ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস

51-protest-teacher-19052016-02

বাংলাদেশের এখনকার অসহিষ্ণু সময় বিবেচনায় ধর্মাবমাননার মতো জ্বলন্ত ইস্যুকে কেন্দ্র করে জোরজবরদস্তিতে নারায়ণগঞ্জের ওসমান বংশের কনিষ্ঠ ভ্রাতা সাংসদ সেলিম ওসমানের উপস্থিতিতে একজন শিক্ষক শ্যামল কান্তি ভক্তকে মারধর ও কানে ধরে উঠবস করার ঘটনার ডালপালা ব্যাপকভাবে বিস্তৃত হয়েই চলেছে। শিক্ষকের অমর্যাদার বিরুদ্ধে দেশবাসীর জোরদার সমস্বরিক প্রতিবাদের মুখে বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটি কর্তৃক উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বহিষ্কৃত ওই শিক্ষকের বিরুদ্ধে প্রাথমিক তদন্তে কোনো ধরণের ধর্মাবমাননার প্রমাণ না পাওয়ায় তাঁকে স্বপদে বহাল এবং বিতর্কিত ম্যানেজিং কমিটি বাতিল করা হয়েছে বলে বৃহস্পতিবার সকালে জানিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী।

গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী শিক্ষার্থীকে মারধর ও ‘ইসলাম ধর্ম নিয়ে কটূক্তির’ অভিযোগে গত ১৩ মে শুক্রবার নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলার পিয়ার সাত্তার লতিফ উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শ্যামল কান্তি ভক্তকে স্থানীয় সাংসদ সেলিম ওসমানের উপস্থিতিতে মারধর ও কানে ধরে ওঠবস করানো হয়। পরে তাঁকে সাময়িক বরখাস্ত করে বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটি। এ নিয়ে কয়েক দিন ধরেই নিন্দা ও প্রতিবাদের ঝড় বইছে। সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমেও তোলপাড় করা এ ঘটনায় ব্যাপক সমালোচনা হচ্ছে।

এমন বাস্তবতায় নিজের বিরুদ্ধে উঠা বিতর্ক নিরসনে একই দিন সকালে সংবাদ সম্মেলন করেছেন সেলিম ওসমান। সংবাদ সম্মেলনে সেলিম ওসমান শিক্ষক শ্যামল কান্তি ভক্তকে ‘তারছেঁড়া’ আখ্যা দিয়ে বলেছেন, ঐ শিক্ষক ব্রেনের উন্নত চিকিৎসার জন্য ভারতের ভেলোরে যেতে চান এবং সাংসদ তাঁকে সহায়তা করতে প্রস্তুত। জাতীয় সংসদের একজন দায়িত্বশীল আইনপ্রণেতার এমন বক্তব্যে আমরা এবার বলতে পারি, জীবন সংশয়ী মারধর বা চরম অসম্মানিক কানে ধরে উঠবসেই ঐ শিক্ষকের কথিত ‘ধর্মাবমাননার’ নিদান হয়নি। তাঁকে ভারতেই চলে যেতে হবে? ৪৭’র দেশভাগের পর কিছু সাম্প্রদায়িক মুসলিমের উৎপীড়নে এদেশের সংখ্যালঘু হিন্দুদের নিজভূমি থেকে বিতারণের সেই দহনকাল কি তবে এইভাবে আবার ফিরিয়ে আনা হবে? দেশ ছাড়তে হবে নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষক শ্যামল কান্তি ভক্তকে?

সামগ্রিক অবস্থাদৃষ্টে এমনটা না ভাববার কারণ নাই। কারণ নামে জাতীয় পার্টি তবে সরকার সমর্থক এই সাংসদ বলেই দিয়েছেন, ঈমানদার মুসলমানেরা শিক্ষকের শাস্তি চেয়েছিলেন তাই তিনি জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচতে শিক্ষক অবমাননায় ঘি ঢেলেছেন। তবে তিনি তা করেছেন, শিক্ষকের প্রাণ বাঁচাতে। তার মানে হলো এই ওসমান ভ্রাতারা ঐ এলাকায় ইতোমধ্যে মহান ঈশ্বরের সমকক্ষতা অর্জন করবার দাবি করছেন। না হলে ওনারা মানুষের প্রাণ সংহার বা প্রাণদানের ক্ষমতা রাখেন কি করে?

অথচ কে না জানে, এই ওসমান ভ্রাতারা নারায়ণগঞ্জকে ত্রাসের রাজত্ব, সন্ত্রাসের নগরী, খুনের উপত্যকা, অনাচারের বধ্যভূমি, স্বেচ্ছাচারিতার জল্লাদকূপ আর ন্যায়নিষ্ঠা বিবর্জনের ইতিহাসে রূপান্তর করেছেন। প্রগতিপুত্র মেধাবী ত্বকির বাবা মা কিংবা সাত খুনের ভূক্তভোগীদের মতো এমন হাজারো নির্যাতিতের অশ্রুকান্না, বিয়োগব্যাথা আর মর্মন্তুদ কারুণ্যরা আকাশে বাতাসে সেই সাক্ষ্য দিয়েই চলেছে। সেই দুর্বীনিত সাংসদ এবার জাতির সামনে ঔদ্ধত্যপূর্ণ প্রশ্ন ছুড়েছেন, আমরা কি ইবলিশের রাজত্বে বাস করছি, যে ঐ শিক্ষকের কাছে ক্ষমা চাইতে হবে?

