ক্যাটেগরিঃ ফিচার পোস্ট আর্কাইভ, রাজনীতি

12573868_1674695759470402_5618857963969027564_n

মানুষ, দেশ ও রাজনীতি নিয়ে বঙ্গবন্ধুর সামগ্রিক দর্শন, চিন্তা ও চেতনা সবচে’ ভালোভাবে উপলব্ধি করতে পারতেন যিনি -তিনি হলেন তাঁরই ঘনিষ্ঠ সহচর তাজউদ্দীন আহমদ। খুব স্বাভাবিকভাবেই নিজে পাদপ্রদীপের অন্তরালে থেকেও তাঁর নেতা শেখ মুজিবের নামে জীবনের সমস্ত কর্ম সম্পাদন করেছেন তিনি। একাত্তরে বঙ্গবন্ধুর অবর্তমানে কূটনৈতিক প্রজ্ঞা ও বিচক্ষণতায় স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সরকার পরিচালনা ও মুক্তিযুদ্ধে বাঙালি জাতিকে বিজয়ী করে দেশকে পৌছে দিয়েছিলেন স্বাধীনতার সুবর্ণ বন্দরে। তারপরও নানা দোলাচলে পড়ে মুক্তিযুদ্ধের পর স্বাধীনতার অবিসংবাদিত নেতা তাঁকে কখনো কোনো কারণে ভুল বুঝলেও তাজউদ্দীন আমৃত্যু তাঁর নেতাকেই মান্য করেছেন এবং নিজের অসাধারণ সদগুণপনা দিয়ে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রূপরেখা রচনা করবার প্রয়াসী হয়েছেন।

একাত্তরে যারা হেরেছিল, তারা বঙ্গবন্ধুকে তাজউদ্দীন থেকে হয়ত বিভক্ত করতে পেরেছিল, যার পরিণতিতেই এই বাংলাভূমে ভয়াল ও ঘৃণ্য পঁচাত্তর হানা দিয়ে স্বাধীনতার স্থপতিদের তছনছ করে দিয়ে দেশকে উল্টোরথে চড়াতে পেরেছিল। কিন্তু ইতিহাসের পথ পরিক্রমায় আমরা জানি দেশের স্বাধীনতা ও অক্ষয় অগ্রগতির ক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধু ও বঙ্গতাজ ছিলেন এক ও অভিন্ন সম্পূরক সত্তা। তাই বঙ্গতাজ কন্যা শারমিন আহমদ রচিত ‘নেতা ও পিতা’ গ্রন্থের তাজউদ্দীন আহমদের চেয়েও তিনি আমাদের কাছে আরও বেশি কিছু।

একথা সত্য যে, তাজউদ্দীন নামের এমন একজন রাজনীতির প্রবাদ পুরুষকেও জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর কাছ থেকে দূর দ্বীপবাসী হতে হয়েছিল। কারণটা সোজা, রাজনীতির রঙ্গমঞ্চে যুগে যুগে মীর জাফর আলী খাঁ, খন্দকার মোশতাক ও একালের শেখ সেলিমরা বহাল তবিয়তে থাকতে পারেন- তাদের শিয়াল সদৃশ ধুর্ততার কারসাজিতে। আর এই শৃগালরা যে বাঘকেও ছেড়ে কথা কয় না, তা কে না জানে?

রাজনীতি বুঝতেন গাজীপুরের প্রত্যন্ত দরদরিয়া গ্রামের তাজউদ্দীন। নেতাকে পরামর্শ দেয়ার অধিকার, সক্ষমতা বা ধৃষ্টতা যাই বলি, তা তাজউদ্দীনের ছিল। স্বাধীনতা পরবর্তীকালে বাকশাল গঠন বা অপরাপর বিষয়ে নেতার সাথে তাঁর মতান্তর হতো। আর সেই ক্ষণে মোশতাক গংরা নেতাকে কান পড়া দিয়ে নিজেদের পথ সুগম করতে পেরেছিলেন। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, বঙ্গবন্ধুর বাবা শেখ লুৎফর রহমান মারা গেলে, তাঁর কবরে গিয়ে মোশতাক হাউমাউ করে কেঁদে কেটে দাবি করে, আমিও বাবার সাথে কবরে যাব, আমার বাবা নাই, আমার আর বেঁচে থেকে কী লাভ?
‘তাজউদ্দীনতো চাননি, আপনি আর দেশে ফিরে আসেন’! এই মোশতাকের এমনতর কানভারী কথা বঙ্গবন্ধু বিশ্বাস না করে পারেন? আর সেই বিশ্বাসের দানবেরা পঁচাত্তরের মহাট্রাজেডির অমানিশা নিয়ে এসেছিল।

