ক্যাটেগরিঃ দিনলিপি

আমার একমাত্র আত্মজা ওর মমতাময়ী মায়ের উদরাশ্রয় থেকে পৃথিবীর মুখ দেখবার পরই নিয়মভাঙ্গা দিয়ে যাত্রা শুরু করে। মানুষের এই ধর্ম যে, ভূমিষ্ঠকালেই কান্না দিয়ে জানিয়ে দেয় মাতৃজঠরের প্রশান্তির চেয়ে পৃথিবী কতোটা অসুখের, কতোটা অনিরাপদের। কিন্তু আমাদের ক্ষুদে জননী তা করল না। কান্না হাসির ধারেকাছেই গেল না ও। সেসময় আকাশ ভেঙ্গে বৃষ্টি নামল ওর হয়ে আমাদের সবাইকে কান্নাজলে ভিজিয়ে দিতে। আমরা কাঁদলাম, আনন্দে নয় অনাগত ভবিষ্যৎ শঙ্কায়!

13249682_1125108074199772_4159158_n
মে মাসে পৃথিবীতে আসা আমাদের এই কন্যাটি তার জন্মের চার মাস পার করে ফেলবার পরও সঠিক নাম নিশানার দিশা পাচ্ছিল না। অক্টোবরে সাহস করে একদিন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আমার শিক্ষাগুরু প্রথিতযশা নাট্যকার, তাত্ত্বিক ও অধ্যাপক সেলিম আল দীন স্যারের দ্বারস্থ হলে তিনি পৃথিবীর এই নবীন সদস্যের নাম রাখলেন ‘সুখপ্রীতা’। এক ও অদ্বিতীয় নাম। বাংলায় এমন শব্দবন্ধের ব্যবহার এর আগে আর ঘটেনি। এরপর পিতার চিন্তায় মুসলিম পুরাণের মহাপুরুষের ধ্যানগুহা হেরা অথবা গ্রিক পুরাণের স্বর্গরাণী ও উর্বরতার দেবী হেরাকে মাথায় রেখে কন্যাটি তার পূর্ণাঙ্গ নাম পেল ‘সুখপ্রীতা হেরা’।
আর সেই নামকরণের মাস ১৯১৫ সালের অক্টোবরের ছাব্বিশে দাদরা তালে ভৈরবী রাগে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছিলেন এই গান,
আলোকের এই ঝর্ণাধারায় ধুইয়ে দাও।
আপনাকে এই লুকিয়ে-রাখা ধুলার ঢাকা ধুইয়ে দাও ॥
যে জন আমার মাঝে জড়িয়ে আছে ঘুমের জালে
আজ এই সকালে ধীরে ধীরে তার কপালে
এই অরুণ আলোর সোনার-কাঠি ছুঁইয়ে দাও।

এই অসাধারণ সুরসম্ভারপূর্ণ সংগীতখানা যে, সুখপ্রীতার পিতৃপুরুষ তার সুকন্যার দশম বর্ষ সমাপনান্তে ঐ কন্যারই জন্য উৎসর্গ করবেন, তা জানলে গুরুদেব নিশ্চয় প্রীত হতেন।

২৫ মে প্রেম, দ্রোহ ও মানবতার কবি কাজী নজরুল ইসলামের জন্মজয়ন্তী সম্পন্ন হওয়ার দু’দিন পর ২৭ মে সুখপ্রীতার জন্মতিথি ফি বছর ঘুরে আসে। সুখপ্রীতার জন্ম ২০০৬ সালের ২৭ মে বলেই এই বছর জীবনের এক দশক পূর্ণ করল সে।
13315392_10206335917667289_4355528176644335357_n

