ক্যাটেগরিঃ পাঠাগার

 

অন্তর মম বিকশিত করো
অন্তরতর হে।
নির্মল করো, উজ্জ্বল করো
সুন্দর করো হে!
আজ ২৫শে বৈশাখ সেই সুন্দরের পূজারী কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শুভ জন্মদিন। ১২৬৮ বঙ্গাব্দের এই দিনে বাবা দেবেন্দ্রনাথ ও মা সারদা দেবীর কোল আলো করে ধুলির ধরায় গুরুদেবের আগমন ঘটেছিল। ‘জল পড়ে পাতা নড়ে’ দিয়ে যার দর্শনকথার শুরু তার গৌরবময় পরিসমাপ্তি ঘটে ‘তোমার সৃষ্টির পথ রেখেছ আকীর্ণ করে/ বিচিত্র ছলনা জালে হে ছলনাময়ী’র-মধ্য দিয়ে।
Rabindranath-Tagore
জ্ঞানাশ্রম শান্তিনিকেতনে কবিগুরুর প্রাত্যহিক বৈঠকে নানা শ্রেণিপেশার ভক্ত উপস্থিত হতেন। একদিন সেই বৈঠকে তিনি একটি সুন্দর ফাউন্টেন পেন বা ঝরনা কলম উপস্থিত সবাইকে দেখিয়ে বললেন, ‘এটা আমি কিনেছি’। ‘দেখি গুরুদেব’ ‘দেখি গুরুদেব’ বলে তৎক্ষণাৎ হুলস্থুল কান্ড বাঁধিয়ে কেউ একজন কলমটা গায়েব করে দিলেন। কবিগুরু মন ভার করলেন, কিন্তু কাউকে কিছু বুঝতে দিলেন না।
এর কয়েকদিন পর এমন এক প্রাত্যহিক বৈঠকে ভক্তদের একজন বলে বসলেন, ‘গুরুদেব, পূর্ববঙ্গে একটা কথা আছে এই যে- কাগা বগায় খায় মাছ, মাছরাঙাই কলঙ্কিনী। এটার পাদপূরণ কী হবে? কবি গোঁফে হাসির রেশ টেনে বলে উঠলেন-
কাগা বগায় খায় মাছ, মাছরাঙাই কলঙ্কিনী;
কলম চেয়ে লিখে সবাই, আমিই শুধু কলম কিনি!

যার ভবিতব্যে ছিল শুধু লেখালেখি, সুর-সংগীত, আঁকাআঁকি, ভাষণ বা দর্শনচিন্তা দিয়ে বাঙালির গুরুদেব বা কবিগুরু হয়ে ওঠবেন, তাঁকে শত সহস্র কলম কিনতে হবে বৈকি। সেই তিনি ভক্তের সাথে যতই মশকরা করুন। কবিতা, উপন্যাস, সংগীত, নাটক, চিত্রকলা, ছোটগল্প, প্রবন্ধ, অভিনয়, কন্ঠশীলন প্রভৃতি চিত্তবৃত্তির চর্চায় যখন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে বাংলা ভাষার সর্বশ্রেষ্ঠ দার্শনিক ও সাহিত্যিক হয়ে ওঠতে হয়, লাখো কলম আর অযুত দিস্তা কাগজে কী কথার সমাপণ ঘটে? তাই সবাই কলম চেয়ে লিখুক, কবিকে কিন্তু কলম কিনেই সাহিত্য চর্চাটা অব্যাহত রাখতে হয়েছে। কলকাতার জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবারের জমিদার বংশে জন্ম বলে কলম কিনে পকেট ফতুর হওয়ার ভয় কবির ছিল না। ৫২টি কাব্যগ্রন্থ, ৩৮টি নাটক, ১৩টি উপন্যাস, ৩৬টি প্রবন্ধ, ৯৫টি ছোটগল্প আর ১৯১৫টি গান নিয়ে ৩২ খন্ডে রবীন্দ্র রচনাবলী প্রকাশিত। যিনি দুই হাজারের মতো ছবিও এঁকেছেন। এমন যাদুকরী শিল্পপুরুষের কলমের অবাক গতি নিয়ে অপার বিস্ময়বোধে তাড়িত হওয়া যায়, কোনো কথা বলা চলে না। এখানে রবীন্দ্রনাথই স্বয়ং ত্রাতা হয়ে ওঠতে পারেন। তাঁর নিজের কথায়, অনেক কথা যাও যে বলে কোনো কথা না বলি’র মতো করে বিমুগ্ধ নির্বাক অনুরণনটাই কেবল সচল রাখা চলে, আর কিছু না!

