ক্যাটেগরিঃ মানবাধিকার

2223106956_af70c2bdf1_z

০৮ মার্চ বিশ্ব নারী দিবস। নিউইয়র্কের পোশাক কারখানার কর্মীরা এর সূচনা করেছিলেন। দৈনিক কাজের সময় ১২ ঘণ্টা থেকে কমিয়ে ৮ ঘণ্টা নির্ধারণ, ন্যায্য মজুরি ও কর্মক্ষেত্রে স্বাস্থ্যকর পরিবেশ নিশ্চিত করার দাবিতে তারা সোচ্চার হয়েছিলেন; যেতে হয়েছিল কারাগারেও। নিজেদের অধিকার আদায়ে ১৮৫৭ সালের ৮ মার্চ এভাবেই উঠে দাঁড়ান যুক্তরাষ্ট্রের নারীরা। এ দিনটিকে স্মরণীয় করে রাখতে ১৯১০ সালে জার্মানির নারী নেত্রী ক্লারা জেটকিন ‘নারী দিবস’ পালনের ডাক দেন। কিন্তু এই শত বছরেও নারীর নিজস্ব অধিকার নামের অনুভবের কি আসলেই কোনো হেরফের ঘটেছে?

জাতিসংঘ এবার প্রতিপাদ্য দিয়েছে, ‘প্ল্যানেট ৫০-৫০ বাই ২০৩০: স্টেপ ইট আপ ফর জেন্ডার ইক্যুয়ালিটি’। আর বাংলাদেশে ‘অধিকার, মর্যাদায় নারী-পুরুষ সমানে সমান’ প্রতিপাদ্য নিয়ে দিবসটি উদযাপিত হচ্ছে। কিন্তু তাতে কি নারীর অবিরাম তিমির রাত্রিতে গহন যাত্রা থেমে যাচ্ছে?

বরং এই উত্তারাধুনিক যুগেও এসেও আমরা বড় বেদনায় অবলোকন করছি নারী দিবসের এক অতি ভিন্নতর ও পুরোদস্তুর বিপরীত চেতনা।
বোধ হচ্ছে, পিতৃতান্ত্রিক বিধাতা পুরুষরা অতিশয় দয়া পরবশ হয়ে আজ ২৪ ঘন্টার একটি দিন অন্তঃপুরবাসিনীদের জন্য নির্ধারণ করেছেন। বিভিন্ন মঞ্চে ব্যাপক জ্ঞানগর্ভ আলোচনা হবে। পত্রিকায় ললনা মঙ্গল বিষয়ক রঙিন ক্রোড়পত্র বের হবে। পুরুষের সাথে নারীর সমতা সমতা করে গগনবিদারি চিৎকার উঠবে। মাত্র আজ একটা দিন। পক্ষান্তরে বছরের ৩৬৪ দিন নিজেদের করে উৎসব উদযাপনের জন্য আগলে রেখে দিয়েছেন আত্মগৌরবে গৌরবান্বিত মহাপুরুষেরা। নারীর গর্ভে জন্ম নেয়া অকৃতজ্ঞ পুরুষের তৈরি বিধি বিধান কিংবা ধর্মীয় সংস্কৃতি সবখানেই যেখানে নারী অতীব ফেলনা, সেখানে তার জন্য একটা দিবস দয়া করে বরাদ্ধ করা হয়েছে শোকর গুজর করতে হবে বটে। নারীকে নারী হয়ে উঠবার জন্য এই দিবসটি বড়ই যথার্থ। নারী মুক্তি আন্দোলনের পথিকৃৎ সিমোন দ্য বোভোয়ার যেমনটি জোর দিয়ে বলেছেন, কেউ নারী হয়ে জন্ম নেয় না, বরং নারী হয়ে উঠে

নারীর একটা নিজস্ব সত্তা আছে, এটা পুরুষতন্ত্র কখনো স্বীকার করেনি। পুরুষের কাছে নারীর মূল্য কেবল তার শরীরের জন্য, তার ভূমিকার জন্য -স্ত্রী, মাতা বা দাসী হিসেবে, এর বেশি কিছু নয়। পুরুষ চিরকাল গৌরব বোধ করে এসেছে যে সে পুরুষ। কারণ তার কল্পনায় সে সব কিছুর প্রভু। পুরুষের চেতনায় অন্ধ, বিকলাঙ্গ, নির্বোধ পুরুষও নারীর ওপর অধিষ্ঠিত শ্রেষ্ঠ। সেই প্রবাদটি কে না জানে, সোনার আংটি বাঁকাও ভালো! এমন চেতনাধারী মহাপুরুষেরা নারীর জন্য একটা দিন ধার্য করেছেন। বহুত শুকরিয়া মহামহিম পুরুষকূল।

