ক্যাটেগরিঃ খেলাধূলা, ফিচার পোস্ট আর্কাইভ

11204467_10153589979981328_5996007295881555153_n

ক্রিকেট রাজনীতির বাইরে বাংলাদেশ নয় বলেই, নানামুখি সাত সতেরো সমালোচনা সত্ত্বেও বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড পাকিস্তানের নিরাপত্তার কষ্টিপাথর বানাতে আমাদের নারী ক্রিকেটারদের সেখানে পাঠিয়েছিল। সালমাদের দল দুটি টি-টোয়েন্টি ও দুটি ওয়ানডের সবগুলোতে হারের হতাশা নিয়ে দেশে ফিরেছেন। কিন্তু এটা খেলারই অংশ। কিছুদিন আগে পাকিস্তানের পুরুষ দলও আমাদের কাছে গো হারের মর্মবেদনা নিয়ে দেশে ফিরেছিলেন।

কিন্তু আমাদের নারীদের হতাশাজনক পারফরম্যান্স নিয়ে পাকিস্তানের জনপ্রিয় টিভি চ্যানেল জিও টিভি যেরকম অভব্য ভাষায় ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ করে রীতিমতো অপমান করল তাতে কেবল পাকিস্তানী মানসিকতার পুরনো ইতিহাসকেই স্মরণ করতে পারি। পাকিস্তান আটকে আছে সেই একাত্তরের বর্বরতার তিমিরেই। আমাদের কাছে পরাজয়ের গ্লানি যে তাদেরকে দিবারাত্র কুড়ে কুড়ে খায় এবং তারা যে সবসময় বাংলাদেশ নিয়ে একধরণের ঈর্ষাকাতরতায় ভোগে তা মনে করিয়ে দেয়। তাদের এমন আচরণে আমরাও আমাদের পাকিস্তান বিবমিষা এড়াতে পারছি না।
গত ৭ অক্টোবর জিও টিভিতে প্রচারিত একটি অনুষ্ঠানে উপস্থাপক দুজন নারীকে মঞ্চে ডাকেন। বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের নারী ক্রিকেট দলের অধিনায়ক সালমা ও সানা মীরের ভূমিকায় মঞ্চে আসেন দুই অভিনেত্রী। দুজনের গায়েই ছিল জাতীয় দলের জার্সি। পাকিস্তানী ক্রিকেটারের পরণে তাদের অরিজিনাল জার্সি থাকলেও আমাদের সালমারূপি অভিনেত্রীর পরণে ছিল ঢিলাঢালা জার্সি। যেখানে বাংলাদেশ লেখা অক্ষরগুলো বড় বেমানানভাবে ঝুলে ছিল। মনে হচ্ছিল যেন আমার বাংলা মাকেই যেন ওরা ঝুলিয়ে দিয়েছে।

কাঁদতে কাঁদতে মঞ্চে ঢুকতে দেখা যায় সালমার ভূমিকা নেওয়া অভিনেত্রীকে। উপস্থাপক বলেন, ‘খেলায় তো হার-জিত থাকবেই। আপনি কাঁদছেন কেন?’ তখন সালমারূপি অভিনেত্রীর জবাব, ‘আমি হেরে যাওয়ায় কাঁদছি না। আমাদের এতদূর ডেকে এনে হারিয়ে দেওয়া হয়েছে, তাই কাঁদছি।’ তখন উপস্থাপক বলেন, ‘আমরা আপনাদের ভিআইপি নিরাপত্তা দিয়েছি। কিন্তু এখন তো দেখা যাচ্ছে আপনাদের সামাজিক নিরাপত্তাও নেই!’

সালমার সানগ্লাস পরা নিয়েও ঠাট্টা করা হয়েছে অনুষ্ঠানটিতে। মঞ্চের ‘সালমা’র দিকে ইঙ্গিত করে উপস্থাপক বলেন, ‘মনে তো হচ্ছে না আপনি প্লেনে করে এসেছেন। মনে হচ্ছে আপনি এখানে এসেছেন মোটরসাইকেলে চড়ে।’

জিও টিভি’র ঐ অনুষ্ঠানের ভিডিও ফুটেজ এই লিঙ্কে দেখতে পারেন!

