ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

Tarek-zia-back

বাবারা সব সময় সন্তানদের কাছে গল্প করতে ভালবাসেন যে তিনি বরাবরই পরীক্ষায় প্রথম হতেন। সন্তানরা বাবাদের শ্রদ্ধা করেন প্রাণের অধিক তাই বাবাদের সেই গল্পের সত্যাসত্য যাচাই করতে যায় না। ফলে নাতিরা এক সময় বিশ্বাস করতে শুরু করে যে বাবার বাবা বা দাদামহাশয় দারুণ মেধাবী ছিলেন আইনস্টাইনের দোস্ত ছিলেন, বীরবল তার সাগরেদ ছিলেন ইত্যাদি ইত্যাদি। আবার যার বাবা এমন কোন গল্প তার বাবা সম্পর্কে বলেননি তখন কি নাতিরা বলবে তার দাদা আস্তা গাধা ছিলো? কোন সন্তান যদি বাবাকে সবার ওপরে স্থান দিতে গিয়ে বাবার চরিত্র হরণ করে বাবার মর্যাদা নষ্ট করে তবে কিন্তু বিষয়টা খুব রসালো হয়। রস তখন উপচে পড়তে থাকে টিভি টকশো জনসভা আর চায়েরস্টল সবখান থেকে।

যাক সেসব আলাপ থাক। বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রপতি মরহুম জিয়াউর রহমান বলতেন, আমি রাজনীতিকদের জন্য রাজনীতিকে ডিফিকাল্ট করে দিয়ে যাব। তিনি কেন কথাটি বলেছিলেন জানেন? গবেষকরা বলছেন- তার মুর্খ স্ত্রী আর বেকুব সন্তান যাতে রাজনীতিতে এসে তার সম্মান নষ্ট না করে তাই তিনি রাজনীতিকে কঠিন করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু বেকুব আর মুর্খরা কি সব কিছুর মানে বোঝে? বোঝে না বলেই তারেক রহমান নামের এক সন্তান এবার একাত্তরের ২৫ মার্চের কালরাত্রির দুঃসহ স্মৃতিবহ দিনে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তিনি ঐতিহাসিকদের জন্য ইতিহাস রচনা কঠিন থেকে কঠিনতর করে দিয়ে যাবেন। মহান স্বাধীনতার তেতাল্লিশ বছর পর এসে সাধারণ জ্ঞানের প্রশ্নোত্তর পরিবর্তিত হয়ে গেছে। বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি কে? আগে জানতাম, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। আর এখন জিয়াউর রহমান। তারেক রহমান কর্তৃক পরীক্ষিত নোটে এ কথাটি লিখতে ভুলে গেলে চলবে না ।

মেজর জিয়া জীবতকালে ভুলেও কোনোদিন নিজেকে ঘোষক, দেশের প্রথম প্রেসিডেন্ট বা মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক বলেননি। জনগণের ম্যান্ডেটবিহীন তা করার এখতিয়ারও তার ছিল না। তবে জিয়া তনয় ও দুর্নীতির বর্বরপুত্র তারেক রহমান বাবার ভুল শোধরানোর মহান দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছেন। আর তাই চলুন লণ্ডনের এফডিসিতে নির্মিত ব্লকব্লাস্টার হিট একটা হিস্টরিক ডকু ড্রামা দেখে আসি। ডকুড্রামার শুরু এবং শেষ অবধি কেবলই কথিত দেশনেতা তারেক রহমানের ঐতিহাসিক ভাষণ। আবহে হৈ হুল্লোড়, হর্ষধ্বণি ও রণ মিউজিক।