নারী ও পুরুষের সমতা সমতা নিয়ে গলা ফাটানো আওয়াজের এই যুগে আমাদের দেশে বড় দুই দলের প্রধান নির্বাহী খালেদা জিয়া বা শেখ হাসিনা নারী বলে এই বঙ্গভূমে নারীর ব্যাপক অধিকার রক্ষিত হয়েছে এমনটা ভাববার কোন কারণ নাই। রাজনীতির গরম মাঠে পুরুষের মতামত না নিয়ে বা তাদের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে এই দুই নেত্রীর একচুলও নড়বার জো নেই। নেত্রীদ্বয়কে আপাতঃ স্বাধীন দেখালেও সহকর্মী পুরুষের ঈর্ষার আগুন নিয়ে খেলবার সক্ষমতা অর্জন নিয়েও তাদের মাথা ঘামাতে হয় বিস্তর। ঐ দুই নারী নেত্রীর দীর্ঘ সময় ধরে দেশ শাসন করবার সক্ষমতা নিয়ে দল দুইটির পুরুষ নেতারা ওপরে সরব থাকলেও, ভিতরে তারা গুঞ্জরণ তোলেন, একজন বাবা অপরজন স্বামীর জোরে নেতা। ঈর্ষাকাতর পুরুষ নেতারা মুখ বাকা করে ভ্রু কুচকে, ‘মাইয়া মানুষ আবার নেতা’ বলে তির্যক মন্তব্যের বানভাসিতেও প্রায়শঃ ভিজেন। দেশের উপর থেকে নীচ পর্যন্ত আমাদের নারীদের অধিকার আসলে এমনটাই।

Labour
কিন্তু যে নারী এতো লাখো পুরুষের জন্মদাতা তার এমন নিয়তি হওয়ার কী কথা ছিল? মানুষের সেই ভ্রূণকালে কেউ নির্দিষ্ট করে নারী বা পুরুষ ছিল না। অথবা নারী বা পুরুষ সৃষ্টিতে দুইজনের ভূমিকাই পঞ্চাশ পঞ্চাশ অংশ নির্ধারিত। তারপরও কেবল পুরুষের স্বার্থপরতা এবং লিঙ্গ নিয়ে কূটিল রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রেই নারীর সাথে এমনতর বৈষম্য যুগ যুগ ধরে চলছে। নারীকে দাবায়ে রাখতে পুরুষের গভীর ষড়যন্ত্রেই তথাকথিত নারী দিবস উদযাপন করতে হয়। পুরুষের ভাষায় নারী ক্রিকেট, নারী ফুটবল, নারীনীতি বা নারী নিয়ে অগ্রগতি আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। পুরুষ সম্পাদকের পত্রিকায় সপ্তাহান্তে নারীমঞ্চ, নারীজগত নামে বিশেষ সংখ্যা বের করতে হয়। টেলিভিশনে সুন্দরীতমা বা অপরাজিতা নামে প্রোগ্রাম উপস্থাপন করতে হয়। এর বিপরীতে কখনো শোনা যাবে না, পুরুষ দিবস উদযাপিত হয়। পুং আলোচনা সভা, পুং ক্রিকেট কিংবা পত্রিকার পাতায় ‘পুরুষালি’ সংখ্যা বা টেলিভিশনে ‘বীরপুঙ্গব’ জাতীয় কোন বিশেষ প্রোগ্রাম থাকে না। কারণ পুরুষ নিজেকে প্রভু ঠাওরায় সবখানে। সবই যখন তার, বিশেষ কিছুর আর কি দরকার। পুরুষকে পুরুষ প্রভু হয়ে উঠার এই লাইসেন্স তাকে দিয়েছে তার ধর্ম, তার সমাজ এবং তার নিজের রচিত বিধান। বাংলাদেশের সংসদে ঠেলেঠুলে সাকুল্যে ৩০ জন নারী আইন প্রণেতাকে পুরুষ রাজনীতিবিদরা দয়া করে স্থান দেন। সেখানে নারীর সমান অধিকার নিয়ে আইন পাশ করতে গেলে যে ৩০০ : ৩০ ভোটে বাতিল হবেই তা নিশ্চিত করে বলা যায়। দয়া বা অনুকম্পা যেখানে মূখ্য সেখানে সমান অধিকারের কথামালা স্রেফ বাতুলতা মাত্র।

