ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

file (2)

আজকের ০৫ জানুয়ারিটা একটু অন্যরকম। গত বছর এই দিনে ২০১৪ সালে অনুষ্ঠিত ১০ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ট্রেন মিস করা দেশের দুই বড় দলের এক দল বিএনপি লাগাতার অবরোধের ডাক দেয়। শতাধিক মনুষ্যপ্রাণ ও সহস্রাধিক যানবাহনের প্রাণও পোড়ানো হয় সেসময়। সেই অবরোধ এখনও চলছে। কারণ বিএনপি ঘোষণা দিয়ে তাদের অনির্দিষ্টকালের অবরোধ তোলে নিয়েছে এমন কথা কেউ নিজ কানে শোনেননি। আজকের দিনটি ক্ষমতাসীন আওয়ামীলীগ গণতন্ত্রের বিজয় দিবস হিসেবে পালন করছে। বিপরীতদিকে সংলাপ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন প্রার্থনাকারী বিএনপি পালন করছে গণতন্ত্র হত্যা দিবস হিসেবে। একই দিনে দুই বিপরীতমুখি দিবস পালন সব সম্ভবের দেশ বাংলাদেশেই সম্ভব। কারণ এখানে হীরক রাজারা কারো রাজি বা নিমরাজির তোয়াক্কা না করে হরহামেশা সোৎসাহে একে অপরের সাথে যুদ্ধবাজি করেন। সেই যুদ্ধের মাঝখানে পড়ে উলুখাগড়ারূপি ঊণ মানুষেরা অঝোরে প্রাণপাত করেন। আর এটাই এখানকার রাজনীতি বা গণতন্ত্রের মূখ্য চালচিত্র। রাজনীতির এমন চালচিত্রের ভাবচক্কর অনুধাবন করতে আমরা বরং ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নিয়ম রক্ষার নির্বাচনের সময়কালটা দেখে আসতে পারি।

১০ নাম্বার নির্বাচন সংকেতঃ
কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘আনন্দ ধারা বহিছে ভুবনে’ এবং ‘জেনে শুনে বিষ করেছি পান’ এর মতো বাংলার আকাশ, বাতাস ও জমিনে আনন্দ ধারা ও বিষ পানের উৎসব মাথায় রেখে গতকাল সন্ধ্যায় নির্বাচনী চাঁদ উঠেছিল। তাই আজ ১০ নাম্বার জাতীয় নির্বাচন। নির্বাচনে নানা কূট কৌশল আর ছলচাতুরীতে জিতনেওয়ালাদের আনন্দ ধারা বইবে, অন্যদিকে যারা ১০ নাম্বার বিপদ সংকেতে পড়ে ১০ নাম্বার জাতীয় নির্বাচন নামক দিল্লীর লাড্ডু ভক্ষনের সুযোগ হেলায় হারিয়েছেন তাদের জন্য এ যে, রাজনৈতিক বিষ পান তা বলাই বাহুল্য।

