ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

RANGPUR-Gaibandha--04

বিচারহীনতার যে অন্ধকার সংস্কৃতি মহীরুহ রূপ ধারণ করেছে, সেখানে গাইবান্ধায় শিশু সৌরভকে গুলি করে হত্যাচেষ্টার মামলায় সাংসদ মঞ্জুরুল ইসলাম লিটনের গ্রেপ্তার ও জামিন নামঞ্জুরের মধ্য দিয়ে ক্ষীণ আলোর ঝলকানি দেখা যাচ্ছে। কিন্তু আর দশটা সরকার সমর্থক বা দলদাসদের মামলার মতো এই মামলার বিচারও যদি আই ওয়াশ নামের ধোলাইকরণ পদ্ধতিতে হাওয়ায় মিলায়ে যায় তবে সেই বিচারহীনতার সংস্কৃতি নিশ্চিতার্থেই দানবীয় রূপ ধারণ করবে।

দেশটা নিরাপদ করবার জরুরত বা দেশের মানুষের জীবনে শান্তি ফিরায়ে দেবার সদিচ্ছা কারো মধ্যে থাকুক বা না থাকুক, সরকার কিন্তু সোয়া দুই লাখ বিদেশিকে বাড়িতে বা কর্মস্থলে নিরাপত্তা দিবে বলে ঘোষণা দিয়েছে! আপনিতো কাউকে ভোট দেন নাই, তাই আপনার আবার কীসের নিরাপত্তা। রাজনীতির সওদাগরদের কাছে আপনার জীবনের মূল্য ফুরায়ে গেছে। গুরুত্ব পুরোটা এবার বিদেশির বেলায়! ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার ‘র’ এর সাথে সুর মিলায়ে দেশের আরক্ষা প্রধানরা যতই বলুন, দেশে জঙ্গি নেই, মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্লুম বার্ণিকাট কিন্তু বলেই দিয়েছেন, আইএস দমনে মার্কিনীরা বাংলাদেশের সাথে থাকবে। এইরকম ওপর দিয়ে জল ঢালা বচনবিলাসী বন্ধুদেরইতো আমরা সর্বোচ্চ নিরাপত্তার চাঁদরে মুড়ায়ে রাখতে চাই। এবার আমাদের আর শত্রুর মুখপানে তাকায়ে থাকতে হবে না! আমেরিকাই যে আমাদের পরম মিত্র! এসবই আসলে বাংলাদেশের রাজনীতিতে চালু থাকা কথার জাদুবাস্তবতা।

তো আমেরিকা যাদের বন্ধু সেই বাংলাদেশে গাইবান্ধার মঞ্জুরুল ইসলাম লিটনের মতো আইন প্রণেতারা যদি সাত সকালে দ্রাক্ষারস পান করে বেসামাল হয়ে ৯ বছরের শিশু শাহাদাত সৌরভদের ওপর ব্যক্তিগত পিস্তল দিয়ে একটু আধটু স্যুটিং প্র্যাকটিচ করেন, তাতে কার কীইবা আসে যায়?
তাছাড়া যেইদেশে শিশু রাজন বা রাকিবরা অমানুষের আক্রোশে বেঘোরে প্রাণ দান করে, সেখানে পায়ে গুলি টুলি ধরাই ঠিকনা! তাই না?
পত্রিকায় প্রকাশিত খবর থেকে জানা যায়, গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ এলাকার একচ্ছত্র অধিপতি মঞ্জুরুল ইসলাম লিটন নাকি রাতভর আসর শেষে নিজের এলাকায় পাজেরো থামিয়ে এক নারীকে গাড়িতে ওঠানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু বিধিবাম! সেই পথে প্রাতঃভ্রমণ করছিলেন মুটিয়ে যাওয়া চাচা ভাতিজা। নিজের কুকর্মে সহায়তা চেয়ে সৌরভের চাচাকেই কাছে ডাকেন এমপি সাহেব। কিন্তু ভোরবেলার বিপজ্জনক ও রাক্ষস এমপির পাগলামি জানা আছে সবার; তাই ভয়ে পালিয়ে যান চাচা। কিন্তু এমপির আক্রোশের গুলির সামনে পড়তে রয়ে যেতেই হয় ৯ বছর বয়সী নিরুপায় সৌরভকে। দুই পায়ে তিনগুলি নিয়ে সে এখন হাসপাতালের বেডে শুয়ে নিজের ভবিষ্যতের ভাবনায় জেরবার হচ্ছে।