হাজার বছর ধরে পুরুষ তার প্রকৃতিগতভাবে প্রাপ্ত উত্তেজিত বিশেষ প্রত্যঙ্গের হাতিয়ার সুবিধার জন্য নারীর উপর আধিপত্যবাদিতা প্রকাশ করে এসেছে। আনন্দ বা প্রজাতি উৎপাদনে প্রকৃতিগত কারণেই নারীকে থাকতে হয় নিষ্ক্রিয় নিষ্প্রভ। আনন্দ সমরে একেই নারীর পরাজয় বলে পুরুষ তার আদিপত্যবাদিতা ফলায়। পুরুষের শরীর ও তার ধর্মই তাকে শক্তি দেয় কয়েকগুন বেশি। প্রায় সব বড় ধর্মেই আছে, নারী কথা না শুনলে স্বামী তাকে পেটাতে পারবে। কিন্তু সমাজে হাজার পুরুষ আছে যারা নারীতো দূরে থাক কারও কথাই কোনোদিন শোনে নি। কিন্তু তাদেরকে পিটিয়ে সোজা করবার মতো কোথাও কেউ নাই। সব সমাজেই চুরি, ডাকাতি, রাহাজানি, খুন, ছিনতাই, ধর্ষণ, মাস্তানি, গুন্ডামি, বদমায়েশি সব করে পুরুষ। তবুও নারীকেই বলা হবে পুরুষের নীচ।

অকপটে পুরুষ নিজে সাধু সেজে যৌনকর্মীদের পতিতা বলে গালাগাল দিয়ে নারীর চৌদ্দ গোষ্ঠী উদ্ধার করলেও যৌথাচারী পুরুষকে কোথাও নিকৃষ্ট পতিত বলতে শোনা যায় না। পুরুষের নারীবিদ্বেষপনা এমনই নির্লজ্জ ও কপটতাপূর্ণ।

FB_IMG_1457372154643

ড. হুমায়ুন আজাদ তাঁর রচিত ‘নারী’ গ্রন্থে সূচারুরূপে নারী নিয়ে পুরুষের হাজার বছরের সুবিধাবাদী রাজনীতির স্বরূপ উন্মোচন করেছেন। তিনি বলেছেন, পিতৃতান্ত্রিক ধর্ম, সাধারণ বিশ্বাস এবং কখনো কখনো বিজ্ঞানও মনে করে যে, নারী পুরুষের সামাজিক মনস্তাত্ত্বিক পার্থক্যের মূলে রয়েছে তাদের শারীরিক পার্থক্য। কিন্তু আধুনিক ভ্রূণতাত্ত্বিকদের মতে, নারী ও পুরুষের উভয়েরই সূচনা ঘটে নারীরূপে। সপ্তম সপ্তাহে এসেই শুধু কোনো কোনো ভ্রূণ ক্রোমোসোম ভিন্নতার কারণে পুরুষ হয়ে উঠে। নারী হচ্ছে শুরু থেকে নারী, পুরুষ হচ্ছে শুরুতে নারী তারপর পুরুষ। নারীর ডিম্বানু ও পুরুষের শুক্রাণু – এই দু’ধরণের কোষের সম্মিলনে জীবন জ্বলে উঠলেও নারীর দায় কে অস্বীকার করে তাকে বলা হয় নিষ্ক্রিয়। পুরুষেরা বিধান তৈরী করেছে। তাতে একচেটে সুবিধা দেয়া হয়ছে পুরুষকে। তারা মুখর হয়েছে নারী নিন্দায়।

জীবন সৃষ্টিতে শুক্রাণু ডিম্বাণুর ভূমিকা সমান সমান হলেও মানুষের কৃতজ্ঞ থাকার কথা ছিল নারীর ডিম্বাণুর কাছে। কারণ প্রারম্ভিক জীবন লালনে ডিম্বাণুর ভূমিকা অনেক বেশি। ডিম্বানুর ভিতর শুক্রাণু প্রবেশের পর ডিম্বাণু ভ্রূণটিকে লালন করে, পুষ্টি যোগায়, তাকে বিকশিত করে তোলে। প্রকৃতিগতভাবে নারীই জীবনের প্রধান স্রষ্টা বা মাতা হলেও ইহুদি, খ্রিস্টান বা মুসলমানের চেতনায় নারী এক অশীল বক্র হার বিশেষ। ধর্মগ্রন্থগুলোতে হাওয়া বা ইভের আগেই আদমকে তৈরি করে উল্টে দেওয়া হয়েছে জন্মের সাধারণ রীতি। নারীকে জন্ম দেওয়া হয়েছে পুরুষের দেহ থেকে। পুরুষই হয়ে উঠেছে নারী জাতির মাতা। ধর্মের কারবারী পুরুষেরা এই সুযোগে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্য জাহির করে লৈঙ্গিক রাজনীতির মাধ্যমে নারীকে করে রেখেছে দ্বিতীয় লিঙ্গ।

