ক্যাটেগরিঃ খেলাধূলা

 
file

আমাদের বাঙালি সমাজে তিলকে তাল করা, শাক দিয়ে মাছ ঢাকা বা ঘোলা পানিতে মাছ শিকার প্রবণতার ঐতিহ্য হাজার বছরের। কিন্তু এই আপ্তবাক্যের সমূহ সম্প্রসারণ আজকাল পৃথিবীব্যাপী। এই তিন কাজটিই এখন পাল্লা দিয়ে করে যাচ্ছে ভারত পাকিস্তান ও তাঁদের ক্রিকেট মিত্ররা। মহামতি শেক্সপিয়রের যুগ পার হয়ে এসেছি অনেক আগে, তাই এখন আর ওথেলো সিন্ড্রোম নয়! এখনকার তাজা সিন্ড্রোমের নাম হলো সুধীর গৌতম সিন্ড্রোম! আমাদের মাশরাফি, মুস্তাফিজ তথা টাইগারস ক্রিকেট ভূমিকম্পে বিধ্বস্ত ভারত এখন শেষ আশ্রয় হিসেবে সুধীর সিন্ড্রোমকেই খড়কুটো করেছে। এক মুস্তাফিজের হাতের জাদুতে বেসামাল ধোনি কোহলি রাহানের দেশীয়রা সুর তুলেছেন ক্রিকেটের ভক্তদূত সুধীর যেখানে অপমানিত সেখানে ক্রিকেটের নাম নিশানাও চলতে পারে না! আসলে ভারত হারেনি হেরেছে বাংলাদেশই। এমনসময়ে পাকু ও তাঁদের বাংলাদেশী দোসরেরাও দোহারকি করে চলেছেন, আহা! তাইতো তাইতো! অভব্য বাঙালি ক্রিকেটের মর্ম বুঝে না! অবুঝদারদের সাথে আবার হারজিত কী?

ভারতীয় টেলিভিশন এপিবি আনন্দের বরাত দিয়ে বিভিন্ন মিডিয়া আগুপিছু না ভেবেই খবর ছেপে দিল ক্রিকেট ভক্ত ভারতীয় পতাকাবাহী সুধীর গৌতম খেলা শেষে স্টেডিয়ামের বাইরে অসভ্য বঙ্গদর্শকের হাতে নিগৃহীত হয়েছেন, তবে পুলিশ তাঁকে রক্ষা করে নিরাপদে পৌছানোর ব্যবস্থা করেছেন। সময়ের সবচে’ আলোচিত পত্রিকা কলকাতার আনন্দবাজার লিখল, চেনা সাজেই ঢাকা গিয়েছিলেন ভারতের হয়ে গলা ফাটাতে। যেমনটা তিনি ভারতের প্রত্যেক খেলাতেই করে থাকেন। সারা দেহে তিরঙ্গা এঁকে রবিবারেও যথাসময়ে শের-ই-বাংলা স্টেডিয়ামে ভারত-বাংলাদেশের দ্বিতীয় একদিনের ম্যাচে হাজির হয়েছিলেন ভারতীয় সমর্থক সুধীর গৌতম। কিন্তু ম্যাচ শেষে তাঁকে যে তিক্ত অভিজ্ঞতার মুখে পড়তে হবে কল্পনাও করতে পারেননি সুধীর। রবিবারের ওই ম্যাচে ভারত হারার পর স্টেডিয়ামের বাইরে বাংলাদেশের এক দল সমর্থক তাঁর উপর হামলা চালায় বলে দাবি সুধীরের।

তিনি জানান, স্টেডিয়াম থেকে বেরনো মাত্রই কিছু লোক এসে তাঁকে ঘিরে ধরে। তেরঙ্গা ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। তখন স্টেডিয়ামের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা দু’জন পুলিশকর্মী তাঁকে উদ্ধার করে অটোতে তুলে দেন। অভিযোগ, সেই সময় অটো লক্ষ্য করেও পাথর ছোড়ে ওই সমর্থকরা।
http://www.anandabazar.com/khela/an-act-of-shame-bangladesh-supporters-attack-indian-fan-sudhir-gautam-in-dhaka-1.164013

