ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

 
maps

আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর যৌবনে একটি অসাধারণ মিলনাত্মক গান গেয়েছিলেন,
মোরা এক বৃন্তে দু’টি কুসুম হিন্দু-মুসলমান।
মুসলিম তার নয়ন-মণি, হিন্দু তাহার প্রাণ।।

হিন্দু মুসলমানের এমন মিলন ভাবনার স্বাপ্নিক কবি আজ বড়ই সুখি হতেন এই ভেবে যে, আমাদের এই বাংলাদেশে হিন্দু বিরোধী তথা ভারত বিরোধী বলে কেউ নেই। আমাদের মানুষে, পরিবারে, সমাজে, গোত্রে বা দলে কতোনা বিভেদের ছড়াছড়ি। কিন্তু মোদি কী মন্ত্রবলে, সকল বাংলাদেশিকে একসূত্রে গেঁথে ফেললেন।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফরকে স্বাগত জানিয়ে বিএনপি বলেছে, তারা কখনো ভারতবিরোধী রাজনীতি করেনি, করছে না, করবেও না। বিএনপি দেশের স্বার্থে কাজ করে। এটাকে ভারত বিরোধিতা বলা যাবে না।
০৬ জুন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ঢাকা সফরকে সামনে রেখে কয়েকদিন আগে নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে দলের আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক আসাদুজ্জামান রিপন এমনটাই দাবি করেন।
এছাড়া বিএনপির শীর্ষ নেতারা বলছেন, দেশের উন্নয়ন বা অগ্রযাত্রার স্বার্থে মোদি আগমনের এই মাহেন্দ্রক্ষণে বৃহৎ দল বিএনপির সাথে সরকারের আলোচনায় বসা উচিত। তার মানে মোদির সম্মানে অবৈধ সরকারের সাথে সংলাপাকাঙ্খী এখন বিএনপি। এযে বিভেদ নয় মিলনেরই মধুর সুর।

ভারত তোষণকারী এই সরকারের কাছে ইসলাম তলিয়ে গেল বলতে বলতে গলার তার ছিড়ে ফেলা বিএনপি এখন বলছে দেশে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনতে মোদির সাহায্য প্রার্থনা করবে তারা। তার মানে কী; মোদি এখন কট্টর ডানপন্থী হিন্দু নন; বিশ্ব ত্রাতা?
দেশে সেকুলারিজম রহিত করে সংবিধান পরিবর্তন করে আল্লাহ্‌র ওপর পূর্ণ আস্থাবান ১৯ দফার উদগাতা জিয়াউর রহমানের এসময়ের দলটি এখন একজন কট্টর হিন্দু ভারতীয়কে দেবতা মানছেন। যিনি আমাদের দেশে গণতন্ত্রের জোয়ার বইয়ে দিয়ে ১৬ কোটি মানুষকে সুখের বানভাসিতে ভাসিয়ে দেবেন।
তবে যে, পার্বত্য শান্তি চুক্তির সময় খালেদা জিয়া বলেছিলেন, এই চুক্তি হলে ফেনী পর্যন্ত ভারত হয়ে যাবে। বিএনপির বরাবরের নির্বাচনী প্রধান জুজু আওয়ামীলীগকে ভোট দিলে মসজিদে উলু ধ্বনি শোনা যাবে; মেয়েদের শাঁখা সিঁদুর পরতে হবে; বাংলাদেশে মুসলমানরা আর দাড়ি-টুপি নিয়ে রাস্তায় বের হতে পারবে না; বাংলাদেশে পুরোপুরিই রামরাজ্য হয়ে যাবে ইত্যাদি ইত্যাদি। এসব কথার এখন কী হবে? বিএনপির গেল সরকারের আমলে জঙ্গিবাদের উত্থান কিংবা ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের জন্য ১০ ট্রাক অস্ত্র চোরাচালানের হিসাবটারই বা কী হবে? হয়ত মোদির জাদুতে হাওয়ায় মিলায়ে যাবে পূর্বতন প্রকাশ্য ভারত বিরোধিতার বিষবাষ্প।

