ক্যাটেগরিঃ ধর্ম বিষয়ক

01_eid_journey_train_mm_040616_037

চিলির নোবেল বিজয়ী বিশ্বনন্দিত কবি পাবলো নেরুদা’র ‘১০০টি প্রেমের সনেট’ কাব্যে দয়িতা এবার ঘরে ফেরার পালা’ নামে একটি সনেট রয়েছে। সেখানে তিনি লিখেছিলেন-
দয়িতা, এবার ঘরে ফেরার পালা
যেখানে ঘরের জাফরি বেয়ে উঠে যায় লতানো আঙুর,
গ্রীষ্ম পৌঁছে যায় মধু-মালতীর চকিত পায়ে,
তোমার আগেই, তোমার শোবার আঙিনায়।
……
আর এখন, এই তো ফিরছি, প্রেয়সী,
সমুদ্র পার হয়ে, দুটি অন্ধ পরিযায়ী পাখি
যে ভাবে নীড়ে ফেরে বহুদূর বসন্তের টানে

মাতৃভূমি, মাতা-দুহিতা-দয়িতা, স্বজন কিংবা বন্ধু-বান্ধবের টান অথবা বসন্ত বা বর্ষার টান। প্রাণের আকুতিভরা যে টানই হোকনা না কেন ঈদ মানে নীড়ে ফেরা, ঘরে ফেরার উৎসব। দৈনন্দিন ব্যস্ততা, দুঃখ-ক্লেশ ভুলে ঈদের উপলক্ষকে সঙ্গি করে মনটাকে চাঙ্গা করে কে না নিতে চায়? গ্রামের ছায়াঘেরা শ্যামলিমায় দুদন্ড জিরিয়ে নিয়ে প্রাণভরে নিঃশ্বাস নেওয়ার ডাকে কে হায় সাড়া না দিতে চায়? শেকড়ের টানে বিশ্বচরাচরের পথিক যদি মায়ের কাছে ফিরে আহ্লাদ আলিঙ্গনে মমতার আবেশে মন-প্রাণ জুড়ায় -তবেই ঈদ আনন্দের পূর্ণতা পায়। নিজের চেনা ঘর, আপন মানুষ, শৈশব থেকে হেঁটে চলা মেঠো পথে নিজের ভারী হয়ে যাওয়া পদযুগলকে আরেকবার শানিয়ে নেয়া, তালপুকুরের ঘোলা জলে অনভ্যস্ত ডুব-সাঁতারের অনুশীলন করা, কে না মিস করে? ঈদকে উপলক্ষ করে নীড়ে ফিরবার পরম আনন্দ আর অন্যরকম এক অনুভব সবকিছুর সাথেই তুলনারহিত। পুরোনো স্মৃতি হাতড়ে মনিমুক্তো খুঁজবার প্রথাকে জাগরূক করবার উপলক্ষই তো ঈদপার্বণ। তাই আপন আলয়ে ফিরবার টানই তো ঈদ আনন্দ।

বাঙালি মুসলিম সমাজে ঈদুল ফিতরের পর সবচে’ বড় উৎসব ঈদুল আজহা। পার্বণের চরিত্র সর্বোতভাবেই প্রায় ঈদুল ফিতরের মতোই। তবে ঈদুল আজহার বড় অনুষঙ্গ কোরবানি। যা মুসলমানকে ত্যাগের মহিমায় ভাস্বর করে। মূলত ঈদুল আজহা হলো হজরত ইবরাহীমের কোরবানি দানের স্মারক বা স্মরণোৎসব। ঈদুল আজহা ঘিরেই মুসলমানের পূণ্যভূমি সৌদি আরবের মক্কা ও মদিনায় অনুষ্ঠিত হয় হজ। যে হজ সারা বিশ্বের মুসলিমদের একই ছাতার নীচে মিলিত হওয়ার সুযোগ দেয়। বিভিন্ন জাতি-গোষ্ঠীর মানুষের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব ও মমতার শিক্ষা দেয় হজ।
উৎসব জিনিসটাই বাঙালির বড় প্রিয়। তার ওপর ধর্মীয় কর্তব্য যদি সেই উৎসবের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে তবে তো কথাই নেই। আনন্দ ও আরাধনার ষোলকলা যেন পূর্ণ মাত্রা পায়। আমাদের এই উৎসবপ্রীতি, এ শুধু একালের নয়? মানুষ তার সমান বয়স থেকেই গোষ্ঠীর সার্বিক অংশগ্রহণে যুথবদ্ধভাবেই নানা উৎসব পালন করে আসছে।

ইতিহাসবিদ মুনতাসীর মামুন তাঁর রচিত ‘সেই ঢাকা’ প্রবন্ধে ৫০ এর দশকের ঈদ উৎসব প্রসঙ্গে আনোয়ার হোসেনের জবানিতে বলেছেন, ঈদের চাঁদ দেখামাত্র খুশিতে আত্মহারা হয়ে উঠতাম আমরা ছোটরা। যাদের বয়স আমাদের চেয়েও কম ছিল তারা মজার একটা ছড়া আবৃত্তি করত তখন-
চান সালাম চান সালাম
চান কা আন্দার চিজ হ্যায়
আও বাবু হাত মিলাতে
কাল বাবু ঈদ হ্যায়।
বড়রা একজন আরেকজনকে সালাম জানাতেন, তারপর সমবেত হয়ে মোনাজাত করতেন। আমরা ছোটরা তখন দলবেঁধে যেতাম মুরব্বিদের কাছে, কদমবুসি করার জন্য। দূরে, একটু পর পর বাজাতে থাকত সাইরেন; ওই আওয়াজ শুনে আরো বাড়ত আমাদের আনন্দ। উনিশ শতকের শেষদিকে এবং বিশ শতকের শুরুর দিকে নবাববাড়ি থেকে তোপধ্বনি করে চাঁদ ওঠার খবর জানিয়ে দেয়া হতো ঢাকাবাসীদের। ‘চানরাতে’ আতশবাজি জ্বালিয়ে আনন্দ করত অল্পবয়সী ছেলেমেয়েরা।

