ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

0,,15704959_303,00

৬৩৭ খ্রিস্টাব্দে রাজা শশাঙ্ক মারা যাওয়ার পর যোগ্য শাসকের অভাবে এতদাঞ্চলে সার্বভৌমত্ব বিনষ্ট হলে এক ঘোর অরাজকতার সৃষ্টি হয়। ফলে ‘জোর যার মুল্লুক তার’ রীতিতে ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বণিক, ব্যবসায়ীরা প্রত্যেকেই স্ব স্ব গৃহে হয়ে ওঠে রাজা। ফলে স্থানীয়ভাবে দুর্বলেরা সবলদের দ্বারা অত্যাচারিত হতে থাকে। ইতিহাসের এই অবস্থাকে ‘মাৎসন্যায়’ নামে অভিহিত করা হয়।
কিন্তু স্বাধীনতার চুয়াল্লিশ বছরে এসে এখন এইসময়ে নি:সন্দেহে সেই ‘মাৎসন্যায়ের’ যুগ রহিত হয়েছে। ১৯৭১ সালের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে লাখো প্রাণ ও সম্ভ্রমের বিনিময়ে কয়েক হাজার বছর আগে বঙ্গোপসাগর থেকে জেগে উঠা বাংলাদেশ এখন স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র।

বহু চড়াই উৎরাই পেরিয়ে বঙ্গভঙ্গ, দেশভাগ এবং লোভী পশ্চিম পাকিস্তানীদের শোষণ, বঞ্চনা নির্যাতন, নিপীড়নের বন্ধুর পথ পেরিয়ে আমরা যে বাংলাদেশ নামের ভূখন্ডটি পেয়েছিলাম তার তিন দিকেই এখন মুরুব্বী রাষ্ট্র ভারত। যে দেশটি কিনা ভারতবর্ষ নামে একদা আমাদের দেশই ছিল। কিন্তু চলনে বলনে সেই বড় দাদা ভারতের যুগ যুগব্যাপী সীমান্ত কান্ডকীর্তি ৬ষ্ঠ শতাব্দীর ‘মাৎসন্যায়’র কথাই মনে করায়ে দেয়।

যদিও আমরা ৭৪ সালের ইন্দিরা-মুজিব চুক্তির আলোকে গেল আগস্টে ছিটমহল বিনিময়ের মাধ্যমে ভারতের সাথে থাকা ৩ হাজার ৭ শত ১৫ কি:মি: সীমান্ত এলাকা নির্ঝঞ্ঝাট করে নিয়েছি। তারপরও নানা অজুহাতে ভারতীয় সীমান্ত নিরাপত্তা বাহিনী বিএসএফ কর্তৃক আমাদের মুটে, মজুর, চাষাভূষা মানুষেরা অবিরাম খুন হয়েই চলছে। এমনকি ঐ উদ্ধত বর্বর বাহিনীটি আমাদের জমিনের ভিতরে ঢুকে পর্যন্ত নির্বিঘ্নে মানুষ খুন করে যাচ্ছে। আর সেসময় আমাদের বিজিবি হা করে কী দেখতে থাকে তা কেউ জানে না! ওরা আমাদেরকে মেরে চলেছে প্রায় অর্ধ শতাব্দী ধরে। কখনও মেরে সীমান্তের কাঁটা তারে অমানবিকভাবে ঝুলিয়ে রাখছে নিহতের লাশ। কখনওবা নিজের সীমান্তে নিয়ে গিয়ে উলঙ্গ করে পিটিয়ে আমার বাংলাদেশকেই নাঙ্গা করে দিচ্ছে। অজুহাত ওরা নাকি গরু চোরাচালানি বা মাদক পাচারকারীদের মারছে। কিন্তু জীবনেও শুনিনি সন্ত্রাসী সুব্রত বাইন বা সাত খুনি নূর হোসেনরা কোনোদিন বিএসএফের ফাঁদে পড়ে প্রাণ হারায়। তাহলে সাধারণ শ্রমজীবিদের হত্যার উদ্দেশ্যটা আসলে কী? হতে পারে ওরা খেলাচ্ছলে ওদের নিজেদের রাইফেলের গুলির ধার পরীক্ষা করে। অথবা আমাদের সার্বভৌমত্ব নিয়ে রশি টানাটানা করে দেখে আমরা কতোটা গিনিপিগ হয়ে উঠছি।