পিপীলিকার পাখা মরিবার তরে গজাতে পারে তাই বলে এমনটা ভাববার কোন কারণ নাই যে, আজকের নির্বাচনের পাখাও গজিয়েছে গণতন্ত্রের পটল তোলা কর্ম সারবার জন্যে। ক্ষেত্রভেদে হঠাত গজানো সেই পাখাটি কাজ করে কেবল উপযুক্ত হাওয়া পেলে। অর্থাত উড়বার কাজটি সম্পন্ন হয় হাওয়ার উপর দিয়ে। আজও এই মহা নির্বাচনের দিনে এক ধরণের হাওয়া উত্তর থেকে দক্ষিণ বা পূর্ব থেকে পশ্চিমে আসা যাওয়া করছে। প্রাচীন কাল থেকেই মানুষ উড়বার জন্য বড় ব্যাকুল ছিল তা বোঝা যায় প্রাচীন রূপকথা বা উপকথার দিকে তাকালে। গ্রীক পুরাণে দেবতা ডিডালুস ও তাঁর প্রিয় পুত্র ইকারাস পাখির পালক দিয়ে ডানাসদৃশ বস্তু তৈরী করে তা মোম দিয়ে সন্নিবেশ করে আকাশে উড়তে সক্ষম হয়েছিল। একসময় ইকারাস বেশি উপরে উঠে গেলে অর্থাত বেশি বাড় বাড়লে সুর্যের উত্তাপে ডানার মোম গলে তা থেকে পালক খসে পড়ে গেলে সে নদীতে পড়ে যায়। একদম সলিল সমাধি যাকে বলে। ওই পুরাণ কথার ধারাবাহিকতায় মার্কিন বিজ্ঞানী অরভিল রাইট ও উইলবার রাইট ১৯০৩ সালে ফ্লায়ার ওয়ান নিয়ে ১২ সেকেন্ড আকাশে উড়তে সক্ষম হলেও হার মেনে নীচে পড়তে হয়। পরবর্তীতে অবশ্য ওই ভ্রাতৃদ্বয় হাওয়াকে বশ্যতা স্বীকার করাতে বাধ্য করে। হাওয়া নিয়ে এতো কথা বলবার উদ্দেশ্যটা খুব সরল। আমাদের এই বঙ্গভূমির আজকের নির্বাচনটাও পুরোটা হাওয়ার উপর দিয়ে হচ্ছে। সবটাই কেমন বায়বীয়। দেখা যায়, আবার যায় না। রাইট ভ্রাতৃদ্বয় আজ বেঁচে থাকলে বড়ই খুশি হতেন এই ভেবে যে, হাওয়া নিয়ে কেবল তারাই কাজ করেননি। বিংশ শতাব্দির বঙ্গীয় উপত্যকার প্রধান সংবিধান রক্ষক শেখ হাসিনাও হাওয়ার উপর দিয়ে অনেক কিছু করবার চেষ্টা করছেন। তারা এটাও ভাবতেন হাওয়াকে বশ করতে যে পাখা নামক বস্তুটি গজাতে হয় তা হাজারো বিপদ সংকেত বুঝে বড় সাবধানে নিয়ন্ত্রন করা বাঞ্ছনীয়। না হলে আমাদের সামনে ডিডালুসের সুপুত্র ইকারাসের উদাহরণটা জাজ্বল্যমানই আছে।

দিল্লীকা লাড্ডু যোভী খায়ে গা ওভী পস্তায়েগা, যোভী নেহি খায়েগা ওভী পস্তায়েগা। সেই দিল্লীর লাড্ডুর সুস্বাদ যারা অপকৌশলে হারিয়েছেন তারা আজকের নির্বাচনকে পুতুল নাচের নির্বাচন বলছেন। এই ক্ষণে ‘পুতুল নাচের ইতিকথার’ কথাশিল্পী মানিক বন্ধ্যোপাধ্যায় বেঁচে থাকলে কি বলতেন তা জানা না গেলেও আজকের এই হাওয়া হাওয়া নির্বাচনেও একজন পুতুলের সমূহ ভূমিকা আছে। পুতুল নাচের ইতিকথায় মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছিলেন, মানুষ যত উপরের দিকে উঠতে থাকে ততই বুঝি সে একা হতে থাকে। তেমনি আমাদের এই পুতুল ওরফে খালেদা জিয়া ম্যাডামও আজ বড় একা। তিনি আজ হালছাড়া অথচ জনপ্রিয় পত্রিকাওয়ালাদের জরিপে তার দলই নাকি সবচেয়ে জনপ্রিয়। তিনিই দেশের ভাবী প্রধানমন্ত্রী। তারপরও তাদের আন্দোলনে লোক হয় না। টিভিতে টকশোতে শত নেতার মুখ দেখা গেলেও রাস্তায় তাদের অস্তিত্ব থাকে না। তবে ভাড়াটে পাকি বোখরান ছাগল মার্কা কিছু জামায়াত শিবিরের সন্ত্রাসীরা বিএনপি’র পক্ষে আন্দোলন ফান্দোলন করে দেয় এই যা। ঘোড়ার কাজ কর্ম কী আর পাকি পাঠা দিয়ে চলে। চলমান সরকারে মৎস ব্যবসায়ীরা যেমন খেয়ে বর্তে মোটা তাজা হয়েছেন। তেমনি আগের সরকারেও বিএনপি’র নেতাকর্মীরা এতো খেয়েছিলেন যে, মোটা নাদুস নুদুস শরীর নিয়ে ঘরের বাইরেও বের হতে পারেন না তারা। ফলাফল আজকের ১০ নাম্বার নির্বাচনীয় বিপদ সংকেত।