C1HXvYVyyELp
রবীন্দ্রনাথের সংগীত ছাড়া বাঙালি দিনগুজরানের কথা ভাবাটা বৃথা। প্রেম-বিরহ, সুখ-দুঃখ, প্রকৃতি বা ঋতু বন্দনা, মানবীয় সকল গুণ-অগুণের আনন্দযজ্ঞের ফুল তোলে বেছে বেছে মালা গাঁথবার যে কবিসত্তার প্রয়াস, তার মূলভূমি হলো কবিগুরুর ১৯১৫টি গান। উপনিষদ, হিন্দুপুরাণ, সংস্কৃত কাব্যনাটক, বৈষ্ণব ও বাউল দর্শনের প্রভাব, বাংলা লোকসংগীত, কীর্তন ও রামপ্রসাদী, এমনকি পাশ্চাত্য ধ্রুপদি সুরসুধার প্রভাবজাত এই অমৃত সংগীত হয়ে ওঠেছে বাঙালির প্রাণেরই সুর। ‘আহা আজি এই বসন্তে কত ফুল ফোটে কত পাখি গায়’ কিংবা ‘এসো হে বৈশাখ, এসো, এসো’ না গাইলে কি আর আজকাল বাঙালির ঘরে ঘরে প্রাণপ্রাচুর্যের বসন্ত বা রৌদ্রগ্রীষ্মের কৃষ্ণচূড়া লাল বৈশাখ আসে? কবি তাঁর সংগীতকে এক অনুপম প্রার্থনা হিসেবে নিয়েছিলেন। সেই প্রার্থনায়, ঈশ্বর, প্রকৃতি, মানবীয় বোধ সব মিলেমিশে একাকার যেন। কবি এভাবে তাঁর ওপর মহাস্রষ্টা অর্পিত জ্ঞানের মুক্তি খুঁজেছিলেন। তাইতো তিনি ‘প্রার্থনা’ কবিতায় যথার্থ বলেছেন,
চিত্ত যেথা ভয়শূণ্য, উচ্চ যেথা শির,
জ্ঞান যেথা মুক্ত, যেথা গৃহের প্রাচীর
আপন প্রাঙ্গণতলে দিবসশর্বরী
বসুধারে রাখে নাই খন্ড ক্ষুদ্র করি…

আবাল্যেই উপনিষদীয় ভাবধারায় উদ্দীপ্ত ঋষি কবি রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘মানুষের ধর্ম’ গ্রন্থে লেখেন, ‘মানুষের আলো জ্বালায় তার আত্মা, তখন ছোটো হয়ে যায় তার সঞ্চয়ের অহংকার৷ জ্ঞানে-প্রেমে-ভাবে বিশ্বের মধ্যে ব্যাপ্তি দ্বারাই সার্থক হয় সেই আত্মা৷ সেই যোগের বাঁধাতেই তার অপকর্ষ, জ্ঞানের যোগে বিকার ঘটায় মোহ, ভাবের যোগে অহংকার, কর্ম যোগে স্বার্থপরতা৷ বাঙালিয়ানার প্রবল প্রাণশক্তি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মনে করতেন সাম্প্রদায়িক ধর্মের চেয়ে হৃদয়- ধর্মই শ্রেষ্ঠ। যার মধ্যে হৃদয়ধর্মজাত সত্যবোধ নেই তার ধর্মাচারণ মিথ্যাচারণ মাত্র। আচার-ধর্ম ও মানব-সত্যের সংঘাতে রবীন্দ্র সাহিত্যে মানবসত্য লাভ করেছে বিপুল মহিমা। কাজেই জীবনের সর্বভূমির কবি বা ঋগবেদের ভাষায় ‘কবীনাং কবিতমঃ’ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাহিত্য কর্মের প্রধানতম আরাধ্য ছিল সত্য ও সুন্দরে আবিষ্ট প্রকৃত মানুষের অনুসন্ধান।