ওরা সীমান্তে যতোই মানুষ মারুক আর যাই হোক আমাদের চৈতন্যেরা নৈঃশব্দে বেঘোর ঘুমেই আচ্ছন্ন থাকবে। তাই ফেলানীর বাপ ও মা যতই কাঁদুন, বিএসএফের উল্লাস অস্ত্রবাজি কোনোদিন থামবার নয়।

অথচ ভারতের সাথে থাকা আমাদের এই সীমান্তই নাকি পৃথিবীর সবচে’ ঝামেলামুক্ত। এবং এবছর ৭৪ সালের সীমান্ত চুক্তি অনুযায়ী দু’দেশের সীমান্ত চুক্তি বাস্তবায়নের মাধ্যমে বিদ্যমান ছিটমহল সমস্যা সমাধান করবার জন্য আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সীমান্তজয়ী বা ‘ডটার অব বর্ডার্স’ অভিধায় ভূষিত হয়েছেন। এমন বাস্তবতায় সীমান্ত হত্যা শূণ্যের কোটায় নামিয়ে আনার কথা বলব না, এটা যদি সহনীয় পর্যায়ে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে রাখা যেত তবে এই প্রধানমন্ত্রীই হয়ত আমজনতার কাছে ‘মাদার অব বর্ডার্স’ বলে স্বীকৃত হতেন। আমরা যেভাবে দাদাদের মাথায় করে রাখি। দাদাদের দেয়া গরুর হাড্ডিতে রসনা তৃপ্ত করি, দাদারা তিস্তার জল আটকে রাখলেও আমাদের পদ্মার ইলিশ খাইয়ে ওদের জামাই ষষ্ঠি ঠিকঠাক রাখি, দাদাদের মুম্বাইয়া চলচ্চিত্রের মুগ্ধতায় মোহাবিষ্ট হই, দাদারা চাইলেই ট্রানজিট বা বিচ্ছিন্নতাবাদী অনুপ চেটিয়াদের সোৎসাহে দিয়ে দেই। সেই দাদারা আমাদের সীমান্ত মানুষের প্রতি এমনধারার বেরহম কেন হবে? স্মরণাতীত কালের চেয়ে বর্তমান সময়ে আমাদের ও তাদের ভাব ভালোবাসা যেখানে তুঙ্গ স্পর্শ করে আছে, সেখানে সীমান্ত সন্ত্রাস বন্ধ করাতো মামুলি ব্যাপারই ছিল। তবে তা হচ্ছে না কেন? আমরা কি তাহলে ওদের নজরদারি বা ছত্রছায়ায় নিজেদের অস্তিত্ব তেলাপোকাবৎ টিকিয়ে রাখবার মানসে এসব অমীমাংসিত ইস্যুগুলো ভুলে থাকতে গোল্ডফিশ সেজেই আনন্দ বোধ করি। হতে পারে!

