ক্যাটেগরিঃ মানবাধিকার

 
file (2)

এই সময় পুঁজিবাদ, ধনতন্ত্র বা সাম্রাজ্যবাদ এমন এক উন্নাসিক পর্যায়ে উপনীত হয়েছে যে,
যেখানে হরহামেশা হেলাফেলায় ভেসে বরবাদ হয়ে যাচ্ছে মানবতা।
লোভ, ক্ষমতা আর ব্যক্তিস্বার্থের টানাপোড়েনে মানবীয় লাশের কফিনে অবিরাম জ্বলছে বেদনাদায়ী অগ্নিচিতা।
এমন অবস্থায় পতিত হয়ে আমার, আপনার বা সাধারণ্যের বিবেকের হিসাব মিলবার উপায়ই থাকছে না। এক জটিল প্রশ্নই আমাদের কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে এই নীল পৃথিবীতে কি আদৌ কোনো মানুষ আছে? নাকি এরা সবাই কোনো এক কালো রঙ্গা ভিনগ্রহের অসভ্য ইতরসদৃশ অপাংক্তেয় অভিবাসী!
কী লজ্জা! কী লজ্জা! কী অপার বেদনা!

উন্নাসিক সেই পুঁজিবাদের সর্বশেষ তোলপাড় করা বলি তুরস্কের তিন বছরের শিশু আয়লান কুর্দি। যে শিশুটি আসলে নিজের প্রাণ দানের মাধ্যমে আক্ষরিক অর্থেই মানবতাকে ভাসিয়ে দিয়েছে সাগরতীরে। অথবা মানবীয় বোধকেই ডুবিয়ে দিয়েছে অতল সাগরের গহবরে। আমরা কি বেঁচে আছি? বরং আমরা সবাই আজ আয়লানের মতোই মৃতবৎ!

সম্প্রতি সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া একটি ছবিতে দেখা যাচ্ছে, তুরস্কের অন্যতম অবকাশ যাপন কেন্দ্র বোদরামের সৈকতে মুখ মাটির দিকে দিয়ে পড়ে আছে লাল টি-শার্ট আর নীল প্যান্ট পরা একটি শিশু।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী তিন বছর বয়সের এ শিশুটিই আয়লান কুর্দি। সিরিয়ার গৃহযুদ্ধ থেকে বাঁচতে সেদেশের হাজার হাজার মানুষ দেশ ছেড়ে এখন ইউরোপের দিকে ছুটছে৷ এক্ষেত্রে তারা প্রথমে নৌকা করে সাগর পাড়ি দিয়ে তুরস্ক, কিংবা ইটালি ও গ্রিসে পৌঁছাচ্ছে।
এমনই এক নৌকা গ্রিস ও তুরস্কের মাঝামাঝি সাগরে ডুবে গেলে ১২ জন সিরীয় নাগরিকের মৃত্যু হয়। ছোট্ট শিশুটি তাদেরই একজন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
file (1)

এই একটি মাত্র ছবি বিশ্বের বিবেক যেটুকু অবশিষ্ট আছে তাকেই নাড়িয়ে দিয়ে গেছে প্রচণ্ডভাবে।
যেসব পশ্চিমা বিশ্ব মোড়লরা নানা বাহানা ও ছলচাতুরীর আশ্রয়ে সিরিয়া বা তুরষ্কে স্রেফ নিজেদের ফায়দার দুগ্ধ থেকে ননি তুলবার মানসে দিনের পর দিন গৃহযুদ্ধের আগুনে ঘি ঢেলে যায় সেই কথিত ইউরোপীয় মোড়লদের মানাবাধিকার নীতি বা শরণার্থী নীতিকে প্রশ্নের মুখে ঠেলে দিয়েছে আয়লানের অতি অসহনীয় নীল মরদেহটি।
এই মর্মন্তুদ ঘটনায় পুঁজিবাদ বা ধনতন্ত্রের ছোঁয়াচ বাঁচিয়ে কেবলমাত্র এখনও বিপ্লবী মানুষ যারা, সেই তাদের মধ্যে বিশ্বব্যাপী প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে।

যারা দেশে দেশে যুদ্ধের নীলনকশা বানায়, অস্ত্রে শান দেয়, মানুষের ওপর অসহায়ত্ব চাপিয়ে দেয়;
সেইসব সাম্রাজ্যবাদী যারা আয়লানের মতো নিষ্কলুষ, অপাপবিদ্ধ ও অবুঝ শিশুদের শরণার্থী হতে বাধ্য করে; তাদেরকে নিন্দা ও ঘৃণায় ধুয়ে দিয়েছেন টুইটার ও ফেসবুকাররা।

