ক্যাটেগরিঃ পাঠাগার

file

আমাদের প্রিয় কবি দুখু মিয়া তাঁর লেখা শ্রেষ্ঠ কবিতা ‘বিদ্রোহী’তে লিখেছেন,
আমি চির বিদ্রোহী বীর
বিশ্ব ছাড়ায়ে উঠিয়াছি একা চির উন্নত শির।
মম এক হাতে বাঁকা বাঁশের বাঁশরি, আর হাতে রণ তুর্য…

১৯৪১ সালের ৬ এপ্রিল কলকাতার মুসলিম ইনস্টিটিউট হলে ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতি’র রজত জয়ন্তী উৎসব অনুষ্ঠানে সভাপতিরূপে জীবনের শেষ অভিভাষণে আমাদের জাতীয় কবি সেই একক বীর কাজী নজরুল ইসলাম নিজের সম্পর্কে যথার্থ বলেছেন, সুন্দরের ধ্যান, তার স্তব গানই আমার উপাসনা, আমার ধর্ম। যে কূলে, যে সমাজে, যে ধর্মে, যে দেশেই জন্মগ্রহণ করি, সে আমার দৈব। আমি তাঁকে ছাড়িয়ে উঠতে পেরেছি বলেই কবি। এই সমাজে জন্মেছি বলে, আমি শুধু এই সমাজের বা এই দেশেরই নই, আমি সকল দেশের, সকল মানুষের।

আমি বিদ্রোহ করেছি, বিদ্রোহের গান গেয়েছি, অন্যায়ের বিরুদ্ধে, অত্যাচারের বিরুদ্ধে, যা মিথ্যা-কলুষিত-পুরাতন-পঁচা সেই মিথ্যা সনাতনের বিরুদ্ধে। ধর্মের নামে ভণ্ডামি ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে। কেউ বলেন আমার বাণী যবন, কেউ বলেন কাফের। আমি বলি ও দু’টোর কোনোটাই নয়। আমি কেবলমাত্র হিন্দু মুসলমানকে এক জায়গায় ধরে এনে হ্যান্ডশেক করাবার চেষ্টা করেছি। গালাগালিকে গলাগলিতে পরিণত করার চেষ্টা করেছি।

যেই কবি আবাল্য থেকেই জীবনযুদ্ধ করতে গিয়ে একাধারে রুটির দোকানের শ্রমিক, লেটুর দলের অভিনেতা, মসজিদের মুয়াজ্জিন, মাজারের খাদেম, ক্রিস্টান গার্ডের খানসামা, ব্রিটিশ আর্মির সৈনিক হিসেবে কাজ করেছেন, সেই কবি জীবনের শেষ ভাষণে মানুষের অধিকারের বিষয়টিও তুলে আনেন সমাজ বাস্তবতার নিরিখে। তিনি বলেন, মানুষের জীবনে একদিকে কঠোর দারিদ্র-ঋণ-অভাব; অন্যদিকে লোভী অসুরের যক্ষের ব্যাংকে কোটি কোটি টাকা পাষাণ স্তুপের মতো জমা হয়ে আছে। এই অসাম্য ভেদজ্ঞান দূর করতেই আমি এসেছিলাম। আমার কাব্যে সঙ্গীতে কর্মজীবনে অভেদ ও সুন্দর সাম্যকে প্রতিষ্ঠা করেছিলাম।
তাইতো তিনি এমন করে বলতে পেরেছেনঃ

গাহি সাম্যের গান
মানুষের চেয়ে বড়ো কিছু নাই, নহে কিছু মহিয়ান।
নাই দেশ-কাল-পাত্রের ভেদ, অভেদ ধর্ম জাতি,
সব দেশে, সবকালে ঘরে ঘরে তিনি মানুষের জ্ঞাতি।

অসাম্প্রদায়িকতা ও মানবতাবাদে বিশ্বাসী কবি নজরুল সকল ধর্ম দর্শনের সার্বজনীন মূল্যের প্রতি প্রগাঢ় আস্থাবান ছিলেন বলেই হিন্দুর শ্যামা সঙ্গীত কিংবা মুসলমানের ইসলামী সঙ্গীতে সমান্তরাল পারদর্শীতা দেখিয়েছেন তিনি। ‘জাতের বজ্জাতি’ কবিতায় নজরুল লিখেনঃ