গত মাসে বাংলাদেশ ভারত সীমান্তে হত্যা বন্ধের ব্যাপারে দু’দেশের স্বরাষ্ট্র সচিবদের সপ্তদশতম বৈঠকে বিশেষ গুরুত্ব দেয়ার কথা বলবার এক সপ্তাহের মধ্যেই সাতক্ষীরার তলুইগাছা সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে নজরুল ও খালেক সরকার নামে দুই বাংলাদেশি গরু কারবারি মারা যান। একইভাবে গেল সাত মাসে বিএসএফের হাতে অন্তত ২৮ জন বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন। এমনকি বিএসএফের জিঘাংসা থেকে সীমান্তে থাকা বন্য হাতিরাও রেহাই পায়না!
sherpur-elephant
সীমান্তে এভাবে বিনা কারণে একপাক্ষিক খুনোখুনির ব্যাপারে ইতোপূর্বে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন মানবাধিকার ফোরামে আলোচনা হয়েছে। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর চাপে ভারতের পক্ষ থেকে বেশ কিছুদিন আগে সীমান্তে প্রাণহানি বন্ধে বিএসএফকে ‘প্রাণঘাতী নয় এমন অস্ত্র’ দেয়ার ঘোষণাও দেয়া হয়েছিল। কিন্তু বেপরোয়া বিএসএফের মন সেদিকে নেই, তারা বরং যেমন খুশি মানুষ মারবার হাতিয়ারটাকেই বড় বেশি ভালোবাসছেন! প্রতিবছর অন্তত অর্ধশত বাংলাদেশি বিএসএফের নির্মমতায় প্রাণ হারান। এর অধিকাংশ ঘটনাই দ্বিপাক্ষিক পতাকা বৈঠক নামের সমঝোতায় হাওয়ায় মিলায়ে যায়। তবে মাঝে মাঝে নৃশংসতা মাত্রা ছাড়ালে মিডিয়ায় তোলপাড় হয়ে বিনা বিচারে তাও বিস্মৃতিতে রূপান্তরিত হয়।

২০০৯ সালের ০৯ ডিসেম্বর চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার সতেররশিয়া গ্রামের বাসিন্দা হাবিবুর রহমানকে বিএসএফ সদস্যরা মুর্শিদাবাদের চরমৌরুসী সীমান্তে নিয়ে নগ্ন করে চরম নির্যাতন করে মৃত ভেবে ফেলে রেখে যায়। বিএসএফের এক সদস্যের মোবাইলে ধারণ করা নির্যাতনের ভিডিও চিত্রটি ঘটনাচক্রে প্রকাশ হয়ে গেলে এ খবর আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় তোলপাড় সৃষ্টি হয়। হাবিবুরকে উলঙ্গ করে নির্যাতনের হৃদয়বিদারক ছবি ছাপিয়ে সেসময়ের পত্রিকায় শিরোনাম করা হয়, ‘একবিংশ শতাব্দীর এই সভ্য দুনিয়াকে আবারও লজ্জা দিয়েছে বিএসএফ।’

কুড়িগ্রামের সীমান্ত এলাকা খিতাবেরকুঠিতে ২০১১ সালের ০৭ জানুয়ারি বিএসএফের সদস্যরা ফেলানী নামের এক কিশোরীকে গুলি করে হত্যা করে। যার লাশ অন্তত ৫ ঘন্টা কাঁটাতারের বেড়ার ওপর ঝুলে থাকে। বাবার সঙ্গে ফেলানী নয়াদিল্লীতে গৃহকর্মীর কাজ করত। বিয়ের উদ্দেশ্যে সীমান্ত পথে বাড়ি ফিরছিল ওরা। কাঁটাতারের বেড়ায় ফেলানীর ঝুলন্ত লাশের ছবি গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলে বিশ্বজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি হয়। বাংলাদেশ সরকার ও মানবাধিকার সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকে প্রতিবাদ জানানো হয়। এরই ধারাবাহিকতায় বিএসএফ সদর দপ্তর ‘জেনারেল সিকিউরিটি ফোর্স কোর্ট’ গঠন করে। এবং নানা নাটকীয়তা শেষে এই খুনের দায়ে অভিযুক্ত বিএসএফের হাবিলদার অমিয় ঘোষকে বেকসুর খালাস দেয় ওই কোর্ট।
Felani-03-F

