েছে। অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও বিধিমালা লঙ্ঘন করে ইমারত নির্মাণ বন্ধ করতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।
রাজধানী ঢাকা ও এর আশেপাশের এলাকায় ভূমিকম্প ঝুঁকির ব্যাপারে শহরের বাসিন্দা ও কর্তৃপক্ষের ব্যাপক উদাসীনতা রয়েছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের ভাষ্য, বিদ্যমান ভবনগুলোকে ভূমিকম্প সহনীয় করার ব্যাপারে কার্যত কোনো উদ্যোগ নেই।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শহরটিতে ভবন নির্মাণে অনেক ক্ষেত্রে যথাযথ মানরক্ষা হয়নি। অনেক ভবন অবৈধভাবে তৈরি করা হয়েছে। ভবনের নকশাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ভূমিকম্পের ঝুঁকির বিষয়টি গুরুত্ব পায়নি। এখানকার বেশিরভাগ ভবন ভূমিকম্প সহনশীল নয়। বড় ধরনের ভূমিকম্পে এসব ভবন ধসে পড়বে।

আমাদের দেশের ভূমিকম্প প্রস্তুতি কেমন এ বিষয়ে নেপাল বিপর্যয়ের পরদিন আমাদের দেশের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়ার কাছে মিডিয়া কর্মীরা জানতে চাইলে তিনি জানান, যন্ত্রপাতি কেনার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। তার মানে হলো এদেশে ভূমিকম্প মাপা বা ভূমিকম্প পরবর্তী বিপর্যয় মোকাবেলার কোনো প্রস্তুতি আমাদের নেই।
অথবা প্রস্তুতি যাও থাকে তা অচলতার গহ্বরেই পড়ে থাকে। পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থাপিত ভূমিকম্প নিরীক্ষণ যন্ত্রটি (সিসমোগ্রাফ) সাত বছর ধরে অচল অবস্থায় পড়ে রয়েছে। উদ্বোধনের পরের দিনই যন্ত্রটি অচল হয়ে পড়ে। ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল, স্থায়িত্ব ও মাত্রা ভূকম্পনের পর নির্ণয় করা হয়। এ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভূমিকম্প নিরীক্ষণ যন্ত্র স্থাপন করা হলেও তা সচল না থাকায় এ-সংক্রান্ত কোনো তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না। বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ভবনের একটি কক্ষে ২০০৮ সালের ২৭ মে ভূমিকম্প নির্ণয় ও পরিমাপক যন্ত্রটি স্থাপন করা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ল্যামন্ট-ডোহারটি আর্থ অবজারভেটরি প্রজেক্ট ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের মধ্যে স্বাক্ষরিত ভূমিকম্পবিষয়ক যৌথ গবেষণা প্রকল্পের অধীনে যন্ত্রটি স্থাপন করা হয়। এটি উদ্বোধন করেন কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ভূতত্ত্ববিদ ওউন ইওন কিন। এই হলো আমাদের দেশের ভূমিকম্প প্রস্তুতি বা মোকাবেলার নমুনা।

এক পা দু পা করে ভূমিকম্পের সজোর ঝাঁকুনি আমাদের দিকেও ধেয়ে আসছে। এখন চলছে কেবল প্রিলিমিনারি। একদিন ভূমিকম্প আসবে সদলবলে। সেদিন আমাদের পূর্বতন মানবিক স্বার্থপরতার কারণেই তাড়াহুড়ো করে ভবন থেকে নীচে নামতে পারব না বা ফেসবুক টুইটারের মতো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেষ স্ট্যাটাসও দিতে পারব না। বাঙালির ঘুম কবে ভাঙবে?

ফারদিন ফেরদৌসঃ লেখক ও সাংবাদিক
২৭ এপ্রিল ২০১৫
facebook/fardeen.ferdous
twitter/fardeenferdous