আমরা এবার গলার স্বর উঁচু করে বলব হ্যাঁতো, আপনারা নিজেদের কুকর্ম দিয়ে, ছলচাতুরী আর ভেলকিবাজি করে, লোক ঠকিয়ে, মানুষ মেরে কেটে, লুটপাট করে, দেশের ভাবমূর্তির বারোটা বাজিয়ে দিয়ে, চরম অসভ্যতাকে সারথি করে গোটা নারায়ণগঞ্জকে ইবলিশের রাজত্ব বানিয়ে সেইখানে দুর্মর আনন্দ আয়েসে বসবাস করছেন। এবার সেই স্বৈরাসন ছাড়বার সময় এসেছে হে ওসমান ভ্রাতঃ। আলোর পথের ভালো বাঙালিরা দ্রোহের নিশান হাতে প্রতিবাদের ডঙ্কা বাজিয়ে হুঙ্কার ছাড়ছে যে। বীরমানুষের অভিশাপ দানা বাঁধছে তো। স্রেফ আপনাদের আসন এবার টলাবে বলে!

মহামতি লালন ফকিরের ভাষায় ‘মানুষ ভজে সোনার মানুষ হওয়া’ আপনার ঐ কদাকার জীবনে আর হবে না জনাব সেলিম ওসমান। আপনি এখন উগ্র মুসলিম সম্প্রদায়ে নাম লিখিয়ে দাম্ভিক ও হিংসুটে মোল্লাদের ক্ষেপিয়ে তুলছেন। ধর্ম নিয়ে পাশা খেলছেন, বাণিজ্য বেসাতি করছেন। তবে কেন খামোখা জিগির তোলেন, আপনাদের বাপ দাদারা মানুষের সমতা ও অধিকারে বিশ্বাসী ছিলেন। তাই বঙ্গবন্ধুর আওয়ামীলীগ করতেন। আর এখন আপনারা গলা উঠিয়ে বলছেন, আল্লাহকে যদি কেউ কটাক্ষ করে, একজন মুসলমান হিসেবে তাঁকে শাস্তি দেয়াই হলো জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষাকবচ। আর সাজানো ঘটনায় শাস্তির বেলায় প্রভুর বিচার কি হবে সেলিম সাহেব? তা জনাব অধার্মিক এমপি মহোদয় মহাপরাক্রমশালী মহান রাব্বুল আলামিন তাঁর নিজের অস্মমান দূরীভূত করবার দায়িত্ব আপনার মতো নস্যিকেই কবে দিতে গেল, বলতে পারবেন? ধর্মতো বলে আপনাদের কাছে আপাতঃ তুচ্ছ ঐ হিন্দু’র স্রষ্টাও স্বয়ং আল্লাহ্ই। তাহলে আল্লাহ্র সৃষ্ট সেই মানুষকে মিথ্যা অপবাদে শায়েস্তা করবার ভেকধারী ইসলামী নেতা বা ত্রাতা হয়ে উঠতে হলো আপনাকেই, কেন?

সম্প্রতি ফাঁস হওয়া নারায়ণগঞ্জ প্রেসক্লাবের এক সাংবাদিকের সাথে সেলিম ওসমানের শ্লীলতার সীমাছাড়া অশ্রাব্য কথাবার্তা শোনার পরও যেসব হেফাজতি ওলামা মাশায়েখ এই এমপিকে ঘিরে ধর্মরক্ষার স্লোগান দেন, মিছিল করেন, শিক্ষকের ফাঁসি দাবি করেন তাদের জন্য সেলিম ওসমানের গালাগালগুলো ডেডিকেট করা থাকল। একবার ভাবুন কী করতে কী করছেন!

আসল কথা হলো, এসব মোটেই ধর্মপালন বা ধর্মাচার নয়। আপনারা আসলে পরিবর্তিত হেফাজতের বাংলাদেশে ভেকধারী ধর্ম দিয়ে নিজেদের ফায়দা হাসিল করতে চান। কারণ প্রকৃত ধার্মিককে মাইকে ঘোষণা দিয়ে ধর্ম রক্ষায় নামতে হয় না। ধর্ম একান্তের, নিভৃতের, নিস্তব্ধতার। ধার্মিকের স্বর থাকে নিম্নগামী। তাঁর মন থাকে স্নিগ্ধ-সুশীতল। লোক দেখানো উচ্চবাচ্চে ঈশ্বরের আরাধনা হয় না। ধর্ম পালন করলে, সাতখুনের ক্রীড়নক নূর হোসেনকে পালা যায় না! ধার্মিক হলে শিশু ত্বকিকে হত্যা করে নদীতে ভাসিয়ে দেয়া যায় না মিস্টার এমপি সাহেব। আগে নিজের বিবেক ও বোধকে পরিস্কার করুন তারপর নাহয় ধর্মের ঘুঁটিতে পাশা খেলবেন।

