ক্যাটেগরিঃ মুক্তমঞ্চ

file (2)

বেয়াইনগরের ডাকসাইটে মন্ত্রীর শহুরে ৮ বিঘা হিন্দু বাড়ি দখল নিয়ে ছলচাতুরির বিরুদ্ধে কথা বলবার সাহস সাংবাদিক সিকদার ছাড়া কারও থাকতে নেই। সে বেয়াই সাহেব যতোই জেলে পুরে রিমান্ডে নিয়ে অভিনব কায়দায় সিকদারকে আদর করবার কথা ভাবুন না কেন?

অনাচারের অথই সমুদ্র থেকে যদি বিচারবিভাগীয় তদন্ত কমিটিও কিছুই খুঁজে না পাবার অক্ষমতা রাখে, সেখানে বেয়াই মন্ত্রীর হিন্দু ভূমি ভক্ষণের আদ্যোপান্ত উদ্ধার করবেন নামকাওয়াস্তে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটির বশংবদ ডিসি এসপিরাই।

কি হবে না হবে এই চিন্তায় আপনার কাজ নাই, আপনার ভাবনার মোড়টা কেবল ঘুরিয়ে দিতে পারলেই কেল্লাফতে। জয় তদন্ত কমিটি! জয় বিয়াইনগরের জয়!

সেই বেয়ানগরের স্থানীয় বেপরোয়া মন্ত্রীর সামনে গভীর প্রশ্ন, মাইনরিটি বিনা দোষে জেলে কেন? এই প্রশ্ন যদি ভারতবর্ষ থেকে উদিত হয় তার জবাব কি হবে একরোখা ব্ল্যাকমেইলার বেয়াই?

এবার তড়িঘড়িতেই বেয়াইয়ের বোধ জাগে। হ্যাঁ তাইতো। তাইতো।
রিমান্ড চাইনা, জেল চাই না, সিকদার তুই বাইরে এসে ফুলের মালা গলায় দিয়ে আমাকে বাঁচারে। ডিবি, পুলিশ, আইন আদালত দিয়ে আদর টাদর করতে আর ভাল্লাগে না। তোর সুপ্রিয়’র মাকে বৌমা বলে সরি প্রকাশ করেছিরে সিকদার।

তিনি সাধু ছিলেন, সাধুই আছেন। ভবিষ্যতে মহাসাধু সাজবেন!
তাই এমনতর সাধু সন্তু কর্তৃক হিন্দুর জমি দখল করে মেধাবী হিন্দু কন্যা তুলির বাপকে ইন্ডিয়ায় ভাগিয়ে দেয়ার মতো কোনো ইতিহাস জন্মই নেয়নি। এসব কথা কলকাতায় হাওয়া বদল করতে যাওয়া আমাদের গেদির বাপ গুহদা নিজে এসেই ঢাকার সংবাদ মাধ্যমে বলে যেতে অবশ্যই বাধ্য।
বেয়াইর হাত লম্বা যে, আসমান সমান।

পাবলিক আর বদ মিডিয়াকে ঠান্ডা করতে এখন দরকার একটা ইস্যু। এবার অন্ধকারে বেয়াই সাহেব যজ্ঞে বসে যান। হাতে পায়ে ধরে হলেও ইস্যুর ঘোরপ্যাঁচে দেবতাকে তুষ্ট করতেই হবে।

সেদিন নিশুত রাতেই বেয়াই সাহেবের যজ্ঞে তুষ্ট ভারতীয় ইস্যুদেব চিল সেজে নারায়ণগঞ্জের হেফাজত পরগণার প্রার্থনালয়ের ওপর দিয়ে বিষ ছড়ায়ে যায়। সেখানকার স্বপ্নবাজ মৌলভীদের ধ্যানে জ্ঞানে হঠাৎ উদিত হয়, বোম্বাই ডেন্সার সানি লিওনি। বড় তাজ্জব ব্যাপার। বারো চান্দের ফজিলত বাদ দিয়ে প্রার্থনালয়ের খুতবাতেও উঠে আসে সানি।
হঠাও সানি, বাঁচাও দেশ।

তাঁকে এই তাওহিদী দেশে নাচতে দেয়া হবে না। যে বিমানবন্দর দিয়ে তার প্রবেশ ঘটবে, সেই বিমানবন্দরেই আক্রমণ করা হবে। সেই এয়ারপোর্টের নাম জিয়া নাকি শাহজালাল তা বিবেচনাতেই রাখা হবে না। ভয়াল চোখের গলার রগ ফুলে যাওয়া মধ্যবয়সী মৌলভীর গলাবাজি।

