ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস

 
15_Jahangirnagar+University_Protest_080915_0002

মানুষের সমতায় বিশ্বাসী এই আমি মাঝে মাঝেই নারীবাদী সেজে বউয়ের সাথে ভাব মারি। বউয়ের কাছ থেকে আনন্দ কাড়বার এ এক মোক্ষম দাওয়াই বটে। নারীর পক্ষে যখন আমি পুরোটা ভিড়ে যাই, বউ আহ্লাদে গদগদ হয়। এতে ভালোবাসায় বাড়তি প্রণোদনাও জুটে। কিন্তু যেইনা আমার ভাব ছুটে দৌড়ে পালায়, অমনি বউয়ের রৌদ্র মূর্তি, এই তুমি না নারীবাদী? সব তোমার ফাঁকাবুলি, নাকি!

বাংলাদেশে যেদিন অষ্টমবারের মতো বেতন বাড়ল, সেদিন কলেজে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের শিক্ষক আমার এই বউয়ের সাথে ডিম আগে না মুরগী আগের মতো ঠুনকো বিষয় নিয়ে তুমুল ঝগড়া বেঁধে গেল। আমি বলছিলাম, আজ থেকে সংসারের সব খরচ তুমি চালাবে, আর আমি শুধু টাকা জমাব। ও বলল, সেটা যখন বেশি বেতন পাই তখন দেখা যাবে। আমি গু ধরলাম, না আজ থেকেই এটা শুরু। সরকার তোমাকে এরিয়া বিলসহ দিবে, আমিতো এরিয়া চাইনি। ও বলল, এসব আলাপ এখন একদম হবে না।

এক কথায় দুই কথায় মেজাজ মর্জি যখন চরমে, ঠিক সেই মুহূর্তে ওকে ‘ফালতু মেয়ে’, ‘ঝগড়াটে মহিলা’ বলে গালি-গালাজ করে বসলাম। পরক্ষণেই ভাবলাম, হায় হায় নারীর এই অসম্মান বুঝি ওর মনের বাজারে একদম বিকাবে না। আজ আমার ঘরের চাঁদ অস্তাচলে, তাই শুক্লপক্ষই আমার সারথি। কিন্তু ঘটনা ঘটল উল্টো, এতো শক্তপোক্ত গালি খেয়েও ও রীতিমতো ফ্রিজ হয়ে গেল। কেন যেন মেজাজটা বিগড়াল না। গালি-গালাজ করতে গিয়ে আমার স্বর যখন সপ্তমে, বউ তখন শান্তভাবে আমাকে জিজ্ঞাসা করল, আমি কি তোমাকে একটা প্রশ্ন করতে পারি? আমি আরও তেতে গিয়ে বললাম, করো, কি জিজ্ঞাসা করবে?

বউ বলল, ধরো তোমার কোন জিনিস তুমি কাউকে দিতে চাচ্ছো, কিন্তু সে যদি না নেয় তাহলে জিনিসগুলো কার কাছে থাকবে? আমি উত্তেজিত হয়ে জবাব দিলাম, এত সহজ বিষয়, এটাও তুমি বুঝ না? আমার কোন জিনিস আমি কাউকে দিতে চাচ্ছি কিন্তু যদি সে না নেয় তাহলে সেগুলো আমারই থাকবে। বউ আবার জিজ্ঞাসা করল, তোমার জিনিস তুমি যাকে দিতে চাচ্ছো সে না নিলে তা তোমারই থাকবে?
আমি জবাব দিলাম, হ্যাঁ, আমার ই থাকবে। এবার গভীরভাবে বউ বলল, তাহলে এতক্ষণ ধরে তুমি আমাকে যা(গালি-গালাজ) উপহার দিলে আমি তার কিছুই নিলাম না!

ভেবেছিলাম কান ধরে বউয়ের কাছে সরি না বললে এবার চলবেই না। মন জোছনায় অঙ্গ ভিজিয়ে গল্প করা আর বুঝি হবে না। আমার রাতের ঘুম বা দিনের কাজও হারাম হবে এবার। কিন্তু ওর বদান্যতায় এসবের বালাই থাকল না। এমন মনের মানুষ নিয়ে ভাবলাম আহা, বউয়ের মর্যাদা আমি না বুঝলে কি হবে, আমার এমন শিক্ষক বউয়ের জন্যই বুঝি কবি কাজী কাদের নেওয়াজ ‘শিক্ষকের মর্যাদা’ কবিতাখানি লিখেছিলেন।
বাদশাহ আলমগীর-
কুমারে তাঁহার পড়াইত এক মৌলভী দিল্লির।
একদা প্রভাতে গিয়া
দেখেন বাদশাহ- শাহজাদা এক পাত্র হস্তে নিয়া
ঢালিতেছে বারি গুরুর চরণে
পুলকিত হৃদে আনত-নয়নে,
শিক্ষক শুধু নিজ হাত দিয়া নিজেরি পায়ের ধুলি
ধুয়ে মুছে সব করিছেন সাফ্ সঞ্চারি অঙ্গুলি।
…….
আজ হতে চির-উন্নত হল শিক্ষাগুরুর শির,
সত্যই তুমি মহান উদার বাদশাহ্ আলমগীর।
=======
মাফ করবেন বাদশাহ আলমগীর। আমার শিক্ষক বউ নিয়ে ভুল ভাবনার জন্য।