যে জাত ধর্ম ঠুনকো এত
আজ না হয় কাল ভাঙ্গবে সে তো।
যাক না সে জাত জাহান্নামে রইবে মানুষ নাই পরোয়া।

তাই মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী সংগ্রামে, পরমতসহিষ্ণুতা প্রতিষ্ঠা কিংবা ধর্মীয় সম্প্রীতি সাধনায় নজরুলের গান কবিতাই বাঙালির অশেষ প্রেরণা।

nazrulllll20140827134115

কবি নজরুল তাঁর ডাক নাম ‘দুখু’ মিয়ার মধ্য দিয়েই জীবনের এক সংগ্রামমুখর কঠিন অধ্যায়কে চিরতরে প্রতিষ্ঠিত করে গেছেন।
সেকালে সারা ভারতজুড়ে ব্রিটিশরাজের বিরুদ্ধে অসহযোগ আন্দোলন, স্বদেশী আন্দোলনের কালে বাংলা কবিতা ভুবনে নজরুলের আবির্ভাব।

নজরুলের প্রতিবাদ আর তাঁর লেখনীর অন্যতম দিক হলো নজরুলই ভারতবর্ষে প্রথমবারের মতো পূর্ণাঙ্গ স্বাধীনতার কথা উচ্চারণ করেন। কবিতা রচনার মাধ্যমে দেশদ্রোহিতার অভিযোগে অভিযুক্ত নজরুল ১৯২৩ খ্রিস্টাব্দের ১০ জানুয়ারি এক বছর সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন। জেলখানার ভেতর অকথ্য নির্যাতন আর বৈষম্যের শিকার হয়ে নজরুল এখানেও বিদ্রোহী হয়ে ওঠলেন। শুরু করলেন আন্দোলন। বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর যুবা বয়সেই ১৯২৩ খ্রিস্টাব্দের ১৪ এপ্রিল হুগলী জেলে অনশন ধর্মঘট শুরু করেন। ব্রিটিশ শাসক গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে নজরুল একটানা অনশন করে যান ৩৯ দিন। সেই সময় বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর স্বয়ং নজরুলকে চিঠি লিখে অনশন ভঙ্গ করার অনুরোধ জানান। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শিলং থেকে এ বিষয়ে তাকে টেলিগ্রাম পাঠান। রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন- ‘Live up hunger strike. Our Literature claims you’ কিন্তু টেলিগ্রামটি নজরুলের হাতে পৌঁছায়নি। জেল কর্তৃপক্ষ ‘Address is not found’ লিখে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাছে টেলিগ্রামটি ফেরত পাঠান। জেল কর্তৃপক্ষ প্রকৃত ঠিকানা জানলেও ইচ্ছে করেই টেলিগ্রামটি নজরুলের কাছে না পাঠিয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাছে ফেরত পাঠান। রবীন্দ্রনাথ এ ঘটনায় দারুণ মর্মাহত হন।

যেই রবীন্দ্রনাথ বিদ্রোহী নজরুলকে প্রায়ই বলতেন,
‘দ্যাখ উন্মাদ। তোর জীবনে শেলীর মতো, কীটসের মতো খুব বড় একটা ট্রাজেডি আছে, তুই প্রস্তুত হ’।

পরবর্তীকালে ১৯৪২ সালেই জীবনের সাথে অবিরল যুদ্ধ করতে করতে কী এক অজানা অভিমানে মধ্যবয়সী কবি চিরকালের জন্য বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েন। আমরা বঞ্চিত হই তাঁর আরও অত্যুঙ্গ অনল সাহিত্য সুধা থেকে।
অজ্ঞাত রোগে বাকরুদ্ধ ও লেখনি শক্তি হারিয়ে অকালে সাহিত্যাকাশ থেকে ঝরে পড়ার আগে কবি এভাবেই তাঁর শেষ শ্রদ্ধাঞ্জলি জ্ঞাপন করেছিলেন কাব্যলক্ষ্মীকেঃ
অঞ্জলি লহ মোর সঙ্গীতে
প্রদীপ শিখা সম,
কাঁপিছে প্রাণ মম
তোমার সুন্দর ভঙ্গিতে।