কবি তাঁর এই অনুসন্ধিৎসু মন পেয়েছিলেন বাল্যকালে নিজ গৃহেই। পাঠশালার প্রথাবদ্ধ পড়াশোনা তাঁর ভালো লাগেনি। কার্যত নিজের গৃহশিক্ষকই হয়ে উঠেছিলেন শেষ ভরসা। বহুসন্তাবতী কুলপালিকা মাতার স্নেহদৃষ্টি বঞ্চিত রবীন্দ্রনাথের বাল্যকাল কেটেছে সদর অন্দর মহলের বাইরে, চাকরদের অধিকৃত দ্বিতলের এক গৃহকোণে ভৃত্যশাসনের গন্ডি-ঘেরায়। কবিগুরু নিজেই তাঁর জীবনস্মৃতিতে উল্লেখ করেছেন, ‘চাকরদের মহলে যে সকল বই প্রচলিত ছিল তাহার লইয়া আমার সাহিত্য চর্চার সূত্রপাত হয়। তাহার মধ্যে চাণক্যশ্লোকের বাংলা অনুবাদ ও কৃত্তিবাসের রামায়ণই প্রধান’। এরপর জয়দেব, কালিদাস, বেদান্ত ধর্মমত উপনিষদ পাঠ রবিকবির আপন মানস গঠনে বড় ভূমিকা রেখেছে। এমনকরে ধীরে ধীরে গৃহশিক্ষিত ও আত্মশিক্ষিত রবীন্দ্রনাথ পৃথিবীর পথে তাঁর পথচলা শুরু করেন। সাহিত্যে শ্রেষ্ঠ পুরস্কার নোবেল প্রাইজও পান। কালে তিনি হয়ে ওঠেন মানবীয় জীবনভাবনা ও জগৎদর্শনের শ্রেষ্ঠ প্রতিভূ। কবির মন ও কবিতার ভাষায় কাব্যসৃষ্টির অপার বিস্ময় নিয়ে আবির্ভূত হন রবীন্দ্রনাথ। তারপর নিজের কাঁধে দায়িত্ব তোলে নিয়ে প্রাণের কান্না হাসির খবর জানাতে গানে-কথায় জগতের আনন্দযজ্ঞে মানবপ্রাণকে নিমন্ত্রণ জানান কবি। তিনি নিজেই গীতাঞ্জলিতে যেমনটা বলেন,
জগতে আনন্দযজ্ঞে আমার নিমন্ত্রণ
তোমার যজ্ঞে দিয়েছ ভার
বাজাই আমি বাঁশি।
গানে গানে গেঁথে বেড়াই
প্রাণের কান্না হাসি।

