ক্যাটেগরিঃ ধর্ম বিষয়ক

IMG - Copy
ধর্মের আভিধানিক অর্থ হলো বৈশিষ্ট্য। কোন ব্যক্তি, বস্তু বা যেকোন জিনিসের বৈশিষ্ট্যই তার ধর্ম। তবে ধর্মটা মানুষের ক্ষেত্রে ব্যবহার হয় তার মূল্যবোধের ক্ষেত্রে। অর্থাৎ মানুষের মূল্যবোধই হলো তার ধর্ম। কিন্তু অধম মানুষ নিজের মূল্যবোধ নিজে নিজে সৃজন করতে অপারগ। তাই পৃথিবীতে যুগে যুগে মানব কল্যাণে পথ নির্দেশনা দেওয়ার জন্য আব্রাহামী খ্রিস্ট, ইসলাম, ইহুদি, বাহাই, ভারতীয় জৈন, বৌদ্ধ, হিন্দু এবং চীন কোরীয় জাপানী তাও, শিন্তো ও কনফিউশিয়ান বা রুচিয়াসহ বহু ঐশী ধর্মের আবির্ভাব ঘটেছে। কিন্তু এসব ধর্ম সেকেলে ও সনাতন হওয়ায় বর্তমানের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে পারছে না। মানব প্রজাতির মুক্তির লক্ষ্যে ধর্মের এই অচল অবস্থায় তা উদ্ধারের দায়িত্ব নিজ কাঁধে চাপিয়ে নিয়েছে চটগ্রামের হাটহাজারি নিবাসী আল্লামা শফি।
তিনি এক অভিনব ও নতুন ধর্মমতের প্রচলন ঘটিয়েছেন। তার ধর্মের নাম কলি ধর্ম। এই ধর্মের মূল কথা নারী, শেষ কথা নারী এবং নারীকেই ঘিরেই তার যত বাহাস বা কাজিয়া। নারী ভিন্ন কোন ওয়াজ নয়, কোন নসিহত নয় এবং কোন ফতোয়া নয়। কথায় নারী, উঠায় নারী, বসায় নারী, জাগরণে নারী, ঘুমে নারী, সজ্ঞানে নারী এবং অজ্ঞানেও নারী। ঈশ্বরের প্রেরিত পুরুষ ও ঈশ্বর বন্ধু শফির সাফ কথা হলো নারীর যথোপযুক্ত নিয়ন্ত্রনই কেবল পারে পুরুষের মুক্তি দিতে। আর সেই নারী নিয়ন্ত্রনে কন্যা জায়া জননী চাচী ফুফু ভগ্নী বিভেদ নাই। নিয়ম কানুন প্রয়োগে নারীর সাধারণীকরণই হলো এই নতুন ধর্মের মূল মর্মবাণী। আগের সব ধর্মই নাকি পুরুষবাদী আর পুরুষের গুণকীর্তনেই আবির্ভূত। তাই নারীর প্রকৃত অধিকার দিতেই শফির এই নতুন ধর্ম তত্ত্ব।
শফি তার নতুন ধর্মের মাধ্যমে দেশের মন্ত্রীদেরও নতুনধারার রাজনীতি শিক্ষা দিতে মনস্থ করেছেন। কে সবল ও বীর্য্যবান পুরুষ আর কে পুরুষ নয় তা পরীক্ষা করবেন শফি। মন্ত্রীদেরকে তিনি সুন্দরী নারীদের পাশে বসিয়ে ধ্যানমগ্ন করাবেন তার দিলের অবস্থা জানবার জন্য। তিনি নব্বই বছর বয়সেও যেমনটা এখনো বহাল তবিয়তে উথিথত হন, সেরকম মন্ত্রীরাও যাতে নারীর আগুন রূপ কল্পনায় মোমের মতো গলে কথিত লালা স্খলন হতে হতে খাবু হয়ে যায়। ফলে নেতিবাচক বা ইতিবাচক কাজ করবার এতটুকু ফুরসত না পায়, শক্তি না পায় তারা। তাদের ধ্যান জ্ঞান যেন হয় আল্লামা আল্লামা ও আল্লামা। শফির নতুন ধর্মের প্রথম পরীক্ষা হবে এটাই।
শফির ধর্মমতে নারীরা তেঁতুল নয়, তবে তেঁতুলের মতো। তেঁতুল গাছের নীচ দিয়ে হাঁটলে বা মুখে নিলে লালা আসে। কামপরায়ণা নারীও তদ্রুপ। আবার নারীরা ফুলের মতোও, দেখলেই ছুঁয়ে দিতে ইচ্ছে করে। নারী রাণীর মতো, মন চায় সব নারীকেই নিজের বধূ করতে। তেঁতুল বা ফুলের ক্ষেত্রে নারীর কোন ক্ষেত্রভেদ ভাবার দরকার নেই। আসলে কলি অবতার আল্লামা শফি ফ্রয়েডের মনোসমীক্ষণকেও কঠোর চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছেন। ভাবখানা এমন যে, নারী ও যৌনতা নিয়ে তুমি নাস্তিক ফ্রয়েড বলার কে? যা বলবার এই আমি হাটহাজারির কলি ধর্মাবতার বলব।
ধর্মাবতার শফির কলি ধর্মের মূল শ্লোগান হলো, পুরুষ থেকে নারীকে আলাদা করো। পুরুষ আর নারী কখনো মিলবে না। তবে কীভাবে হবে নতুন মানব জীবন। দরকার নাই। এতদ অঞ্চলে তেঁতুল হুজুরের শিষ্য সাবুদ মিলে যত পুরুষ মনুষ্য প্রজাতি আছে, তাদের দ্বারাই তারা চলবে। নারী তুমি জোঁক, কেবল পুরুষের রক্ত শোষে খাও। তাই তোমাকে সর্বদা লাঠির আগায় রাখতে হবে। তুমি যদি নিরবে মুখ বুঝে পুরুষের কথায় উঠবস না করো তবে তোমাকে নিয়ে আমাদের ধর্মমত চালু হলেও, কোন দরকার নাই তোমাকে। দূর হও নারী।
ভাববেন না আল্লামা শফি হঠাৎ করেই আকাশ থেকে এই কলি ধর্ম পয়দা করে ফেলেছেন। তিনি পুরাতন ধর্মমত বাদ দিলেও, সেখান থেকে প্রেরণা নিতে ভুল করেন নাই।
ভারতীয় ধর্মমতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ধর্ম হিন্দু ধর্ম গ্রন্থের মধ্যে বেদের স্থান অত্যুচ্চ মর্যাদায় আসীন।

