ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 
file (4)

আমাদের প্রিয় কাব্য গীতাঞ্জলিতে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর জীবনের শেষবেলা নিয়ে মৃত্যুদূতকে উদ্দেশ্য করে বলেছেন,
মরণ যেদিন দিনের শেষে আসবে তোমার দুয়ারে
সেদিন তুমি কী ধন দিবে উহারে।
ভরা আমার পরানখানি
সম্মুখে তার দিব আনি,
শূন্য বিদায় করব না তো উহারে–
মরণ যেদিন আসবে আমার দুয়ারে।

কিন্তু অধর্ম দস্যুর চাপাতির আঘাতে যে প্রাণটি অনিচ্ছায় দেহাতীত হয়, সেই মুক্তপ্রাণটি তাঁর মৃত্যুদূতকে আসলে কী ধন উপহার দিতে পারে?
হে প্রিয় কবি! আমাদের তা জানা নাই।

হরহামেশা বিপদে-আপদে, শূণ্যে-পাতালে, শান্তিতে-অশান্তিতে মৃত্যুদূতকে যিনি নিয়ন্ত্রণ করেন, তিনি এমন এক সত্ত্বা, তাঁর চেয়ে মহত্তর আর কিছু ভাবা যায় না! ঈশ্বর জাগতিক ক্ষমতার সর্বোচ্চ অবস্থানে অবস্থানকারী কোন অস্তিত্ব। ভাষাভেদে একে ইংরেজিতে গড, আরবিতে ইলাহ এবং বাংলা ও সংষ্কৃতে ঈশ্বর ইত্যাদি নামে ডাকা হয়। যে ঈশ্বর সম্পর্কে বিজ্ঞানী আইজাক নিউটন বলতেন, অভিকর্ষ গ্রহসমূহের গতির বিষয়টি ব্যাখ্যা করে, কিন্তু এটি ব্যাখ্যা করতে পারেনা, কে গ্রহগুলোকে গতিশীল হিসেবে নির্দিষ্ট স্থানে স্থাপন করে দিল। ঈশ্বর সকল কিছু নিয়ন্ত্রণ করেন এবং যা কিছু ঘটছে বা যা কিছু ঘটা সম্ভব তার সবই তিনি জানেন।

আমি জন্মসূত্রেই সেই মহান সত্ত্বা ইলাহ বা ঈশ্বরের সন্তান বলেই ভাবতাম, আমার স্রষ্টাকে নিয়ে কথা বলবার বা জ্ঞানগর্ভ তর্ক-বিতর্ক করবার অধিকার আমার জন্য সদা সংরক্ষিতই।
কিন্তু ইদানিংকালে চরম অমানবিকতায় চাপাতিতে সিরিয়ালি মানুষ হত্যাদৃষ্টে নিজেকে বুদ্ধিহীন, বাকহীন, ক্লীব ও জড়বস্তু হিসেবে ঘোষণা করা ছাড়া উপায় থাকছে না!

আমরা আর জ্ঞানের কথা বলব না, চিন্তার কথা বলব না, মানবমুক্তির কথা বলব না। আর ধর্মের কথা বলা থেকে শত হস্ত দূরে থাকব। কারণ একজন তার্কিকের দেয়া কথা বা লেখার আনুভূতিক আঘাত সমানুপাতিক উগ্র মৌলবাদীর খড়গ হস্তের রক্তাক্ত খুন! পথে বসে যাওয়া অসহায় পরিবারের বোবা কান্না আর ভালোবাসা ও স্নেহকাঙাল রিক্ত সন্তানের বেদনভরা হাহাকার!

মহান ঈশ্বরের দেয়া অনিন্দ্য সুন্দর পৃথিবীতে পরিবার পরিজন বন্ধুবান্ধব নিয়ে বাঁচবার অধিকার আমারও আছে।
কিন্তু ধর্মান্ধ চাপাতিবাজের তথাকথিত কট্টর প্রভুর কাছে আমার সত্য, সুন্দর, সরল, দয়ালু, শান্ত, ধীরস্থির, সর্বংসহা মহান ঈশ্বর যে আর পেরেই উঠছে না। উগ্রবাদী প্রভু জঙ্গিদের দায়িত্ব দিয়েছেন চাপাতিতে কুপিয়ে কুচি কুচি করে মানুষ কেটে তবেই তাদের ধর্ম রক্ষা করতে হবে!

