ক্যাটেগরিঃ মানবাধিকার

 
0,,17890571_303,00

এই আধুনিক যুগে নিজেদেরকে অতিশয় সুসভ্য মনুষ্য প্রাণি বলে হরহামেশাই দাবি করি। নারীর অধিকারবোধ সম্পর্কেও সদা সচেতন আমরা; মিনিটে মিনিটে তা জানানও দেই। আমাদের এখানে দেশ নেতা, বিরোধী নেতা, স্পীকার বা বড় দল নেতা মহোদয় সকলেই নারী। আমরা ভবিষ্যতে যুদ্ধ বিমান বানানোর ঘোষণা দিয়ে রেখেছি। অস্ত্র আমদানি করব না, অদূর ভবিষ্যতে রপ্তানিই করব। ঠিক সেই দেশের মা, বোন বা নারীরা কিনা অন্ধকার রাজ্য মধ্যপ্রাচ্যে যাবে ‘হাউজ মেড’ হতে। আমাদের মেয়েরা যদি আমাদের কাছে বেশি হয়ে থাকে তবে তাদের বনবাস বা দ্বীপান্তর দেয়া যেত; তবু বিবমিষাগ্রস্ত আরবভূমে নয়! কে না জানে শরিয়তি আরবে হাউজ মেড মানে ‘সেক্স স্লেভ’।

যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যের একটি মোহনায় বসবাসকারী তিন শতাংশ করাত মাছেদের কোনো জৈবিক পিতা নেই। এসব মাছ বাবা মায়ের কাছ থেকে জোড়া জিন পাওয়ার পরিবর্তে কেবলমাত্র মায়ের কাছ থেকেই উত্তারাধিকার সূত্রে দুই জোড়া জিন পেয়ে থাকে। তাই এসব স্ত্রী মাছ পুরুষ যৌনসংসর্গ ছাড়াই বংশ বৃদ্ধি করতে পারে। বিষয়টি আপাতঃ ক্ষুদ্র মনে হলেও প্রতীকি অর্থে অহংকারি পুরুষের মুখে ঝামা ঘষে দেয়ার মতো ঘটনা; যেসব পুরুষ দাবী করেন তাদের ছাড়া নারীর মাতৃত্ব অধরা তাই পুরুষই শ্রেষ্ঠ। বরং পুং পান্ডবদল নিজেরা কোনোমতেই তাদের বংশ রক্ষা করার সামর্থ্য রাখে না। এটাই তাদের দীনতা। নারীর কাছে নতি স্বীকারের উপলক্ষিতা। তারপরও নারীর ভাগ্যনিয়ন্তা কালে কালে অহংবোধগ্রস্ত পুরুষেরাই। পুরুষ সৃষ্ট সমাজ সংসার, সংস্কার, প্রথা, কানুন বা ধর্মাচার তাদের চিরায়ত ক্ষমতা অর্পণ করেছে। তাই পুরুষ তার নির্লজ্জ দম্ভে অ্যাকটিভ; নারী বাধ্যগতভাবেই প্যাসিভ। আর সেই পুরুষ পশুটি যদি হয় ধর্ম রাজ্য আরবভূমির-তবেতো কথাই নেই।

আব্রাহামিক ধর্মসমূহের বিভিন্ন পুস্তকাদিতে স্বর্গ নরকের বিস্তারিত বিবরণ পাওয়া যায়। যাতে স্বর্গ হুর বা মদিরা লোভ কিংবা নরকের আগুন ভয়ে মানুষ নিজেকে শোধরে নিয়ে সোজা ও সরল পথে নিজেকে চালিত করতে পারে। আবার এসব পুস্তকে ঐ মতাবলম্বী গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের হারেমে নারীকে যৌনদাসী বানিয়ে রাখার বিধানও আছে। কিন্তু মায়ের অসম্মানের সুতার ওপর দিয়ে হেঁটে কীভাবে আপনি সোজা সরল পথে হাঁটবেন সেসব প্রশ্নের জবাব গ্র্যান্ড মুফতির কাছেও মেলে না। উত্তর খোঁজার আগে আমরা বরং আব্রাহামিক দাম্ভিক অনাচারী পুরুষ বা তাদের সূতিকাগার সম্বন্ধে সত্যকথন জেনে রাখি।

আব্রাহামিক ধর্মাচারী ইসলামী জঙ্গি সংগঠন আইএস (ইসলামিক স্টেট) ইরাক সিরিয়া বা লেবাননের বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছে। আইয়ামে জাহেলিয়াত বা নরকাবস্থা এখন ঐ জঙ্গি স্টেট। নারী নির্যাতনের মত র্স্পশকাতর বিষয়েই তারা সবচে’ অগ্রগামী। তাদের পুস্তকাদি মতে নাকি নারীদের যৌনদাসী হিসাবে ব্যবহার করা জায়েজ বা পূণ্যের কাজ। এবিষয়ে রয়েছে তাদের নিজস্ব বিধানও। শুক্রবার জুম্মার নামাজ শেষে মসুলে তাদের কুখ্যাত আধ্যাত্মিক গুরু আবুবকর আল বোগদাদী সমর্থিত যৌনদাসী সম্পর্কিত লিফলেট বিতরণ করে আইএস। এসব লিফলেটে খ্রিষ্টান, ইহুদি ও ইয়াজিদি নারীদের যৌনদাসী হিসাবে ব্যবহারের বৈধতার ব্যাপারে বলা আছে। নারী বেচাকানা করা, উপহার হিসাবে প্রদান করাসহ কোনো মৃত যোদ্ধার অধীনস্ত স্ত্রীদেরও সম্পত্তি হিসাবে ব্যবহার করার কথা বলা হয়েছে।