বাংলাদেশ জন্মের আগে দেশের মানুষের মুক্তির জন্য ২৮ বছর সংগ্রাম করেছেন ও জেল জুলুম সয়েছেন জিয়াউর রহমান। ছিষট্টিতে ৬ দফা দিলেন সেই জিয়া। ঊনসত্তরের গণ অভ্যুত্থান হলো তারই নেতৃত্বে। সত্তরে জনগণ বিপুল ভোটে ম্যান্ডেট দিল জিয়াকেই। কিন্তু ইয়াহিয়া ভুট্টোরা জিয়াকে ক্ষমতা থেকে বঞ্চিত করল। পরে ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে লাখো মানুষের জনসমুদ্রে লালগোলাপ শফিক রেহমানের রচনায় জিয়া একখানা বিশাল ভাষণ দিলেন, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম’। এরপর কালুর ঘাট থেকে হান্নান টান্নানের পরে বিশাল গণম্যান্ডেট পাওয়া জিয়াই ঘোষণা দিলেন মহান স্বাধীনতার। কিন্তু এদেশের সৈন্যবাহিনী দ্বিধাদ্বন্ধে ভুগছিলেন তারা তাদের অস্ত্র নিয়ে কি করবেন। কারণ মেজর জিয়াতো তার ঘোষণায় অস্ত্রের কথা কিছু বলেননি। এবার ত্রাণকর্তা হলেন আমাদের প্রিয় ম্যাডাম জিয়া। সেইসময় একদিন আব্দুল কাদের নামের একজন হাবিলদার দৌঁড়ে খালেদার বাসায় গিয়ে জিয়ার খোঁজ করলেন। জিয়া তখন বাসায় ছিলেন না। ঐ হাবিলদার জানালেন, পাকিস্তানি সেনা কর্মকর্তারা বাঙালি সেনা সদস্যদের বলছে, অস্ত্র জমা দিয়ে দিতে। এখন তারা কি করবে, এজন্য জিয়ার নির্দেশনা নিতে এসেছেন। ম্যাডাম তখন বললেন, স্যার না আসা পর্যন্ত অস্ত্র জমা দিবেন না। এই কথাটিই মুক্তিযুদ্ধে জিয়ার ঘোষণার চেয়েও বেশি বারুদের মতো কাজ করেছিল। ম্যাডামের কথায় সকল সৈন্যরা রণাঙ্গনে যুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়েছিল। মুক্তিযুদ্ধে প্রথম মন্ত্রনা দেওয়ার জন্য তেতাল্লিশ বছর পর গেল ২৭ মার্চ মুক্তিযোদ্ধা দল কর্তৃক ম্যাডাম জিয়াকে মুক্তিযোদ্ধা সম্মাননা দেয়া হলো। তবু ভালো, কৃতজ্ঞ জাতি এতোদিন পর হলেও ম্যাডামের অবদানকে স্বীকার করেছে।
এতক্ষন আমরা যা দেখছিলাম, ম্যাডাম হাবিলদারকে নির্দেশনা দিলেন এবং শুরু হল মুক্তিযুদ্ধ। পরে ম্যাডামের পরামর্শে ১০ এপ্রিল মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলায় জিয়াউর রহমানকে প্রেসিডেন্ট করে গঠন করা হলো প্রবাসি সরকার।

আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হলো, স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র। সেসময় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, তাজউদ্দীন আহমদ, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, এম এ জি ওসমানি বলে কেউ আসলে ছিল না। থাকলেও তারা শরনার্থী হয়ে ওপারে চলে গিয়েছিলেন। আর দেশের প্রথম প্রেসিডেন্টের নেতৃত্বে রণাঙ্গনে মুক্তিযুদ্ধ করেছিলেন বিএনপি, পাকিস্তানি হানাদার, রাজাকার, আলবদর ও আলশামসরা। দীর্ঘ নয় মাস পর ১৬ ডিসেম্বর মাত্র তিন হাজার বিএনপি আলশামস শহিদ ও কয়েকশত নারীর সম্ভ্রম হারানো শেষে পাকিস্তানিদের বুঝিয়ে শুনিয়ে দেশ স্বাধীন হলো। ওপার থেকে ফিরে এলো কোনো এক শেখ মুজিব ও তাজউদ্দীনরা। তাদের কাছে ক্ষমতা ছেড়ে দিয়ে জিয়া হয়ে রইলেন সামান্য গভঃমেন্ট মিলিটারি সার্ভেন্ট। পরে তুচ্ছ ও নগণ্য মুজিবের কাছ থেকে নিলেন বীরউত্তম খেতাব। এতোটাই মহানুভব ছিলেন জিয়া তথা জিয়া পরিবার। এটাই হলো লন্ডনি ডকুড্রামা!