কিন্তু আমাদের দেশের ৩৭টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের আত্মমর্যাদা নামের সংবেদনশীল বস্তুটি কিন্তু অন্য ধাতুতে গড়া। অর্থমন্ত্রী যদি নিজের বয়সদোষ বা বাচালতার ভ্রান্তিতে এই শিক্ষকদের ‘জ্ঞানের অভাবী’ বলে গালি দেন, তবে মাফ না চাওয়া পর্যন্ত ঐ বর্ষিয়ান মন্ত্রীর রেহাই থাকে না। ২৪ ঘণ্টার আলটিমেটাম আসে, লাগাতার কর্মবিরতি চলে। মানুষের মর্যাদার অবনমনের সাথে পাল্লা দিয়ে চলে অর্থমন্ত্রীর এমনতর ভ্রান্তিবিলাস। গেল বছর নভেম্বর মাসেও মন্ত্রী বলেন, কাজ দ্রুত করায় যদি কেউ কাউকে উপহার হিসেবে কিছু দেয় তবে তা অবৈধ নয়। উন্নত দেশে এটার বৈধতা দেওয়া হয়েছে ভিন্ন নামে। তারা এটার নাম দিয়েছে স্পিড মানি। অর্থাৎ যে টাকা কোনো কাজে গতি সঞ্চার করে। ঘুষ গ্রহণ বা প্রদানে এমন করে প্রত্যক্ষভাবে কোনো মন্ত্রীর ইন্ধন আর কোথায় হয়েছে কে জানে?

এই মন্ত্রীই আবার চাপে পড়ে ঠেলাকে বাবাজি বলে নির্দ্বিধায় বলে যেতে পারেন, ‘আমি মনে করি, এটা অত্যন্ত অপমানকর বক্তব্য ছিল। তাতে অবশ্যই মানহানি হয়েছে। এ জন্য আমি দুঃখিত। আমি এই বক্তব্য প্রত্যাহার করছি’।
আমাদের কথা হলো, মন্ত্রী এমন কথা বলবেন কেন, যার জন্য বিনয়াবনত হয়ে দুঃখ প্রকাশ করতে হয়? বিপরীতভাবে আমাদের মানমর্যাদার পলতেটাই বা এতো নিভু নিভু কেন যে, সামান্য ঝড়ের আভাসেই তা হাওয়ায় মিলায়ে যায়!

12_Literacy+Day_080915_0001 (1)

এক বিস্ময়কর জাদু বাস্তবতার মধ্য দিয়ে আমরা এগিয়ে চলছি। এই সরকার নামের সংস্থাটিই পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক বানায়, তাদেরকে সাদা নীলের বর্ণবিভেদে গিনিপিগ বা দাসে রূপান্তর করে নিজেদের বশে রাখে। আবার সেই সংস্থাটিই বিশ্ববিদ্যালয়ে করাপশন প্র্যাকটিচ হচ্ছে বলে গলাবাজি করে। আপনি আচরি ধর্ম অপরে শিখাও বা কাকের মাংস কাকে খায়না বলে কথাগুলো সমাজে প্রচলিত আছে। কিন্তু কেউ এসব কথার ধার ধারে বলে মনে হয় না।

সমাজের সবচে’ শিক্ষিত জনগোষ্ঠী হলো শিক্ষক। আমাদের সন্তানেরা মানুষ হয়ে উঠে তাঁদের ছত্রছায়ায় থেকেই। আজকে যে মন্ত্রী বা আমলারা নিজের সুবিধা বিবেচনায় বেতন কাঠামো তৈরি করে শিক্ষকদের হেয় করবার প্রয়াসী, সেই তারাও এসব শিক্ষকের কাছেই পড়াশোনা করে বড় হয়েছেন। আবার নিজের সন্তানকেও ঐ শিক্ষকের কাছেই পড়তে পাঠাবেন। কিন্তু আমলা বা মন্ত্রীরা বড় হয়েই তাঁর শিকড়কে ভুলে যায়। ফলে শিক্ষক বা শিক্ষা নামের প্রতিষ্ঠানটি চিরকালের অবহেলার যাতাকলেই পিষ্ট হতে থাকে।
কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে, আন্দোলন বা বর্জনের মধ্য দিয়ে শিক্ষকদেরকে নিজেদের অবনমিত মর্যাদা ফিরিয়ে আনবার প্রয়াসী হতে হবে। আমরাতো ভাবি আমাদের শিক্ষকরা ত্যাগের সর্বোচ্চ উদাহরণ, বিনয়ের অবতার। তাঁরা অল্পতেই তুষ্ট। তাঁরা শুধু শিক্ষার্থীকে তাঁর সমস্ত জ্ঞান ও প্রজ্ঞা বিলিয়ে দেন, বিনিময়ে নেন না কিছুই। আমার ভাবনা ভুল হতে পারে, তবে অধ্যাপক আহমদ শরীফ, কবীর চৌধুরী, সরদার ফজলুল করিম, সেলিম আল দীন বা এমিরিটাস অধ্যাপক আনিসুজ্জামান স্যারদের নিজেদের বৈতনিক বা অবৈতনিক মান মর্যাদা নিয়ে কোনোকালেই আন্দোলন করতে শুনিনিতো, তাই মনে হলো, শিক্ষকরা দেন, বিনিময়ে নেন না কিছুই।