এসব রঙ্গব্যঙ্গে অনুষ্ঠানে উপস্থিত পাকিস্তানী হীন মানসিকতার দর্শকেরাও হেসে গড়াগড়ি খাচ্ছিলেন। কিন্তু একটি জাতীয় দল, সেই দলের জার্সিরূপি দেশের পতাকা নিয়ে যে বালখিল্য কৌতুক চলে না এই বোধ পাকিস্তানীদের থাকবার কথা নয়। যারা নাকি একাত্তরে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় নিজেদের মুসলমান পরিচয় দিয়ে আরেক বাঙালি মুসলমান ভাইদের বেশুমার প্রাণ কেড়ে নিতে বা অগণন মা বোনের ইজ্জত লুন্ঠন করতে ছাড়েনি।

পাকিস্তান সফরে সংবাদ সম্মেলনে উর্দুতে কিছু কথা বলার জন্য সমালোচিত হচ্ছেন সালমা। বাংলাদেশ অধিনায়ককে এমনকি শাস্তিও দিতে পারে বিসিবি। জিও টিভির অনুষ্ঠানে উর্দু নিয়েও ঠাট্টা করা হয়েছে। উপস্থাপক সালমারূপী অভিনেত্রীকে জিজ্ঞাসা করেন, ‘আপনি এত ভালো উর্দু বলেন কীভাবে?’ তখন সেই অভিনেত্রীর উত্তর, ‘কারণ ফেসবুকে আমার অনেক পাকিস্তানি বন্ধু আছে।’ এ সময় সানা মীরের ভূমিকায় থাকা অন্য অভিনেত্রী বলেন, ‘তিনি কিন্তু ফেসবুকে নিজের আসল ছবি আপলোড করেননি।’
হয়তো সানার ভূমিকা নেওয়া অভিনেত্রী বোঝাতে চেয়েছেন সালমা ফেসবুকে নিজের ছবি প্রকাশ করলে তাঁর কোনো পাকিস্তানি বন্ধু জুটত না!

আমাদের বাংলা পরগণায় ১৯৫২ সালে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন হয়েছিল। পাকিস্তানি পুলিশের গুলিতে বাঙালি সালাম বরকত রফিক জব্বাররা শহিদ হয়েছিলেন এবং বাংলা পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষারূপে স্বীকৃত হয়েছিল।
এমন ট্র্যাজিক এবং গৌরবময় ইতিহাস থাকা সত্ত্বেও সালমার উর্দু বলায় বিস্মিত হয়নি। কারণ একটি জাতিরাষ্ট্রের ভাষার ওপর আমাদের কোনো ঘৃণা থাকবার কথা নয়। প্রাণান্ত ঘৃণা কেবল তাদের জন্য যারা ৫২তে ভাষা নিয়েও নোংরা রাজনীতির ঘুঁটিবাজি করেছেন। মানুষের আপন সংস্কৃতি নিয়ে ছিনিমিনি খেলেছেন।

উর্দু ভাষাতেও পৃথিবীর বিখ্যাত শায়ের, গজল বা সাহিত্যকর্ম রচিত হয়েছে। আমরা সেসব জীবনবাদী গাঁথার সাথে থাকতে চাই। কিন্তু আমাদের ক্রিকেটার সালমাদের নিয়ে যে মশকরার নাটক করা হলো, তাতে পাকিস্তানী তমসাচ্ছন্ন মানসিকতার ওপর অশ্রদ্ধা বা ঘৃণা না জানানোটাই হবে স্বাধীন বাঙালি হিসেবে চুড়ান্তরকমের জ্ঞানপাপ।

নাজমুল হাসান পাপনের মতো সেসব ক্রিকেট কর্তাবাবু অথবা ক্রিকেট ফ্যানরা পাকিস্তান প্রেমে বুঁদ হয়ে থাকেন, সেই তাদের জন্য ঐ অনুষ্ঠানের ভিডিওটা বারবার দেখবার অনুরোধ থাকল।
পাক সার জমিন সাদ বাদ এর রচয়িতা ড. হুমায়ুন আজাদের ভাষায়, আমি একজন পাকিস্তানীকেও বিশ্বাস করিনা; যদি সে ফুল নিয়েও আসে। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানী দখলদার বাহিনী বাংলাদেশে যে গণহত্যা চালিয়েছে; তাতে এই যুক্তিসঙ্গত উপলব্ধিই আমাদের সবার। পাকিস্তানকে ঘৃণা করতেও ঘৃণা বোধ করি!

সিন্ধু সভ্যতা পৃথিবীর অন্যতম প্রাচীনতম সভ্যতা। বর্তমান পাকিস্তানের সিন্ধু নদের তীরে গড়ে ওঠা এই সভ্যতার নগরী হরপ্পা ও মহেঞ্জোদারোর অধিবাসীরা খ্রিষ্টপূর্ব তিন হাজার শতকে দৈনিক প্রক্ষালন কর্মের জন্য নিজেদের বাড়িতে ব্যবস্থা করেছিল পৃথিবীর প্রথম ফ্লাশ টয়লেটের। সেসময় থেকে পাকিস্তানী ভূমিপুত্ররা সভ্য বলতে ওইটুকুই। সততা, মূল্যবোধ, পরমতসহিষ্ণুতা, লজ্জা, মানবিকতা, সদাচরণসহ বাকী সব মানবীয় গুণই সেই ফ্লাশ টয়লেটের নোংরা জলে ধুয়ে খেয়েছে ওরা।
এই যুগে ইতিহাসে নজিরবিহীন গণহত্যা চালিয়ে বাঙালিকে নিশ্চিহ্ন করার দুরভিসন্ধিতে হেরে গিয়েও গলার জোড় কমেনি ওদের। পাকিদের উচ্চবাচ্য আর উল্লম্ফন দেখে আপনি বিস্মিত হোন, হাসুন, গালাগাল করুন, রাগে মাথার চুল ছিঁড়ুন তাতে ওদের কিচ্ছু আসবে যাবে না। কারণ ওদের রক্তেই মিশে আছে ইবলিশ শয়তানের বিষ। ইবলিশ মহান ঈশ্বরকেই লজ্জা পায় না। আর আমি আপনিতো বাঙালি মানুষ বটে।

