ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

13599986_1207265109324123_1597776396641809451_n

মহাপ্রকৃতির এ এক নিদারুণ বিচার এই যে, যখন একা থাকার অভ্যাস হয়ে যায় ঠিক তখনি সৃষ্টিকর্তা কিছু মানুষের সন্ধান দেন। যখন তাদেরকে নিয়ে ভালো থাকার অভ্যাস হয়ে যায়, ঠিক তখনি আবার একা হয়ে যেতে হয়। দার্শনিক বার্নার্ড শ’র এই খাঁটি কথাটি মনে-প্রাণে বেশ নাড়া দিয়ে যায়, যখন নিজের জীবনে এই অনুভব স্বতঃসিদ্ধ হয় যে, এক বিশেষ মানুষকে অকালে হারিয়ে আসলেই আমরা বেশ একা হয়ে গেলাম। আর সেই বিয়োগ ব্যথাটা সত্যিকার অর্থেই করুণ কাব্য হয়ে ওঠে যখন দেখি, স্বামী বিবেকানন্দের আপ্তবাক্য ‘মানুষের সেবা করাই হচ্ছে ঈশ্বরের সেবা করা’- একে আদর্শ মেনে যে মানুষটি নিজের জীবনে সেবাকে ব্রত করে ছিল। বলছিলাম, অকালপ্রয়াত এক স্বপ্নবাজ তরুণ পুলিশ অফিসার রবিউল ইসলামের কথা। যিনি পহেলা জুলাই হলি আর্টিজান ট্রাজেডিতে বুক চিতিয়ে যুদ্ধ করে দেশের জন্য নিঃশেষে নিজের প্রাণ উৎসর্গ করে গেছেন। সেই একনিষ্ঠ মানবহিতৈষী ব্রতচারীর অকাল প্রয়াণ কিছুতেই মেনে নেয়া যায় না। তবে মনে মনে সান্তনা খোঁজে ফিরি ঠিকই, নাহ, রবিতো যায়নি, আদর্শের কচি সবুজ ঘাসে শিশির বিন্দু হয়ে, বর্ণিল পুষ্পের মধুরিমায়, বোধ প্রকোষ্ঠের উপলব্ধিতে, কর্মের নিপুণ কুশলতায়, সেবার পরম ব্রতে রবি কামরুল আমাদের মাঝে চিরঞ্জীব হয়ে আছেন। আমরা সেই মানুষ রবি’র জয়গানই গাই।

ঈশ্বরের এক অপার কৃপা এই যে, ছাত্রজীবনের বেশ কয়েকটি বছর এই আলোকোজ্জ্বল রবি’র সাথে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সবুজ অরণ্যের উন্মুক্ত পথে একসাথে হেঁটেছি। সাংস্কৃতিক আন্দোলনে সমস্বরে স্লোগান তুলেছি। জহির রায়হান মিলনায়তনে ধ্রুপদী চলচ্চিত্রের রস আস্বাদনের সাথে সাথে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের সেকাল ও একালের চিত্রধারা নিয়ে তুমুল বিতর্কে মেতেছি। মহুয়া তলে কবিতা সন্ধ্যায় একসাথে বিমুগ্ধ স্রোতা হয়েছি কতদিন। কবিতাপত্র প্রকাশ করবার এক ধরণের বন্য নেশা ছিল রবি’র। আর সেই কাব্যপত্রে কতবার ভালোবাসার পঙক্তিমালা সাজিয়েছি। মানুষ হিসেবে অসাম্প্রদায়িক ও সাম্যবাদী চেতনা কিংবা বোধেরা একই খেয়াতে পাল তুলত বলে প্রগতির স্রোতস্বিনীতে আমাদের যৌথ চলন ছিল নিয়ত বেগবান। আমাদের বন্ধুবর, সতীর্থ, সুখ আর দুঃখেরও ভাগীদার গোয়েন্দা পুলিশের সহকারী কমিশনার সেই রবিউলকে ১লা জুলাইয়ে গুলশানের হলি আর্টিজান রেস্টুরেন্টে এক অস্পৃশ্য ঝড় এসে বড় অকালে কেড়ে নিয়ে গেল। তবে রেখে গেল রবি’র অকৃত্রিম দেশপ্রেম, বিরল সাহসিকতা আর উদাহরণযোগ্য কর্মনিষ্ঠার অবিচল দৃষ্টান্ত। আমরা এই রবি’রই বন্দনা করব। আমাদের এই রবি’র জন্যইতো কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সেকালে গলা সেধেছিলেন:
আলোকের এই ঝর্ণাধারায় ধুইয়ে দাও।
আপনাকে এই লুকিয়ে-রাখা ধুলার ঢাকা ধুইয়ে দাও।
যে জন আমার মাঝে জড়িয়ে আছে ঘুমের জালে
আজ এই সকালে ধীরে ধীরে তার কপালে
এই অরুণ আলোর সোনার-কাঠি ছুঁইয়ে দাও।