২৬ মে ২০০৬ শুক্রবার মধ্যরাত্রি। জন্মযন্ত্রণার অসহ্যতায় রাতেই প্রসূতি মাকে স্থানীয় হাসপাতালে স্থানান্তর করা হলো। গাড়ি বা এ্যাম্বুলেন্সের বন্দোবস্ত করা গেল না বলে প্রতিবেশী সিদ্দিক মিয়ার ট্রলিকেই নিদানের ভরসা করা হলো। সুখপ্রীতা সময়ের পরিক্রমায় নিতান্ত বাধ্য হয়ে পৃথিবীর আলো বাতাসে শীঘ্র পা রাখতে চায়। কিন্তু পথ বড়ই বিপদসঙ্কুল। মায়ের অবর্ণনীয় কষ্ট। অপেক্ষার তীব্র দহন যন্ত্রণা। রাতভর আগুনের পথ পাড়ি দিয়ে অবশেষে ২০০৬ এর ২৭ মে শনিবার সকাল ৭টা ৫৫মিনিটে ‘ও’ স্বাভাবিক নিয়মে পৃথিবীর আলোয় নতুন প্রভাতের সূচনা করল বটে। কিন্তু ধাতৃবিদ্যায় অযোগ্য কালিয়াকৈরের রাবেয়া ক্লিনিকের গুমোট পরিবেশে মা ও সন্তান কঠোরতম সংকটে নিপতিত হলো। ভুল আমাদের নিয়তিরই, নইলে কেন আমরা ওই অখ্যাত ক্লিনিকেই মা ও সন্তানের জন্মতিথিটাকে সমর্পিত করতে গেলাম!

পৃথিবীতে মানব সৃষ্টির নিয়ম এটাই, মাতৃ জঠর থেকে বের হয়ে সন্তানকে কাঁদতে হবে। কিন্তু ও কাঁদল না। এমনকি কাঁদার জন্য শক্তি সঞ্চয়ী অক্সিজেনও সুখপ্রীতা গ্রহণ করতে পারছিল না। সে বড় নিদারূণ কষ্টের সময় হয়ে দেখা দিল আমাদের সবার জন্য। বেবিটা নাকি অতিরিক্ত সময় মায়ের উদরে থেকে এবং স্বাভাবিক পথে আসতে গিয়ে ব্রেনে চাপ পেয়ে ‘ব্রিথিং’ সমস্যায় আক্রান্ত হয়েছে। এই অবস্থায় বঙ্গবন্ধু মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. আতিকের পরামর্শে ঐ দিন বিকেলেই ওকে ঢাকার প্যানকেয়ার হাসপাতালে রেফার্ড করা হলো। ওর মুমূর্ষু মা পড়ে থাকল আগের ক্লিনিকেই। পরদিন মাকেও ঐ হাসপাতালে সন্তানের সান্নিধ্যে নিয়ে আসা হলো। কিন্তু সময়টা বড় মর্মন্তুদ হয়ে দেখা দিল। ঐ হাসপাতালের ডাক্তার সাহেবরা আশা ছেড়ে দিয়ে বলে দিলেন, সুখপ্রীতা স্বর্গে ফিরতে চায়-এছাড়া তার আর কোনো উপায় নাই! তবে শেষ চেষ্টা হিসেবে কোনো ‘এনআইসিইউ’তে নিয়ে দেখা যেতে পারে। বাঁধভাঙ্গা কান্না ও গভীর শোকগ্রস্ত অসুস্থ্য মাকে সামলানো দায় হয়ে দাঁড়ালো। শিশু হাসপাতালসহ অনেক জায়গায় খোঁজ করেও যখন এনআইসিইউ পাওয়া যাচ্ছিল না সেসময় আমার বউয়ের মামা ডা. ইমরান হোসেন খান স্বর্গদেবতারূপে আভির্ভূত হলেন। তাঁর ইচ্ছা ও ঐকান্তিকতায় বৃষ্টিস্নাত ঐ রাতেই সুখপ্রীতাকে ধানমন্ডির নিওন্যাটাল হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের পর্যবেক্ষণে রাখা হলো। সকল আত্মীয়-স্বজন কায়মনোবাক্যে জীবনস্রষ্টার কাছে এই প্রার্থনা করতে থাকলেন যে, সুখপ্রীতাকে যেন ভালোবাসা ও পরম মমতায় আমাদের সান্নিধ্যে থাকবার কৃপাটুকু করা হয়।
facebook_1464526997460