সংবাদ সম্মেলনের নামে আপনার মিথ্যাচার আর হুমকি ধামকির মুখেও খানপুর শহরের নারায়ণগঞ্জ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন শিক্ষক শ্যামল কান্তি ভক্ত ইসলাম ধর্ম নিয়ে কোনো কটূক্তি করেননি জানিয়ে আসল সত্যটার হদিস দিয়েছেন। সেদিন আপনি সেলিম ওসমান তাঁর দুই গালে দুটি করে চারটি চড় মারেন। এরপর বলেন, ‘শালা কান ধর।’

আমরা জানি, এই রাষ্ট্র, বিচারব্যবস্থা, আইন-প্রশাসন ওসমান পরিবারের কেশাগ্রও স্পর্শ করতে পারবে না। বিনা অপরাধে সাজানো নাটক মঞ্চস্থ করে একজন নিরীহ শিক্ষকের গায়ে হাত তোলে, সর্বসমক্ষে কানে ধরে উঠবস করিয়ে যে অপমানটা করলেন মিস্টার সেলিম ওসমান। এই প্রেক্ষিতে আমরা এবার একটা কথাই বলতে পারি, হে প্রকৃতি, এই অপমান শতগুণে অভিশাপরূপে ফিরিয়ে দাও সেলিম ওসমান প্রতি। ওদের দম্ভ আর অহংকারে তাসের ঘর এবার নিমিষে ভেঙ্গে দাও। প্রকৃতির প্রতিশোধই বড় প্রতিশোধ। আর কিছু চাওয়ার নাই!

ঘটনা আর কতো প্রকারে নোংরাভাবে সাজালে তবে তাকে বানোয়াট বলা যাবে মিস্টার সেলিম ওসমান। আপনার অপকর্মের বিরুদ্ধে গণমানুষের প্রতিবাদকে যতোই বিভ্রান্তিকর আখ্যা দেন, সত্য একদিন আলোর মুখ দেখবেই। ইতোমধ্যে শিক্ষামন্ত্রণালয় শিক্ষক শ্যামল কান্তি ভক্তকে তাঁর স্বপদে বহাল করে সেলিম ওসমানের বশংবদ ম্যানেজিং কমিটিকে বাতিল ঘোষণা করে সে নজির রেখেছেন। আর শ্যামল কান্তি ভক্তকে লাঞ্ছনার ঘটনায় জাতীয় পার্টির ঐ স্থানীয় সাংসদ সেলিম ওসমানসহ জড়িতদের বিরুদ্ধে কেন আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল দিয়েছেন হাইকোর্ট। বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী ও বিচারপতি ইকবাল কবিরের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ বুধবার স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে এই রুল দেন।

এখন আমরা আমাদের এই সোনার বাংলাকে পুরোপুরি ধর্মস্থানে রূপান্তরিত হওয়ার আগে, মিথ্যা অজুহাতে নিগৃহীত অসহায় শিক্ষক শ্যামল কান্তি ভক্তকে পাগল সাজিয়ে ভারতে পুশ আউট করার আগে, বোধবুদ্ধি বিচার বিবেচনা ব্যাপকভাবে নারায়ণগঞ্জের ওসমানিয়া মতবাদে রূপান্তরিত হওয়ার আগে, সকল আশাবাদ তিরোহিত হওয়ার আগে, সরকারের তার ছিঁড়ে যাওয়ার আগে, সবকিছু নষ্টদের অধিকারে গিয়ে ভেঙ্গে পরার আগে দেশের প্রধান নির্বাহী মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে করজোড়ে অনুরোধ রাখতে চাই, মানুষের প্রকৃত মর্যাদাকে সমুন্নত রাখতে ওই পরিবারের পাশে থাকার অঙ্গিকার থেকে সরে এসে দয়া করে সময় থাকতে জীবন ও বোধবিনাশী এই ভয়ালদর্শন ওসমানিয়া গংরা চুড়ান্তরূপে ‘ফ্রাঙ্কেনস্টাইন’ হয়ে উঠবার আগে এই দূরাচার দৈত্যদের পায়ে শিকল পরান প্লিজ। নাহলে হয়ত একসময় বাঙালি হিসেবে কোথাও মুখ দেখানোর জায়গা থাকবে না!
বিব্রত ও বিধ্বস্ত মানুষের ক্রমবর্ধমান অভিশাপ না লাগুক আমার বাংলার গায়!

লেখকঃ সংবাদকর্মী, মাছরাঙা টেলিভিশন
২০ মে ২০১৬
https://twitter.com/fardeenferdous
https://www.facebook.com/fardeen.ferdous.bd