১৯৭৫ পরবর্তী সময়ে প্রায় প্রতিটি নির্বাচনেই বিএনপি-জামায়াত ও এদের মিত্ররা জনগণকে মিথ্যা ভারত জুজু ও ভারতীয় আগ্রাসনের ভয় দেখিয়ে তাদের সরল বিশ্বাসের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। জনগণের মধ্যে ১৯৯৬ সালেই বোধদয় হয়, ভারত জুজুর নামে স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব বিপন্নের আশঙ্কা জাগিয়ে তোলাটা আসলে ছিল এক ধরণের ঠকবাজি। বর্তমান বিশ্ব রাজনীতির বাস্তবতায় কোন রাষ্ট্র ইচ্ছে করলেই তার প্রতিবেশি রাষ্ট্র যতই দুর্বল হোক না কেন তা দখল করে নিতে পারে না বা কেউ দেশ বিক্রি করে দিতে পারে না।

অখন্ড ভারতে যে একগুয়েমি ও অজ্ঞতার কারণে মুসলমানদের অস্তিত্ব থাকবে না এটা মনে প্রাণে বিশ্বাস করতেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তাঁর লেখা অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে তিনি তা স্পষ্ট করেই বলেছেন। সে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর জমিদারি রক্ষা বা অখন্ড সোনার বাংলাকে ভালোবেসে বঙ্গভঙ্গ রদের জন্য যতই অনশন করুন। কিংবা দেশভাগ নিয়ে অন্নদাশঙ্কর রায় যতই কাব্য করুনঃ
‘তেলের শিশি ভাঙল বলে
খুকুর ‘পরে রাগ করো
তোমরা যে সব বুড়ো খোকা
ভারত ভেঙ্গে ভাগ করো!
তার বেলা?’
অথবা যতই আক্ষেপ করুনঃ
‘ভারতভাগ আমার কাছে অপ্রত্যাশিত ছিলো না। কিন্তু বাংলাভাগ ছিলো আমার কাছে সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত। ঘটনাটা একবার ঘটে যাওয়ার পর তাকে মেনে নেওয়া ছাড়া অন্য গতি ছিল না। বুদ্ধি দিয়ে মেনে নিলে কী হবে, অন্তর দিয়ে মেনে নিতে পারি নি। হৃদয়ে যে বেদনা ছিলো, সে বেদনা এখনও রয়েছে।’
লেখক বা সাহিত্যসেবীরা সার্বজনীনতা বা মানবতার চর্চা করেন, তাই দেশ ভাগাভাগি নিয়ে তাঁদের বেদনা থাকতেই পারে। পশ্চিমবঙ্গের মূখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির সফর সঙ্গি হয়ে চিত্র পরিচালক গৌতম ঘোষ বা নায়ক দেবরা বলতেই পারেন, দুই বাংলাতো একই, সীমানার বাঁধাটা না থাকলে কী হয়? এসব এখন দেশভাগের আবেগ মাত্র। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্নতর।