#KiyiyaVuranInsanlik বা মানবতা ভেসে গেল সাগরতীরে হ্যাশট্যাগ ব্যবহার করে প্রতিবাদে মুখর হয়েছে বিশ্ব মানুষেরা।
তারা বলছেন, আমরা দুঃখিত। মানবতা তোমাকে পরাজিত করেছে। বাকি বিশ্বের কাছে: এই হলো তোমাদের ‘অনাকাঙিক্ষত অভিবাসী’।
সব শিশু একইভাবে পৃথিবীতে জন্ম নিলেও রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের কারণে সবাই সমান সুযোগ-সুবিধা পায় না। মানবতা ধুয়ে গেছে সাগরের তীরে। বিশ্বের উচিৎ কাঁদা। কিন্তু এখনও তা হয়নি।
পুঁজিবাদীদের উদ্দেশ্য করে কেউ কেউ বলছেন, তোমাদের এই একচক্ষু মানবতা আমাদের লজ্জিত করে।
তোমরা কি বিবেকের কাঠগড়ায় দাঁড়াও না কখনো?”
এমনকি পুঁজিবাদী যুক্তরাজ্যের মিডিয়া ডেইলি মেইল লিখেছে, ‘মানবিক বিপর্যয়ের ক্ষুদ্রতম বলি’; ইতালির ‘লা রিপাবলিকা’ পত্রিকায় ছবিটির শিরোনাম ছিল, ‘এক ছবিতে স্তব্ধ বিশ্ব’; দ্য অস্ট্রেলিয়ান শিরোনাম করেছে, ‘অভিবাসী সংকটের ট্রাজিক প্রতীক’।

যুদ্ধ বিধ্বস্ততা নিয়ে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম আখ্যানকাব্য ওয়ার এন্ড পীচে লেখক লিও তলস্তয় বলেছেন, আমরা জানি যে, আমরা আসলে কিছুই জানি না। আর এটাই মানুষের সর্বোচ্চ প্রজ্ঞা।
তিনি আরও বলেন, সবাই যদি নিজের অসদাচারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করত, তবে পৃথিবীতেই কোনো যুদ্ধ থাকত না।
কিন্তু আজকের ইউরোপ আমেরিকার ধনতান্ত্রিকরা নিজেদের প্রজ্ঞাকে পতিত করে, কেবলমাত্র নিজেরাই এককভাবে বুঝদার বনে যাচ্ছে। নিজেদের সমস্যার বিরুদ্ধে তারা যুদ্ধ না করতে পেরে, সারা পৃথিবীব্যাপী গণ্ডগোল পাকিয়ে রাখছে। আর সেই গন্ডগোলের পাতা ফাঁদে ব্যাপকহারে পা দিচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের নির্বোধ মুসলিমরাই।

খুব স্বাভাবিকভাবেই সেই গণ্ডগোলের ধারাবাহিকতা রক্ষায় আমাদের দেশের খালেদা হাসিনার চেয়েও জামায়াত হেফাজত বা আনসারুল্লাহরাই পুঁজিবাদী আমেরিকার অতি আপন। ঘোলা পানিতে মাছ শিকারেই যাদের প্রধান প্রতীতি তাদের মুখে গণতন্ত্রের গলাবাজি আসলে মস্ত বড় ভেক। যে কারণে আমাদের দেশ তথা এতদাঞ্চলে সুশাসন কখনোই স্থিতাবস্তা পায় না। খালেদাকে নির্ভর করতে হয় ২১ আগস্টের গ্রেণেড হামলায়,
আর হাসিনাকে নির্ভর করতে হয় ৫ জানুয়ারীর একপাক্ষিক নির্বাচন নামের ফানুসের ওপর। দেশের প্রধানমন্ত্রীকে নিরন্তর যুদ্ধ করে যেতে হয় ধর্মানুভূতি, নাস্তিক অনুভূতি বা বেয়াই অনুভূতির মতো নানামুখী ধুরন্ধর প্রতিক্রিয়াশীলতা বিরুদ্ধে।
এর ফলে অশান্তির পারদ যেখানে চরমভাবাপন্ন হয়ে উঠানামা করে, সেখানে বিকৃত মস্তিষ্কদের রোষানলে পড়ে বেঘোরে প্রাণ হারায় রাজন বা রাকিবরা। এইসবই আসলে ধনতান্ত্রিকদের মঞ্চায়িত নাটকের বিদঘুটে জের। যা আয়লান কুর্দির প্রাণপাতেরই ভিন্নতর ধারাবাহিকতা।

file

আমাদের মতো ভূ-রাজনৈতিক অবস্থানের দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ কোনো রাষ্ট্র সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্র যদি সাফাই সনদ দেয় আপনার কোনো সম্ভাবনা নাই তবে আপনি ঠিক লাইনেই আছেন। আর যদি উনাদের জরিপ সংস্থা বলে আপনি ভালো আছেন, আপনার সম্ভাবনা শতভাগ, তবে জানবেন আপনার কপালেই শনি আছে। সেই এ্যাবোটাবাদের লাদেনরাই আবার আপনারই দেশে বেঁচেবর্তে উঠে সাদ্দাম বুশের ফিকশন দেখাবে। আর আপনার দেশের নিরীহ আয়লান কুর্দিরা বেঘোরে মারা পড়বে। কারণ এই কুর্র্দিরাই যে, আমেরিকা ইউরোপের জীয়নকাঠি।

এইসব পুঁজিবাদীরা লিও তলস্তয়ের মতো করে কখনও বলবে না,
We are asleep until we fall in Love!
কারণ মানুষে মানুষে ভালোবাসা বা সাম্যে তাদের অপার ক্ষতি। আর আইএস, আলকায়েদা বা বোকো হারামের মতো জঙ্গিভাবাপন্ন অসহ্য হিংসাতেই তাদের সমূহ লাভ। আপনি যদি যুদ্ধে নিপতিতই না হলেন, তবে ওদের বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র আসলে কোথায় বিক্রি হবে, বলতে পারেন?