যৌন সহিংসতাকে রীতিমতো প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছে আইএস। তরুণীদের তারা আস্তানায় ধরে নিয়ে দাসী হিসেবে ব্যবহার করছে। তাদের ওপর চালাচ্ছে পাশবিক যৌন নির্যাতন। অসংখ্য তরুণীদের ধরে নিয়ে যায় আইএস। এরপর অস্ত্রের মুখে তাদের কুমারিত্ব পরীক্ষা করে। কোনো তরুণীকে ‘সুন্দরী কুমারী’ মনে হলে তাকে তোলে নিলামে। এভাবেই তাদের মধ্যে তরুণীদের নিয়ে চলে কেনাবেচা। পরে তাদের উপর চলে অমানবিক যৌন নির্যাতন। আর এ কাজে কোনো তরুণী অস্বীকৃতি জানালে তাকে হত্যা করা হচ্ছে নির্মমভাবে।

তাদের ‘সাম্রাজ্যে’ চালু করেছে খোলা বাজারে মেয়ে কেনাবেচার ব্যবসা। ‘ইয়েজিদি ও খ্রিস্টান মেয়েদের তুলে নিয়ে গিয়ে যৌন ক্রীতদাসী করলে তাতে পাপ তো নেই-ই, বরং পুণ্য আছে। জঙ্গিদের ভাষায়, যে সব পরিবার কাফের, তাঁদের বন্দি করে বা অধিকার করে দাস বানানো এবং তাঁদের মেয়েদের রক্ষিতা করার অধিকার শরিয়তে দেওয়া রয়েছে। জঙ্গি সাম্রাজ্যে ১ থেকে ৯ বছরের মেয়েদের দাম ১৭২ মার্কিন ডলার, ১০ থেকে ২০ বছরের মেয়েদের দাম ১২৯ ডলার, ২০ থেকে ৩০ বছরের মেয়েদের দাম ৮৬ ডলার, ৩০ থেকে ৪০ বছরের মেয়েদের দাম ৫৬ ডলার, আর ৫০ বছরের ওপরের মেয়েদের দাম ৪৩ ডলার। নারীদের বাজার অনুযায়ী এক বছরের মেয়ে? তিন বছরের মেয়েও যৌন ক্রীতদাসী? এই শিশুদের শরীর থেকেও কী তৃপ্তি আদায় করে নেবে মোল্লারা? মোল্লাদের আরবিয়া নরকে এসবই সম্ভব।

২০ বছর আগে ইন্দোনেশিয়ার গরিব ঘরের সপ্তদশী মেয়ে সুনারশির হৃদয় ভেঙ্গে খান খান করে গোপন কান্নার গুমরে উঠা উথাল সমুদ্রে অশ্রুঝড় তুলেছিল কারা? জানেন কী? সুনারশি বিদ্যালয়ের গণ্ডি না পেরোতেই দালাল পুরুষের ফাঁদে পড়ে গেল। বিদেশ যাওয়ার প্রস্তুতি নিতে হয় তাঁকে। দালাল জানতেন, এক আরব তার বাসার কাজের জন্য এমন একজনকে খুঁজছেন, যে হবে একজন কুমারী, বাদামী বর্ণের গায়ের রঙ, লম্বা। কিন্তু দালালটি সুনারশিকে দেখালেন ভালো বেতনের প্রলোভন। সুনারশি তাঁর যোগ্যতায় টিকে গেল। নির্বাচিত হবার দুই সপ্তাহ পর তাঁকে এক আরব নিয়ে গেলেন, তার বাড়িতে, সৌদি আরবে৷

এখান থেকেই শুরু হলো দু:স্বপ্নের৷ তাঁকে যে ব্যক্তি তার বাড়িতে নিয়ে গেলেন, সে আসল নিয়োগকর্তা নয়৷ আসল নিয়োগকর্তা তার পক্ষাঘাতগ্রন্থ বাবা৷ তার শরীরের নিম্নাংশ অবশ৷ সেই বৃদ্ধ সুনারশিকে বললো ভাইব্রেটরের সাহায্যে তার পুরুষাঙ্গে মালিশ করতে৷ সুনারশি না করলে, ক্ষেপে গেলো ঐ ব্যক্তি৷ নানা ভয়ভীতি দেখালো৷ তাকে ঐ বাড়িতেই বন্দি করে রাখা হলো৷
পরবর্তীতে কেবল ঐ ব্যক্তিই নয়, তার নয় পুত্রও পালাক্রমে তাকে দিয়ে মালিশ করাতো৷ করতো নানা যৌন অত্যাচার৷ এর পাশাপাশি তাকে রান্নাও করতে হতো৷