এনআইসিইউ’র চতুর্থ দিনে আমাদের পরম আরাধ্যের সন্তানটি মায়ের দুধ পান করতে পারল। কিন্তু সে এক অন্য মহান মায়ের দুগ্ধ। আমাদের কাছে আজীবনের জন্য অচেনা অথচ আমার কন্যার সাথে অচ্ছেদ্য বন্ধনে আবদ্ধ ঐ মায়ের জন্য সশ্রদ্ধ সালাম। ৩১ মে ৫ম দিনে প্রথমবারের মতো নিজের ঠোঁটে মায়ের স্তনস্পর্শে সুশীতল দুগ্ধপানে সুখপ্রীতা উদরপূর্তি করল। এবার চিকিৎসক আজফার হালিম আশাবাদের স্বপ্ন দেখালেন। এভাবেই সুখপ্রীতা তাঁর জীবন প্রাপ্তির ৭ম দিন ০২ জুনে এনআইসিইউ থেকে মায়ের কোলে ফিরে এসে আমাদের সবার সকল শূণ্যতা স্বর্গ সুখে ভরিয়ে দিল। সুখপ্রীতার মায়ের অসম্ভব ত্যাগ, নানা-নানুদের অবর্ণনীয় শ্রম ও ভালোবাসা, সকল আত্মীয়-স্বজন ও শুভানুধ্যায়ীর অশেষ প্রার্থনার পর সর্বশক্তিমানের ইচ্ছায় কন্যাটির জীবনঘরে বাতি জ্বলে উঠল। এরপর নানা বাহানায় সুখপ্রীতার কান্না থামতেই চাইত না, আর তা দেখে ওর মায়ের হাসিও বাঁধ মানতো না!

কেমন করে যেন আমাদের সেই আদুরে মেয়েটি দশ বছর পার করে এগারোতে পা ফেলল। দিন দিন নিঃশেষিত সময়ের পথ ধরে এগিয়ে চলছে আমাদের সুখপ্রীতা। তার বেড়ে ওঠার আনন্দে আমি ও আমরা আপ্লুত হচ্ছি ঠিকই। পাশাপাশি কবিগুরু’র আফগানী কাবুলিওয়ালার ছোট্ট মিনিকে উদ্দেশ্য করে বলা সেই অমোঘ বাণী, ‘খুকি তুমি শ্বশুর বাড়ি যাবে!’- কানে বাজে ভীষণ। আত্মজা যতোটা আপনার, ঠিক ততোটা বিচ্ছেদ বেদনারও। চোখের সামনে রঙিন প্রজাপতি দেখে বিমোহিত হই যেমন, নিমিষে তার চোখের আড়াল হওয়াটাও অবলোকন করতে হয় অতি কষ্ট নিয়ে। তবু চোখজুড়ে স্বপ্ন আর বুকভরা আশারা বেঁচেই থাকে।

সেই সুখপ্রীতার জন্মক্ষণটাকে স্মরণে রাখতে ফি বছর আড়ম্বর বা অনাড়ম্বরে জন্মদিনের উৎসব পালন করে যেতে হয়েছে। আমার পিতাসম শিক্ষক সেলিম আল দীন অবশ্য বলতেন, তোর জন্মদিনটা যখন অন্যে ঘটা করে পালন করবে তখন তা সার্থক জন্মদিন হবে। আমাদের সুখপ্রীতাও হয়ত তার নামকবি’র কথাটি মেনে চলতে চাইছে। যে কারণে আমাদেরকে দিয়েই উৎসবটা এখনও করিয়ে নিচ্ছে। যদিও তাত্ত্বিকরা বলে রেখেছেন, জন্মদিনের উৎসব পালন করাটা বোকামি। জীবন থেকে একটা বছর ঝরে গেল, সে জন্যে অনুতাপ করাই উচিত। কিন্তু আমাদের সুখপ্রীতা এখনও অনুতাপের বুঝটা বুঝতে শিখেনি। তাই জন্মদিনে মোমবাতি, বেলুন ও কেক অত্যাবশকীয় উপকরণ তার চাইই।