তবে আশার কথা হলো, ১৪ অক্টোবর বুধবার রাত সোয়া ১০টার দিকে রাজধানীর উত্তরায় এক আত্মীয়ের বাসা থেকে এমপি লিটনকে গ্রেপ্তার করা হয়। বৃহস্পতিবার দুপুরে শিশু সৌরভকে গুলি করে হত্যাচেষ্টা মামলায় সাংসদ মঞ্জুরুল ইসলাম লিটনের জামিন ও রিমান্ড আবেদন নামঞ্জুর করে তাঁকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন গাইবান্ধা জেলার অতিরিক্ত মুখ্য বিচারিক হাকিম মইনুল হাসান ইউসুফের আদালত।
আর এর মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রের প্রধান নির্বাহির নির্দেশে বিচারালয়ের সমন থাকা সত্ত্বেও পালিয়ে বেড়ানো গুলিবাজ এই এমপি মহোদয়কে খুঁজে পেতে পুলিশের চোখে রীতিমতো অন্ধকার দেখার পালার আপাততঃ অবসান হলো।

সৌরভকে গুলির ঘটনার পর লিটনের স্ত্রী সৈয়দা খুরশিদ জাহান মিডিয়ায় বলেছিলেন, জামায়াতের একদল নেতাকর্মি রাস্তায় গাড়ি ঘেরাও করলে তার স্বামী তখন মাটির দিকে এক রাউন্ড গুলি করেছিলেন। তাতে কারও আহত হওয়ার বিষয়ে তাদের জানা নাই। অথচ ঐ শিশুটিকে গুলির পর হাসপাতালে পর্যন্ত যেতে বাঁধা দেয়া হয়েছিল।
একই কায়দায় আদালত লিটনের জামিন নামঞ্জুর করায় তাঁর উগ্র সমর্থকেরা গাইবান্ধা শহরে ব্যাপক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করলে পুলিশের কাঁদানে গ্যাসে তাদের নিভৃত করতে হয়।

আদালতের রায়ের প্রতি অবজ্ঞা প্রকাশকারী এমন দলবাজ উগ্র সমর্থকদের নেতা এই লিটনই ২০১৩ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি জামায়াত নেতা সাঈদীর ফাঁসির রায় ঘোষণার পর গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে বামনডাঙ্গা রেলস্টেশনে অগ্নিসংযোগ ও চার পুলিশ সদস্যকে কুপিয়ে হত্যা করার ঘটনায় দায়েরকৃত মামলার আসামী শিবির ক্যাডারদের আওয়ামীলীগকর্মী বানিয়ে তাদেরকে পুনর্বাসিত করেছেন। এমনকি বামনডাঙ্গায় যাত্রা ও হাউজির প্যান্ডেল ভাঙতে গেলে ম্যাজিস্ট্রেটকে পর্যন্ত লাঞ্ছিত করে নিজের সীমালঙ্ঘনের পরীক্ষায় আলফা গ্রেডিং পেয়ে পাশ করেছেন চরম স্বেচ্ছাচারী লিটন।
এমন ধারার সেই লিটন এমপিকে আইনের আওতায় আনতে গিয়ে কিনা সরকারের নানা নাটকীয়তা, ছলচাতুরি বা কথামালার ফুলঝুরি দেখেই পার করতে হলো প্রায় এক পক্ষ সময়।

তাহলে সরকার তোষামোদে এমন আরক্ষা বাহিনীর আরোপিত শৈথিল্যতার ফলেই দেশে অঘটনেরাও দুর্বার গতিতে ঘটেই যেতে থাকবে না কেন?। গুলশানে বিনাদোষে ইতালীয় নাগরিক তাভেলা সিজারকে শট ডেড করা হলেও সরকারী ভাঙ্গা রেকর্ডীয় অমৃত বচন শুনবেন, ইহা একটা বিচ্ছিন ঘটনা। দেশ ও দশের নিরাপত্তা অবিচ্ছিন্নই আছে! রংপুরে জাপানী নাগরিক হোশি কুনিওকে দুর্বৃত্তরা গুলি করে মেরে ফেলবার পর বলা হবে, কুনিও একজন আলু ব্যবসায়ী ছিলেন! আচ্ছা, আলু ব্যবসায়ীদের গুলি খেয়েই কি মরবার বিধান? তাহলে বলতেই হয় ঐ বিষতুল্য আলু খাওয়া সবার বারণ।
রাজধানীর বাড্ডায় পিডিবির সাবেক চেয়ারম্যান খিজির খানকে গলা কেটে হত্যা কিংবা পাবনার ঈশ্বরদীতে ফাদার লুক সরকারকে গলা কেটে হত্যা প্রচেষ্টা চলতেই থাকবে যতক্ষণ না রাষ্ট্রযন্ত্র স্বীকার করছে, এই মর্মন্তুদ ঘটনাগুলো ঘটাবার মতো অপশক্তি এই দেশে আছে এবং এসবই তাদের শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ করতে না পারার চরম ব্যর্থতার ফল!

