ক্যাটেগরিঃ স্যাটায়ার

 
25_Waterlogging_Bangladesh+Parliament+_01092015_0003

বিশ্ব শিল্পধারায় ফোররিয়ালিজমের প্রথম উদ্ভাবন সেলিম আল দীনের ‘নিমজ্জন’ নাটকের আগুন্তুক বিশ্ব ভ্রমণ শেষে মৃত্যু শয্যায় শায়িত বন্ধুর কাছে আসবে বলে ত্রিনদীর মোহনায় গড়ে উঠা এক ভয়ঙ্কর উদ্ভট শহরে এসে উপস্থিত হয়। আগুন্তুক ট্রেন থেকে স্টেশনে নেমে একে একে দেখতে পায় এক কুলির ঝুলন্ত লাশ। অদ্ভুতদর্শন এক বৃদ্ধ। স্টিমারে হলোকাস্ট। নাড়িভুঁড়ি বেরিয়ে আসা এক রূপসী নারী যাকে যতবার কবরে শোয়ানো হয় ততবার সে মৃত্যু থেকে উঠে বসে। আগুন্তুক পৃথিবীর তাবৎ গণহত্যা, লুন্ঠন, ধর্ষণ, অনাচার, বিস্ফোরণ দেখতে দেখতে সবশেষে এক নিমজ্জিত নগরীকে পিঠপিছন রেখে পশ্চিমমুখা হাঁটুগেড়ে বসে স্তোত্র পাঠ করেঃ
চলো মানুষ। যুগযুগান্তরের দিগন্তরেখা ভেদ করো। সে যাত্রার শেষ নাই। সীমা নাই।
আলোহীন উল্কাপিন্ডের গায়ে সঙ্গীতের সুর লিখে দাও রাষ্ট্রহীন দেশহীন কালহীনতার সর্বমানবের মিলিত উৎসবের ভাষায়।

অন্যদিকে সুকুমার রায়ের অবাক জলপান নাটকের পথিক বড্ড তৃষ্ণায় কাতর হয়ে ঝুড়িওয়ালাকে জিজ্ঞাসা করেন, ‘মশাই, একটু জল পাই কোথায়, বলতে পারেন?’ উত্তরদাতা চটজলদি উত্তর দেন, ‘জলপাই এখন কোথায় পাবেন? এ তো জলপাইয়ের সময় নয়। কাঁচা আম নিতে চান দিতে পারি…’
না না, আমি তা বলিনি‒
না, কাঁচা আম আপনি বলেননি, কিন্তু জলপাই চাচ্ছিলেন কিনা, তা ত আর এখন পাওয়া যাবে না, তাই বলছিলুম‒
না হে আমি জলপাই চাচ্ছিনে‒
চাচ্ছেন না ত ‘কোথায় পাব’ ‘কোথায় পাব’ কচ্ছেন কেন? খামকা এরকম করবার মানে কি?
আপনি ভুল বুঝেছেন‒ আমি জল চাচ্ছিলাম‒
জল চাচ্ছেন তো ‘জল’ বললেই হয়‒ ‘জলপাই’ বলবার দরকার কি? জল আর জলপাই কি এক হল? আলু আর আলুবোখরা কি সমান? মাছও যা মাছরাঙাও তাই? বরকে কি আপনি বরকন্দাজ বলেন? চাল কিনতে এসে চালতার খোঁজ করেন?

বোঝার ভুলে ঠাঠা রোদে একবুক তৃষ্ণা নিয়ে পথিককে রাস্তায় ঘুরতে হয় পানির জন্য। তৃষ্ণার্ত পথিককে পানি পান করতে শেষ অবধি নানা বিড়ম্বনা পোহাতে হয়েছিল সেদিন।

সেলিম আল দীনের সেই বিশ্বভ্রমণকারী আগন্তুক বা সুকুমার রায়ের পথিক মনস্থির করলো, পুরাকালের প্রাচ্যের ভেনিস আর একালের আটলান্টিক সাগর খ্যাত আজকের ঢাকা শহরে আসবে পরিভ্রমণে!