চাপাতির রক্তে রঞ্জিত হয়ে ইবলিশ পুত্র আইএস, আল কায়েদা বা আনসারুল্লাহ খুনিরা প্রতিটি অপারেশন শেষে টেলিভিশনের সামনে গিয়ে নিজেদের সৃষ্ট অন্ধকার যুগীয় ভয়াল বীভৎসতা দেখে অট্টহাসিতে উল্লাসে ফাটে। আমরা মিডিয়া বা আরক্ষরা ঘটনা উদ্ধারের নামে ঘন্টায় ঘন্টায় নির্মমতার নাটক করি। আমেরিকান এফবিআই’র মতিগতির দিকে তাকিয়ে থাকি। ঠিক সেইসময় এসবের ক্রীড়নকদের নির্বিকার আপাতঃ শক্তিশালী চাপাতি নিয়ন্ত্রক প্রভুও বুঝি হাসিতে মুক্তো ঝরান। একসময় ভুলো মানুষ ভুলে যায় সব।
হায়! আনসারুল্লাহ’র নির্মম প্রভু আপনি কেমনে পারেন এসব করতে? কিভাবে এসব দিনের দিনের পর সয়ে যেতে পারে আপনারই শিষ্যতুল্য আমাদের আরক্ষা বা ক্ষমতাবানরা!
চিকন সুতোর ওপর দিয়ে হাঁটলেই বুঝি এতোটা বোধহীন হয়ে যেতে হয়?

শুধুমাত্র বিজ্ঞান চিন্তা করতে গিয়ে, ধর্মের নামে গোঁড়ামি বা কুসংস্কারের বিরুদ্ধে লেখালেখি করতে গিয়ে সব হারানো রাজীব, অভিজিত, ওয়াশিকুর, অনন্ত বা নিলয়ের স্বজনদের দুর্মর ক্রন্দন মৌলবাদীর প্রভুবশংবদ আপনাদের কর্ণকুহরে কোনোদিন কি পৌছবে না?
খুনিরা যখন ছায়া হয়ে মৃত্যু পরোয়ানা নিয়ে ঘুরে মানুষের পেছনে পেছনে। নিঃশ্বাস ফেলে ঘারে। সেসময় প্রভুভক্ত পুলিশও নালিশ না নিয়ে নিলয়দের বিদেশ যাওয়ার পথ দেখায়। কারণ মানুষ রক্ষার দায়িত্ব তাদের না। তারা শুধু প্রভুর ইচ্ছায় রক্ষা করে যাবে প্রভুভক্ত স্বগোত্রীয় তথাকথিত ধার্মিক উগ্রবাদী বা মৌলবাদীদের! কারণ এই মোল্লাপুষ্ট রাষ্ট্রে লেখা বা মুক্তচিন্তার সীমারেখা অনতিক্রম্য; কিন্তু দায়িত্বহীনতার কোনো সীমারেখা থাকতে নেই। চিন্তায় সীমালঙ্ঘনকারীর জন্য জেল, ফাঁস বা দেশান্তরই একালের বিধায়ক নির্ধারিত শাস্তি!
সত্যি সেলুকাস কি বিচিত্র এই দেশ!
আলেকজান্ডারের সুপ্রিয় বন্ধু…
হে গ্রিক বীর ‘সেলুকাস’ আপনি এসে এদেশের রঙিলা বৈচিত্র্য নিজ চোখে দেখে যান!

প্রাচ্যের বৌদ্ধ ধর্মগুরু গৌতম বুদ্ধ বলতেন, প্রাজ্ঞ ব্যক্তি কখনো কারো নিন্দা বা প্রশংসায় প্রভাবিত হন না। কিন্তু একথা আজ আর এই ধর্মদেশে খাটে না। এখন সবাই ঐ চাপাতিবাজদের প্রভুবলয় পরিবেষ্টিত। এখানে প্রভুকথায় অনুভূতির উগ্র বিকিরণে নিমিষে গায়ে ফোস্কা পড়ে ধর্মপুত্র মৌলবাদী যুধিষ্ঠিরদের। তাই চাপাতি খাও, নাহয় ভাগো। দুনিয়া থেকে অথবা এই দেশ থেকে।
আমাদের কবিগুরু বলতেন, যে ধর্মের নামে বিদ্বেষ সঞ্চিত করে, ঈশ্বরের অর্ঘ্য হতে সে বঞ্চিত! কিন্তু ধর্ম রক্ষার নামে চাপাতিবাজ কুৎসিত হিংসা বিদ্বেষীদের কিঞ্চিৎ বঞ্চনাও যে দেখি না।
তাই এবার হয়ত মুক্তচিন্তকদেরও বুঝবার সময় এসেছে, শুয়োরের সাথে দ্বন্ধযুদ্ধ করতে নেই, তাতে শরীর নোংরা হয়ে যায় এবং শুয়োরটি এইটিই পছন্দ করে।

