ক্যাটেগরিঃ খেলাধূলা

 
2.+A13T1990

কাব্যকলায় শিবঠাকুরের বিয়েতে মেঘের ঘনঘটা কিংবা বাজ বিজুলি হানা দিয়ে দয়িত দয়িতার আসন্ন সম্মীলন সুখ কবিগুরুকে স্মৃতিকাতর করে করুক, কিন্তু বৃষ্টির উৎপাত কত প্রকার ও কি কি গেল সাতদিন অনুভব করেছে কেবল আমাদের ক্রিকেট শার্দুলরা। আইসিসির ঘোরপ্যাচে বিশ্বকাপে যেতে নেদারল্যান্ড, আয়ারল্যান্ড বা ওমানের সাথে ক্রিকেট পরীক্ষা দিয়ে আমাদেরকেও এক অদ্ভূত বাছাইপর্ব উত্তীর্ণ হতে হয়। আবার সেই খেলাগুলো গিয়ে পড়ে কিনা ধর্মশালায়। বাঙালির কাছে ভারতীয় হিমাচল প্রদেশের যে ধর্মশালার নাম ইতোমধ্যে পরিবর্তিত হয়ে ‘বৃষ্টিশালায়’ পরিগণিত হয়েছে!

অবশেষে এই বঙ্গভূমির ক্রিকেটীয় সুবর্ণপুত্ররা সেই ‘বৃষ্টিশালা’র ধারাবাহিক মেঘাক্রমণ আর আইসিসি আরোপিত আরাফাত সানি ও তাসকিনের বোলিং সংশয়ের মানসিক চাপ পেছনে ঠেলে বিশ্বকাপের বন্দরে তাদের ক্রিকেটযাত্রার ঘাঁটি গাড়তে পেরেছে। হাজারো চড়াই উৎরাই পেরিয়ে ওমানকে একরকম কাঁটাছেড়া করে নিজেদেরকে জানান দিয়েই বীরদর্পে টি-২০ বিশ্বকাপের সুপারটেনে পৌছে গেছে আমাদের প্রাণের বাংলাদেশ। এবার তবে টাইগারদের কুর্নিশেই গীত হোক বাংলা ক্রিকেটের জয়গান।

আজকাল ক্রিকেটমাঠে আমাদের বর্ণিল উদযাপনটা দেশের কিছু কঠিন কঠোর দুঃখকেও খানিকটা ভুলিয়ে রাখতে পারছে যেন। আর সেই উদযাপনের জাদুকর যদি ক্রিকেটের ড্যাশিং হিরো তামিম ইকবাল হন। তবে আর কোনো কথা হবে না।

সেঞ্চুরির আকাশ ছুঁয়ে লম্ফ দিয়ে শূণ্যে ভেসে গিয়ে বাতাসে ঘুষি ছুড়ে নিজের ক্ষিপ্রতার জানান দিয়ে আক্রমণাত্মক এক অনিন্দ্য সৌন্দর্যে পুরো বাংলাদেশকেই যেন বিশ্ব ক্রিকেটে রিপ্রেজেন্ট করে দেখাতে জানেন আমাদের তামিম ইকবালরা। বাংলাদেশের হয়ে প্রথমবারের মতো টি-২০ সহস্রক্লাবে প্রবেশ আবার ৬৩ বলে ১০৩ রান করে অপরাজিত প্রথম বাংলাদেশি সেঞ্চুরিয়ানের তকমাটা আইসিসি তথা বিশ্ব ক্রিকেট মোড়লদের চোখ রাঙানির এক মোক্ষম জবাব বলেই প্রতিভাত হয়। কোচ হাথুরুসিংহেকে দেয়া প্রতিশ্রুতি কিংবা নিজের নবজাতকের জন্য সূচনা উপহার হয়ে অনবদ্য শতকের গৌরবের মালাটা যখন তামিমের গলায় ঝুলে, ক্রিকেটের বিশ্ব চোখ যখন তামিমের নান্দনিকতায় বিমুগ্ধ হয়, ঠিক সে সময় আমাদের মুস্তাফিজরা এক ভিন্নতর প্রতিভা দিয়ে যাদের চোখে জ্বালা ধরিয়ে দিয়েছে সেই ভারতীয় স্পিনার রবিচন্দ্রন অশ্বিনরাও আমাদেরকে কুর্নিশ করতে বাধ্য হন। বাংলাদেশের পরাজয় প্রার্থনায় আমাদের প্রতিপক্ষের প্রতি নিরঙ্কুশ সমর্থন জানিয়েও তাদের নিলাজ টুইটে কিচিরমিচির করতে হয়, ‘হোয়াট আ নক ফ্রম তামিম! টেক আ বাও!’
8.+ALM_4559
আমাদের অধিনায়ক ও ক্রিকেট হিরো মাশরাফি বিন মর্তুজার শিষ্যরা নিজেদের ক্রিকেট ম্যাজিকে আজ ক্রিকেট মোড়লদের আকাশচুম্বী অহমিকা ও আত্মম্ভরিতাকে ধুলায় লুটাতে পারছেন। পরশ্রীকাতর ও হিংসুকদেরকে মাটিতে পা রাখবার মন্ত্রণাটা দিতে পারছেন। স্বঘোষিত বড় ঝিঁঝিঁপোকাদের অভিধানের অভিজাত পাতায় সোনার অক্ষরে তামিম সাকিবরা নিজেদের নাম লিখিয়ে চলেছেন। আর নিজেদেরকে স্মরণীয় করতে রবিঠাকুরের সুরে ক্রিকেটের সুবাসিত পুষ্পে ভ্রমর হয়ে গুণগুণিয়ে গান শুনিয়ে যাচ্ছেন, হেলাফেলা সারাবেলা একি খেলা আপন সনে/এই বাতাসে ফুলের বাসে মুখখানি কার পড়ে মনে!

