ক্যাটেগরিঃ ধর্ম বিষয়ক

 
Dr.-Md.-Zafar-Iqbal-111

সে এক সত্য, সুন্দর ও সুবর্ণ সময় ছিল। এখানকার আলো বাতাস জলে মাখামাখি করেই আমার অমৃত প্রাণপাখিটা বেঁচে থাকতো। বহুদিন পর এখানে এই ভূমিতে পুনর্বার এসে একদম অবাক হলাম না। এ যেন ভবিতব্যই ছিল। শ্মশ্রুবান টুপিয়াল আলখাল্লাধারী পুরুষের এদিক সেদিক আনাগোনা ও ক্রিয়াকর্ম। সেকালের প্রাজ্ঞ লেখক সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর শস্যের চেয়ে টুপি বেশি ও ধর্মের চেয়ে আগাছা বেশির চারণভূমি যেন এখনকার এইদেশ। এখন আর এক সাগর রক্তের বিনিময়ে পাওয়া বাংলাদেশ নয় দেশটির নাম পরিবর্তিত হয়ে আরব আলওয়াতান হয়েছে। মায়ের বা মুখের ভাষার আরবীটা এখনও সাধারণ্যে রপ্ত হয়নি বলে মৌখিক ভাষা হিসেবে বাংলাটা রেখে দেয়া হয়েছে। তবে অক্ষরটা আরবীই পাকাপোক্ত। বাংলা হিন্দুয়ানী ভাষা বলে সর্বত্র পরিত্যাজ্য হয়েছে। অর্থাৎ আলিফ যবর আ, মীম যের মি দিয়ে আমি লেখা হচ্ছে। পুরাকালের ধর্মমন্ত্রী মতিউর রহমানের আমলে চালু করা সড়ক সংলগ্ন দেয়ালিকা হুনা মামনু আততাবুল বা এখানে মুতু করবেন না’র পরিসর আরও বেড়েছে, তবে লম্বা আলখেল্লা উঁচু করে ঐ মুখো হয়েই মুত্রপাত করছে। কারণ এতোদিনে সর্বত্র আরবীকরণে সকলেই বুঝে গেছে কোন আরবী ছুড়ে ফেলা যায় বা কোন আরবী মাথায় করে রাখা যায়।

এখানকার আদিবাবা অথবা প্রধান আধ্যাত্মিক ধর্মগুরু হলেন, অ্যাবোটাবাদে নিহত ওসামা বিন লাদেন। আর আবুবকর বোগদাদী ও মোল্লা ওমর হলেন মান্যবর পুরুষ। এই আরব আলওয়াতানের জাতীয় কবি পরিবর্তিত হয়ে আল্লামা ইকবাল হয়ে গেছেন। অনেকেই ‘রমজানের ঐ রোজার শেষে’ খ্যাত কাজী নজরুল ইসলামকেই জাতীয় কবির আসনে রেখে দেয়ার প্রস্তাব করলেও উগ্র ধর্মবাগীশদের দ্বারা তা প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। কারণ নজরুল প্রচুর হিন্দুয়ানী গান কবিতা লিখে মানবতার জয়গান করেছেন। তাকওয়া ঠিক রাখতে হলে এসব মুসলিম বিরুদ্ধ কবিদের পাত্তা দিলে চলবে না। এখানে এখন আমার সোনার বাংলার কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নামোচ্চারণও কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। তাই জাতীয় সঙ্গীতটা ঐ আল্লামা ইকবালের লেখা পাক সার জমিন বাদ সাদের মতো করে আরবীতেই লেখা হয়েছে, বাও দার ইস আরদ আলমিয়াত।

এখানে নারীরা বাড়ির বাইরে বের হোন কদাচিৎ। নারীদের জন্য পড়াশোনা বা চাকরিবাকরি পুরোদস্তুর হারাম বা নিষিদ্ধ। নারী শুধু বাচ্চা কাচ্চা লালন পালন করবে আর স্বামী সেবা করে দিন গুজরান করবে। সেকালের লাদেন শিষ্য লালা ঝরা তেঁতুল খ্যাত হাটহাজারীর শফি হুজুরের চ্যালা চামুন্ডরা নারী বিদ্বেষী ১৩ দফার জায়গায় ১৬৯ দফা বাস্তবায়ন করে ছেড়েছে। এক কথায় লাদেনীয় ধর্মের শাসন ব্যবস্থা কায়েম হয়েছে এই নব্য দেশ আরব আলওয়াতানে। এই ধার্মিক পুরুষ রাজ্য নির্দিষ্ট কোনো শাসকের অধীনে নয় বরং আয়াতুল্লা খামেনীর মতো লাদেন শিষ্য ধর্মগুরুরাই দেশ চালান।