ওহে স্বাধীন চিন্তকেরা…
যেহেতু নিজের নিরাপত্তা নিজে দিতে পারছেন না,
যেহেতু রাষ্ট্র তার নানামুখী সুবিধাবাদে আপনার নিরাপত্তা নিয়ে নির্লিপ্ত ঘুমঘোরে আক্রান্ত,
তারচেয়ে এই ভালো অধর্ম হায়েনার কাছে নির্যাতিত আপনি বরং অনন্য শক্তিধর অভিব্যক্তি, বিশেষ জ্ঞান, প্রজ্ঞা, মনোবল, সংস্কার, লালিত বিশ্বাস নিয়ে আজকের এই বাংলায় আপাততঃ নীরব থাকুন।
অসামান্য নৈতিক শক্তিধর যুক্তিবাদী মানুষ হয়েও আপনার মুখে কুলুপ আটুন যতদিন না আমাদের সর্বশক্তিমান ঈশ্বরের প্রেরণায় সত্যিকার মানুষ জাগে! এই ঘণায়মান অন্ধকারবেলা সত্যিকারের মানুষের ওপর বিশ্বাস না হারিয়ে আমরা বরং প্রেরণা নিতে পারি মহামনিষীদের অমৃত বচনেঃ
মানুষের বিশ্বাস হারানো উচিত নয়। মানবতা হলো মহাসমুদ্র।
এর কোনো এক বিন্দু যদি দূষিতও হয়,
সমুদ্র তাতে দূষিত হয়না। অথবা
মানুষ, হ্যাঁ আমি তাই। তাছাড়া আমি একজন খ্রিস্টান, একজন মুসলিম, একজন বৌদ্ধ এবং একজন ইহুদি। এমন কথাই বলতেন মহাত্মা গান্ধী।
এদিকে মিস্টিক কবি লালন ফকির কি অসাধারণভাবেই না বলেছেন, এমন সমাজ কবেগো সৃজন হবে, যেদিন হিন্দু মুসলমান বৌদ্ধ খ্রিস্টান গোত্র নাহি রবে।

আইএস বা তালেবানীয় দুর্মর অসভ্য প্রভুপুত্রদের বহু বাড় বেড়ে গেছে। এবার আমাদের ঈশ্বর নিশ্চিত জাগবেনই। জাগতে তাঁকে হবেই।

আব্রাহামিক পুরাণে আছে, নিশ্চয় মনের বিরুদ্ধে জিহাদ করাই শ্রেষ্ঠ জিহাদ। কিন্তু এর বিপরীতে গিয়ে খুনোখুনির জিহাদী মদে মত্ত যারা, তাদের ধ্বংস অনিবার্য। লাদেনতো টেকেনি। বোগদাদী বা জাওয়াহারীও টিকবে না।

পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত মার্কিন নাগরিক গবেষক কাশিফ এন চৌধুরী হাফিংটন পোস্টে সম্প্রতি প্রকাশিত এক নিবন্ধে বলেছেন, মুসলমানদের শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) প্রায় দেড় হাজার বছর আগে এই ধর্মান্ধ উগ্রবাদী আইএস, আলকায়েদা, তালেবান তথা আনসারুল্লাহ জঙ্গিদের বিষয়েই সতর্ক করেছিলেন।
নবী ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন, ‘এমন এক সময় আসবে যখন নাম ছাড়া ইসলামের আর কিছু থাকবে না, অক্ষর ছাড়া কোরআনের কিছু থাকবে না এবং অনেক ‘মসজিদ জাঁকজমকে পূর্ণ থাকবে, কিন্তু সত্য পথের নির্দেশনা সেখানে থাকবে না’।
হাদিস সংকলন ‘মিশকাতুল মাসাবীহ’ তে উল্লেখ আছে ‘সেই দিনগুলোতে ইসলামের আধ্যাত্মিক মর্ম ‘হারিয়ে যাবে’ এবং অধিকাংশের কাছে ধর্ম ‘সীমাবদ্ধ থাকবে’ কেবল আচারের মধ্যে। ওই সময়ে ইমামরা ‘দুর্নীতিতে নিমজ্জিত’ হবেন, পরিণত হবেন ‘তত্ত্বীয় বিবাদের কেন্দ্রে’।

