ক্যাটেগরিঃ আন্তর্জাতিক, ফিচার পোস্ট আর্কাইভ

fff2

পশ্চিমা রাজনীতি মোটাদাগে বরাবর দুই শিবিরেই বিভক্ত; লিবারেল বা উদারপন্থী ও কনজারভেটিভ বা রক্ষণশীল। বৈশ্বিক নীতি নির্ধারণ বা অভ্যন্তরীণ শাসন ব্যবস্থায় আহামরি পরিবর্তন না ঘটলেও সেসব দেশে কখনো উদারপন্থী আবার কখনোবা রক্ষণশীলরা জনগণের রায়ে শাসন ক্ষমতা পান। কিন্তু নিজেদের দেশের নিরাপত্তা জোরদার, অর্থনৈতিক সক্ষমতা বাড়ানো বা পৃথিবীব্যাপী মোড়লগিরির চাকা সচল রাখতে যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ, যুক্তরাজ্যের এমআই৬, কানাডার সিএসআইএস কিংবা মধ্যপ্রাচ্যের ইজরাইলী মোসাদ একজোট হয়েই কাজ করে। বিশ্বের উন্নয়নশীল অথবা অনুন্নত দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নাক না গলালে উদারপন্থী কিংবা রক্ষণশীল কারোরই পেটের ভাত হজম হয় না। এক্ষেত্রে উদার বা রক্ষণে তেমন বিভাজন না থাকলেও ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, পশ্চিমে শাসন ক্ষমতায় উদারপন্থী তথা লিবারেলরা আসলে আমাদের মতো উদীয়মান দেশেরা একটু হলেও খুশিই হয়।

এর কারণ লিবারেলরা যতোটা বহুত্ববাদী সংস্কৃতির ধারক হন, তৃতীয় বিশ্ব থেকে অভিবাসী হওয়া জনমানুষের বিষয়ে অধিকার সচেতন হন, কনজারভেটিভরা ঠিক ততোটা নন। আর তাই গেল ১৯ অক্টোবরে কানাডায় ৪২ তম নির্বাচনের মাধ্যমে লিবারেল পার্টির ৪৩ বছর বয়সী তরুণ নেতা জাস্টিন ট্রুডোকে ক্ষমতায় দেখতে পেয়ে পশ্চিমাদের কৌশলপত্রের গিনিপিগ হিসেবে গরীব আফ্রো এশিয়া অঞ্চলে কিছুটা আলোক রেখা উদ্ভাসিত হচ্ছে। আর আমরা আনন্দিত এজন্য যে, এই জাস্টিন ট্রুডোর সাথে রয়েছে আমাদের বাংলাদেশের জন্মবন্ধন। আধুনিক কানাডার অবিসংবাদিত নেতা ও জনক এবং বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে বিদেশি বন্ধু পিয়ারে ট্রুডো হলেন জাস্টিনের বাবা। ‘Real Change’ এই শ্লোগানকে সামনে রেখে নির্বাচনী প্রচারণার শুরু থেকেই জাস্টিন ঘোষণা দিয়ে রেখেছিলেন তিনি তাঁর প্রতিটি পদক্ষেপই রাখবেন বাবার চিনিয়ে দেয়া পথে। আর এটিই আমাদের আশাবাদের আসল জায়গা।

বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় বসছে অভিবাসী বান্ধব লিবারেল পার্টি। দলটির নেতা জাস্টিন ট্রুডো হচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী। নির্বাচনের চুড়ান্ত ফলাফল অনুযায়ী বিরোধী দল লিবারেল পার্টি ৩৩৮টি আসনের মধ্যে ১৮৪টিতে জয়ী হয়েছে। ক্ষমতাসীন কনজারভেটিভ পার্টি পেয়েছে ৯৯টি আসন। বাকী আসনগুলোতে অন্যান্য দলের প্রার্থীরা বিজয়ী হয়েছেন।