একবার বলবেন, এই ঘটনার পেছনে সরকার বিরোধীদল দায়ি। পরক্ষণেই আবার কথা ঘুরিয়ে বলবেন, ব্লগার হত্যায় যে জঙ্গি গোষ্ঠি জড়িত মূলত তারাই বিদেশি নাগরিক হত্যায় জড়িত। আবার কিছুক্ষণ পরেই বলবেন, দেশে কোনো জঙ্গিই নেই। তাহলে আপনাদের কোন কথাটা ধরব।
অপরাধী সনাক্ত করা বা বিচারের আওতায় আনতে যেসব শৃঙ্খলা বাহিনীর নিজেদের দক্ষতা বা যোগ্যতার ওপর নির্ভর না করে কেবল আমজনতার দোয়া চেয়ে বেড়াতে হয়, তাদের সদিচ্ছা সরকারী তল্পিবাহকের চিকন সুতোয় ঝুলে যায়! পাবলিকের দোয়া কি চেয়ে বেড়ানোর বিষয়, আপনাদের কর্মফলেই না হতে পারে দোয়ার প্রভূত উদগীরণ।

আর যদি বন্ধুকের গুলি মানুষের গায়ে লাগিয়ে ময়মনসিংহের গিয়াস উদ্দিন, ঢাকার পিনু খানের ছেলে বখতিয়ার কিংবা এইসময়ের আলোচিত লিটনের মতো ক্ষমতার স্বাদ পোক্ত করবার প্রয়াস থাকে সরকার বাহাদুরের, তবে সেই কর্মফলে ভোট বঞ্চিত জনগণের কপালে শনির চক্রবলয়ই স্পষ্টতর হতে থাকবে।

আমরা দোষ করে দোষ স্বীকার করবার জাতিই না। আমাদের অপরাধ মন বুঝি আবাল্যেই লুকোচুরি বিদ্যায় পারদর্শী করেই গড়ে তোলা হয়েছে। অথচ বহির্বিশ্বে দেখি ভুল করলে ভুল স্বীকারের সৎসাহস অন্তত তাদের মধ্যে থাকে।

সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাকে নিয়ে নিজের টুইটে বর্ণবাদী রসিকতা করেন ইসরায়েলের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সিলভান শালোমের স্ত্রী টিভি ব্যক্তিত্ব জুডি শালোম নির মোজেস।
তিনি টুইট করেন, ওবামা কফি কী, আপনারা জানেন কি? এটি কালো এবং দুর্বল’।
বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আলোড়ন সৃষ্টি হলে ব্যাপক সমালোচনার মুখে টুইটার থেকে ঐ কৌতুকটি সরিয়ে ফেলে ক্ষমা চান জুডি। যদিও বারাক ওবামা নিজে ঐ বর্ণবাদি মন্তব্যে টু শব্দটিও করেননি। মানুষের বোধ, বিবেক ও ব্যক্তিত্ব আসলে এখানেই। মানুষ ভুলের উর্ধ্বে নয় বলেই, ভুল হলে তা স্বীকার করাই মনুষ্যত্ব। কিন্তু আমরা বাঙালিরা বোধহয় মানবিকতা, নৈতিকতা বা আদর্শের স্তর পার হয়ে ভিন্নমাত্রার এক নিলাজ অবস্থানে পৌছে গেছি। যেখানে থেকে আসলে যা খুশি তাই করা যায়! কিছুতেই কারো কিছু আসে যায় না।