যেই কথা, সেই কাজ।

আগন্তুক ও পথিকের দেখা হয়ে গেল শেরে বাংলা নগরের জাতীয় সংসদ ভবনের সামনে।
পৃথিবীর হাজারো নগরের নিমজ্জন দেখবার সাক্ষী আগন্তুক পুরো সংসদ ভবন এলাকা জলের নীচে দেখে কিঞ্চিৎ অবাক হলো। এই জল নিয়ে ট্রাজিক জল কাব্য লিখবার সাধ হলো তাঁর। আহা মানুষেরা কী কষ্ট সয়ে হাঁটু জল ভেঙ্গে, নর্দমার নোংরা মাখামাখি করে, ম্যানহোলের ভয়কে জয় করে, ধনী, গরিব, নারী, পুরুষ, মৌলবাদী, সহজিয়া, আবাল, বৃদ্ধ, বণিতা এক কাতারে হয়ে যার যার গন্তব্যে পৌছবার প্রাণান্ত চেষ্টা করে যাচ্ছে। হায় সেলিম আল দীন তুমি বাপু সেকালেই কেন আজকের এই জলকাদার রাজধানীর অশেষ দুর্দশায় আমাকে এনে ফেললে না? রাজনৈতিক মতবাদের জন্য নির্যাতনের পর মেরুদন্ডে পেরেক ঠুকে দেয়া বন্ধুর চেয়েও ঢাকার অত্যাধুনিক মেয়রের মুখখানা দেখবার বড় সাধ।
আহা! ঢাকাবাসীর জন্য না জানি কত দরদই না তাদের উছলে পড়ছে।
কেঁদেকেটে তাঁরা আকুল হচ্ছেন।

শহরের বুক জুড়ে আসমুদ্র জলদর্শনে আগুন্তুকের চেয়েও বেশি বিস্ময়াভিভূত হলো অবাক জলপানের তৃষ্ণার্ত পথিক। জলের খুঁজে এখানে না মরতে এসে সেকালে কী ঝক্কি ঝামেলাই না পোহাতে হয়েছিল তাঁকে। এখানে আসলে অন্তত কোনো বাজে বকা বুড়ো ভাঙ্গা জানালায় উঁকি দিয়ে তাঁকে বিষ্টির জল, ডাবের জল, নাকের জল, চোখের জল, জিবের জল, হুঁকোর জল, ফটিক জল, রোদে ঘেমে জল, আহ্লাদে গলে জল, গায়ের রক্ত জল প্রভৃতি চেনানোর বাজে মতলব আটতে পারতো না।

রাস্তায় জল, গলির মোড়ে জল, ফুটপাতে জল, বাড়িতে জল, গাড়িতে জল, সাইকেল, ভ্যান, রিকশায় জল, জলে জলান্তর। আহা! হায় সুকুমার রায় তুমি কেন বাপু সেকালে এই পথিককে এখনকার রাজধানী ঢাকার শহরে এনে ফেললে না। তাহলে অন্তত আমাকে দিয়ে জলের এক্সপেরিমেন্টের নামে তালকানা কেউ খামোখা মাস্টারি ফলাতে পারতো না!

24_Waterlogging_Dhanmondi+27_01092015_0006

জলময় সাম্যবাদী ঢাকা শহরে পানসে দুর্ভোগচিত্র দেখতে দেখতে থই থই রাজপথে হাত ধরাধরি করে এগিয়ে চলে আগন্তুক ও পথিক।
জলমগ্ন মানুষের চেহারায় বিরক্তি, হতাশা, সংশয়। রাস্তায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা স্থির হয়ে আছে ‘অচলমান’ যানবাহন। রিকশার অগণন জট। জীবনের হিসাব মিলানোর চিন্তায় কুঞ্চিত কপালের স্থবির মানুষের মুখ। জলে সয়লাব ঢাকার তল্লাবাগ, শুক্রাবাদ, গ্রিন রোড, ইন্দিরা রোড, পরীবাগ, বাংলামোটর, কারওয়ান বাজার, গার্ডেন রোড, সোনারগাঁও হোটেল এলাকা দিয়ে অশেষ যন্ত্রণা সয়ে অনেকটা সময় পার করে তাঁরা দুইজন চলে আসে জলে তলিয়ে যাওয়া মধ্য ঢাকা বা হাতিরঝিল এলাকায়। সেখানে কয়েক কোটি টাকা খরচ করে বানানো ওয়াটার রেগুলেটর গেট পরিষ্কার করছিল সিটি ও ওয়াসার কর্মীরা। আর শুকনো জায়গায় দাঁড়িয়ে সেই কর্ম কালো চশমার ভিতর দিয়ে দেখছিলেন আধুনিক নগরের স্বপ্নপুরুষ আমাদের ঢাকা উত্তরের সিটি মেয়র আনিসুল হক।