কিন্তু এই ঘটনাটি নিয়ে আমাদের দেশের বহুল প্রচারিত পত্রিকা প্রথম আলো কলকাতার আনন্দবাজারকে টেক্কা দিয়ে এক আবেগঘন আর্টিকেল লিখে ফেলল, ‘কয়েকজনের হঠকারিতায় গোটা বাংলাদেশের অপমান’ শিরোনামে। যেনবা সুধীরের অপমানে আনন্দবাজারের চেয়েও বেশি পুড়ে গেল প্রথম আলোর। ঐ আর্টিকেলে সুধীর সাইকেলে চেপে এদেশে এসেছেন, ফুটপাতে চা স্টলে রাত কাটিয়েছেন, দীনদরিদ্র, শচিন টেন্ডুলকারের দেয়া উপহার টিকেটে নিয়মিত মাঠে বসে খেলা দেখেন, ইত্যাদি ইত্যাদি।
http://www.prothom-alo.com/sports/article/559708
Sachin-Tendulkar-R-of-India-poses-with-the-World-Cup1

এমন হৃদয়বিদারক স্টোরি পড়ে কার না হৃদয় গলে? আমরাই তাই সোশ্যাল মিডিয়ায় স্ট্যাটাস দিলাম।
ক্রিকেটপাগল সুধীর গৌতম..!
তোমার কাছে অবনত ক্ষমা প্রার্থনা…
বিদেশি অতিথির ওপর অন্যায় হামলারুরা কোনোমতেই পুরো বাঙালির ব্রান্ড না…!
ওরা অন্ধ পাকি প্রেতাত্মা হতে পারে, অন্যকিছু না!!
— looking for a great workout …

একই সময়ে কালের কন্ঠে যুক্তিপূর্ণ রিপোর্ট বেরোল,
সুধীর গৌতমের অভিযোগ মিথ্যা!
http://www.kalerkantho.com/online/sports/2015/06/22/236543

এবং সুধীর গৌতম কাহিনী নিয়ে প্রত্যক্ষদর্শী ফটোসাংবাদিকের সাক্ষ্য সম্বলিত প্রমাণিত সত্য রিপোর্ট করা হলো দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় অনলাইন পোর্টাল বিডিনিউজ২৪.কম এ ‘ঢাকায় ভারত সমর্থক সুধীরের উপর হামলা হয়নি: প্রত্যক্ষদর্শী’- এই শিরোনামে।
http://m.bdnews24.com/bn/detail/bangladesh/986885

আমরাও সোস্যাল মিডিয়ায় আবার ঝড় তুললাম…
সুধীর বাবু…
আগে ক্ষমা চেয়েছিলাম…
আর এখন আপনাদের দুরভিসন্ধি ও প্রতারণার জন্য তীব্র নিন্দা জানাই!
আপনি বাংলাদেশের অতিথি গরিব ও নির্যাতিত জেনে আপনার প্রতি সহমর্মিতা উথলে উঠেছিল। কিন্তু আপনারাও যে মোড়লের ক্রীড়নক হতে পারেন তা কে জানত?
— feeling ছি:ছি:ছি

কিন্তু প্রথম আলো থামল না, তারা বিভিন্ন প্রশ্নের অবতারণা করে এক এনালিটিক নিউজে প্রমাণ করবার চেষ্টা করল সুধীর বাবু অপমানিতই হয়েছেন।
শিরোনাম, ‘আসলেই কখন তোলা হয়েছিল সুধীরের ভিডিওটি’?
http://www.prothom-alo.com/sports/article/559813

আমরাও গুরুগম্ভীর ভাষায় প্রতিবাদ জানালাম,
আমাদের প্রথম আলো প্রমাণ করিয়াই ছাড়িবেক…
সুধীর কান্ড ঘটিয়াছেই ঘটিয়াছে!
আরে বাবা! সুধীর বাংলাদেশে আসিয়া ধর্ষিত হয় নাই বা মারাও যায় নাই। বহাল তবিয়তে বাংলাওয়াশ উপভোগ করিবার জন্য প্রস্তুত হইতেছে। তবে ইহা লইয়া এতো মাতামাতির কারণ কি? ইহা হইল ভারতীয় সেই মোড়লগিরি! পাছায় হারিব কিন্তু মুখে হারিব না! কিছুদিন আগেই আমাদের দুইবোন ইন্ডিয়া গিয়া রেপ হইয়া প্রাণপাখি হারাইয়া দেশে ফিরিয়া আসিয়াছিলেন! আমরা প্রতিবাদের টুশব্দটি পর্যন্ত করি নাই। কিন্তু এক্ষণে সুধীর কান্ড লইয়া সোশাল মিডিয়ায় ১৩০ কোটি ইন্ডিয়ান মাত্র ১৬ কোটি বাঙালিরে স্রেফ কচুকাটা করিতেছে!
পাদটীকা: তবে এই ঘটনার তিলমাত্রও যদি ঘটিয়া থাকে তবে বুঝিতে হইবে আমাদের সভ্য ও আন্তর্জাতিকমানের দর্শক হইয়া উঠিতে ঢের বাকী। আমরা এতো ভালো ক্রিকেট খেলি, আসুননা আমরা তারচেয়েও বেশি ভালো দর্শক হইয়া উঠি!