সেখানে বলা আছে, স্ত্রী স্বামীর সম্ভোগ কামনা চরিতার্থ করতে অসম্মত হলে, উপহার দিয়ে তাকে কেনবার চেষ্টা করবে। তাতেও অসম্মত হলে হাত দিয়ে বা লাঠি দিয়ে মেরে তাকে নিজের বশে আনবে। অথবা

মনুসংহিতায় আছে, স্বামীর অনুমতি ছাড়া নারীর কোন ব্রত বা উপবাস নেই। শুধু স্বামীর সেবার মাধ্যমেই নারী স্বর্গে যাবে। অন্যদিকে আব্রাহামী ধর্মমতের শ্রেষ্ঠতম ধর্মের ধর্মগ্রন্থে বলা আছে, তোমাদের স্ত্রীরা হলো তোমাদের জন্য শস্যক্ষেত্র। তোমরা যেভাবে ইচ্ছা তাদেরকে ব্যবহার কর। অথবা প্রেরিত পুরুষের বাণীতেও আছে, যদি কোন স্বামী তার স্ত্রীকে বিছানায় ডাকে আর সে প্রত্যাখ্যান করে ও তাকে রাগান্বিত অবস্থায় ঘুমাতে বাধ্য করে, ফেরেশতারা সকাল পর্যন্ত তাকে অভিশাপ করতে থাকে। পৌরাণিক ধর্মের উপরের বাণীগুলো অক্ষরে অক্ষরে পালন করার কথা বলছেন আল্লামা শফি। এই অমৃত বাণী পালনে নব্বই বছর বয়সেও তিনি যে মজা পান, আর কিছুতেই তা আসে না। ভালো কাজ করব, সৎ পথে চলব, মানুষের সেবা করব, হিংসা করব না, স্বার্থপর হব না এসব কথা থাকবে না কথিত কলি ধর্মে।

ধর্মাবতার শফি তার কলি ধর্মে বলেছেন, নারীকে থাকতে হবে গৃহাভ্যন্তরে। কেবল স্বামী সোহাগ করবে, গৃহকর্ম করবে আর বাচ্চা কাচ্চা লালন পালন করবে। তারা কোন পড়াশোনা করবে না, তাহলে পুরুষের চেয়ে বেশি বুঝদার হয়ে যেতে পারে। সেইযে তিনি কলি ধর্ম নিয়ে ১৩ দফা দিয়েছেন। সবার তা মনে থাকবার কথা। কলি ধর্ম হবে এই যুগের চরম অনাধুনিক, প্রগতিবিরোধী ও জড় বন্ধ্যাগ্রস্থ। এই ধর্মের দোহাই দিয়ে যেকোন শফি অনুসারী কায়েমি গোষ্ঠী নারীকে দাবিয়ে রেখে, শোষিত করে, অন্ত:পুরে অধ:স্তন করে নিজের আখের গোছাতে পারবে। আওয়ামীলীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টি বা আন্দালিব পার্টির কুতুবরা ধর্মাবতার আল্লামা শফির সাথে যোগাযোগ করতে পারে।

মনুসংহিতার মনু’র কথা, নারীর স্বভাব হলো পুরুষদের দূষিত করা – শফির সবচে’ প্রিয় বাক্য। তবে যে নারী কেবলই শফির কথায় উঠবস করবে তার কথা অবশ্য আলাদা। একান্ত বাধ্য নারী দ্বারা শফি বা তার শিষ্যদের দূষিত হতে কোন মানা নেই।