হেফাজত নগরের প্রার্থনালয়ে শুক্রবারের মধ্যবর্তী আরাধনার খুতবায় বয়ান চলে, সানি লিওনি মুক্ত জীবনের নামে অশ্লীল নৃত্য-গীত ও দেহবল্লবী প্রদর্শন করে থাকে। সানি পুরুষদের সাথে সাদৃশ্য স্থাপনের এবং তাদের সাথে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত। যা আমাদের মতো রক্ষণশীল দেশের জাতীয় আদর্শ, ঐতিহ্য রীতি-নীতি ও সংস্কৃতির সম্পূর্ণ পরিপন্থী। এবং সুস্থ রুচির জন্যে পীড়াদায়ক।
নর্তকী আমদানি করে মসজিদের শহর ঢাকায় কোনো পতিতার অনুষ্ঠান হতে দেওয়া যাবে না। অবিলম্বে এই নাচের অনুষ্ঠান ও পতিতা সানি লিওনির আগমন মুলতবি করতে হবে। অন্যথায় অনুষ্ঠানস্থলে ঢাকার সর্বস্তরের তাওহিদী জনতা কর্তৃক গণপ্রতিরোধসহ পরবর্তী যে কোনো অপ্রীতিকর পরিস্থিতির জন্য সংশ্লিষ্টরা দায়ী থাকবেন।
অতএব ভেঙ্গে দাও, গুড়িয়ে দাও সানিদের আস্তানা।

এত কথার পরেও প্রার্থনালয়ের ধার্মিক সাদাসিধা যুবাদের মধ্যে ধ্বনিত হয় সানি কে?
নাস্তিক নাকি ব্লগার!

উড়ো কথা, গুজব কথা সানি আসবে বাংলাদেশে, এতেই মৌলভীদের অনুভূতির যে বিস্ফোরণ ঘটে, তা নিয়েই দুই সপ্তাহব্যাপী পত্রিকায় হেড লাইন, টিভিতে টকশো, সোশ্যাল মিডিয়ায় ঝড় চলতেই থাকে। সানি আর হেফাজত গপ্পে ঝালাপালা কর্ণকুহরে শেখ সেলিম আর জাসদের বাহাস, কিংবা এই বাহাসে ২০ দল লিডার রিপন বা গয়েশ্বরের দোহারকিটাও ঠিক বাজে না।

আমাদের তথ্যমন্ত্রীর পেইড টিভি চ্যানেল ইস্যু-৫৭ তে নিয়মিত ব্রডকাস্ট হতে থাকা আইসিটি আইনের ৫৭ ধারার এপিঠ ওপিঠ, মানুষের চিন্তার অধিকারের গলা চেপে ধরার কলাকৌশল, শেখ সেলিম, সফিউল্লাহ, জাসদ, র্যা বের কথিত বন্দুক যুদ্ধে মারা যাওয়া আজীবর কিংবা ছাত্রলীগের গুলি খাওয়া পেটের শিশু সুরাইয়া ইস্যু আলোচনা ছাড়িয়ে সেখানে স্থান দখল করে সানি হেফাজত গণ্ডগোল।

তবে মৌলভীদের প্রচারণায় পোয়াবারো সানি আহ্লাদে আটখানা হয়ে এখানকার মৌলভীদের সাথে ডুয়েট পারফর্মেন্সের ইচ্ছাটা গোপন রাখতে ভুলে গেলেও এইদেশে সানির নাচন বিষয়ে তার এজেন্ট বি টিম বা সানির স্বামী ড্যানিয়েল ওয়েবার আসলে কিছুই জানে না।

হেফাজত নগরের খুতবায় কিন্তু কাজের কাজ ঠিকই হয়!
খুতবা শুনে জ্ঞান লাভ করা সাধাসিধা ধার্মিক যুবারাও এক্ষণে এন্ড্রয়েড মোবাইলে বিল্ট ইন থাকা গুগল মামাকে হরদম সানি লিওনের কথা শুধায়ে যায়?
…….
প্রতিহত করার আন্দোলনে সামিল হওয়া সানি লিওনি নাস্তিক নাকি ব্লগার তাতো জানতেই হবে, তাই না!

বহুরূপী ইস্যুদের ভীড়ে এই আখ্যানের প্রারম্ভে যা নিয়ে আলোচনা করেছিলাম, এতোক্ষণে তা আপনাদের নিশ্চয় ভুলাতে পেরেছি।
হিন্দুর জমি জোর জবরদস্তিতে কে গ্রাস করে? কেউ জানে না!
কিসের যেন তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছিল? তা কেউ জানে না!

আমাদের তথ্যমন্ত্রীর নিজস্ব চ্যানেল ইস্যু-৫৭ তে আজ সব উল্টে গিয়ে সানি লিওনি হেফাজত গপ্পোর সাথে মাঝে মাঝেই কবি শামসুর রাহমানের ‘পন্ডশ্রম’ কবিতাটিও অন এয়ার হতে থাকে।

এই নিয়েছে ঐ নিল যাঃ কান নিয়েছে চিলে!,
চিলের পিছে মরছি ঘুরে আমরা সবাই মিলে।
কানের খোঁজে ছুটছি মাঠে, কাটছি সাঁতার বিলে,
আকাশ থেকে চিলটাকে আজ ফেলব পেড়ে ঢিলে।

ফারদিন ফেরদৌসঃ লেখক ও সাংবাদিক
০১ সেপ্টেম্বর ২০১৫
https://www.facebook.com/fardeen.ferdous
https://twitter.com/fardeenferdous