ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 
mymensingh-pic-1

আমাদের কালের কিংবদন্তি গণসঙ্গীত শিল্পী প্রতুল মুখোপাধ্যায় তাঁর গানে বড়ই কারুণ্য নিয়ে বলেছেন,
জন্মিলে মরিতে হবে রে, জানে তো সবাই
তবু মরণে মরণে অনেক
ফারাক আছে ভাই রে, সব মরণ নয় সমান।
জীবন উৎসর্গ করে সবহারা জনতার তরে
মরণ যদি হয়,
ওরে তাহার ভারে হার মানে ঐ
পাহাড় হিমালয় রে, সব মরণ নয় সমান।

কিন্তু এই লিরিকের বিপরীতে গিয়ে যদি নূরানী জর্দ্দা কোম্পানির মালিক শাহীন তালুকদারের দেয়া ঢাকঢোল পেটানো ঈদ উপহার বা যাকাত কাপড় নিতে গিয়ে সবহারা সাতাশ প্রাণ নিজেদেরকেই অকাতরে বিলিয়ে আসেন, তবে সেই মরণ কিসের সমান হবে? জানা আছে বা নাই!

দেশের অর্থনীতি মধ্যম আয়ে ফুলে ফেপে উঠবার কালে বেড়ে যাচ্ছে আঙ্গুল ফুলে কলা গাছ বনে যাওয়া জর্দ্দা, গুল বা মলের কারবারীর সংখ্যাও। এসব কারবারীর লোভাতুর প্রত্যুৎপন্নমতিতে প্রাণি বা মনুষ্য বর্জ্য যে আজকাল সারে রূপান্তরিত হয়ে মাছের পুকুর বা জমিতে পৌছে গিয়ে অসময়ে আগাম আমিষ বা সবজি হিসেবে বাজারে গিয়ে আগুন ধরিয়ে দিচ্ছে তা কে না জানে? আর সবহারাদের ঘারে পাড়া দিয়ে এসব কারবার করে ধন লুটেরা বনে যাওয়া শহরতলীর মানুষের মধ্যে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে যাকাত বিলানোর নামে ধর্মের পঞ্চ স্তম্ভ পোক্ত করার বাড়াবাড়িও। কিন্তু কিতাবে যে আছে, তোমার ডান হস্ত দান করলে বাম হস্তও যেন না জানে। সেই কথার কোন মূল্য কি আছে সারাদেশের এসব যাকাতখুনোদের কাছে?

কথায় কথায় আমাদের দেশের স্বঘোষিত একমাত্র ধার্মিক হেজাবি(হেফাজত, জামায়াত ও বিএনপি)দের দুর্বল অনুভূতি দিনে কোটিবার মারা যায়। কিন্তু ধর্মের নামে বলবান হাতির পাড়ায় যদি প্রান্তিকজন ডজন ডজনও প্রাণ হারান তাতে হেজাবি মৌলভীদের অনুভূতিতে কি কিঞ্চিৎ দাগও কাটে? অথচ ধর্মের শব্দ ভাণ্ডার, ইতিহাসের সাথে এডপ্টেশন বা এসিমিলেশন নিয়ে কোনো প্রথিতযশা কথা বললে হেজাবিদের এক ঘোষণায় তিনি মুরতাদ হয়ে যান! তাঁর গালে জুতা মেরে, কল্লা ফেলে দিয়ে উল্লাস করাটা মওদুদীপন্থি মৌলভীদের কাছে ফরজ হয়ে যায়। কিন্তু জর্দ্দা, গুল বা মল জাতীয় বর্জ্য ব্যবসা করে ধনবান বনে যাওয়া সমাজের তালুকদার টাইপ সেই হঠাৎ কুলীনদের অশিষ্ট ধর্মাচার পালনে যদি শতপ্রাণও বিলীন হয় তবুও মৌলভীদের অনুভূতি চাগাড় দিয়ে উঠে না। কেন এমনটা হয়?

প্রথমতঃ মাদ্রাসা, মসজিদ বা ধর্মালয়ে দান করে রাস্তায় রাস্তায় মাইকে চিৎকার করা বা চুতা ধরিয়ে দিয়ে ভিক্ষা যাচ্ঞা করা দ্বীনি বান্দাদের বাঁচিয়ে রাখার সক্ষমতা রাখেন ঐ মলের কারবারী তালুকদারেরাই।

দ্বিতীয়তঃ স্থানীয় পর্যায়ে হেজাবি ধর্ম রাজনীতির সংস্কারাচ্ছন্ন গুটিবাজি বা বাটি চালানের কাজটাও যে তালুকদারদের কাছে ডালভাত; সবহারা প্রান্তিকজন ওসবে এতোটুকু পারঙ্গম নয়! কেন ধর্মের নামে সারাদেশব্যাপী যাকাতখুনো অধর্ম চর্চা হলেও তাদের বিরুদ্ধে জুম্মার নামাজের পর কুশ পুত্তলিকা দাহ বা মিছিল সমাবেশে গলা ফাটায় না হেজাবিরা, এটা বুঝবার জন্যে নিশ্চয় আপনার অনুধাবনিক অনুভূতিটা সজাগই আছে?

