ক্যাটেগরিঃ দিবস প্রসঙ্গ

OLYMPUS DIGITAL CAMERA

“The mother is everything – She is our consolation in sorrow, our hope in misery, and our strength in weakness. She is the source of love, mercy, sympathy, and forgiveness. He who loses his mother loses a pure soul who blesses and guards him constantly.”
Kahlil Gibran

মাকে কতোটা ভালোবাসেন?
কেন জীবন দিয়ে ভালোবাসি।
ঘরের বৌ কিছু বলে না?
কেন বলবে? সেওতো আমার সন্তানের মা।
বলছিলাম, যে মা হাজারো যন্ত্রণা, দুঃখ ও কষ্ট সয়ে আপনার নতুন প্রাণকে জঠরে ধারণ করে, পৃথিবীতে এনে আলো বাতাস আর নিসর্গে বড় করে তুলেছেন, আসলেই সেই মায়ের জন্য জীবনটা দিতে পারবেন?
কেন পারবো না! না মানে, আমার বেবি’র মায়ের কথাটাওতো একটু ভাববেন। সেওতো একজন মা। নিজের মায়ের জন্য যদি পুরো জীবনটাই দিয়ে দিলাম, বৌ বাচ্চা বা তাদের পরিবারের জন্যতো তাহলে কিছু থাকলো না, তাই না।
এইতো লাইনে এসেছেন। মানে সোজা কথা হলো মায়ের জন্য আপনার জীবনটা উতসর্গিত নয়। মা অন্তপ্রাণ আপনি না। মায়ের জন্য অফুরান ভালোবাসা, মায়ের পায়ের নীচে স্বর্গ, সবার উপরে মা এসব কথা বাতুলতা মাত্র। মা দিবসের নামে মা মা মা করা জাস্ট ন্যাকামো ছাড়া আর কিছু না।
আহা! এতো প্যাঁচানোর কি আছে। আমি মায়ের জন্য যেমন জীবন দিতে পারি, তেমনি প্রেমিকা বা বৌয়ের জন্যও জীবন দিতে পারি। সন্তানের জন্যও জীবন দিতে পারি।
তা একখানাই মাত্র জীবন কয়বার কয়জনাকে দেবেন জনাব।
আমার যতবার খুশি ততোবার জীবন দেব, তাতে আপনার কি?
না আমার একদম কিছু না। যে মায়ের কাছে আপনি একমাত্র ও অদ্বিতীয়, আপনার সুখ চিন্তায় যার বিনীদ্র রজনি পার হয়। বৌ বা প্রেমিকাকে সুখী করতে গিয়ে হৃদয় কেড়ে নিতে চাইলেও যে মা তা দিতে পিছপা হোন না। সেই মা যখন আপনার ভালোবাসা মনের সবটা বা বেশিটা কাড়তে পারলো না, তবে বিশেষ দিনের নাম করে মা মা মা করে খামোকা উতলা ভাব দেখাবেন না প্লিজ।

এতক্ষণ মা দিবসে একখানা সার্বজনীন চরিত্র নিয়ে একাংক নাটক দেখছিলেন। বাস্তবতার সাথে সব নাটক নাও মিলতে পারে।
তারচে’ বরং আমরা এবার একখানা অতি তুচ্ছ প্রাণি মাকড়শা মায়ের গল্প বলি। মা মাকড়শা পৃথিবীতে তার চিহ্ন রেখে যেতে চায়। তাই প্রাকৃতিক নিয়মে তাকে মা হতে হয়। মাকড়শার ডিম ফুটে তুলতুলে বাচ্চা বের হয় একথা সবার জানা। মা মাকড়শা সেই ডিম নিজের দেহে অতি যত্নে বহন করে বাচ্চা বের না হওয়া পর্যন্ত। একসময় ডিম ফুটতে শুরু করে। নতুন প্রাণের স্পন্দন দেখা যায় ডিমের অভ্যন্তরে। কিন্তু এই নতুন প্রাণকে বাঁচিয়ে রাখবার খাদ্য কোথায়? বেঁচে থাকার তাগীদ আর ক্ষুধা নিভৃত করার জ্বালায় ক্ষুদ্র মাকড়শা বাচ্চারা মায়ের দেহই খেতে শুরু করে ঠুকরে ঠুকরে। আর সন্তানদের মুখচেয়ে মা নীরবে সয়ে যায় সকল কষ্ট যন্ত্রনা। একসময় খোলস ছাড়া মায়ের পুরো শরীরই চলে যায় সন্তানদের উদরে। মৃত মা পড়ে থাকে আত্মত্যাগের বিরল উদাহরণ অসার কঙ্কাল হয়ে। মায়ের প্রাণের বিনিময়ে সন্তানের নতুন যাত্রা সূচনা হতে থাকে পৃথিবীর বন্ধুর পরিবেশে। সন্তানের জন্য মাকড়শা মায়ের এমন আত্মত্যাগের কাহিনী আমাদের এই প্রিয় বাংলাভূমেও আছে। এবার সেই গল্প।