একাত্তরে আমাদের মহান স্বাধীনতা সংগ্রামে এবং জাতির ক্রান্তিকালে সমস্যা সংকটের সময় সব বাধা অতিক্রমের প্রেরণা হয়ে আছেন কবি নজরুল। আমরা তাঁকে জাতীয় কবির মর্যাদা দিয়েছি। তাঁর ‘চল চল চল’ গানকে রণ সঙ্গীত করেছি। কিন্তু যৌবনের বিদ্রোহবেলায় কিছুতেই কষ্ট ঘুচেনি দুখু মিয়ার।
Nazrul

তাইতো বন্ধু কাজী মোতাহার হোসনকে লেখা এক চিঠিতে কবি নিতান্ত দুঃখের সাথে লিখেন, ‘বন্ধু আমি পেয়েছি- যার সংখ্যা আমি নিজেই করতে পারবো না। এরা সবাই আমার হাসির বন্ধু, গানের বন্ধু। ফুলের সওদার খরিদ্দার এরা। এরা অনেকেই আমার আত্মীয় হয়ে উঠেছে, প্রিয় হয়ে ওঠেনি কেউ। আমার চোখের জলের বাদলা রাতে এরা কেউ এসে হাত ধরেনি’।

দ্রোহ ও প্রেমের কবি কাজী নজরুল ইসলাম প্রেমে পূর্ণ নিমগ্ন হয়ে জীবনে যে নারীকেই আপন করে চেয়েছেন, তাকেই তিনি হারিয়েছেন। প্রেম পূজারী কবির জীবনে তাই নার্গিস, প্রমিলা বা ফজিলাতুন্নেসারা এসেছেন বিরহী চরিত্র হয়েই। প্রমিলা কবিকে ঘরে বাঁধতে পারলেও নার্গিসের জন্যই বিয়োগ ব্যথাতুর প্রেমপূজারী কবি গান রচনা করেনঃ

যারে হাত দিয়ে মালা দিতে পার নাই
কেন মনে রাখ তারে
ভুলে যাও তারে ভুলে যাও একেবারে।

সাম্যের কবি, প্রেমের কবি, বিদ্রোহের কবি, সাম্রাজ্যবাদ ও উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে উচ্চকিত কণ্ঠের কবি কাজী নজরুল ইসলামের মহাপ্রয়াণ দিবসে প্রাণের অশেষ অঞ্জলিতে তাঁর জীবনের শেষ অভিভাষণ স্মরণ করি। যদি আর বাঁশি না বাজে, আমি কবি বলে বলছি না, আমি আপনাদের ভালবাসা পেয়েছিলাম, সেই অধিকারে বলছি, আমায় আপনারা ক্ষমা করবেন। আমায় ভুলে যাবেন। বিশ্বাস করুন, আমি কবি হতে আসিনি। আমি নেতা হতে আসিনি। আমি প্রেম দিতে এসেছিলাম, প্রেম পেতে এসেছিলাম। সে প্রেম পেলাম না বলে আমি এই প্রেমহীন নিরস পৃথিবী থেকে নিরব অভিমানে চিরদিনের জন্য বিদায় নিলাম।

যেদিন আমি চলে যাব, সেদিন হয়ত বা বড় বড় সভা হবে। কত প্রশংসা কত কবিতা বেরুবে হয়ত আমার নামে। দেশপ্রেমী, ত্যাগী, বীর, বিদ্রোহী- বিশেষণের পর বিশেষণ, টেবিল ভেঙে ফেলবে থাপ্পর মেরে, বক্তার পর বক্তা। এই অসুন্দরের শ্রদ্ধা নিবেদনের শ্রাদ্ধ দিনে বন্ধু তুমি যেন যেও না। যদি পার চুপটি করে বসে আমার অলিখিত জীবনের কোন একটি কথা স্মরণ কোর। তোমার ঘরের আঙিনায় বা আশেপাশে যদি একটি ঝরা পায়ে পেষা ফুল পাও, সেইটিকে বুকে চেপে বলো বন্ধু আমি তোমায় পেয়েছি।

তোমাদের পানে চাহিয়া বন্ধু আর আমি জাগিব না,
কোলাহল করি সারা দিনমান কারো ধ্যান ভাঙিব না।
নিশ্চল নিশ্চুপ আপনার মনে পুড়িব একাকী গন্ধবিধুর ধূপ।

ফারদিন ফেরদৌসঃ লেখক ও সাংবাদিক
১২ ভাদ্র ১৪২২/২৭ আগস্ট ২০১৫
https://www.facebook.com/fardeen.ferdous
https://twitter.com/fardeenferdous