স্নাকতোত্তর পাস করে কিছুদিন ইতালি ছিলেন রবিউল। কিন্তু বিদেশ বিভূঁইয়ে ভালো লাগছিল না তাঁর। রক্তে যাঁর দেশসেবার বীজ পোতা, তিনি কেন পরদেশে থাকতে যাবেন? ২০১১ সালে ইতালি থেকে গ্রামে ফিরেন তিনি। আর ঐ বছরের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশের বিজয়ের দিনে নিজের নাড়িপোতা ভূমি কাটিগ্রামে সুবিধাবঞ্চিতদের জন্য ‘বিকনিং লাইট অর্গানাইজেশন অব ম্যানকাইন্ড এন্ড সোসাইটি (ব্লুমস)’ নামে বিদ্যায়তন গড়ে তোলেন। আর এই শুভযাত্রার উদ্বোধক করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজের শিক্ষক কবি খালেদ হোসাইনকে। সমাজের বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের জন্য একটি আশ্রম, খেলাঘর এবং বিদ্যানিকেতনের স্বপ্ন আজন্মই বয়ে বেড়াতেন রবিউল। প্রকৃতিপ্রদত্ত সামান্য অক্ষমতার জন্য শিশুরা অবহেলার পাত্র হবে, অন্যের বোঝা হয়ে থাকবে কিংবা কারো গলগ্রহ হয়ে জীবন কাটাবে -একথা ভাবতেই পারতেন না তিনি। আর জেগে জেগে যে স্বপ্ন রবিউল দেখতে ভালোবাসতেন তা বাস্তবায়ন করবার আত্মপ্রত্যয়টাও তাঁর ছিল। এমন রবিউলের তারিফ করে শেষ করা যায়?

13528914_10154182535226328_3226070596431057874_n

বাংলাদেশের সমাজ বাস্তবতায় আরক্ষাবাহিনীর কিছু বেপথো সদস্যের বিতর্কিত কর্মকান্ডের জন্য পুলিশ নিয়ে একধরণের নেতিবাচক ধারণা জনমানসে বদ্ধমূল হয়ে আছে। বাঘে ছুঁলে আঠার ঘা আর পুলিশে ছুঁলে ছত্রিশ ঘা এমন কৌতুকার্টুন প্রচার করে আমরা যুগপৎ আনন্দিত ও বেদনাহত হই। আমরা নিজেদের বাজে প্রবৃত্তিকে লুকিয়ে রেখে পুলিশের বদনাম করে আনন্দ কুড়াই। আবার কিছু বাজে পুলিশের ফাঁদের কথা চিন্তা করে ব্যাথাতুরও হই। কিন্তু সামগ্রিকভাবে কখনোই ভেবে দেখিনি খারাপ অথবা ভালো পুলিশটি আমাদেরই বাপ চাচা ভাই বেরাদর। ভালো পুলিশের প্রশংসায় পঞ্চমুখ দূরে থাকুক একমুখেই রা ফোটে না। আবার খারাপ পুলিশকে শোধরানোর কার্যকর রাষ্ট্রীয় বিধিব্যবস্থা না থাকলেও নিন্দামন্দটা সবার আগে করি। কষ্টিপাথরে যাচাই করেও নিজের ভালোমানুষির খবর না মিলুক, সুযোগ পেলেই বলে দেই, প্রাণ থাকলেই মানুষ হয়, কিন্তু পুলিশ না হলে অমানুষ হওয়া যায়না। একটি গ্লাসে অর্ধেক পানি ভর্তি থাকলে নেতিবাচক ধারার লোকেরা বলবেন গ্লাস অর্ধেক খালি আর ইতিবাচক ধারার লোকেরা বলবেন গ্লাসতো অর্ধেক ভরা। এটা হলো দৃষ্টিভঙ্গি বা বোধের পার্থক্য। কিন্তু আমাদের রবিউল দেশের শত্রুর বিরুদ্ধে নিজের জীবন বিপন্ন করে প্রমাণ করে গেছেন তিনি পুলিশ বটে, তবে সবার আগে নিখাদ মানুষ। যেই মানুষটি নিজের বেতন, রেশন আর বন্ধু-বান্ধবের কাছে চেয়ে-বর্তে সমাজের অতি প্রান্তিক মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে, তাদের নিভে যাওয়া অন্তর প্রদীপে আলো জ্বেলে দিতে নিরলস কাজ করে গেছেন। শেষাবধি নিজের জীবনটা দেশকে দিয়ে বুঝিয়ে দিয়ে গেছেন পুলিশও মানবিকবোধসম্পন্ন মানুষ। আমরা এই রবিউলকে নিরন্তর আমাদের স্মরণের বরণমালা করব।