mother-and-child

পুরাণকথা, ধর্মদর্শন আর জ্ঞানী গুণিদের বচন মতে নিজের জন্মভূমি হলো দেশমাতা। মাকড়শা বাচ্চাদের মতো নিজের রক্তমাংসের মায়ের ভালোবাসাকে যেমন আপনি ঠুকরে খেতে ভালোবাসেন, তেমনি দেশমাতাকে লুটেপুটে খেতেও আপনার জুড়ি নাই। দেশকে আপনি ধ্বংসস্তুপে পরিণত করছেন। তিনি চুপ করে আছেন। দেশের খেয়েই নানা কূকর্মে দেশের বারোটা বাজাচ্ছেন। তার মুখে রা নেই। দেশের গাছ কাটবেন, নদী দখল করে আপন মঞ্জিল বানাবেন, পরিবেশ প্রতিবেশ দূষিত দুষ্ট বিষাক্ত করবেন। তিনি কিছুই বলবেন না। দেশের মনুষ্য প্রাণিকে গুম অপহরণ ও হত্যা করে নরকরাজ্য তৈরি করবেন। সর্বংসহা দেশ আপনার বিরুদ্ধে এতোটুকু অভিযোগ দাঁড় করাবে না। মায়ের ভালোবাসার সর্বস্ব নিয়ে নেবেন, দেশমাতাকে যথেচ্ছাচারে লুটেপুটে খাবেন। প্রতিদানে প্রিয় মা কিংবা দেশমাতাকে এতোটুকু কিছু দেবেন না। উপরন্তু ঝামেলা বা প্রয়োজন মনে হলে মাকে নিয়ে রাখবেন বৃদ্ধাশ্রমে আর দেশকে দিয়ে দেবেন গুরু বা প্রভুদের দখলে। শুনেছি মাকড়শা বাচ্চারা মাকে খেয়ে ফেলবার পর তাদের সম্বিত ফিরে এলে মাকে খুঁজে না পেয়ে তাদের ভুল বুঝতে পেরে কেঁদে আকুল হয়। কিন্তু আপনার অপ্রেমের কি দুর্মতি হয়েছে আপন স্বার্থে মা অথবা দেশমাতাকে কেটেকুটে জলাঞ্জলি দিতে পারেন। তবুও নিজের চোখে জলরেখা দেখা দেয়ার প্রশ্নই আসে না। মা আপনাকে সব কিছু দিয়ে দিক। আপনি তাকে কিছুই দেবেন না। কারণ আপনার বোধের সলিল সমাধি হয়ে গেছে সেই কবে কালে।

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ভুলে বলেছিলেন, মা তোর বদনখানি মলিন হলে আমি নয়ন জলে ভাসি। এখন এই সময়ে কবি যদি বাংলাদেশে আসতেন, তবে পদ্মা নদীতে বজরায় বসে লিখতেন, মা তোর বদনখানি মলিন করতে আমি বড় ভালোবাসি।

তবু মা আপনাকে ভালোবাসতেই থাকবেন। আর আপনি ক্রমান্বয়ে মা মাটি মানুষের জন্য কংস মামা বা শকুনি মামা হয়ে উঠতে থাকবেন। এবার একটা চৈনিক পৌরানিক গল্প।
আহ্লাদী প্রেমিকা তার প্রিয়াস্পদ মহাপ্রেমিক পুরুষকে পরীক্ষা করার জন্য বলল,
তোমার ভালোবাসার একটা পরীক্ষা নিতে চাই আমি।
আমি সব পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত। পরীক্ষায় আমি জিতবই। আত্মবিশ্বাসের সাথে বলল প্রেমিকবর।
যাও, তোমার মায়ের হৃতপিন্ডটা নিয়ে আসো।
প্রেমে অন্ধ পাগল প্রেমিক পরিমরি করে ছুটল মায়ের কাছে। প্রেমিকার দেয়া ভালোবাসার পরীক্ষা বলে কথা। নিমিষে মাকে নিঃশেষ করে হৃতপিন্ডটা নিয়ে ফেরত আসতে প্রিয়সীর কাছে ছুটল সে। তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে পথিমধ্যে আছড়ে পড়ল পরীক্ষার্থী প্রেমিক। হাত থেকে ছিটকে পড়ল মমতাময়ী মায়ের তাজা হৃদয়। হৃতপিন্ডটি খুঁজে পেয়ে শিঘ্র হাতে তুলে নিল ছেলে।
এবার মায়ের হৃতপিন্ডেও ভালোবাসার উৎসরণ। কথা বলে উঠল ঐ রক্তপিন্ড, ‘কিরে খোকা, ব্যথা পেলি?’ মাতো আসলে এমনই।

মানুষ একবার জন্মায় গর্ভের মধ্যে, আবার জন্মায় মুক্ত পৃথিবীতে। পৃথিবীতে ভূমিষ্ঠ হয়ে তবে মানুষের জন্মের সমাপ্তি, তেমনি স্বার্থের আবরণ থেকে মুক্ত হয়ে মঙ্গলের মধ্যে উত্তীর্ণ হওয়ায় মনুষত্বের সমাপ্তি। এ অমৃত বচন রবি কবি’র।
গর্ভ জন্মের সেই প্রারম্ভিকা দিয়েই এই পৃথিবীতে আমাদের এতো হম্বিতম্বি আর যতসব আস্ফালন। মায়ের দেয়া ভালোবাসার পৃথিবীতে জীবনের আস্বাদ সবটাই শোষে নেবেন অথচ সেই গর্ভ জন্মকেই অস্বীকার করে যারা নিজের মনুষত্বকে শিকেয় তুলে রাখবেন তাদের জন্য শত ধিক।

সন্তানের সুশীতল ছায়া, পরম আশ্রয় ও বটবৃক্ষসম মায়ের অপরিসীম ত্যাগ, প্রাণান্ত ভালোবাসা আর অপত্য স্নেহ-মমতার কোনো তুলনা নেই। কেবল আজকের মা দিবসে নয়, প্রিয় মাকে ভালোবাসায় রাখি, মায়ের ভালোবাসায় থাকি প্রতিদিন প্রতিক্ষণ।
আমাদের দৃঢ় অঙ্গীকার এই হোক।

ফারদিন ফেরদৌসঃ লেখক ও সাংবাদিক
১০ মে ২০১৫
facebook/fardeen.ferdous
twitter/fardeenferdous