ক্যাটেগরিঃ সেলুলয়েড

 

বাঙালির মধ্যে সংক্রামক এক অবিরল গতি রোগ আছে। খুব কঠিন করে বাঁধাপ্রাপ্ত না হলে তার থামবার জো নেই। কেউ একটা কিছু শুরু করলে তা চলবে তো চলবেই। আর সেই চলন ব্যাধিটা যদি অপরকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য বা ব্যঙ্গ-বিদ্রুপে হেয়করণ হয় তবে তার ব্যাপ্তি যেন আকাশস্পর্শী।
এই সময়ে বগুড়ার সাদাসিধে এক স্বপ্নাচারী যুবক আশরাফুল আলম ওরফে হিরো আলম বাঙালি আলোচনা-সমালোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। এমনটা নয় যে, হিরো আলমের নিষ্ঠাপূর্ণ সাংস্কৃতিক কর্মযজ্ঞের চেয়ে দেশে তাৎপর্যপূর্ণ অন্য ঘটনার ঘাটতি আছে। আসল কথা হলো সংক্রমিত চলন ব্যাধিটা, তার মান রাখতে হলে বেশ কিছুদিন হিরো আলম থাকবেন আমাদের কুরুচিপূর্ণ হৃদয়অন্তপুর বা হাসি-ঠাট্টার অধর-ওষ্ঠে। আমরা যেন পণ করে বসেছি, রাজধানীর ভদ্দরনোকদের ভাষায় গেঁয়োভুত আলমের হিরোগিরি’র সাধ মিটিয়ে দেব!

150940hero_alom_kalerkantho_pic
আমাদের এই পরশ্রীকাতর হিংসুক মনের রূপবর্ণনা সেই কবেকালেই কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর করে গেছেন এভাবেঃ
‘আমরা আরম্ভ করি শেষ করি না; আড়ম্বর করি, কাজ করি না; যাহা অনুষ্ঠান করি তাহা বিশ্বাস করি না; যাহা বিশ্বাস করি তাহা পালন করি না; ভূরিপরিমাণ বাক্যরচনা করিতে পারি, তিলপরিমাণ আত্মত্যাগ করিতে পারি না; আমরা অহংকার দেখাইয়া পরিতৃপ্ত থাকি, যোগ্যতালাভের চেষ্টা করি না; আমরা সকল কাজেই পরের প্রত্যাশা করি, অথচ পরের ত্রুটি লইয়া আকাশ বিদীর্ণ করিতে থাকি; পরের অনুকরণে আমাদের গর্ব, পরের অনুগ্রহে আমাদের সম্মান, পরের চক্ষে ধুলিনিক্ষেপ করিয়া আমাদের পলিটিক্স; এবং নিজের বাকচাতুর্যে নিজের প্রতি ভক্তিবহুল হইয়া উঠাই আমাদের জীবনের প্রধান উদ্দেশ্য।

কিন্তু গেল সপ্তাহজুড়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় যাকে নিয়ে ট্রলের ঝড় বইছে কে সেই হিরো আলম? বগুড়ার এরুলিয়া গ্রামের একসময়ের অসফল সিডি বিক্রেতা এবং পরবর্তীতে সফল ক্যাবল নেটওয়ার্ক ব্যবসায়ী আশরাফুল আলম বা হালের হিরো আলম খুব অভাব অনটনের মধ্য দিয়ে বড় হয়েছেন। এমনকি দারিদ্রতার কষাঘাতে নিজের পিতৃ-মাতৃ স্নেহ বঞ্চিত হয়ে আব্দুর রাজ্জাক নামের এক হৃদয়বানের ঘরে বড় হয়েছেন। এমনকি সপ্তম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করারও সুযোগও পেয়েছেন।