কিন্তু ইতিহাসের চির সত্য কেউ বিকৃত করলেই তা মুছে যায় না। ইতিহাস কেবল রাজাকার তুষ্ট সরকারের প্রকাশিত মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস গ্রন্থ নয়। ইতিহাস আছে আমেরিকা, যুক্তরাজ্যের মহাফেজখানায়। ইতিহাস আছে পৃথিবীর তাবত সংবাদ সংস্থায়। ইতিহাস আছে দেশের নিরেট মুক্তিযোদ্ধার মন ও মানসিকতায়।

জার্মান শাসক হিটলারের প্রচারমন্ত্রী জোসেফ গোয়েবলস জোড় গলায় বলতেন, If you tell a lie big enough and keep repeating it, People will eventually come to believe it. – একটা মিথ্যা বার বার প্রচার করলে একদিন লোকে তাকে সত্য বলে গ্রহণ করে। দেশের প্রথম প্রেসিডেন্ট নিয়ে এমনতর গোয়েবলসীয় কথকতা এখন দেদার চলছে লন্ডন থেকে বাংলাদেশ অবধি। তারেক রহমান বলছেন, ম্যাডাম জিয়া সুর তুলছেন আর উনার সভাসদরা পুচ্ছ উচিয়ে দোহারকি করছেন। তারা এবার সদলবলে নব্য গোয়েবলস সেজে আমাজান জঙ্গলের অ্যানাকোন্ডার মতো অপরাজনীতির বিষাক্ত ফ্যাং তুলে ধরেছেন বাঙালির মহান মুক্তিযুদ্ধের উপর! মুক্তিযুদ্ধ সময়কাল নিয়ে এমন অভিনব, উদ্ভট ও অদ্ভূত প্রেসিডেন্ট তত্ত্ব বিশ্বাস করা না করা আপনার বিবেকের ব্যাপার।

নাতসি নেতা জোসেফ গোয়েবলস তার কৃতকর্ম ও পরাজয়ের অনুশোচনায় সন্তান সন্ততিসহ হিটলারকে অনুসরণ করে আত্মহত্যা করেছিলেন। বাংলাদেশে এমন সম্ভাবনা দেখা না গেলেও এদেশের প্রথম, আদি ও আসল গোয়েবলস কে তা নিয়ে ভাবতে পারেন?
দেশের প্রথম প্রেসিডেন্ট কে, তা ঐতিহাসিকভাবেই মীমাংসিত।
তবে প্রথম গোয়েবলস কে? এ নিয়ে সিদ্ধান্তে আসতে পেরেছেন আশা করছি।

আলোচ্য ডকুড্রামা যদি সত্যিই সত্য হয় তবে একটা খুশির খবর আছে। কারণ- ইতিহাসের সাক্ষ্য মোতাবেক সপ্তম, কিন্তু আমাদের দেশনেতার স্বপ্নে পাওয়া তত্ত্ব মতে, দেশের প্রথম প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের প্রথম কবরখানা চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ায়। আবার যেখানটিতে জন্মগ্রহণ করে ব্যাপক ধন্য হয়েছেন বিখ্যাত সোনা কারবারি, লেজের কুকুর নাড়ানো তত্ত্বের জনক ও সর্বোপরি বিএনপি নেত্রীর ভাষ্যমতে রণাঙ্গনের যোদ্ধা, তবে যুদ্ধাপরাধী সাকা চৌধুরী। এখন থেকে যেকোনো কাজ শুরু বা শেষের আগে বড় নেতা বা পাতি নেতারা শফি হুজুরের মতো হেলিকপ্টারে গিয়ে ঐ রাঙ্গুনিয়ার প্রথম কবরেই পুষস্তবক অর্পণ করবেন বলে মনস্থির করেছেন। প্রথম প্রেসিডেন্ট যেমন তারেকের কাছে গুরুত্বপুর্ণ, তারচেয়েও বেশি গুরুত্ব বহন করে প্রথম কবর। এইবার আওয়ামীলীগারদের পোয়া বারো। জাতীয় সংসদের বিখ্যাত স্থপতি লুই আই কানের নকশা অবিকল রাখতে চন্দ্রিমা উদ্যানের মাঝ বরাবর থাকা দেশের সবচেয়ে দৃষ্টিনন্দন কবরখানা নিয়ে বড় মাথা ব্যথা কমে গেল তাদের তাই। ঐখানে কারো পা পড়বে না, কবরের উপর লম্বা সবুজ ঘাসেরা সংসদ ভবনের দিক থেকে আসা দখিনা বাতাসে দোল খাবে কেবল।
এটা কি খুশির খবর নয়?

ফারদিন ফেরদৌসঃ লেখক ও সাংবাদিক
৩০ মার্চ ২০১৪
https://www.facebook.com/fardeen.ferdous
https://twitter.com/fardeenferdous