ব্রিটিশদের ফাঁদে পা দিয়ে হিন্দুরা ইংরেজি ভাষা বা সংস্কৃতিকে যেমনটা খুব ভালোভাবে রপ্ত করেছিল, পক্ষান্তরে মুসলমানরা ইংরেজিকে বিধর্মীর ভাষা ঠাওরে ব্রিটিশদের সাহিত্য দর্শন টোটাল বর্জন করেছিল। ফলে যা হওয়ার তাই হলো। আর্থ সমাজ ও সংস্কৃতিতে মুসলমান ও হিন্দুদের বৈষম্য বাড়ল মারাত্মকভাবে। পরবর্তীতে কালক্রমে দুই বাংলার ভাষা ও সংস্কৃতি এক হওয়া সত্ত্বেও কেবলমাত্র ধর্মের ভিত্তিতে ভাগ হয়ে গেল দুই বাংলা। উদ্ভব হলো ভারতীয় মানচিত্রের পেটে থাকা আলাদা ভূখন্ডের বাংলাদেশি জাতি রাষ্ট্রের। কাজেই একাত্তরের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের দলমত নির্বিশেষে ধর্ম নিরপেক্ষ অসাম্প্রদায়িক মুক্তিকামী মানুষের প্রতিনিধি হিসেবে নয়; সেই সংস্কারাচ্ছন্ন অজ্ঞ মুসলিমদের উত্তরসূরী সাম্প্রদায়িক চেতনাধারী ও আইএসআই আশীর্বাদপুষ্ট বর্তমান তারেকীয় বিএনপি যে, স্ববিরোধীভাবে শুধুমাত্র বিরোধিতার জন্যেই ভারত বিরোধিতা করবে সেটাইতো ছিল স্বাভাবিক। যে বৃহৎ দলটির ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য মৌলবাদী ও একাত্তরের মানবতাবিরোধী জামায়াত শিবিরের প্রচ্ছন্ন সহায়তা লাগে; যে দলটিকে গণতন্ত্র রক্ষার নামে অন্ধকার তেরো দফাধারী শফি হুজুরদের হেফাজতকে সমর্থন দিতে হয়, তারা কেন ভারত তোষণকারী হবে। তবে কী ইসলাম ধর্মভিত্তিক রাজনীতির গণেশই উল্টে গেল? তারা এখন হিন্দুয়ানী জল খেয়ে পূজারম্ভের মতো রাজনীতির ইবাদত শুরু করবে?

এখন থেকে তবে আর শেখ হাসিনা ভারতের সেবাদাস নন কিংবা আওয়ামীলীগ ভারতের দালাল নয়? সবাই আমরা ভারতবাদী এই ভারতবর্ষে।

ম্যাজিকাল মোদি যে বাঘে মহিষে এক ঘাটে জল খাওয়াতে পারছেন। বাবার চায়ের দোকানের সহকারী মোদি যে তেজোদীপ্ত হবেন তা আবাল্যেই বোঝা গিয়েছিল। কিশোর মোদি পারিবারিক চায়ের দোকানে কাজ শেষে প্রতিদিন নিজ গ্রামের শর্মিষ্ঠা খালে সাঁতার কাটতেন। খালের মাঝখানে থাকা মন্দিরের পতাকা ছুঁয়ে দেখার বাতিক ছিল তার। ঐ খালে বাস করা অন্তত ৩০টি কুমীর মোদিকে রীতিমতো সমীহ করেই চলত। কামড়ে দেয়ারতো প্রশ্নই নেই, একদিন লেজ দিয়ে মোদির পায়ে সামান্য আঘাত করেই এক তরুণী কুমীর বিব্রত হয়ে গিয়েছিল। সেই মোদি রাষ্ট্র ক্ষমতায় আসবেন এমন ভাবনায় কেমব্রিজ ও অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিশ্বের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ভারতীয় বংশোদ্ভূত ৭৫ জন শিক্ষাবিদ, অধ্যাপক ও লেখক অরুন্ধতি রায়, সালমান রুশদি বা নোবেল লরিয়েট অমর্ত্য সেনরা চিন্তিত হয়েই বলেছিলেন-
: মোদি ক্ষমতায়; এ ভাবনা আমাদের শঙ্কিত করে!

কিন্তু গুজরাট দাঙ্গার নায়ক, একসময় আমেরিকার ভিসা না পাওয়া সেই চায়ের দোকানদার মোদি নিজের খোলনলচে পাল্টে দিয়ে দূরদর্শী প্রজ্ঞায় তাঁর এক বছরের রাজনৈতিক কারিশমা ও প্রতিবেশিদের মূল্যায়নের মধ্য দিয়ে পূর্বের ধারণা অনেকাংশেই ভুল প্রমাণ করেছেন। নির্বাচনের আগে যে মোদি ঘোষণা দিয়েছিলেন ক্ষমতায় গেলে ভারতে অনুপ্রবেশ করা কোটি খানেক বাংলাদেশি অভিবাসীকে ঝেটিয়ে বিদায় করবেন বা বাংলাদেশের এক তৃতীয়াংশ ভূমির মালিকানা দাবি করবেন, সেই মোদি স্থল সীমান্ত চুক্তি লোকসভায় পাশ করিয়ে ছিটমহলবাসী দেশহীনদের দেশ দিয়েছেন। মোদি এখন আগ্রহ নিয়েই বাংলাদেশে আসছেন এই সুসম্পর্ককে আরও বেগবান করতে।