সিডি ব্যবসা করবার কালেই সিডিতে ঢাকাইয়া মডেলদের দেখে দেখে নিজেরও মডেল হওয়ার ইচ্ছা জাগে আলমের। ২০০৮ সালেই বাংলা সিনেমার একটি গানের সাথে করে ফেলেন মডেলিং। তারপর একে একে ৫০০ গানের মডেলিং ও দু’টি নাটকে অভিনয় করেছেন দুই সন্তানের জনক এই আলম। চেহারা হয়ত নোবেল বা সালমান শাহ’র মতো সুশ্রী নয়, কন্ঠটাও নয় এন্ড্রুকিশোরের মতো নামীদামী। কিন্তু আলমের হিরো হয়ে উঠবার জন্য এসবের কিচ্ছুটির দরকার পড়েনি। ছিল শুধু সদিচ্ছা, একাগ্রতা আর দৃঢ়তা। কিছু করে দেখাবার এই মানসিকতাই দেখতে কেতাদুরস্ত গ্রামের সাধারণ একজন আলমকে পৌছে দিয়েছে যথার্থ হিরো আলমের কাছে।

আমাদের প্রচলিত হামবড়া সমাজের খটকাটা এখানেই বেজেছে। মডেলিং, মিউজিক ভিডিও, নাটক বা চলচ্চিত্রের কলাকুশলী বলতেই আমরা বুঝি বিশাল তারকালোকের ব্যাপারস্যাপার। যেনবা তারা ভিনগ্রহের বাসিন্দা। একদম ধরাছোঁয়ার বাইরে। ঠিক সেইখানে এমনতর পরাবাস্তবতায় হ্যাংলা লিকলিকে কৃষ্ণকায় দেখতে এক প্রান্তিকজন হিরো আলমের ভিডিওতেই কিনা বুদ হয়ে আছে আপামর মানুষেরা। পুনে ফিল্ম ইন্সটিটিউট কিংবা নিদেনপক্ষে আমাদের গণমাধ্যম ইন্সটিটিউট থেকে যার প্রশিক্ষণ নেই, লাইট, ক্যামেরা, অ্যাকশনের ভাষা বুঝবে কি ছাই, নিজের ভাষায় শুদ্ধ করে কথা বলতে পারে না যে, মিডিয়ার ব্যাকরণের ধার না ধারা সেই সহজিয়া হিরো আলমই কিনা তারকাদের টাইমলাইনে ঘুরছেন ফিরছেন, গান গেয়ে অভিনয় করে মাত করে দিচ্ছেন। যদিও বিদ্রুপের ভাষায় আলমের নিন্দাবাদেই আত্মতুষ্টিতে ভেসে যাচ্ছেন সেইসব তারকারাজিরা। অথচ সুশিক্ষিত ও সুন্দর দেখতে যারা কিনা হাজার প্রশিক্ষণের পরও এখনো অদক্ষ নকলনবিশতার দোষে দুষ্ট হয়ে ঘোষিত জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পর্যন্ত খুইয়ে বসেন।

কিন্তু আমাদের এই হিরো আলমের হারাবার কিছু নেই। সাক্ষাৎকার বা সংবাদ সৃজনের নামে অনেকেই তাকে হারাতে চাইছেন। কিন্তু আমাদের আলম সহজিয়া ঢঙে বলে যান, আমার মডেল হওয়ার ইচ্ছে ছিল আগে। যখন সিডি বিক্রি করতাম। আমি জানি না এসব ইচ্ছে পূরণ হয় কি না, তবে লেগে ছিলাম। হয়েছে। অনেকে বলে বাজে হয়েছে আমি কান দেই না। অনেকে আবার বলে ভালোই হয়েছে। আমি গ্রামের ছেলে মন যা চায় করি। মানুষের কথায় কান দেওয়ার ইচ্ছে নেই।

হ্যাঁ! এটাই স্পিরিট। মানুষের কথায় কান দেয়ার দরকার নাই। দুঃখের এই জগতে, বিষাদের এই পরগণায় মানুষকে নির্মল বিনোদন দিতে তোমার মন যেমনটা চায় খুশিমতো তুমি তা করে যাও। মনের দাম দিতে পারার শিক্ষাটাই তো আসল শিক্ষা। আর এটাই হলো প্রকৃত হিরোগিরি। আমাদের সম্মিলিত ঈর্ষায়ও যার বিনাশ বা বিধ্বংস অবশ্যই অসম্ভব।

হিরো আলম তার কর্মযজ্ঞে নিন্দিত হবেন এমনটা ভবিতব্যই ছিল। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কিংবা সাম্যবাদ, দ্রোহ ও প্রেমের কবি কাজী নজরুল ইসলাম পর্যন্ত নিন্দুকের কাছ থেকে নিস্তার পান নাই।