তাছাড়া আপনাদের মনে থাকবার কথা আপেক্ষিকতা তত্ত্ব প্রদানের জন্য সুখ্যাত বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইনের জন্মদিনে বিশ্বব্যাপী ২২ জুলাই পাই দিবস পালন করা হয়। অন্যদিকে রোমান মহাকাব্য রচয়িতা ও সম্রাট অগাস্টাসের রাজকবি ভার্জিলের জন্মদিন স্মরণে ১৫ অক্টোবর বিশ্ব কবিতা দিবস পালন করা হয়। আমাদের দেশের জাতির জনকের জন্মদিনে শিশু দিবস হিসেবে পালন করা হয়। কে জানে, ভবিষ্যতে ঘটা করে সুখপ্রীতা দিবস পালন করা হবে না?

২০১৬ সালের ২৭ মে শুক্রবার, সুখপ্রীতার দশম জন্মদিনটা এক বিশেষ আনন্দের উপলক্ষ নিয়ে এসেছিল। ওর একমাত্র মামা মেজর এম এ কাদের মহান প্রভুর ইচ্ছায় প্রথমবারের মতো বাবা হচ্ছে। সাতমাসের কালে বেবি’র শ্রেষ্ঠ আশ্রয় ও মমতার আধার ওর মা শারমিন চৌধুরী মেঘলাকে আবহমান বাঙালি সংস্কৃতির রেওয়াজ অনুযায়ী সাড়ম্বরে ‘সাধ’ খাওয়ানো হলো এদিন। কাদেরের ঢাকা সেনানিবাসের বাসায় এ উপলক্ষে দীর্ঘদিন পর অনুষ্ঠিত হলো দুইপক্ষের স্বজনদের অবিস্মরণীয় মিলনমেলা। সেই মিলনমেলার যৌথ আয়োজনের অংশ হিসেবে ওর মামার ঐকান্তিকতায় বেলুন উড়িয়ে, মোমবাতি জ্বালিয়ে এবং কেক কেটে সাড়ম্বরে উদযাপিত হলো সুখপ্রীতার জন্মদিন। ইংল্যান্ডের ষাটের দশকের জনপ্রিয় ব্যান্ডদল বিটলসের ‘হ্যাপি বার্থ ডে টু ইউ’ গানটিও সুর ছড়ালো সবার কন্ঠে। দশম জন্মদিনে দশটি মোমবাতি জ্বালানোর কথা থাকলেও শূণ্যকে বাদ দিয়ে রাখা হলো একটি তেজস্বী মোমবাতি। একদিকে মায়ের সম্মাননায় এক নবীন মানুষের আগমনকে স্বাগত জানাবার দারুণ উপলক্ষ, সেইসাথে জন্মদিন উৎসব! ভিন্নমাত্রার এই দুই জন্মের এমন এক অবিস্মরণীয় স্মৃতি নিশ্চয় সুখপ্রীতা বয়ে বেড়াবে জীবনব্যাপী। আর ভবিষ্যতে আগত ভাই অথবা বোনের কাছে খুলে বসতে পারবে জীবন গল্পের ভালোবাসার ঝাপি!