নির্বাচনে জয়লাভের পর বাজেট ঘাটতি পূরণ ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করার অঙ্গীকার করেছেন জাস্টিন। কানাডার নির্বাচনে বরাবর অর্থনীতি প্রধান ইস্যু হিসেবে কাজ করে। তাই নির্বাচনের আগে উচ্চ আয়ের নাগরিকদের কাছ থেকে আয়কর বেশি নিয়ে মধ্যবিত্তদের স্বস্তি দেয়াই তাঁর লক্ষ্য -প্রচারে এমন প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন জাস্টিন। এটাই ১৮৪ আসনের শক্ত জয়ের ভিত্তি বলে মানছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। এছাড়া ১১ সপ্তাহের নির্বাচনী প্রচারে লিবারেল পার্টির মূল লক্ষ্য ছিল, পরিবেশগত বিষয় তেল পাইপ লাইন, মাদকে আইনী ছাড়পত্র দান, সিরিয়ার শরণার্থী গ্রহণ এবং ইসলামিক স্টেটের বিরুদ্ধে হামলা বন্ধ করে বিপদে পড়া ইরাকি সেনাবাহিনীকে প্রশিক্ষণ দান।

CANADA-articleLarge

নির্বাচনী অঙ্গীকার রাখতে ক্ষমতা হাতে না পেতেই ইরাক ও সিরিয়া থেকে নিজেদের সিএফ-১৮ যুদ্ধ বিমান প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়েছেন জাস্টিন ট্রুডো। এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সাথে টেলিফোনে কথাও বলেছেন তিনি। এসময় অবশ্য ‘ট্রুডোর মাথায় সাদা চুল খুব কম এবং সম্ভবত শিগগিরই তা হয়ে যাবে’ বলে জাস্টিনের ইমম্যাচিউরিটি নিয়ে খুনসুটি করতে ছাড়েননি বারাক ওবামা।

১৯৭১ সালের ২৫ ডিসেম্বর জন্মগ্রহণকারী বাংলাদেশের সমান বয়সী জাস্টিন ট্রুডো যে ইমম্যাচিউরড নন সাধারণ জনগণের ম্যান্ডেটই তা প্রমাণ করে দিয়েছে। কারণ রক্ষণশীল প্রধানমন্ত্রী স্টিফেন হারপারের বিরুদ্ধে গিয়ে তিনি নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, মধ্যপ্রাচ্যে কানাডার যুদ্ধ বিমান থাকবে না এবং সিরিয়া থেকে ২৫ হাজার শরণার্থী কানাডায় অভিবাসন দেয়া হবে। উদারতার জনক পিয়ারে ট্রুডোর সন্তান জাস্টিন তরুণ হলেও ঠিকই অনুধাবন করতে পারছিলেন, আমেরিকার নেতৃত্বে মধ্যপ্রাচ্যে আইএসের বিরুদ্ধে নাটকীয় যুদ্ধে যখন থেকে রাশিয়ার বাস্তববাদী পুতিন জড়িয়ে গেছেন, সেখানে নেটো বাহিনীর থাকা মানে স্রেফ নিজেদেরকে খেলো করা ছাড়া আর কিছু নয়।
ইতিমধ্যে সিরিয়ার আকাশে নেটোর যুদ্ধবিমানের সাথে রাশিয়ার যুদ্ধ বিমানের অনভিপ্রেত সংঘর্ষ এড়াতে রাশিয়ার সাথে সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করতে বাধ্য হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। যেখানে ৩০ সেকেন্ডের ভুলে রাশিয়া বা নেটোর বিমানের সংঘর্ষের ভুলে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের আশঙ্কা করেন সমর বিশারদরা। এছাড়া চীনের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক ও সমর শক্তির চাপে এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানও যেখানে হুমকির মুখে; যাকে আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরা পর্যন্ত বলছেন তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের হাতছানি! এমন বিস্ফোরন্মুখ পরিস্থিতিতে কানাডার যুদ্ধ বিমান ইরাক বা সিরিয়া থেকে ফিরিয়ে নেওয়া এক যুগান্তকারী সিদ্ধান্তই বটে। কাজেই ম্যাকগিল ইউনিভার্সিটি ও ইউনিভার্সিটি অব ব্রিটিশ কলম্বিয়ার গ্রাজুয়েট সাবেক স্কুল শিক্ষক জাস্টিন ট্রুডোর ক্ষমতা লাভের পথে যাত্রা শুরুর কালেই এমন কিছু সিদ্ধান্ত শান্তপ্রিয় মানুষের মনে আশার প্রদীপই জ্বালায় বটে!