কোন পুরষ যদি উত্তম হতে চায় তাকে অবশ্যই তার স্ত্রীর কাছে উত্তম হতে হবে। অথবা মায়ের পায়ের নীচে সন্তানের স্বর্গ – জাতীয় অমৃত ধর্ম বাণী দ্বারা শফি কস্মিনকালেও প্রভাবিত হবেন না। কত কষ্ট করে নব্বই বছর ধরে নিজেকে সোমত্ত পুরুষ হিসেবে ধরে রেখেছেন, সেই তিনি নারীকে বেহেস্তের চাবি মানবেন। শফির মাথা খারাপ নাকি আপনার মাথা খারাপ।
এহেন কলি ধর্মের প্রথম প্রাজ্ঞ অনুসারী পতিত রমণীমোহন স্বৈরশাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ হবেন, এমনটা যেন ভবিতব্যই ছিল। নারী ধর্মের নামে ধর্মাবতার হিসেবে নারীকে খেলো করা যেমন আল্লামা শফির কাজ, তেমনি ওই পথের অগ্রপথিক হিসেবে সাবেক রাষ্ট্রনায়ক এরশাদই অগ্রগণ্য। সুতরাং রতনে রতন চিনেছে। শুয়োরে কচুও চিনিছে। এরশাদ এখন নারী ধর্মের কলি অবতার আল্লামা শফির একনিষ্ঠ পাণিপ্রার্থী।

নারীদের নিয়ে এতো গুণমুগ্ধকর ধর্মমত নিয়ে কিছু সাংবাদিক উল্টাপাল্টা লিখে শফি হুজুরের বদনাম করার প্রয়াস পাচ্ছেন। ওইসব সাংবাদিকরা শফি হুজুরকে প্রশ্ন করবার দু:সাহস দেখাচ্ছেন। হুজুর খালি নারী নিয়া কথা কন। এই যে, দেশে প্রতিদিন বোমা হামলা হয়। মানুষ মারা যায়। কিংবা কেউ ঝলসে যায়, কারো চোখ অন্ধ হয়ে যায়। এসব কুকর্মে দায়ী যারা অথবা একাত্তরে মঈনুদ্দিন আশরাফরা জ্ঞানী গুণিদের বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে আজরাইলের কাজটা সহজ করে দিল তাদের বিষয়ে আপনার কোন মতামত নাই। শফি হুজুর তেলেবেগুনে জ্বলে উঠে ফতোয়া দেন, নাস্তিক নিপাত করতে আপনার প্রশ্নের সব কয়টা কাজ জায়েজ আছে।

ঠিক ওই ধরণের সাংবাদিকদের বোম মেরে উড়িয়ে দেওয়ার কথা কে বলেছেন। কেন বিগরে যাওয়া ফরহাদ মজহার। তাই মজহারকেই আল্লামা শফি দ্বিতীয় নাস্তিক অনুসারী মেনেছেন।
অন্যদিকে কলি ধর্মের প্রাজ্ঞ মুখপত্র হিসেবে নির্বাচন করা হয়েছে, এ যুগের আমার দেশের আরেক ভারপ্রাপ্ত ধর্মাবতার মাহমুদূর রহমানকে।
কলি ধর্মের প্রধান দুই খলিফা হিসেবে আছেন হাটহাজারি নিবাসী বাবুনগরী ও নুনুপুরী।

তবে শফি হুজুরের গুনমুগ্ধ তারেক কোকোর মাদার্স অর্গানাইজেশনের চেয়ারপার্সন রেড টেলিফোন খ্যাত সেই ম্যাডামকে কলি ধর্মের আওতামুক্ত রাখা হয়েছে। লালা ঝরানো তত্ত্ব এতো ফেলনা না যে, তা যত্র তত্র ঝরবে।

হাটহাজারির হেরেমখানায় কলি ধর্মচর্চা শেষে জেগে ঘুমিয়ে আছেন যুগশ্রেষ্ঠ ধর্মাবতার কলি ধর্মের প্রবর্তক আল্লামা শফি। হঠাৎ শাদা কাপড় পড়া হুজুরের প্রয়াত মাতা সম্মুখে দন্ডায়মান। বিস্মিত শফির প্রশ্ন,

: মা…! তুমি মহান স্বর্গ ছেড়ে এই ধরাধামে?
: বাবা শফি, তোকে না ১০ মাস ১০ দিন পেটে ধরেছিলাম। সেই ছোট্টবেলায় তুই যখন কিছুই বুঝতি না। আমি হাত না ধরলে সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারতি না। আমি তোকে হাতে ধরে ধরে পৃথিবী চিনিয়েছিলাম। মানুষ চিনিয়েছিলাম। কী আদরই না তোকে করতাম। কত ভলোই না তোকে বাসতাম। সেই তুই কিনা আমাকে তেঁতুল বললি !

ফারদিন ফেরদৌস: লেখক ও সাংবাদিক
০৫ মে ২০১৫
facebook/fardeen.ferdous
twitter/fardeenferdous