আমরা বিবাদীয় ধর্মের এমন রূপটাই দেখতে পাচ্ছি দেশে দেশে। কিন্তু এই ধারার জিহাদী ধর্ম আমাদের নয়। আমরা অসাম্প্রদায়িক চেতনায় বরং ৬২২ খ্রিস্টাব্দের ২৪ সেপ্টেম্বরে মহানবী প্রণীত মদিনা সনদটিতে আরেকবার চোখ বুলাতে পারি। যে সনদ সম্পর্কে ঐতিহাসিক পি.কে. হিট্টির বলেছেন, ‘Out of the religious community of all Madinah the later and largest state of Islam arose’। অর্থ্যাৎ মদীনা প্রজাতন্ত্রই পরবর্তীকালে ইসলামী সাম্রাজ্যের ভিত্তিমূল স্হাপন করে।
সকল পক্ষের স্বাক্ষরিত মদীনা সনদের মূল বিষয়বস্তু ছিল:
১) সনদপত্রে স্বাক্ষরকারী সম্প্রদায়সমূহ একটি জাতি গঠন করবে।
২) যুদ্ধ বা হানাহানি শুরু হবার মতো তীব্র বিরোধ তৈরি হলে বিষয়টি আল্লাহ এবং হযরত মুহাম্মদ(সা.)-এর কাছে ন্যস্ত হবে।
৩) মুসলিম, খ্রীস্টান, ইহুদী, পৌত্তলিক ও অন্যান্য সম্প্রদায় ধর্মীয় ব্যাপারে পূর্ণ স্বাধীনতা ভোগ করবে। কেউ কারো ধর্মীয় কাজে কোন রকম হস্তক্ষেপ করতে পারবে না।
৪) রাষ্ট্রের প্রতি নাগরিকের অধিকার ও নিরাপত্তা রক্ষার ব্যবস্থা থাকবে।
৫) অসহায় ও দুর্বলকে সর্বাবস্থায় সাহায্য ও রক্ষা করতে হবে।
৬) সকল প্রকার রক্তক্ষয়, হত্যা ও বলাৎকার নিষিদ্ধ করতে হবে এবং মদীনাকে পবিত্র নগরী বলে ঘোষণা করা হবে।
৭) মুসলমান, ইহুদী ও অন্যান্য সম্প্রদায়ের লোকেরা পরষ্পর বন্ধুসুলভ আচরণ করবে।

তাহলে যেসব কুলাঙ্গার নবীর এমন শান্তির ধর্ম ছুড়ে ফেলে ওয়াহাবী বা মওদুদী মতাদর্শে লাদেন বা জাওয়াহারীর বানানো খুনোধর্মে গা ভাসিয়ে একমাত্র চাপাতিকেই ধর্মাস্ত্র করেছে তাদের কী পতিত হওয়ার সময় আসেনি? রাষ্ট্র গা ছেড়ে দিয়েছে! দিক!
মডারেট মুসলিমরা জেগে উঠুন। মানুষেরা জেগে উঠুন।
প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের দ্রোহে পুড়ুক উগ্রতার বিষবাষ্প। তবেই একদিন স্বাধীন চিন্তা, প্রজ্ঞা ও জ্ঞানে আবারও জেগে উঠবে আমার প্রিয় বাংলাদেশ। অপেক্ষার সেদিনের সেই দেশে মানুষের মুক্তির জন্য সাম্যবাদী কবি কাজী নজরুল ইসলামের অমৃত বাণীই যেন সবে সমস্বরে উচ্চারণ করিঃ
গাহি সাম্যের গান
মানুষের চেয়ে বড়ো কিছু নাই, নহে কিছু মহিয়ান।
নাই দেশ-কাল-পাত্রের ভেদ, অভেদ ধর্ম জাতি,
সব দেশে, সবকালে ঘরে ঘরে তিনি মানুষের জ্ঞাতি।

পাদটীকাঃ
আমরা মুক্তমনা লেখক হইবার চাই না! মানুষও হইবার চাই না!!
পাছে যদি সীমা লঙ্ঘিত হয়ে যায়!
বিদেশ যাওয়ার সাধ্যিতো আমাদের নাই!!
…….
তারচেয়ে বরং ঘুষখোর আমলা, ব্যাংক লুটকারী ব্যবসায়ী, দুর্নীতিবাজ জনপ্রতিনিধি, হলমার্ক বা শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারির নায়ক, হিন্দুর জমি জবরদখলকারী, দলকানা ও চাটারবাজ সাংবাদিক, তৈলাক্ত সব্যসাচী শিল্পী, বিশ্বাসের হেফাজতকারী বা শীর্ষ আরক্ষা কমান্ডার হইবার চাই।
…….
কারণ এসব ক্ষেত্রে সীমালঙ্ঘনের কোনো বালাই নাই।

ফারদিন ফেরদৌসঃ লেখক ও সাংবাদিক
০৭ আগস্ট ২০১৫
https://twitter.com/fardeenferdous
https://www.facebook.com/fardeen.ferdous