খেলারাম খেলে যা খ্যাত সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হকের দেশরত্ন শেখ হাসিনার শাসনামলে মায়ানমার ও ভারতের সাথে সমুদ্রসীমা নির্ধারিত হয়েছে। ভারতের সাথে স্থলসীমাও নির্ধারিত হয়ে গেছে। আমরা এখন ঝক্কি ঝামেলাহীন সীমান্ত অধিকারী এলিট দেশগুলোর কাতারে পৌছে গেছি। দেশে অব্যাহত গুম, হত্যা, সন্ত্রাস, আইনের শাসনহীনতা বা গণতন্ত্র বিমুখতা থাকা সত্ত্বেও শেখ হাসিনাকে বলা হচ্ছে সমুদ্রজয়ী, সীমান্তজয়ী বা ডটার অব বর্ডার্স।

দেখা যায় এসবের একটা কৌশলী ব্যাকগ্রাউন্ডও আছে। হাসিনা সরকার ক্ষমতায় এসেই চীনের সাথে সামরিক ও উন্নয়ন সহায়তা ভাগাভাগি করেছে সবচে’ বেশি। বর্তমানে দেশের সামরিক বাহিনীর ৮০ ভাগ অস্ত্র আসে চীন থেকে। নৌবাহিনীর জন্য সাবমেরিন সরবরাহ করবে চীন। আমাদের গভীর সমুদ্র বন্দর বানিয়ে দেবে চীন। অরুণাচল প্রদেশ নিয়ে তিক্ততা থাকায় ভারতের এক নাম্বার শত্রু রাষ্ট্র চীনের সাথে বাংলাদেশের এমন মাখামাখি নরেন্দ্র মোদির প্রবল মাথা ব্যথার কারণ হয়েছে বৈকী। বাংলাদেশ চীনের এই উষ্ণ সম্পর্ক ভারতের বন্ধু রাষ্ট্র বাংলাদেশে চীনের প্রভাব হিসেবে দেখছেন মোদি। ফলশ্রুতিতে সমস্যা সমাধানের ডালি নিয়ে শেখ হাসিনার কাছে আসছেন বৃহৎ গণতান্ত্রিক ও ক্ষমতাধর রাষ্ট্র ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। বিএনপির প্রকাশ্য লোক দেখানো নাটকীয় ভারত বিরোধিতা নয় বরং চীনের সাথে সুসম্পর্ককে প্রাধান্য দিয়ে ভারতকে চাপে ফেলে তাদের কাছ থেকে অমীমাংসিত আন্তঃরাষ্ট্রীয় সমস্যা দূরীকরণে উপায় খোঁজার এই কৌশলকেই প্রকৃত দেশহিতৈষী ভারত বিরোধিতা আখ্যা দেয়া যেতে পারে। যা আসলে কারো সাথে শত্রুতা নয়, সকলের সাথে মিত্রতারই সারসংক্ষেপ।

এর মধ্য দিয়ে কালের পরিক্রমায় ইতিহাসের দাবিতে ভাগ হওয়া মহান মুক্তিযুদ্ধে সহায়তা দানকারী ভারত সম্পর্কে দেশের প্রবল ভারত বিরোধীরাও নিজেদের রাজনৈতিক দেওলিয়াপনা প্রকাশ করে এখন সমস্বরে বলে চলেছেন,
আহা, ভারত তবে মিত্র!
কিন্তু এটাই কী আসল চিত্র?

ফারদিন ফেরদৌসঃ লেখক ও সাংবাদিক
৩০ মে ২০১৫
Facebok/fardeen.ferdous
Twitter/fardeenferdous