এখন আমাদের কথা হলো, যাহা রটে তার কিছুটাতো বটে’র সূত্র মেনে যদি ইন্ডিয়ান ক্রিকেটের সুপার ফ্যান সুধীর গৌতমের অভিযোগ সত্যও হয়, তবু মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যায়না। এটা সুধীর গৌতমের কাছে ‘সরি’ প্রকাশ করেই বলছি। যেখানে জাতিগত বা ঐতিহাসিকভাবেই ভারত বিরোধী বা পাকিস্তান বিদ্বেষীদের চারণভূমি সেই দেশে গ্যালারীর ৩০ হাজার দর্শকের মধ্যে সকলেই ফেরেস্তা বা অবতার হবেন এমন ভাবনা ভুল। দু’চারজন অসদাচারীর জন্য পুরো বাঙালি নিকৃষ্ট তকমা পাবেন এমনটা হতেই পারে না।

কিন্তু সুধীর গৌতম যে, আমাদের দেশে এসে আমাদের শৃঙ্খলাবাহিনীর কাছে কোনোরূপ অভিযোগ না করে গোপনে তাঁদের নিজ দেশের মিডিয়ায় নিজের অপমান প্রকাশ করে ভারতীয় মিডিয়ার ক্রীড়নক হয়ে গেলেন এবং আমাদের দেশীয় কিছু মানুষ ও মিডিয়ার ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের ঘুটি হিসেবে ব্যবহৃত হলেন সেই বোধবুদ্ধি কি উদয় হবে তাঁর? সুধীর যদি আমাদের জানাতেন, প্রয়োজনে আমরা পুরো বাঙালি তাঁর মতো অসাধারণ ক্রিকেটপ্রেমীর পায়ে ধরে ক্ষমা চাইতাম!

তবে ভারতীয় ক্রিকেট ভক্তদূত সুধীর গৌতমের ওপর হামলা আমাদের অভিভাবকদের সন্তানকে শিষ্টাচার শিক্ষা দিতে ব্যর্থ হবার সূচক বলে অনেক সমাজ চিন্তকরাই মনে করেন। আবার সুধীর মিথ্যা বলছেন, এটা প্রমাণ করার চেষ্টাটাও আমাদের দোষ অস্বীকারের সেই চিরাচরিত ‘ডিনাইয়াল’ কালচার বলেই মুক্তচিন্তকদের মত।

আমরা ক্রিকেট জয় করে চলেছি, কিন্তু বিনয়ী না হলে যে, সেই জয় বিজিত হতে সময় নেবে না? এবারের ভারত বাংলাদেশ প্রথম ম্যাচে ধোনি আমাদের ম্যাজিকম্যান মুস্তাফিজকে ধাক্কা দিয়ে নিজের দেশেই ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়লেও মুস্তাফিজ সাফ জানিয়ে দিয়েছিলেন ভুলটা তাঁর নিজেরই। এটাই বিনয় বা ঔদার্য! আচার আচরণ না শিখলে কে কবে বিজয়ী হতে পেরেছে? আমাদের কিছু বখে যাওয়া দর্শকের জ্ঞান চক্ষু খুলে যাক, বোধ উদয় হোক।

তাই সুধীর গৌতম সিন্ড্রোমে ভর দিয়ে নিজেদের হারের ব্যথায় মলম লাগাবার প্রয়াস খুঁজে ভারতীয় মিডিয়া আমাদের যতই কচুকাটা করুক, আমরা যেন হই বিনয়ের অবতার। বাংলার ক্রিকেট চেতনা কিছু উচ্ছৃঙ্খল দর্শকের হাতে বিনষ্ট হওয়ার আগেই সুধীর কাণ্ডের যৌক্তিক সুরাহা হোক। আজন্মেই ফিরে না আসুক এই বাংলাভূমে লজ্জাকর সুধীর সিন্ড্রোম।

বেঁচে থাক অহিংস ভ্রাতৃপ্রেম!
জয় হোক সুন্দর ক্রিকেটের!

ফারদিন ফেরদৌসঃ লেখক ও সাংবাদিক
২৩ জুন ২০১৫
facebook/fardeen.ferdous
twitter/fardeenferdous