পাকিস্তানী মানসিকতা বুঝাতে ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্র পাকিস্তানের একাত্তর সময়কালীন ফৌজি লিডার জেনারেল ইয়াহিয়ার একটি ব্যক্তিগত কাহিনী স্মরণ করা যেতে পারে। একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বর জেনারেল ইয়াহিয়াকে তার এক বন্ধু বলেছিল, স্যার কায়েদে আজম কা পাকিস্তান ভী টুট গ্যায়া (কায়েদে আজমের পাকিস্তান ভেঙ্গে গেছে)। উত্তরে মুসলমান ইয়াহিয়া বলেছিল, ও ছুড়দো, মুঝে দারু আর জরিনাকো দেদো (ওসব ছাড়ো, আমাকে মদ ও সুন্দরী জরিনাকে এনে দাও)। পাকিস্তানের এহেন অতিধার্মিকরাই পুরো একাত্তর সাল জুড়ে বাংলাদেশে ৩০ লাখ মুক্তিযোদ্ধার প্রাণ হরণ, ২ লাখ মা বোনের সম্ভ্রম ও দেড় কোটি মানুষকে উদ্বাস্তু করে ছেড়েছিল।

এমন কোন নিকৃষ্ট কাজ আছে, যা বর্তমান পাকিস্তানে হয় না! পশ্চিমা মদদপুষ্ট উগ্রবাদী তালেবানরা যখন তখন মসজিদ, গির্জা বা সেনা স্কুলে আত্মঘাতি বোমা ফেলে প্রাণ বিনাশ করছে। তাদের গুলির হাত থেকে বাদ যায়নি বিদেশি ক্রিকেটাররাও। এমন নিরাপত্তা ঝুঁকির নিদান করতে যেখানে আমাদের বাংলাদেশি নারী ক্রিকেটাররা যান, সেখানে তাদের কোথায় প্রশংসা করা হবে। তা না করে উলটো করা হলো ভর্ৎসনা। মানসিক বিকারাক্রান্ত পাকিস্তানের কাছ থেকে এর বেশি আশা করা পাপ।

একাত্তরে আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হওয়ার প্রাক্কালে সদর্পে পাকিস্তানী সৈন্যাধ্যক্ষরা ঘোষণা দিয়েছিলেন, বাঙালির বংশধারা নিপাত করবেন তারা। এতোটা অমানবিক ঘোষণার পর ভবিষ্যত পরিস্থিতি বিবেচনায় মানসিক চাপ সইতে না পেরে বাথরুমে গিয়ে নিজের পিস্তলে আত্মহত্যা করতেও বাধ্য হন অনেক বাঙালি তরূণ অফিসার। অবশেষে নিরস্ত্র বাঙালি ১৬ ডিসেম্বর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ৯৩ হাজার সৈন্যসহ কুলাঙ্গার জেনারেল নিয়াজীকে নাকে খত দিয়ে আত্মসমর্পণ করাতে বাধ্য করে। এমন পরাজয়ের গ্লানিতেও ওদের লজ্জা হয়নি।

আসলে বোখরা ও বাগদাদ নরহত্যার নায়ক চেঙ্গিস খা কিংবা হালাকু এবং জালিয়ানওয়ালাবাগ গণহত্যার কুশীলব বৃটিশ জেনারেল ডায়ারের অনুসারী পাকিস্তানীদের রক্তেই হয়ত সমস্যা আছে। কে আছে এমন যে ওদের রক্ত শোধন করে মানবিক বোধসম্পন্ন করে তুলতে পারে?
আমরা ভবিষ্যতে আবারও আমাদের টাইগার ক্রিটারদের পাকিস্তানে পাঠিয়ে বিদ্রূপের মুখে ফেলব কিনা তা দ্বিতীয়বার ভাববার সময় এখনই।

ফারদিন ফেরদৌসঃ লেখক ও সাংবাদিক
১২ অক্টোবর ২০১৫
www.facebook.com/fardeen.ferdous
www.twitter.com/fardeenferdous