সেই মোশতাকদের দুরাত্মাও একসময় বাংলাভূমি থেকে অন্তর্নিহিত হয়েছিল। তবে তাদের প্রেতাত্মারা এইখানে আরাম আয়েশে থেকে যেতে ভুল করেনি। এখনকার চরিত্রটির নাম শেখ সেলিম। না থাকুন ক্ষমতার কাছাকাছি। বঙ্গবন্ধুর নিকটাত্মীয় তিনি। এইটুকু দাপট ও পৃষ্ঠপোষকতাতেই রাজাকার লুলা মুসাদের নিজেদের বেয়াই বানিয়ে দিয়ে অর্থের কুমির করে দিতে পারেন। সেকালে তাজউদ্দীনকে মোশতাক জ্বালাতেন, আর একালে তাজউদ্দীন আহমদের সুযোগ্য পুত্র তানজিম আহমদ সোহেল তাজকে কে জ্বালাতে পারেন? কেন ঐ যে, প্রেতাত্মারা আছেন তো!

এবার পুরনো ঘটনা খুলে বলি।
২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারিতে বাংলাদেশ সরকারের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন পুত্র সোহেল তাজ। কয়েক মাসেই বাবার আদর্শবাদিতা ও সততার কথা মনে করিয়ে দিচ্ছিলেন সোহেল তাজ। নিজের যোগ্যতার প্রমাণ রাখছিলেন তিনি। কিন্তু ৫ মাসের মাথায় অজানা রহস্যজনক কারণে ৩১ মে’তেই তিনি পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। সোহেল তাজ কতটা মানসিক বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে নিজেকে রাজনীতি থেকে গুটিয়ে নিতে বাধ্য হন, তা সাধারণ মানুষের জানার বাইরেই রয়ে গেছে। কারণ বঙ্গতাজ পুত্র নিজের দলকে বিব্রত করতে চাননি। রাজনীতিতে ত্যাগের ব্রতটা যে এমনই।

শোনা যায়, সেসময় বিমানবন্দরে এক চোরাচালান চক্রকে আটকে দেয় পুলিশ। স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী সোহেল তাজ পুলিশের ন্যায়নিষ্ঠ ভূমিকাকেই সমর্থন করেন। কিন্তু সোহেল তাজ অনুধাবন করতে পারেননি, চোরাচালানকারী যদি শেখ সেলিমদের আত্মীয় হয়, তাকে সসম্মানে ছেড়ে দিতে হয়। এর ফল সরাসরি শারীরিকভাবে লাঞ্ছনা। আরে বাপু তুমি মন্ত্রীতো কি হয়েছে। আমাদের পূর্বসূরী খন্দকার মোশতাকরাতো তোমার বাপকেও ছেড়ে কথা কয়নি।
2.

কাউকে অভিযোগ দিলেন না, বাবার মতোই দৃঢ়চেতা সোহেল তাজ। নিজের আত্মমর্যাদা নিয়ে মন্ত্রীসভা থেকে পদত্যাগ করে যুক্তরাষ্ট্রে চলে যান। কিন্তু তখন তাঁর পদত্যাগপত্র গ্রহণ করেননি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিন বছর পদত্যাগপত্র গৃহীত না হওয়ায় ২০১২ সালের ১৭ এপ্রিল মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে একটি চিঠি তিনি এবং পদত্যাগ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারিরও আবেদন জানান। সেই সময় থেকে তাঁর ব্যক্তিগত হিসাবে পাঠানো বেতন-ভাতার যাবতীয় অর্থ ফেরত নেওয়ারও অনুরোধ জানানো হয় ঐ চিঠিতে। ২০১২ সালের ২৩ এপ্রিল সংসদ থেকে পদত্যাগের পর গাজীপুর-৪ কাপাসিয়া এলাকাবাসীর উদ্দেশ্যে খোলা চিঠি লিখে সুখে দুঃখে তাদের পাশের থাকার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছিলেন তিনি।