কড়া মেকাপে অদ্ভুত দর্শন নাট্যচরিত্র আগন্তুক ও পথিককে দেখে মেয়র মোটেও অবাক হলেন না!
যিনি ঢাকার শহরে এতো জল দেখে ঘাবড়ে না গিয়ে বরং শহরে কীভাবে জলবিদ্যুৎ উৎপাদন কাম মৎস চাষ
কাম নৌরুট চালু করার স্বপ্ন দেখেন, তিনি কিছুতেই কী অবাক হওয়ার মানুষ?

স্যার আমি এসেছিলাম ঢাকার নিমজ্জন দেখতে, মানে আর কতোটা জলে নামলে আসলে আপনারা রাজধানীকে নিমজ্জিত শহর ঘোষণা করবেন? চোখ পিটপিট করে মেয়রের দিকে চকিতে প্রশ্ন ছুরে দেয় আগন্তুক।

স্যার আমি এসেছিলাম আসলে জলের খুঁজে। প্রচণ্ড তৃষ্ণা আমার। এই ধরেন বঙ্গোপসাগরের সব জল যেন এক নিশ্বাসে খেয়ে ফেলতে পারি। এতো তৃষ্ণা আমার। কিন্তু ঢাকা শহরের এতো জলেও আমার ঠিক মন ভরছে না। শৌচকাজে ব্যবহারের জন্য একটু জল পাই কোথায় বলতে পারেন? আগন্তুকের প্রশ্ন শেষ হওয়ার সাথেই সাথেই ক্যাচ করে মাথা ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে মেয়রকে প্রশ্ন করে পথিক।

দেখুন পথিক, দেশের আইন প্রণেতারা সভা করে শেরে বাংলা নগরের সংসদে।
বৃষ্টি জলে মহাপ্রভু ধুয়ে দিলেন সেখানকার এলিট শৌচাগার।
সেই ধুয়া জলেও আপনার অরুচি? এযে অযাচার!
উত্তর দিলেন মেয়র।

আর এইযে আগন্তুক সাহেব, রাজধানীর জলাবদ্ধতা নিরসনে ৩০৩ কোটি বরাদ্ধ ছিল। এর সবই খরচা হয়েছে। কিন্তু অবুঝ পাবলিক কিনা বাদামের খোসা ফেলে সমস্ত পয়োনিষ্কাষণ বন্ধ করে দিয়েছে। তাঁর মানে হলো, বাদামের খোসায় খেল ৩০৩ কোটি টাকা।
এখন নিমজ্জিত শহর ঘোষণার চেয়েও জরুরী বাদামের খোসার সহজ নিষ্কাষণ।

আগন্তুক ও পথিকের সমস্বরে প্রতিউত্তরঃ
বুঝেছি মেয়র সাহেব, বাদামের খাতে আপনার আরও ৩০৩ কোটি টাকা চাই!
কিন্তু আমরা নিমজ্জনও চাইনা, জলও চাই না!
ভীষণ ক্ষুধার্ত! তাই আমরা বরং এক ঠুঙ্গা বাদাম চাই।
সাথে আপনার বুক পকেটটা বাদামের খোসা ফেলবার ডাস্টবিন হিসাবে ব্যবহার করতে চাই।

ফারদিন ফেরদৌসঃ লেখক ও সাংবাদিক
০৩ সেপ্টেম্বর ২০১৫
https://www.facebook.com/fardeen.ferdous
https://twitter.com/fardeenferdous