সজনীকান্ত দাস কিংবা ভবকুমার নামের কালেরগর্ভে হারিয়ে যাওয়া লেখকরা নজরুলের চৌদ্দগোষ্ঠী উদ্ধার করে কাব্য বা গদ্য করেছেন। নজরুল তাঁর ‘বিদ্রোহী’ কবিতায় বলেছিলেন ‘আপনারে ছাড়া কাহারে করিনা কুর্নিশ’। কথাগুলো ভালো লাগেনি সেকালের ঈর্ষাকাতর সমালোচকদের। ভবকুমার ‘বিদ্রোহী’ কবিতার বিপরীতে ‘অসমছন্দ’ একটি কবিতা লিখেন এভাবেঃ
‘আমি ব্যাঙ
লম্বা আমার ঠ্যাং
ভৈরব রভসে বর্ষা আসিলে ডাকি যে গ্যাঙোর গ্যাং।
আমি ব্যাঙ
আমি পথ হতে পথে দিয়ে চলি লাফ;
শ্রাবণ নিশায় পরশে আমার সাহসিকা
অভিসারিকা
ডেকে ওঠে ‘বাপ বাপ।’

এহেন অপকাব্যে নজরুলের কিচ্ছুটি এসে যায়নি। বরং কালক্রমে কবি হয়ে উঠেছেন আমাদের জাতীয় চেতনার প্রধানতম প্রবাদমানুষ।
লেখক নীরদচন্দ্র চৌধুরীর মতে, ‘বাঙালি সমাজে উৎপীড়িত এবং নিন্দিত না হইয়া থাকিবার দুইটি মাত্র উপায় আছে; ১ম, অন্য সকল বাঙালীর মত হইয়া নিজের চরিত্র সম্বন্ধে অজ্ঞ হওয়া; ২য়, চরিত্রধর্মে বিভিন্ন হইলেও সাধারণ বাঙালি চরিত্র মনে রাখিয়া অতি সাবধানে চলা, অর্থাৎ সামাজিক আচরণে সম্পূর্ণভাবে কপট হওয়া, বনবিড়াল হইলেও ভিজে-বেড়াল হইয়া থাকা।

নজরুল সেই স্রোতে গা ভাসাননি বলেই নিন্দিত হয়েছেন। ব্যতিক্রম হয়েছেন। আমরা মনে করি গ্রামীণ মানুষের সত্যিকারের মডেল, আসল নায়ক এই হিরো আলমও ভিজে বেড়াল হয়ে নিজের জীবন পার করতে চাননি। সাহস দেখিয়েছেন। সেই সাহস তাঁকে পৌছে দিচ্ছে মানবিক মনুষ্যপ্রাণের কাছাকাছি। তাঁর এই চলার পথে এখন বিস্তর পরামর্শ আসবে, তাঁকে সিঁড়ি করে অনেকেই ওপরে উঠতে চাইবে। কাজেই এইবার রাজধানীর কপট পথে সাবধানেই তাঁকে পা ফেলতে হবে। প্রায় বাঙালির স্বভাবতো এমনটাই, ‘আমরা এগোইব না, অনুসরণ করিব; কাজ করিব না, পরামর্শ দিব’!
বাঙালি মননের বিকারগ্রস্ত হাহুতাশ, হায়! হিরো আলম নাজানি কোথায় চলে যায়, আমি তো কিছুই করে দেখাতে পারলাম না। অতএব তুচ্ছ তাচ্ছিল্যতায় তবে মেটানো যাক মনের ঝাল। কারণ প্রতিটি বাঙালি ভোগে অহমিকারোগে, নিজেকে বড়ো ভাবার অচিকিৎসা ব্যাধিতে আক্রান্ত বাঙালি। বাঙালির দুর্বলতাই তার ভীরুতার কারিগর। আর সেই কারিগর ক্ষণে ক্ষণে কানপড়া দিয়ে যায়, ‘যে চায় ওপরে উঠতে, তাকে পা ধরে নীচে নামিয়ে রাখো’। তবে না, তোমার ভীরুতা বা দুর্বলতা রোগের মুক্তি।