এই পাতানো সভ্যতার সংকটে একেকজন আয়লান কুর্দি আসলে ধনতান্ত্রিকদের অর্থলাভ বা সক্ষমতা অর্জনের ঘুটি। কেবল ঘৃণার গণবিপ্লবই পারে এইসব জঘন্য অর্থলোলুপদের চুপসে দিতে। কিন্তু আমাদের যে, একজন চে গুয়েভারার মতো অসম্ভব সাহসী দুর্দান্ত বিপ্লবীর বড়ই অভাব।

আমাদের কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সেই ১৮৯৪ সালেই অনুধাবন করেছিলেন সাম্রাজ্যবাদী পাশ্চাত্য নয় স্রেফ প্রাচ্যভাবনাতেই সভ্যতার সংকটের মুক্তি। সভ্যতার সংকট প্রবন্ধে তিনি যথার্থ বলেন, জীবনান্তিকে দাঁড়িয়ে পাশ্চাত্য সভ্যতাকে সভ্যতা বলা যায় কি-না, জেগেছে সেই সংশয়। ‘ল অ্যান্ড অর্ডার’, অর্থাৎ আইন-শৃংখলার নামে পাশ্চাত্য সভ্যতার ধারকেরা ভারতীয়দের ওপর শুধু শাসনদণ্ডই ঘুরিয়েছে। কেননা এই শক্তি শুধু ভারতীয়দের দেখিয়েছে তার ‘শক্তিরূপ’, ‘মুক্তিরূপ’ দেখাতে পারেনি। শুধু ভারতে নয়, এই শক্তি ‘সাম্রাজ্যমদমত্ততায়’ পৃথিবীর অনেক দেশেই তাদের এই শক্তি প্রদর্শন করে জাতিগত ‘নিষ্পেষণী যন্ত্রের শাসন’ চালিয়েছে। জাতিগত এই নিষ্পেষণের বিপরীতে মানবসভ্যতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে ‘মানুষে মানুষে সম্বন্ধ’ স্থাপন করা, আর এই সম্বন্ধই হচ্ছে ‘যথার্থ সভ্যতা’।

একারণেই এই প্রবন্ধের শেষে তিনি বলতে পেরেছেন পশ্চিমা সভ্যতা নয়, পুব বা প্রাচ্যই হয়ে উঠেবে সভ্যতার প্রকৃত অভ্যুদয় ও বিকাশের কেন্দ্রস্থল, ‘মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারানো পাপ, সে বিশ্বাস শেষ পর্যন্ত রক্ষা করব। আশা করব, মহাপ্রলয়ের পরে বৈরাগ্যের মেঘমুক্ত আকাশে ইতিহাসের একটি নির্মল আত্মপ্রকাশ হয়তো আরম্ভ হবে এই পূর্বাচলের সূর্যোদয়ের দিগন্ত থেকে।’
কিন্তু আমাদের মনে রাখা দরকার, আফ্রিকা বা মধ্যপ্রাচ্যের বিনাশ সাধন করে আবারও গভীর দৃঢ়তায় আমাদের এই প্রাচ্যের দিকেই বিষ নজর নিবদ্ধ করেছে সাম্রাজ্যবাদীরা।

কাজেই সেই লাল টি-শার্ট আর নীল প্যান্ট পরা নিঃশেষে প্রাণ দান করা আয়লান কুর্দিরা আমাদের সমুদ্রতীরেও মানবতা ভাসিয়ে দেয়ার অপেক্ষায় প্রহর গুণছে। অথবা মানবতা ভাসিয়ে চলছে ইতোমধ্যে।

বিশ্ব মোড়লদের চাপিয়ে দেয়া নীতিতে আমরা নিজের দেশেই আয়লান কুর্দির মতো পরবাসী। তাই আমরা যুগযুগান্তরের অসহায় অভিবাসীরা সাম্রাজ্যবাদী সেইসব অস্পৃশ্য ধনলিপ্সুদের অভিশাপ দেই দু’টি শব্দ এদিক সেদিক করে কবি শামসুর রাহমানের ভাষায়ঃ
আজ এখানে দাঁড়িয়ে এই রক্ত গোধূলিতে
অভিশাপ দিচ্ছি।
আমাদের বুকের ভেতর যারা ভয়ানক কৃষ্ঞপক্ষ
দিতে চায় সেঁটে।

ফারদিন ফেরদৌসঃ লেখক ও সাংবাদিক
০৫ সেপ্টেম্বর ২০১৫
https://www.facebook.com/fardeen.ferdous
https://twitter.com/fardeenferdous