অন্যদিকে এই যে সাতাশ জন মানুষ যাদের শ্রমে ঘামে ত্যাগে শাহীন তালুকদারদের বাড়বাড়ন্ত, সেই তালুকদারের কাছ থেকেই ঈদ উপহার হিসেবে রঙচটা পাতলা ফিনফিনে একখানা কাপড়ের জন্য নিজেদের প্রাণ দিলেন তাতে কারোরই কি আসলে কিছু আসল গেল! আমাদের প্রিয় মহানবী(দ.)’র ধর্মের পঞ্চ স্তম্ভের নিয়মানুযায়ী যে কাপড় বা মাল আসলে তাঁদের প্রাপ্যই। নিজের প্রাপ্যতা বুঝে নিতে গিয়ে প্রাণপাত, ধর্মে এটা সইবে?

কিন্তু আমাদের মানুষের মনে কোনো বিকার হবে না। সাতাশই কি আর সাতাশ হাজার মরলেই কি। কারো মনেই শোকের বা দুঃখের গান গাইবে না। কারণ কেউ গাড়ির তলে পড়ে মরে, কেউ গুমে মরে, কেউ আরক্ষা বাহিনীর ফায়ারে মরে, কেউ চোর চামাড়ের ছুড়ি খেয়ে মরে। কেউবা অবোধ প্রাণি গরুর গুতা খেয়েও মরে। এই সাতাশ প্রাণ নাহয় নিজেদের পায়ের তলায় পিষ্ট হয়েই মরেছে। সুখের কথা হলো, সুইচ ব্যাংকে টাকা রাখনেওয়ালা ক্ষমতাবান, সরকার, মন্ত্রী মিনিস্টার, ফলফ্রুট, গরু ছাগল ভক্ষণকারী বা মাসে মাসে বিদেশ ভ্রমণকারী দামী শরাব পানকারীরাও আগে পরে মরবেই। ঐ যে, পুরাণে আছে প্রত্যেক প্রাণকেই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতেই হবে!
কাজেই পদপিষ্টে মরণই নাহয় সবহারাদের নিয়তি হলো। সে যতোই অসভ্যতা হোক।

তবে প্রকৃত মানুষের অভিব্যক্তি হয়ত ভিন্নতর।

আমরা মধ্যম আয়ে গমন করবার পাশাপাশি…
হাত ধরাধরি করে হয়ত বস্ত্রবিহীন জাতিতেও পরিণত হচ্ছি…!
আমাদের এই…
উলঙ্গ লজ্জাকর ও করুণ দুর্দশায়…
এক টুকরো কাপড় পরাবে কে…?

আচ্ছা স্বর্গের দরজায় পা রাখার অতিশয় সহজ পন্থা কী? ধনী হয়ে একখন্ড পাতলা কাপড় দেয়ার নামে গরীবের প্রাণহরণ… নাকি গরীব হয়ে ধনবানের যাকাত প্রদানের নামে নিজেকে সমাজে জাহির করবার সেতুকে পোক্ত প্রতিষ্ঠিত করতে গিয়ে দীনহীনের প্রাণকে সেই নদীতে বলিদান? প্রশ্ন?
দেশের যাকাতখুনো তথাকথিত ধর্মপরায়ণদের জন্য গরীবের অকাতর প্রাণদান বিষয়ে…আমার শিক্ষক ও প্রিয় কবি খালেদ হোসাইনের পঙক্তিমালা এখন বাংলা মানুষেরই মনের অনুরণন।

ঈদ এলে যাই দেশ-বিদেশে ঘুরতি
মনে কত ফূর্তি!
মনের কিছু জমা-খায়েশ
তখন করি পূর্তি।
জন্ম থেকে যাদের ফাঁপর–
ভাগ্যে জোটে ধমক থাপড়
চায় তারা যাকাতের কাপড়
ভাগ্য তাদের আপন না, পর–
দেখে তারা ধনকুবেরের
কী ভয়ানক মূর্তি!
সেই মিছিলে আহাজারি
পায় না লুঙি পায়না শাড়ি
কিন্তু এসব বাড়াবাড়ি–
সবই ওদের সৃষ্ট।
এমন হলে হবেই তো
পদতলে পিষ্ট!
আমরা আহা উহু করি
আর বলি, ‘অদৃষ্ট!’
মৃত্যু ওদের জড়িয়ে ধরে
মৃত্যৃই হয় আপন
এর জন্য থমকায় না
কারো জীবন-যাপন।
পরার কাপড় যার জোটে না
তার কি জোটে কাফন?

ফারদিন ফেরদৌসঃ লেখক ও সাংবাদিক
১২ জুলাই ১৫
https://www.facebook.com/fardeen.ferdous
https://twitter.com/fardeenferdous