প্রান্তিক বা দারিদ্র মানসিকতার শিকড়কে উপরে ফেলে হিরো আলমের মতো মানুষেরা যখন দাপটে ছুটিয়ে চলেন তাঁদের নিজস্ব ব্র্যান্ডের মডেলিং এর ঘোড়া, সেইসময় আমাদের উচ্চাভিলাষী তারকাখচিত মন বড়ই আনচান করে। আত্মঘোষিত আর্য এই আমার সোনায় মোড়ানো পায়ের তলার মাটি বুঝি খাবলে নিবে হিরোদের মতো সেই অনার্য হরিজন। কাজেই দাবায়ে রাখবার মন্ত্রণার বিষেদেরই বরাবর বাড়বাড়ন্ত। মন্ত্রণার সেই অভিজাত আর্য অমানবের বিষ তার ফ্যাং উঁচিয়ে ধরে ছোবল মেরে মেরে হিরোদের ঘায়েল করাটাকেই আসল কর্তব্য মনে করে।

আমরা একজন সুশোভন স্বপ্নবাজ রিয়েল হিরোকে সমমর্যাদা বা আরও বৃহৎ সুযোগের সন্ধান দিয়ে নিজেদেরকে মহিমান্বিত করতে পারতাম। কিন্তু আমরাতো সেই ধাতুতে গড়া মানুষ না। অপরের কুৎসায় বাড়ে উদরের হজম শক্তি। আর আমাদের সেই অশোভন সব আচার আচরণকে ওই উদরে অবলীলায় হজম করে নিলাজ ভঙ্গিতে খিলখিল হাসতেও পারি।

বগুড়ার এই হিরো আমাদের দৈনন্দিন সকল কদাচার, অনাচার, ত্রাস, ভয়ভীতি, আতঙ্ককে পাশ কাটিয়ে নিখাদ আনন্দ বিধান করতেই নিরলস শ্রম দিয়ে গেছেন। তাঁর শ্রমের মূল্য সংকীর্ণ বাঙালি মানসিকতা দিয়ে না মেপে আমরা বরং আমরা একজন স্বপ্নবাজ তরুণকে সুস্বাগত জানাতে পারতাম। যে নিজের স্বাভাবিক যাপিত জীবন দিয়েই আনন্দলোকের সন্ধান দিয়ে চলেছে। যেই ছেলেটি পেসিমিজম দূরীভূত করে আমাদেরকে অপটিমিস্টিক হতে শেখাচ্ছে তাকে সাধুবাদ না জানাতে পারি, অন্তত চুপ করেও থাকতে পারতাম। কিন্তু তা যেন হবার নয়! আমাদের এমনধারার আবেগহীনতা, চিন্তার অক্ষমতা, অনাগ্রহ, অসংলগ্ন কথাবার্তায় প্রমাণ হয়, আমরা যেন সামগ্রিকভাবেই মানসিক ব্যাধি সিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত। আসলে আমাদের স্বভাব বুঝি এমনটাই, কেবলমাত্র নিজেরে গৌরব দান করতে গিয়ে নিজেরেই অপমান করে বসে থাকি’। চোখের জলে সকল অহংকার ডুবানোর প্রত্যয় আমাদের কোনোকালেই থাকে না। এবার আমরা নিজেকে একবার প্রশ্ন করেই দেখিনা, কীসে আমরা হিরো আলমের চেয়ে বড়?

অথচ মনে রাখাটা শুভবুদ্ধিজাত হতো যে, আমরা সবাই স্বপ্নের দিক থেকে এই পোড় খাওয়া সমাজের একেকজন হিরো আলম। কাজেই নিজেই নিজেকে নিয়ে মশকরা করার কিছু নেই। তারচেয়ে বরং আমাদের জ্ঞাতি হিরো আলমের মতো মানুষের স্বপ্নের জয় বন্দনায় সুবোধ আমাদের কোমল কন্ঠে কবি কাজী নজরুল ইসলামের সাম্যবাদ প্রতিধ্বনিত হতে থাকুক।
গাহি সাম্যের গান
মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান!
নাই দেশ-কাল-পাত্রের ভেদ, অভেদ ধর্ম জাতি,
সব দেশে, সব কালে, ঘরে ঘরে তিনি মানুষের জ্ঞাতি।

লেখকঃ সংবাদকর্মী, মাছরাঙা টেলিভিশন
০১ জুলাই ২০১৬
facebook.com/fardeen.ferdous.bd
twitter.com/fardeenferdous