তথাকথিত নাগরিক সভ্যতাকে পাশ কাটিয়ে প্রান্তজনের সখা হওয়াই ছিল রবিউলের লক্ষ্য। লিও তলস্তয়ের মতো রবিউলও মনে করতেন সভ্যতা মানেই দাসত্বের শৃঙ্খল। সমাজ নিজের প্রয়োজনে এসব শৃঙ্খল সৃষ্টি করে নিয়েছে। কাজেই তথাকথিত সভ্য সমাজ থেকেই যাবতীয় গরল উত্থিত হয়ে মনুষ্যত্বকে গ্রাস করেছে। এ সমাজ বেশকিছু মিথ্যা মূল্যবোধ দিয়ে আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা পড়ে আছে। তাই মানুষের ভেতরকার খাঁটি ভালো গুণগুলো স্ফূরিত হতে পারছে না। সরল, সত্য ও সুন্দর হারাতে বসেছে সমাজ থেকে। তাই মর্যাদা বা ঐশ্বর্যের মেকি বাগাড়ম্বরতা এড়িয়ে গ্রামীণ অসহায় মানুষটির পরম ভালোবাসায় বাঁধা পড়েছিলেন রবিউল। নিজের বাহিনীকে মনে করতেন সেবাশ্রয়। আর নিজে ধ্যানজ্ঞানে ছিলেন আপাদমস্তক একজন সেবক।

আমরা একজন অন্তরতম বন্ধুকে হারিয়েছি, ওঁর পরিবার একজন আদর্শ পিতা, স্বামী, পুত্র বা ভাইকে হারিয়েছেন। রক্ষাবাহিনী একজন নিপাট সৎ কর্মকর্তাকে হারিয়েছে। কিন্তু রবিউল যে শিখিয়ে দিয়ে গেলেন, মানুষকে ভালোবাসার নি:স্বার্থ মন্ত্রণা, দেশসেবার চরম পরাকাষ্ঠা আর মানবীয় গুণপনার সবিশেষ অভিব্যক্তি। এসবের কাছে রবি’র নশ্বর প্রাণদানের বিয়োগ ব্যথা কিছু নয়। বরং আমরা যুগে যুগে এমন মানুষই খোঁজে ফিরব। যাঁর মমতায় গড়ে ওঠে বঞ্চিতের ভরসার আশ্রয়স্থল।

আমরা দাবি করতে পারি, এমন মানুষের স্বপ্নসৌধকে প্রতিষ্ঠা করতে সবার সহযোগ, মনোযোগ ও সদিচ্ছা অব্যাহতই থাকবে। আর যেসব হায়েনারা মানুষ, পরিবার, সমাজ তথা দেশ ধ্বংসের কুশীলব তাদের শেকড় উপরে ফেলে সমূলে বিনাশ করে দেশটাকে মানুষের বাসযোগ্য করবার প্রত্যয় হোক আরক্ষাবাহিনী, রাজনীতিক এবং নীতিনির্ধারকদের। তবেই আলোক চাষের অমর কারিগর আমাদের রবি’র আত্মার প্রশান্তি। আর রবি’র আদর্শের আলোতে শুভবোধের প্রহরায় আমাদের প্রাণ সদা জেগে থাকবে। কবিগুরু আমাদের রবিউল ইসলামের মতো আলোকিত মানুষদের জন্যই বুঝি ‘নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ’ কবিতায় বলেছিলেন:
আজি এ প্রভাতে রবির কর
কেমনে পশিল প্রাণের পর,
কেমনে পশিল গুহার আঁধারে প্রভাতপাখির গান!
না জানি কেন রে এত দিন পরে জাগিয়া উঠিল প্রাণ।

লেখক: সংবাদকর্মী, মাছরাঙা টেলিভিশন
০১ সেপ্টেম্বর ২০১৬
facebook.com/fardeen.ferdous
twitter.com/fardeenferdous