তাছাড়া সম্প্রতি যুক্তরাজ্যের প্রভাবশালী পত্রিকা ‘ইকোনোমিস্ট’ তাদের গবেষণায় দেখিয়েছে বাংলাদেশ মরার জন্য সবচে’ খারাপ রাষ্ট্র। ৮০’র মধ্যে আমাদের অবস্থান ৮৯ তম। স্বাভবিক মৃত্যুর এতোটুকু গ্যারান্টি নেই আমাদের। যখন তখন যেখানে খুশি চাপাতির কুপ খেয়ে, গরু ছাগলের মতো জবাই হয়ে, গুলি খেয়ে বা গুম হয়ে মরে পড়ে থাকতে পারি আমরা। বিভিন্ন সূচকের ওপর ভিত্তি করে ইকোনোমিস্ট জানায়, সারা বিশ্বে সরকার যেভাবে তাদের নাগরিকদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে কাজ করছে, একইরকমভাবে নাগরিকদের ভালোভাবে মরতে সাহায্য করাও উচিত তাদের। কিন্তু মৃত্যুর সূচকে আমাদের অবস্থান তলানিতে দেখে দেশের ক্ষমতার স্বাদ পাওয়া এমপি, মন্ত্রী বা আধিকারিকদের ভাবসাব ঠিক লাইনে আছে বলেই মনে করতে পারেন। উনাদের অভিজাত হাতের পিস্তলের গুলি খেয়ে আমাদের আমজনতার মরবার সুযোগটাই হয়ত ইকোনোমিস্ট’র সূচকের অবস্থান পাল্টাতে পারে।এই স্তরে থেকে শিশু সৌরভ অন্তত নিজের বুকে গুলি খেয়ে মৃত্যুর কাছে হার মানেনি বলে লিটন এমপি বাহাদুরের কাছে আমরা হয়ত কৃতজ্ঞই থাকতে পারি।

হায় রাষ্ট্র! তুমি যতক্ষণ না পর্যন্ত অপরাধ রাজ্য নিয়ন্ত্রক নারায়ণগঞ্জের শামীম ওসমান, ইয়াবা ব্যবসায়ী কক্সবাজারের বদি কিংবা হিন্দুর জমি জবরদখলকারী ঠাকুরগাঁওয়ের দবিরুল ইসলামদের মতো সাংসদদের ন্যায়ের পথে ফেরাতে পারছ, ততদিন তোমার মুখে চুনকালি মাখানোর ঘোর কেউ কাটাতে পারবে না। লিটনের মতো কিছু এমপি’র কান্ডকীর্তি দেখে কে না ভাববে তারা শুধু মেম্বার অব পার্লামেন্টই নন, তারা পৃথিবীর সবচে’ অমর অক্ষয় ক্ষমতাধর ব্যক্তি। কে আছে এমন যে, তাদের টিকিটার নাগাল আন্তরিক অর্থেই পেতে পারে?

অতএব আপনি সরকারী সুরে বলে যান, ইহা বিছিন্ন ঘটনা, দেশে কোনো আইএস নাই, সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত কোনোকালেই কালোবিড়াল ছিল না, হরতালকারীদের পিলার ঝাঁকুনিতেই রানা প্লাজা ট্র্যাজেডি ঘটেছে, হোশি কুনিও আলু ব্যবসায়ী, শেয়ার মার্কেট, হলমার্ক বা বেসিক ব্যাংকের টাকা লোপাট হয়নি এবং ২০১৫ সালে মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস হওয়ার কথা কেউ স্বপ্নেও ভাবতে পারে না! আমাদের কালের এমপি মন্ত্রী নীতিনির্ধারকরা সফেদ সাদা পোশাক পরেন। তারা আপাদমস্তক সাদা মনের মানুষ। বিরুদ্ধবাদী বা সমালোচকের নিন্দায় আসলে তাদের কিছু যায় আসে না।

ভালো এমপিরা আমাদের প্রশংসায় সর্বদা ধন্য হবেন, তবে রাষ্ট্র করে করুক নিঃসহায়ে আঘাত হানা বিদ্বেষবিষযুক্ত হিংসুক ও কপট এমপিদের আমরা কখনো ক্ষমা করবো না। সৌরভ বিচার পাবে এই প্রত্যাশায় আমরা কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘প্রশ্ন’ কবিতার ভাবকল্পনা পারায়ে যেতে চাই।
আমি যে দেখেছি গোপন হিংসা কপট রাত্রিছায়ে
হেনেছে নিঃসহায়ে,
আমি যে দেখেছি প্রতিকারহীন শক্তের অপরাধে
বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে কাঁদে।

ফারদিন ফেরদৌসঃ সাংবাদিক, মাছরাঙা টেলিভিশন
১৫ অক্টোবর ২০১৫
https://www.facebook.com/fardeen.ferdous
https://twitter.com/fardeenferdous