একাত্তর পরবর্তী দৃশ্যপট আর এখনকার পরিবর্তিত বাংলাদেশের দৃশ্যপট হয়ত এক নয়। শোনা যাচ্ছে, প্রধানমন্ত্রী পুত্র সজিব ওয়াজেদ জয়ের সচেষ্ট উদ্যোগের কারণে তানজিম আহমেদ সোহেল তাজ হয়ত রাজনীতিতে ফিরতে পারেন। সেইসাথে নিজের দলের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের ডেপুটি হিসেবে যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকের পদটিও তাঁকে দেয়া হতে পারে। সত্যিকার অর্থেই যদি এটা ঘটে, তবে বাংলাদেশের রাজনীতিতে তা শুভবার্তাই দেবে। রাজনীতি দিন দিন যেখানে নষ্ট মানুষদের অধিকারে চলে যাচ্ছে, সেখানে একজন সোহেল তাজের মতো নিবেদিতপ্রাণ যুবাপুরুষ যদি টিকে যান তবে মোশতাকের ভাবশিষ্যদের দৌরাত্ম্য কমতেও পারে। আর তা হবে কলুষিত রাজনীতিতে ছিটেফোটা হলেও অমৃত আলোকবর্তিকা।

আমরা বঙ্গতাজ কন্যা মাহজাবিন আহমদ মিমি’র সোশ্যাল মিডিয়া থেকে ইতোমধ্যে জেনেছি, গেল ২৩ জানুয়ারি শনিবার রাতে গণভবনে যান সোহেল তাজ। দুই বোন সিমিন হোসেন রিমি ও মাহজাবিন আহমেদ মিমিও তার সঙ্গে ছিলেন। শেখ হাসিনার সঙ্গে সোহেল তাজের আবেগঘন সাক্ষাতের ছবি ফেইসবুকে দেন মিমি। ‘ব্রাদার অ্যান্ড সিস্টার রিইউনিয়ন!!!’ শিরোনামে গণভবনে সাক্ষাতের ছবি দেন তিনি, যাতে দীর্ঘ দিন পর সাক্ষাতে প্রধানমন্ত্রী ও সোহেল তাজের আবেগপ্রবণ হয়ে পড়ার বহিঃপ্রকাশ দেখা যায়।

সোহেল তাজ চারদলীয় জোট সরকার আমলে রাজপথে আন্দোলনে সক্রিয় থেকে সবার নজর কাড়েন। স্বাধীনতা সংগ্রামের অনন্য ইতিহাসের গৌরময় ঐতিহ্য যাঁর রক্তে মিশে আছে, তেমন একজন মানুষ কারো ব্যক্তিগত আক্রোশের শিকার হয়ে রাজনীতির মঞ্চ ছেড়ে পলায়ন করবেন -এমন ভাবনা কারো মনেই প্রশ্রয় পাওয়ার কথা নয়। তাঁরও হয়ত অনুধাবন করবার সময় এসেছে, সব দিনইতো খন্দকার মোশতাক বা শেখ সেলিমদের নয়। রাজনীতি যদি তার আপন সময়কে ভালো মানুষের গলায় বরমাল্য হিসেবে ঝুলিয়ে দেয়, তবে সেই বিনিসুতোর মালাকে অবহেলায় দূরে না ঠেলাই সমীচিন বোধ করি। ভোগবাদীদের বিতাড়িত করতে ত্যাগীদের প্রত্যাগমন ছাড়া উপায় কি? শুভবুদ্ধির আলোয় উদ্ভাসিত হোক পলায়ন প্রবৃত্তির অন্ধকার। উপযুক্ত মানুষের যথার্থ মূল্যায়নে কেটে যাক গুমোট রাজনীতির কুয়াশা বিষবাষ্প। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় শিখরস্পর্শী হোক প্রাণের বাংলাদেশ।

রাজনীতির রণাঙ্গনে পুনরায় সুস্বাগত তানজিম আহমদ সোহেল তাজ।

পাদটীকাঃ সোহেল তাজ অবশ্য আজ দুপুরে নিজের ফেসবুক পেজে জানিয়ে দিয়েছেন, তাঁর রাজনীতিতে ফেরার খবর ঠিক নয়। তাহলে আমাদের আমজনতার আশাবাদটা কি এভাবেই আশাভঙ্গে পর্যবশিত হতে থাকবে? এমনটা হতে দেয়া কি ঠিক হবে মিস্টার সোহেল তাজ?

ফারদিন ফেরদৌসঃ সংবাদকর্মী, মাছরাঙা টেলিভিশন
২৫ জানুয়ারি ২০১৬।
facebook.com/fardeen.ferdous.bd
twitter.com/fardeenferdous