সেইসাথে আমাদের ক্রিকেটের বাংলাগায়েনদের উদ্দেশ্যে আমরাও আনন্দাশ্রুতে ভিজে গিয়ে গেয়ে চলছি, আঁখির কাছে বেড়ায় ভাসি কে জানে গো কাহার হাসি/দুটি ফোঁটা নয়নসলিল রেখে যায় এই নয়নকোণে!

ক্রিকেট খেলাটার তথাকথিত ভালোর জন্য যারা ওমানের জয় কামনা করে বাংলাদেশকে ব্যাকফুটে ঠেলে দেয়ার প্রার্থনা করেন, সেই তাদের সাথেই এবার আমাদের আসল লড়াই শুরু। আমাদের বাংলা ক্রিকেটের প্রিয় সন্তানেরা নিশ্চয় সেই যুদ্ধটা লড়েই দেখিয়ে দেবে, তোমাদের ভাষায় আমরা আর ছাই ফেলতে ভাঙা কুলো নই! আমরা আপন দ্যোতিতেই ক্রিকেটীয় অনিবার্যতার অবিনাশী যোদ্ধা। ‘ও মা তোমার চরণ দুটি বক্ষে আমার ধরি, আমার এই দেশেতে জন্ম যেন এই দেশেতে মরি’- দেশ ও মানুষের নামে এই পণ নিয়েই আমাদের বিরামহীন যুদ্ধটা চলবে। তোমরা আমাদের তাসকিনের পরীক্ষা নেবে, আরাফাত সানির পরীক্ষা নেবে, নাও। তোমরা তামিম সাকিব বা বিশুদ্ধ অধিনায়ক মাশরাফিরও পরীক্ষাও নিয়ে নাও। আমাদের একদম কোনো হাহুতাশ নেই! আমরা আগুনে পুড়ে পুড়েই খাঁটি সোনা হতে শিখে গেছি। তাই আর কে ঠেকায় ক্রিকেটীয় কালের পথে আমাদের অগ্রযাত্রা?
tamim+mash+on+sabbir

টি-২০ বিশ্বকাপের মূলপর্বের দ্বিতীয় গ্রুপে ১৬ মার্চে কলকাতার ইডেনগার্ডেনে পাকিস্তানের সাথে দেখা হবে টাইগারদের। সেদিন কি ফিরে আসবে মিরপুরের ০২ মার্চ? অথবা ২৩ মার্চে ভারতের অধিনায়ক মহেন্দ্র সিং ধোনি রাগের কাছে হার মেনে আমাদের তামিম ইকবালকে আরেকবার গুতো মেরে বসবেন? ০২ মার্চ বারবার ফিরে আসুক আর মুস্তাফিজের ভুবন ভোলানো কাটারে কোহলিরা চোখ রাঙাক। সবই ক্রিকেটানন্দেরই অনুষঙ্গ।

আমরা সবটাতেই সর্বান্তকরণে আছি আমাদের দুর্দান্ত ব্যাঘ্রশাবকদের সাথে। তবে স্বঘোষিত বিগ থ্রি’র কাউকে যদি আমাদের ক্রিকেট নৈপূণ্যের দুর্ধর্ষতা দিয়ে পরাভব মানাতে পারি, তা হবে বিশেষভাবে অবিস্মরণীয়। আর সেটাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। ইন্ডিয়া, অস্ট্রেলিয়া তোমরা প্রস্তুত হও, আমরা আসছি। টি-২০ বিশ্বকাপ সর্বোতভাবে আমাদের বাংলাদেশের জন্য শুভ হয়ে আরাধ্য অভিলাষেরা ধরা দিক। গো টাইগার্স!

লেখকঃ সংবাদকর্মী, মাছরাঙা টেলিভিশন
১৫ মার্চ ২০১৬
facebook.com/fardeen.ferdous.bd
twitter.com/fardeenferdous