কাজেই বেতন স্কেল দিয়ে শিক্ষকের মান মর্যাদা নির্ধারিত হবে, এই কথা একজন ছাত্র হিসেবে বিশ্বাস করি না। বিশ্বাস করতে চাইও না।
আমি আমার শিক্ষককে সর্বদা মাথায় তুলেই রাখি। আমার কাছে পিতৃস্থানীয় শিক্ষকরা সদাসর্বদা অত্যুচ্চ মর্যাদাবান বলেই সুবিধা অসুবিধাবাদের মধ্য দিয়ে অতিরিক্ত সম্মান বা সমীহ আদায়ের জরুরত দেখি না।

বয়সের ভারে ন্যুব্জ অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত তাঁর চিন্তার বৈকল্যে যেকোনো ভিন্নমতকেই রাবিশ বা বোগাস বলে অবমূল্যায়িত করতে পারেন। কিন্তু আমার কাছে আমার শিক্ষকেরা শিরদাঁড়া ঋজু ও মাথা উঁচু রাখা দার্শনিক রাজা। যাঁদের মহানুভব ত্যাগের বিনিময়েই বিনির্মিত হয় সুন্দর সমাজ, গড়ে উঠে সৃষ্টিশীল উদার মানুষ।

রাষ্ট্র তার বেহায়াপনার মধ্য দিয়ে বারবার ঘোষণা দেয়া সত্ত্বেও শিক্ষকের মান মর্যাদার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ স্বতন্ত্র বেতন কাঠামো না নির্ধারণ করতেই পারে, কিন্তু সমাজের সর্ব শ্রেষ্ঠাংশ শিক্ষকেরা তার সাথেই পাল্লা দিয়ে খেলতে পারেন না। এখানেই শিক্ষকের মহত্ব বা শ্রেষ্ঠত্ব।

তাই সরকারের ছলচাতুরি বা গোয়ার্তুমির বাইরে এসে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রিয় শিক্ষকেরা তাঁদের শিক্ষার্থীদের পাঠদানে মনোনিবেশ করবেন। দাবি আদায়ে অহিংস আন্দোলনের পথ খুঁজবেন। এমনটাই আমরা আশা করি। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মধ্যে দলদাস, অমেরুদণ্ডী বা অবক্ষয়ী যাঁরা আছেন তাদের কাছে এই আশা বাতুলতা মাত্র জানি। কিন্তু প্রকৃতির কবি জীবনানন্দ দাশ যেমনটা বলেছেন, সকলেই শিক্ষক নয় কেউ কেউ শিক্ষক; আমরা সেই কেউ কেউ শিক্ষকের কাছেই মান মর্যাদা নামের আপেক্ষিক ফানুসের পেছনে না ঘুরে শিক্ষা ও গবেষণায় ফিরবার সবিনয় আবেদন জানাই।

আপনাদের সর্বোচ্চ ত্যাগে ফিরুক শিক্ষার ভাগ্য। জেগে উঠুক বিদ্যার অচলায়তন।
আপনার বিনয়ে সৃজিত লজ্জায় ধুয়ে যাক সরকারের সাপ লুডু খেলবার অনৈতিক প্রয়াস।

গ্রিক পণ্ডিত প্লেটোর শিক্ষাগুরু মহামুনি সক্রেটিস যেমনটা বলতেন, যে মানুষ খাওয়া-পরায় অল্পতেই সন্তুষ্ট, সহজভাবে সরল কথায় সৎচিন্তায় সময় কাটায়, সেই সুখী—আধপেটা খেয়েও সুখী; মানুষের নিন্দা অত্যাচারের মধ্যেও সুখী।
আমাদের বাংলাদেশের সকল শিক্ষকদের এমনতর সুখী দেখাটাইতো আমাদের সতত স্বপ্ন।

প্রজ্ঞার ভালোবাসায় বেঁচে থাকুক সেইসব শিক্ষকের দার্শনিকতা।
গৌরব ও সম্মানে সুশিক্ষার আনন্দধাম হোক আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়।

ফারদিন ফেরদৌসঃ লেখক ও সাংবাদিক
১০ সেপ্টেম্বর ২০১৫
https://www.facebook.com/fardeen.ferdous
https://twitter.com/fardeenferdous