আজন্ম অধিকার বঞ্চিত নারীদের মধ্যে কোন দান্তে নেই, শেক্সপিয়র নেই, রবীন্দ্রনাথ নেই। নিউটন, আইনস্টাইন নেই। ভিঞ্চি, পিকাসো, প্লেটো, এরিস্টটল বা মার্ক্স নেই। কোন প্রেরিতপুরুষও নেই। কিন্তু সত্য হচ্ছে পুরুষদের মধ্যেও এদের মানের লোক বেশি নেই। এ প্রসঙ্গে ড. হুমায়ুন আজাদ তাঁর রচিত নারী সম্পর্কিত বাঙলা ভাষার ধ্রুপদী গ্রন্থ সেই ‘নারী’তেই আরও বলেছেন, ‘নারীকে শিক্ষা থেকে দূরে সরিয়ে রেখে বলা যায় না নারী অশিক্ষিত। তাকে বিজ্ঞান থেকে বহিস্কার করে বলা যায় না নারী বিজ্ঞানে অনুপযুক্ত। নারীর কোন সহজাত অযোগ্যতা নেই, তার সমস্ত অযোগ্যতা পুরুষের সৃষ্টি, সুপরিকল্পিত বা রাজনীতিক ষড়যন্ত্র’।

এমন নিলাজ পুরুষ সম্পর্কে ফরাশী ঔপন্যাসিক, দার্শনিক ও নারীবাদের প্রধান প্রবক্তা সিমোন দ্য বোভোয়ার তার ‘সেকেন্ড সেক্স’ গ্রন্থে বলেন, ‘পুরুষের মুখে স্ত্রীলিঙ্গ কথাটি অবমাননাকর শোনায়, তবু পুরুষ তার পাশবিক স্বভাব সম্পর্কে লজ্জিত হয় না; বরং কেউ যদি তার সম্পর্কে বলেঃ সে পুরুষ! তখন সে গর্ববোধ করে। ‘স্ত্রীলিঙ্গ’ শব্দটি অমর্যাদাকর, এ কারণে নয় যে এটি জোর দেয় নারীর পাশবিকতার ওপর, বরং এজন্যে যে এটি তাকে বন্দী করে রাখে তার লিঙ্গের মধ্যে’।
কেবল পুরুষ নয় সমাজের পরম পুরুষরাও সচেতনে অস্বীকার করেছেন নারীর একক অস্তিত্ব বা সম্পূর্ণ বাস্তবতা।
পুরুষের এক মহৎ প্রতিনিধি আমাদের কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও যেমনটা বলেছেন,
শুধু বিধাতার সৃষ্টি নহ তুমি নারী!
পুরুষ গড়েছে তোরে সৌন্দর্য সঞ্চারি। অথবা
অর্ধেক মানবী তুমি অর্ধেক কল্পনা।

নিজের সর্বস্ব নিংড়ে দিয়েও পরম পুরুষের কাছেও যখন নারী তার সম্পুর্ণতা আদায় করতে পারে নি। সেখানে আমরা সাধারণ সে কোন ছাড়।
যে নারীর রক্ত দুগ্ধ পানে পরিপুষ্ট মানুষ আমি, তাকে সবার ওপরে স্থান দেওয়ার মতো ঔদার্যতা নাইবা হলো। নারীর রাজনৈতিক, আর্থ-সামাজিক অধিকার প্রতিষ্ঠা, সকল নিপীড়ন, নির্যাতন ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে সরব হয়ে আসুন অন্তত আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের অমোঘ পঙক্তিমালা মনে প্রাণে বিশ্বাস ও চর্চা করি।
বিশ্বের যা কিছু মহান সৃষ্টি চির কল্যাণকর
অর্ধেক তার করিয়াছে নারী অর্ধেক তার নর।

লেখকঃ সংবাদকর্মী, মাছরাঙা টেলিভিশন
০৮ মার্চ ২০১৬
facebook.com/fardeen.ferdous.bd
twitter.com/fardeenferdous