11

মানুষ, প্রাণ ও জগতকে ভালোবাসবার কথা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতো করে আর কে বলতে পেরেছে? রাবীন্দ্রিক ভাব ভালোবাসায় যদি উচ্চারণ না করা যায়, ‘কতবার ভেবেছিনু আপনা ভুলিয়া/ তোমার চরণে দিব হৃদয় খুলিয়া/ চরণে ধরিয়া তব কহিব প্রকাশি/ গোপনে তোমারে, সখা, কত ভালোবাসি’। তবে বাঙালির প্রেম যেন অপ্রকাশ্যই থেকে যায়। রবিকবির মতো করে যদি, ‘তোমারেই করিয়াছি জীবনের ধ্রুবতারা/ এ সমুদ্রে আর কভু হব নাকো পথহারা’পঙক্তিমালা হৃদয়ের তন্ত্রিতে সুর হয়ে বাজে, তবেই কেবল প্রেমের সুখপাখিরা ‘ভালোবাসি ভালোবাসি’ বলে প্রাণখুলে ডাকতে পারে!
বিশ্বভারতী ও শান্তিনিকেতনের অমর স্রষ্টা রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘তোতা কাহিনী’ গল্পে বিদ্যালয়ের মুখস্ত-সর্বস্ব শিক্ষাকে প্রতি তীব্রভাবে আক্রমণ করেন। এই গল্পে রবীন্দ্রনাথ দেখিয়েছিলেন, দেশের ছাত্রসমাজকে খাঁচাবদ্ধ পাখিটির মতো শুকনো বিদ্যা গিলিয়ে কিভাবে তাদের বৌদ্ধিক মৃত্যুর পথে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। আমাদের কালে তাঁর এই চিন্তা বড় প্রাসঙ্গিক। বিশ্বভারতীতে কবি সনাতন ভারতীয় শিক্ষাব্যবস্থার ব্রহ্মচর্য ও গুরুপ্রথার পুনর্প্রবর্তন করেছিলেন। এভাবে শিক্ষা সম্পর্কে প্রথাবিরুদ্ধ চিন্তাভাবনা শুরু করেন রবীন্দ্রনাথ।

কবির দেশাত্মবন্দনা এক অবিসংবাদিত অভিধায় ভূষিত। কবি যখন বলেন ‘ও আমার দেশের মাটি তোমার পর ঠেকাই মাথা’ –আমরা প্রবল প্রাণস্পন্দনে দেশমাতৃকার প্রেমে আন্দোলিত হই। তিনি যখন ধ্যানমগ্ন হয়ে এক আন্তরিক আবেশে উচ্চারণ করেন, ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’ –তা হয়ে ওঠে আমাদের দেশবন্দনার জাতীয় সুর ও সংগীত। সদা জাগ্রত চিত্তের আহবানকারী কবি সংস্কারমুক্ত উদার মানুষের সন্ধানে ব্যাপৃত ছিলেন। জাতি-ধর্ম-বর্ণ-গোত্র নির্বিশেষে যে মানুষের অনিন্দ্য ঐকতানেই সূচিত হবে বাংলার মায়ের সত্যিকারের মুক্তি। অন্ধকার হরণকারী আলোর উষা উৎসবই ছিল কবির আজন্মের আরাধনা ও অনুসন্ধিৎসা। প্রাণ জাগানিয়া প্রভাতপাখির গান আর রবির করেই তিনি বিস্ময়াভিভূত হতেন!
আজি এ প্রভাতে রবির কর
কেমনে পশিল প্রাণের পর
কেমনে পশিল গুহার আঁধারে প্রভাতপাখির গান
না জানি কেনরে এত দিন পরে জাগিয়ে উঠিল প্রাণ।

বাঙালিয়ানার প্রাণপুরুষ…
বাংলাদেশের জাতীয় সংগীতের অমর স্রষ্টা…
আমাদের প্রাণের সখা…
কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রতি অশেষ শ্রদ্ধাঞ্জলি!
শুভ জন্মদিন প্রিয় বিশ্বকবি!

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নিজের কন্ঠে তাঁর রচিত গান ও কবিতা ০১
বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নিজের কন্ঠে তাঁর রচিত গান ও কবিতা ০২

লেখকঃ সংবাদকর্মী, মাছরাঙা টেলিভিশন
২৫ বৈশাখ ১৪২৩। ০৮ মে ২০১৬!
twitter.com/fardeenferdous
facebook.com/fardeen.ferdous.bd