??????????????
সুখপ্রীতার দশম জন্মবার্ষিকীর মুহূর্তটাকে দেশপ্রেমে উজ্জীবিত করতে ওর মামা স্বচক্ষে সরেজমিনে মুক্তিযুদ্ধের বিশেষায়িত ইতিহাসের সাথে পরিচয় করিয়ে দিল ওকে। বিকেলে সুখপ্রীতাকে ঘুরিয়ে দেখানো হলো ঢাকা সেনানিবাসের মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর বিজয়কেতন, আগরতলা মামলার স্মৃতি বিজড়িত বঙ্গবন্ধু জাদুঘর ও আগারগাঁও এর বাংলাদেশ বিমানবাহিনী জাদুঘর।

স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রস্তুতি পর্বে ঐতিহাসিক আগরতলা মামলা চলাকালে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে ঢাকা সেনানিবাসের যে ভবনে অন্তরীণ রাখা হয়েছিল, তার অনতিদূরেই তৎকালীন সিগন্যাল অফিসার মেসের একটি কক্ষকে বিচারালয়ে রূপান্তর করে সেখানে অনুষ্ঠিত হয়েছিল আগরতলা মামলার বিচারকাজ। সেখানকার পুরোটাতেই বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর উদ্যোগে গড়ে তোলা হয়েছে ‘আগরতলা মামলার স্মৃতিবিজড়িত বঙ্গবন্ধু জাদুঘর’। ঐতিহাসিক আগরতলা মামলার বিচার যে কক্ষে অনুষ্ঠিত হয়েছিল, সেই স্পেশাল ট্রাইব্যুনাল রুমটি ঠিক আগের মতো করে আসবাবপত্র এবং অন্যান্য জিনিসপত্র দিয়ে সাজানো রয়েছে। বিচারকের এজলাস, সাক্ষী বা আসামির কাঠগড়া, আসামিদের ঘেরাও করা বসার স্থান ইত্যাদি। ১৯৬৮ সালে দায়ের করা মামলায় যার নাম ছিল ‘রাষ্ট্র বনাম শেখ মুজিবুর রহমান ও অন্যান্য’। অভিযুক্ত আসামি ৩৫ জনের স্মৃতিবিজড়িত সেই ঐতিহাসিক কক্ষটি যেন এখনো একটি জীবন্ত ইতিহাস। সুখপ্রীতা জানল, ইতিহাস কেবল তার বইয়ের পাতায় অক্ষরে লিপিবদ্ধ থাকে না। ইতিহাস থাকে ঘটনস্থানের বাস্তবতায়।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, সশস্ত্র যুদ্ধের সঠিক বিবরণ এবং বীর মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্বগাথার তথ্য সংগ্রহ ও সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে বিজয়কেতন মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর গড়ে তোলা হয়েছে। ১৯৯৬ সালের ৬ জুলাই তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল মুস্তাফিজুর রহমান এর ভিত্তি স্থাপন করেন এবং জাদুঘরটি পূর্ণাঙ্গতা লাভ করে ২০০০ সালের ২১ নভেম্বর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাতে। ঢাকা সেনানিবাসের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত বিজয়কেতন মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের সুদৃশ্য ফটক দিয়ে প্রবেশ করলে জাদুঘর প্রাঙ্গণের মাঝে প্রথমেই চোখে পড়বে মুক্তিযুদ্ধের স্মারক ভাস্কর্য ‘বিজয়কেতন’। বামে উত্তর সীমানা বরাবর রয়েছে টেরাকোটায় উৎকলিত দেয়াল ভাস্কর্য ‘সংগ্রাম থেকে স্বাধীনতা’। দরজা দিয়ে ঢুকতেই হাতের বা পাশে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ এবং ডান পাশের বঙ্গবন্ধুর পক্ষে ২৭ মার্চের মেজর জিয়ার স্বাধীনতার ঘোষণা। জাদুঘরে মোট ছয়টি কক্ষে প্রদর্শন সামগ্রীর মধ্যে পাঁচটিতে রয়েছে মুক্তিযুদ্ধের বিজয় অর্জন পর্যন্ত বিভিন্ন ঐতিহাসিক ঘটনাবলি, প্রামাণ্য দলিল, ছবি, ম্যাপ ও স্কেচসহ অস্ত্রশস্ত্র, গোলাবারুদ ও পাঁচটি মূল্যবান কামান। জাদুঘরটির মূল কক্ষে একপাশে স্বাধীনবাংলার পতাকা ও জাতীয় সংগীতের পাশে রাখা হয়েছে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ম্যুরাল এবং বিপরীত দিকে রাখা হয়েছে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ম্যুরাল।