সুনারশি একদিন সুযোগ পেয়ে গেলো সেই বাড়ি থেকে পালানোর৷ কিন্তু পালিয়ে এবার কুমিরের মুখ থেকে পড়ে গেল সিংহের মুখের সামনে৷ নতুন এক ব্যক্তি তাঁকে বানালো ‘যৌনদাসী’৷ জীবনের নানা বাঁক বদলে বয়সী সুনারশির মুক্তি মেলে একসময়, তবে তিনি আরবিয়া অত্যাচারে হারিয়ে ফেলেন তাঁর ভবিষ্যৎ! ইউনিসেফের হিসাবে সুনারশির মতো ইন্দোনেশিয়া থেকে পাচার হওয়া ১ লাখ নারী শিশু এখন মধ্যপ্রাচ্যে যৌনদাসীর জীবন কাটাচ্ছে৷ এমন অব্যাহত ও ক্রমবর্ধমান যৌন নির্যাতনের যাবতীয় রেকর্ড আমলে নিয়ে ফিলিপাইন ইন্দোনেশিয়া এবং শ্রীলংকা সরকার যেখানে সৌদি আরবে নারী গৃহকর্মী পাঠানো বন্ধ করে দিয়েছে, সেখানে বাংলাদেশ গৃহকর্মীর নামে ২০ হাজার নারী পাঠাবে আরবিয়া পূণ্যভূমে।

সৌদি তথা আরবিয়া ধার্মিকরা গৃহকর্মীদের ‘ট্রিট’ করে দাস-দাসী হিসেবে এবং তাদের সাথে যৌন সম্পর্ক স্থাপনকে ‘নিজস্ব শরীয়ত’ মোতাবেক ‘হালাল’ বলেও মনে করে থাকে। সেখানে আমাদের নারীরা গিয়ে কী অবস্থার মধ্যে পতিত হবেন তা না বোঝার লোক কেউ নয়; কর্ম সংস্থান মন্ত্রী যতই বিশাল নিরাপত্তার ডুগডুগি বাজান না কেন? অশিক্ষিত বর্বর শ্রেণির সৌদি পুরুষদের ২৪ ঘন্টা যৌনলিপ্সার মুখে বাংলার নারীরা নিজেদের কীভাবে সামাল দেবেন তা কে জানে?

আমাদের দেশে এখন কর্মক্ষম পুরুষের প্রায় ৮২ শতাংশ কাজ করছেন। অন্যদিকে কর্মক্ষম নারীদের মধ্যে কাজ করেন মাত্র ৩৩ দশমিক ৭ শতাংশ। বিশ্বব্যাংকের গবেষণা অনুযায়ী, বাংলাদেশে যদি সর্বোচ্চ ৮২ শতাংশ কর্মক্ষম মেয়েদের কাজ দেওয়া যায়, তাহলে দেশটির মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) প্রবৃদ্ধির হার হবে সাড়ে ৭ শতাংশ। বিশ্বব্যাংক ‘সম্ভাব্য জিডিপি প্রবৃদ্ধির ওপর শ্রমশক্তিতে নারীর ক্রমবর্ধমান অংশগ্রহণের প্রভাব’ নামে একটি সমীক্ষা পরিচালনা করেছে। সেখানেই প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর এই উপায়ের কথা বলা হয়েছে।

কিন্তু প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর সে উপায় কী নিজের নারীদের দাস বানিয়েই খুঁজতে হবে? দেশে চারটা পোশাক কারখানা বানিয়ে দিলেই ঐ ২০ হাজার নারীর কর্মসংস্থান করা যেত। এদেশে তেমন উদ্যোক্তা হয়ত ছিলও। কিন্তু তা হলো না! তবে কী আরব ভূমের তিন লক্ষাধিক পৌরুষ শ্রমের বাজার ঠিক রাখতেই নারীর এই আত্মত্যাগ? আর আমাদের নারী নেতারাও তবে এই ট্রাজিক আত্মত্যাগ গাঁথার ফেনোমেনন টাইপ সূত্রধর বটে।

এখানে এইসময় আমাদের ভাবনাটাই যেন,
নারী তুমি দাসই থাকো; আমরা নামানুষ হই।

কিন্তু মাইকেল মধুসূদন দত্তের ভাষায়,
‘রেখো মা দাশেরে মনে’ এর মতো করে দেশের অহংকারী বীর পুঙ্গবেরা কী আমাদের নারীর বিয়োগগাঁথা মনে রাখবেন!

ফারদিন ফেরদৌসঃ লেখক ও সাংবাদিক
০৫ জুন ২০১৫
Facebook/fardeen.ferdous
Twitter/fardeenferdous