সেকালের বাংলাদেশ বা আজকের আরব আলওয়াতানে রাস্তার পর রাস্তা হেঁটে চলেছি। সাধাসিধা মানুষ আমি। আরও গভীর অন্ধকার সময়কে জানবার ঔৎসুক্য বেড়েই চলেছে।
কোনো এক ঘরের পাশ থেকে কিন্নর কন্ঠে নারীর কান্নার আওয়াজ ভেসে আসছে। কী হচ্ছে এখানে? কেন ধর্ম চর্চা হচ্ছে। তুমি কেমন বাছা, শুনোনি হে আমাদের লাদেন বাবা বলে গিয়েছেন, ‘যে জাতি নারীর ওপরে নেতৃত্ব দেবে, সে জাতি কখনো সফলকাম হবে না। স্ত্রী কখনও তার স্বামীকে না করতে পারবে না যদি সে উটের ওপরেও থাকে। যেসব বিষয়ের মধ্যে খারাপ ও শয়তানি জিনিস লুকিয়ে থাকে তা হলো: বাড়ি, নারী ও ঘোড়া। সেই ব্যক্তি কোনোদিন উন্নতির মুখ দেখবে না যে নারীর কাছে তার গোপন কথাগুলো বলে। পুরুষের জন্য নারীর চেয়ে বেশী ক্ষতিকর আর কিছু নাই। সমস্ত নারী জাতি হচ্ছে দুষ্ট প্রকৃতির। পুরুষ যেনো কখনও নারীর কাছে পরামর্শ না চায়, কারণ তাদের পরামর্শ অর্থহীন। তাদেরকে লুকায়ে রাখতে হবে যাতে তারা কোনো পুরুষকে দেখতে না পারে। তাদের সংস্পর্শে বেশি সময় কাটায়ো না তাহলে তারা তোমাকে ধ্বংসের প্রান্তে নিয়ে যাবে’।

ঐ বাড়ির গৃহিণী এসব কথায় নাকি পাত্তা দিতে চায় না। সেজন্য স্বামী তাঁকে আচ্ছা করে ধোলাই দিচ্ছে। আমার লাদেন বাবার অপমান করা। এখন বুঝ মজা।
কী বলছেন এসব? তুমি বুঝি জানো না, ‘কোন স্বামীকে (পরকালে) প্রশ্ন করা হবে না কেন সে বৌকে পিটিয়েছিল’। তার মানে হলো, এই নব্য দেশে নারী কেবল শরীরবৃত্তীয় শান্তির সঙ্গী ছাড়া আর কিছু নয়। এই দেশের ধার্মিকদের মতে, কী স্বর্গে কী মর্ত্যে নারী মমতার সাগর মা, স্নেহময়ী বোন, প্রেমময়ী স্ত্রী, সক্ষম ও সাহসী নেত্রী বা জ্ঞানী শিক্ষয়িত্রী নন, কেবলই অতি অপূর্ব হুরের উত্তপ্ত প্রলোভন মাত্র।

এখানে এসময় আমপাড়া পাঠস্থানগুলোতে টাকা চোর ধরতে শিশু শিক্ষার্থীর বুকের ধুকপুকানিকে সাক্ষী মানা হয়। কারো টাকা খোয়া যাওয়ার পর যার বুক সবচে’ বেশি ধড়ফড় করবে তাকেই অমানবিকভাবে তিন চার শিক্ষক মিলে আচ্ছামতো রামধোলাই দিয়ে টাকা চুরির সাধ মেটানো হয়। এছাড়া এসব শিক্ষায়তনের শিক্ষকগণ প্রায় সময় পুং চর্চায় স্বাচ্ছন্দ্য পান বলে তাদের নিজেদের সঙ্গীনির দিকে মনোযোগ দিতেই ভুলে যান। ধর্মস্তানে পশুবৎ শিক্ষকদের লালসায় নিরীহ শিক্ষার্থীদের বলির পাঠা হতে বাঁধা নেই।