এভাবেই ভারতীয় সীমান্ত বাহিনীর বর্বরতা, নৃশংসতা, পাশবিকতার কলঙ্কজনক নজিরগুলোকে ধামাচাপা দেয়ার নিরন্তর চেষ্টা করে যাওয়া হয়। আমাদের প্রতিবাদহীনতা, নির্বিকারতা ও চেতনার বৈকল্য আকাশ ছুঁয়ে থাকে বলেই বিএসএফ লাগাতার এমনকরে বাংলাদেশের বুকে গুলি চালিয়ে যাবার মহোৎসবের নটরাজ হয়ে উঠতে পারে।

০৫ জানুয়ারি ২০১৩ সালে রাজধানীর বিয়াম মিলনায়তনে বিবিসি আয়োজিত বাংলাদেশ সংলাপে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আ স ম হান্নান শাহ বলেছিলেন, সীমান্তে বিএসএফ গুলি চালানো বন্ধ না করলে তাঁর দল ক্ষমতায় এলে পাল্টা গুলি চালানোর নির্দেশ দেবে। এই সরকারের মতো নিশ্চুপ বসে থাকবে না।
যদিও এ বছরের ০৬ জুন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বাংলাদেশ সফরের আগে দলের আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক আসাদুজ্জামান রিপন দাবি করেন, তারা কখনো ভারতবিরোধী রাজনীতি করেনি, করছে না, করবেও না। বিএনপি দেশের স্বার্থে কাজ করে।
ভারতীয় সীমান্ত রক্ষা বাহিনী নিয়ে হান্নান শাহ’র বক্তব্য যেখানে নিজেদের স্বাধীকার সাহসের পরিচয় বহন করে, পক্ষান্তরে এসময়ে এসে রিপনের কথায় এটা স্পষ্ট হয় যে, এই দেশে এখন ক্ষমতায় যেতে হলে বা থাকতে হলে ভারতকে ‘খুশি করে’ এবং ‘খুশি রেখে’ হয়ত করতে হবে। এমন অবস্থায় ভবিষ্যতে পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটেও সীমান্ত সন্ত্রাসের কী হাল হবে তা সহজেই অনুমেয়!

প্রায় প্রত্যেকদিন সীমান্তে থাকা বাংলাদেশিরা প্রান হারাচ্ছেন বিএসএফের কাছে। মিডিয়া, সরকার, সুশীল সমাজ সবাই চুপ। সরকার ভারতের সাথে তাদের খাতির ভাঙ্গতে চায় না বলে চুপ থাকতে পারে! দেশের মিডিয়ারও ঐ পথ না ধরলে সমূহ বিপদ চিন্তা হতে পারে। অন্যদিকে দেশের সুশীল সমাজ ঢাবি’র সাবেক ভিসি প্রফেসর এমাজ উদ্দিনের নেতৃত্বে শত নাগরিক কমিটি ও সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হকের নেতৃত্বে সহস্র নাগরিক কমিটিতে দ্বি-ধারায় বিভক্ত। তাদের অন্যতম প্রধান কাজ হলো প্রতিপক্ষ নেত্রীর শত সহস্র খুত ধরা। সামগ্রিকভাবে দেশের মঙ্গলামঙ্গল নিয়ে ভাববার সময় তাদের কোথায়?

কাজেই উপমহাদেশীয় মোড়ল ভারতের সীমান্ত বাহিনী বিএসএফের তাগড়া জোয়ানেরা আমাদেরকে গুলি করে ঝাঁঝরা করে কাঁটাতারে ঝুলিয়ে রাখুক, ধরে নিয়ে গিয়ে উলঙ্গ করে নিপীড়ন করুক আর আমাদের দেশের ভিতরে এসে মারধর করুক, তাতে কার কি? আমাদের নির্বিকার চৈতন্যরা শান্তিতে ঘুমাক আর আমরা সাদাসিধে মানুষেরা নিজেদের পোড়া কপাল নিয়েই সুখে থাকি।

লেখকঃ সংবাদকর্মী, মাছরাঙা টেলিভিশন
০৫ ডিসেম্বর ২০১৫
twitter.com/fardeenferdous
facebook.com/fardeen.ferdous