জাস্টিনের রক্তেই রোপিত আছে শান্তির বীজ। মহান একাত্তরে আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধে আমেরিকা বা চীনের বিরুদ্ধে গিয়ে জাস্টিনের পিতা পিয়ারে ট্রুডো বাংলাদেশের মানবতার পক্ষে তাঁর নীতি জোরদার রেখেছিলেন। কানাডার তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী পিয়ারে ট্রুডো নিজেদের পার্লামেন্টে পাকিস্তানের বর্বরতা ও নৃশংসতার বিরুদ্ধে নিন্দা প্রস্তাব এনেছিলেন। বিপুল ত্রাণ পাঠিয়েছিলেন শরণার্থী শিবিরে। এমনকি যুদ্ধের পরও ১৮ জন যুদ্ধ শিশুকে কানাডায় আশ্রয় দিয়েছিলেন তিনি। এরা সবাই সফল ও শান্তিপূর্ণ জীবনযাপন করছেন সেখানে। এভাবেই একাত্তরে কানাডার সংবাদ মাধ্যম, বিশ্ববিদ্যালয়, বেসরকারী সংস্থা, বিভিন্ন চার্চ বা মানবাধিকার সংস্থাগুলো আমাদের মহান স্বাধীনতার পক্ষে সোচ্চার ছিল। আর এসবেরই নেতৃত্বে ছিলেন আজকের প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডোর বাবা পিয়ারে ট্রুডো। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে বিশেষ অবদান রাখার জন্য যে ১২৯ জন বিদেশি নাগরিক ও প্রতিষ্ঠানকে স্বাধীনতা মৈত্রী সম্মাননা ভূষিত করা হয় পিয়ারে ট্রুডো তাঁদের অন্যতম।

জাস্টিনের মা কানাডার খ্যাতিমান অভিনেত্রী মার্গারেট সিনক্লেয়ারের মানসিক অসুস্থতা ও বাবার সাথে করুণ বিচ্ছেদের ট্রাজেডির কাছে হার না মেনে বাবার আদর্শে বড় হওয়া কানাডার এই বর্তমান নেতা হয়ত বাবার পদাঙ্ক অনুসরণ করে প্রকৃতপক্ষেই উদারপন্থী হয়ে বিশ্ব শান্তির অন্বেষায় কাজ করবেন এমন প্রত্যাশা আমরা করতেই পারি।

২০০৮ সালের ১৪ অক্টোবরের নির্বাচনে পাপিনিউ আসন থেকে অল্প ভোটের ব্যবধানে প্রতিপক্ষকে হারিয়ে প্রথমবারের মতো কানাডার পার্লামেন্টে মেম্বার হিসেবে জয়লাভ করেন জাস্টিন। সেসময়ই ‘দ্য গ্লোব এন্ড মেইল’ পত্রিকা এক সম্পাদকীয়তে লিখেছিল, জাস্টিন ট্র্রুডো এবারের পার্লামেন্টে একজন আলোচিত পার্লামেন্টারিয়ান হিসেবে আবির্ভূত হলেন। যিনি হয়ত আগামীতে একদিন কানাডার প্রধানমন্ত্রীও হতে পারেন।
সেসময় বিরোধীদলীয় সাংসদ হিসেবেই তিনি ‘National voluntary service policy for young people’ বিল উত্থাপন করলে তা পাশ হয়। ২০১০ সালে হাইতিতে ভয়াবহ ভূমিকম্প আঘাত হানলে জাস্টিন ট্রুডো হাইতিবাসীদের জন্য অভিবাসী সুবিধা প্রদানের পক্ষে প্রচারণা চালিয়ে অভিবাসী কমিউনিটিতে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পান। পরের বছর নির্বাচনে লিবারেল পার্টির ভরাডুবি হলে পার্টির দলপ্রধানের দায়িত্ব এসে পড়ে তাঁর কাঁধে। এর ধারাবাহিতকায় জাস্টিনের চৌকষ নেতৃত্বে লিবারেল পার্টি এবারের নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলে তাঁর বাবার পুরনো কার্যালয় অটোয়ার ২৪ সাসেক্সে প্রধানমন্ত্রীরূপে অধিষ্ঠিত করে তাঁকে। ব্যক্তিগত জীবনে তিন সন্তানের জনক জাস্টিন ট্রুডোর স্ত্রী জনপ্রিয় টকশো অ্যাংকর ও অভিনেত্রী সোফি গ্রেগরি।