ধর্মভিত্তিক এই রাষ্ট্রে জ্ঞান বিজ্ঞান ও দর্শন চর্চা টোটাল বন্ধ। সক্রেটিস, অ্যারিস্টটল, প্লেটো, কোপার্নিকাস, গ্যালিলিও বা নিউটনের নাম উচ্চারণ করা মানে প্রকাশ্যে গর্দানহানি। ওপরওয়ালাই শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানী, তাই পৃথিবীর বিজ্ঞানীদের কোনো খানা নাই এই নতুন দেশে। হাটে ঘাটে নদীর বাঁকে যত্রতত্র প্রার্থনাঘরের ছড়াছড়ি। মানুষের হাতে হাতে একে ৪৭ রাইফেল এর চেয়েও আধুনিক মারণাস্ত্র। গ্রেনেডেরও ছড়াছড়ি। এখানকার মনুষ্যরা সকলেই এতোটাই ধর্মপ্রবণ যে, এখন আর চাপাতি ব্যবহারের মাধ্যমে প্রতিপক্ষকে কোপাতে হয় না। চুন থেকে পান খসলেই বা মেজাজ মর্জি খারাপ থাকলে ঐ রাইফেলতো আছেই। নিমিষে রক্তারক্তি কারবার। এখানকার মানুষেরা কেউ কারো ধার ধারে না বা পরোয়া করে না। প্রার্থনালয়ে বসে কারো আত্মঘাতী বোমা বা রাইফেলে প্রাণ দেয়া মানেই শহীদী মর্যাদায় সোজা স্বর্গ, হুর, সরাবন তহুরা বা মাস্তি। এখানে অধ্যাপক, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, ব্যারিস্টার, পুলিশ, বিচারপতি, রাজনৈতিক নেতা বলে কিছুই নাই। সবই ওপরওয়ালা ভরসা।

এই মাটি থেকে মানুষের সৃষ্টি, এই মাটিতেই প্রত্যাবর্তন এবং এই মাটি থেকেই পুনরুত্থান। এযে মাটিরই কায়কারবার। তাই এই দেশে জ্ঞান গবেষণা অনুশীলন ধ্যান যাকিছু বলেন না কেন, সবই ঐ মাটি। মানুষের মাটির দেহ মাটিই খাবে তাই অন্য কিছু নিয়ে ভাবাভাবির কী দরকার। তাই অন্ধকারেই এখানকার ঘরবসতি বা আরবিতে বললে, ওয়াকতু যোয়াল্লাম।

FB_IMG_1432206969485

কিন্তু কী করে সেই সোনার বাংলাদেশের এই দশা হলো?

বান্দরবানের চিম্বুক পাহাড়ের এক সত্য গুহা থেকে দৈববাণী হলোঃ
এককালে সেই বাংলাদেশে এক প্রতিথযশা শিক্ষক ছিলেন। তুখোর মেধাবী সেই মানুষটি বিদেশের সুখ বিলাস ছেড়ে দেশকে ভালোবেসে এক অজ পাড়াগাঁয়ের বিশ্ববিদ্যালয়ে স্ত্রীসমেত অধ্যাপক হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন। মানুষের জ্ঞান চক্ষুর উন্মীলন করবেন বলে। সেসময় বাংলাদেশে একমুখী শিক্ষা আন্দোলন, মুঠোফোনে ডিজিটাল ভর্তি কার্যক্রম বা চাকরির আবেদন পদ্ধতি, প্রথম বাংলা সার্চ ইঞ্জিন পিপীলিকার উদ্ভাবন, ভেহিকেল ট্র্যাকিং ডিভাইস উদ্ভাবন ইত্যাদি তাঁর নেতৃত্বেই আলোর মুখ দেখেছিল। যার লেখা পড়েই শিশুরা বুঝতে বা জানতে শিখে কতোটা মানবীয় ত্যাগের মাধ্যমে আমরা একটা দেশ পেয়েছিলাম। সারাদেশ ঘুরে মানুষের মাঝে যিনি বিলিয়েছিলেন মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত চেতনা। জ্ঞান-বিজ্ঞান, যুক্তি, মুক্তবুদ্ধি, অনুপ্রেরণা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, অসাম্প্রদায়িক অনুভব, মানবীয় বোধ, আলোর দিশা, আলোকবর্তিকা বা বাতিঘর শব্দবন্ধ আর সেই সরল মানুষটি সমার্থক। হাজার তরুণ তরুণীকে সত্য ও সুন্দর পথে তাঁদের জীবনগল্পের মোড় ঘুরিয়ে দিতে সেই মানুষটির ভূমিকা সমুজ্জ্বল। কেশবিন্যাস বা মনোজাগতিকভাবেই শুভ্রতার প্রতীক এই নির্লোভ, নিরহঙ্কার ও দেশপ্রেমী মানুষটি অধ্যাপক ড. জাফর ইকবালকে অসম্মান করেছিল তৎকালীন শাসকগোষ্ঠী। মেরে ফেলা হয়েছিল তাঁর শিক্ষা, চিন্তন ও চেতনা।

এমন যুগশ্রেষ্ঠ মানুষ জাফর ইকবালবিহীন একটা দেশের যে গতি হওয়ার তাই হলো। কূপমুন্ডক ধর্মান্ধকারেই ঘরবসতি।

ফারদিন ফেরদৌসঃ লেখক ও সাংবাদিক
২২ মে ২০১৫
Facebook/fardeen.ferdous
Twitter/fardennferdous