পোড় খাওয়া রাজনীতি আজ অধরা চাঁদ। উদ্যম ও স্বপ্ন ছাড়া বিপাকে পড়া এই রাজনীতি আজ ঘুরে দাঁড়াতে চায়। কিন্তু আজকের পুতুল নাচীয় হাওয়া হাওয়া নির্বাচনের নামে গণতন্ত্রের সমূহ দুসংবাদের দায় আমাদের এই ম্যাডাম পুতুলেরও।
30_khaleda+zia_05012016_0001
বাংলা নামক আধুনিক রোম পুড়ে ভস্মিভূত হবে, হয়ে যাক। মানুষ মরবে, মরে যাক। আমাদের একালের নীরো শেখ হাসিনা তাঁর কাজ করে যাবেন একাগ্রচিত্তে। এমন দৃঢ়চেতা দেশপ্রেমী কে দেখেছে কবে? সংবিধান নামক জুজু আজীবন জনগণের চোখের সামনে ধরা থাকবে। সেখানে বলা আছে, নির্বাচন হবে এমন, যাতে পূর্ণবয়স্ক নাগরিকদের ভোটাধিকার প্রয়োগের মধ্য দিয়ে প্রত্যক্ষভাবে ‘জনগণের ইচ্ছার’ প্রতিফলন ঘটবে। আজকের নির্বাচনে এতোটাই গণ ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটানো হয়েছে যে, দেশের ৯ কোটি ২০ লাখ ভোটারের মধ্যে ৫ কোটিরও বেশি ভোটারকে কষ্ট করে নির্বাচনী কেন্দ্রেই যেতে হবে না। যে হারে জ্বালাও পোড়াও চলছে চারপাশে, সেখানে এতো গণমানুষের কষ্ট লাঘব করতে পারার কৃতিত্ব শেখ হাসিনাকে দেবেন না, আপনারা ভয়ঙ্করভাবে একচোখা। যারা নির্বাচনে আজ ভোট দিতে পারলো না, তারা আজ যারপর নাই খুশি। হরতাল অবরোধে সহিংসতার বিপদ থেকে তারা বেঁচে গেল তাই এই নির্বাচনের মাধ্যমে পুরো নির্বাচনী প্রক্রিয়ার উপর আস্থা যেমন ফিরবে, তেমনি শেখ হাসিনার দলের ভাবমূর্তি ও আবেদন হাজারগুণ বৃদ্ধি পাবে। অদূর ভবিষ্যতে সরকারী দল ছাড়া বাংলাদেশে অন্যকোন দলের চান্স আছে এখনও এমনটা ভাবতে পারলেন?

প্লেটোর ‘দ্য রিপাবলিক’ গ্রন্থের কথা আপনাদের মনে থাকবার কথা। সক্রেটিসকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, দেশপ্রেম কী? তিনি উত্তর দিয়েছিলেন, নিজের কাজ সর্বোত্তমভাবে করে যাওয়াই দেশপ্রেম। আজকের নির্বাচনের ক্রীড়নকরা তাদের পক্ষে সর্বোত্তমভাবে কাজ করে যাচ্ছেন নি:সন্দেহে। জনগণের আবেগ অনুভূতি বাঁচা মরা গোল্লায় গেলে তাতে কার কী ! মনে রাখবেন শেখ হাসিনার এমন বিরল দেশপ্রেম কেউ ভাঙ্গতে বা মচকাতে পারবে না। সবার উপরে মহান সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের রক্ষাকবচ এখনো আছে।
তবে জনগণ যদি কোনোদিন প্রকৃত সক্ষমতা ফিরে পায়। কথা বলতে ও নিজের পায়ে হাটতে শিখে তারা।
সেদিন আজকের আনন্দধারা ও বিষ পান সদৃশ ১০ নাম্বার নির্বাচনই…
১০ নাম্বার মহাবিপদ সংকেত হবে না তার গ্যারান্টি কে দিতে পারে?
তবে ইতিবাচক আমরা এমনটা ভাবব না আপাতত:।

পাদটীকাঃ লেখার ভূমিকাটি এই সময়ের হলেও মূল লেখাটি ২০১৪ সালের ০৫ জানুয়ারিতে লেখা।

ফারদিন ফেরদৌস: সংবাদকর্মী, মাছরাঙা টেলিভিশন
০৫ জানুয়ারি ২০১৬।
facebook.com/fardeen.ferdous.bd
twitter.com/fardeenferdous