21trudeau-web-articleLarge

বাংলাদেশের অকৃত্রিম বন্ধু পিয়ারে ট্রুডোর পুত্র বলেই জাস্টিন ট্রুডোর কাছে আমাদের আশাবাদের পারদ উর্দ্ধমুখী। কিন্তু কয়েকটি অমীমাংসিত ইস্যুই জাস্টিনের সাথে শেখ হাসিনা সরকারের ভবিষ্যৎ সম্পর্কের গতি প্রকৃতি নির্ধারণ করতে পারে। বর্তমানে কানাডা-বাংলাদেশের মধ্যে বাৎসরিক ১.৮ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্যিক লেনদেন হয়। কিন্তু কোনো কারেন্সি হাব না থাকায় অন্তত ১০ ভাগ বেশি মূল্য গুণতে হয় বলে আমাদের ব্যবসায়ী নেতাদের দাবি। নতুন প্রধানমন্ত্রী এই দিকটিসহ এদেশের পোশাক, ঔষধ, সিরামিক বা চামড়াশিল্প খাতে ব্যবসায়িক বিনিয়োগ বাড়ালে সম্পর্কের নতুন দ্বার খুলতে পারে।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগষ্ট স্বপরিবারে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যাকান্ডের খুনি বিপথগামী সেনাসদস্য এবিএম নূর চৌধুরী জার্মানীতে পলাতক জীবনের পাট চুকিয়ে এখন কানাডার রাজনৈতিক আশ্রয়ে রয়েছেন। আরেক খুনি এএম রাশেদ চৌধুরীও যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেস ছেড়ে কানাডায় আশ্রয় নেওয়ার চেষ্টা করছেন। এসব খুনিদের ফেরৎ চেয়ে আশ্রয়দাতা দেশের সাথে বারবার যোগাযোগ করেও সাড়া পাচ্ছে না বলে দাবি করে আসছে বাংলাদেশ সরকার। অজুহাত হিসেবে কানাডা বলছে, বাংলাদেশে মৃত্যুদন্ডাদেশ বহাল আছে, যা কানাডার আইন বহির্ভূত। এখন বাংলাদেশ বন্ধুর সুপুত্র জাস্টিন ট্রুডো সকল অজুহাত ঝেড়ে ফেলে স্বপরিবারে দেশের স্থপতি হত্যাকান্ডের ন্যায়বিচারের দন্ড কার্যকরের পক্ষে তাঁর উদার কন্ঠ সরব করলে, সেটা হতে পারে কানাডা বাংলাদেশ সম্পর্কের অত্যুঙ্গ মাইলফলক।

এবারের নির্বাচনে জয়ের পর জাস্টিন ট্রুডো তাঁর সমর্থকদের উদ্দেশ্যে বলেছেন, ‘আমরা আশা দিয়ে ভয়কে জয় করি। কঠোর পরিশ্রম দিয়ে নৈরাশ্যবাদকে দূর করি। জনতার রায় পরিবর্তনে এবং এখনই পরিবর্তনের সময়। নেতিবাচক ও বিভাজনের রাজনীতিকে সরিয়ে রেখে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির কথা ভেবেছি, যা কানাডার মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করবে।’

ইজরাইলপন্থী রক্ষণশীল প্রধানমন্ত্রী স্টিফেন হারপারের নীতিকে পাশ কাটিয়ে হ্যান্ডসাম তরুণ প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো তাঁর বিদেশনীতিতেও যদি উদারনৈতিকভাবে এমন বক্তব্যের প্রতিফলন ঘটান, তবে নিপীড়িত বা নিষ্পেষিত তৃতীয় বিশ্বের জন্য তা হতে পারে বড় আশাবাদের জায়গা।

লেখক: সংবাদকর্মী, মাছরাঙা টেলিভিশন
২৬ অক্টোবর ২০১৫
facebook.com/fardeen.ferdous
twitter.com/fardeenferdous