বর্তমান সময়ে দেশের দুই বড় রাজনৈতিক দলের মধ্যে বঙ্গবন্ধু ও জিয়াকে ঘিরে যথেচ্ছাচারে তিক্ত বয়ান শোনা যায়। কিন্তু সেনানিবাসের ভিতর ১৬ বছর ধরে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু ও তাঁর সিপাহসালার জিয়ার একসাথে বসবাসে কোনো বাদবিরোধ নাই। জানা যায়, এই দুই ব্যক্তির জীবদ্দশাতেও তাদের মধ্যে সুসম্পর্কই ছিল। আমাদের পূর্বপুরুষদের এমন বীরত্বগাঁথা সুখপ্রীতাকে বুঝিয়ে বলতে হলো।
এরপর সেনানিবাসের নির্ঝরকুঞ্জের লেক ও নিসর্গে বেড়ানো শেষে আগারগাঁওয়ের বাংলাদেশ বিমানবাহিনী জাদুঘরে গিয়ে সুখপ্রীতা মুক্তিযুদ্ধকালে ব্যবহৃত যুদ্ধ বিমান ডিএইচই৩-৩/১০০০ অটারের ককপিটে ওঠে বসল। সেখানে বিমান চলার বাস্তবানুগ শব্দকে অনুষঙ্গ করে ক্ষুদে পাইলট হয়ে উঠল সুখপ্রীতা।
13256535_10154095607426328_7839259286510922619_n
বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর ইতিহাস, উন্নয়নের ক্রমবিকাশ নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে ২০১৪ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর চালু হওয়া এই বিমান জাদুঘরে রাশিয়ায় তৈরি বাংলাদেশের সর্বপ্রথম যাত্রীবাহী বিমান ‘বলাকা’’র পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি বিজড়িত ২১টি বিমান, ০২টি হেলিকপ্টার ও বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর ব্যবহৃত ০২টি রাডার রাখা হয়েছে।

যে প্রাণের শ্যামলবরণ দেশটির কোমল মূর্তি আমাদের সবার মর্মে গাঁথা, যেখানে বিশ্বমায়ের আঁচল পাতা, যে জন্মভূমি সকল সহা সকল বহা মাতার মাতা, যার শীতল জলে প্রাণ জুড়াই, অন্ন মুখে তুলে জীবনের জয়গান গাই, সেই দেশের জন্মযুদ্ধের সাথে পরিচয়, স্পর্শ বা অনুভবটা নিজের দশম জন্মদিনে সুখপ্রীতার জন্য শ্রেষ্ঠ উপহার, অভিজ্ঞতা ও উপলব্ধি হয়ে থাকল। এবার সকলের মঙ্গলাশিস নিয়ে আলোকের ঝর্ণাধারা বিধৌত আমাদের আত্মজা সুখপ্রীতা হেরা’র এই হোক সকাল সাঁঝের প্রার্থনাঃ
অন্তর মম বিকশিত করো অন্তরতর হে…
নির্মল করো, উজ্জ্বল করো, সুন্দর করো হে ॥
জাগ্রত করো, উদ্যত করো, নির্ভয় করো হে।
মঙ্গল করো, নিরলস নিঃসংশয় করো হে ॥
যুক্ত করো হে সবার সঙ্গে, মুক্ত করো হে বন্ধ।
সঞ্চার করো সকল কর্মে শান্ত তোমার ছন্দ।
চরণপদ্মে মম চিত নিষ্পন্দিত করো হে।
নন্দিত করো, নন্দিত করো, নন্দিত করো হে ॥

মুভিতে সুখপ্রীতা হেরা’র দশম শুভ জন্মদিন!

লেখকঃ সাংবাদিক, মাছরাঙা টেলিভিশন
১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৩। ২৭ মে ২০১৬
twitter.com/fardeenferdous
facebook.com/fardeen.ferdous.bd