ওই রাতে বলতে গেলে মেহেদি-উৎসব চলত পুরো মহল্লায়, বলা যায় পুরো শহরে। চাঁদ বা তারার আকৃতিতে হাতে মেহেদি লাগিয়ে নিতাম আমারও। সেমাই রান্না করার ধুম পড়ে যেত মহল্লার প্রতিটি বাড়িতে। মেশিনে তৈরি করা সেমাই পাওয়া যেত না বাজারে তখন, বাড়িতে বসে হাতেই সেমাই বানাতেন বাড়ির মা-বোনরা। এসব সেমাই ঈদের দিন সকালে গরম পানিতে ধুয়ে ঘন দুধ দিয়ে রান্না করা হতো। তারপর সেগুলো ছোট ছোট পিরিচে ঢেলে দেয়া হতো। প্রতিটা পিরিচের সেমাই-এর উপর কিশমিশ বা পেস্তাবাদাম ছড়িয়ে দেয়া হতো যাতে সৌন্দর্য আর স্বাদ দুটোই বাড়ে।

21_eidjourney_gabtoli_080916_0006

একটু খেয়াল করলেই দেখা যাবে ৫০ এর দশকের ঈদ উৎসবের যেমন আবেদন ছিল, তা তো কমেইনি বরং পুরনো প্রথার সাথে আধুনিক অনুষঙ্গ যুক্ত হয়ে ঈদকে আরও ভিন্ন মাত্রা দিয়েছে। এখন যেমন ঈদের ছুটি পেলেই হাজারো বাঁধাবিঘ্ন পেরিয়ে মানুষের তার জন্মভিটায় ফিরতে চান। রাজধানীবাসীর চিরায়ত ঈদ উদযাপনের সাথে পাল্লা দিলে আবেগ ও আনন্দে বরং গ্রামে ফিরবার এখনকার রেওয়াজটিই এগিয়ে থাকবে। কর্ম-করণে ইট পাথরের নগরীতে মানুষ বসবাস করে বটে। খানিকটা ফুরসৎ পেলেই মানুষ ছোটে আবাল্যে ফেলে আসা সেই চিরচেনা গ্রামে। যেখানে তার নাড়ি পোতা। যেখান তার হৃদয়ের বন্ধন আটা কোনো এক জীর্ণ কুটিরে। খুব স্বাভাবিকভাবে আজকাল ঈদ উৎসবটাই গ্রামের সাথে নগরের সেতুবন্ধন রচনা করে চলেছে। গ্রামে ফেলে আসা স্কুল থেকে ঝরে পড়া মাঠে কাজ করা কিষান বন্ধুটিকে অন্ততঃ বছরে এক দু’বার হলেও বলবার সুযোগ মেলেঃ বন্ধু কী খবর বল?

মাটির পথ মাড়িয়ে শস্যক্ষেতের আল ধরে সবুজের ঘ্রাণ গায়ে মেখে হাত বাড়িয়ে বন্ধুটিকে আলিঙ্গনে বাঁধবার ঈদটাই যে সুযোগ। সমবয়সীদের সাথে আড্ডা, খেলাধুলা, পুকুর বা নদীতে মাছ ধরা আর ঝাঁপাঝাঁপি কংক্রিটের শহরে মেলে না। সে থাকে মায়ের ভিটা সেই প্রাচীণ গাঁয়ে।

ক্লান্ত-শ্রান্ত কাজের ঘোরে বন্দি একঘেয়ে অসহায় জীবন চায় ক্ষণিকের মুক্তি। আর ঈদ নিয়ে আসে সেই মুক্তির প্রাণপ্রবাহ। শেকড়ে ফিরাটাই তো আত্মার শুদ্ধি। তারপর আবার সেই চলমান বহমান একই ধারার জীবন কাটানো। যে জীবনে রঙ-রস-সৌন্দর্য মেলে না। জীবন ও জীবিকার দৈন্যতায় চলে শুধু কাজ আর কাজ। যেখানে রোবোটিক জীবন যেন দম দেয়া যন্ত্র। আর সেই যন্ত্রের যন্ত্রণার ভার কেউ বয় না যান্ত্রিক ছাড়া।

শিকড় হলো নিজেকে উজার করে মেলে ধরবার জায়গা। স্বপ্নের মতো করে বাঁচবার স্থান। সাবলীলভাবে প্রকাশের ভূমি। সেই ভূমিমুখে যাত্রাপথে ঈদ উৎসবই হলো সোপান। আর সোপান আপনাকে নিয়ে যায় এক কঁচি ঘাসের ডগায় শিশিরবিন্দুর কাছে, পত্রপল্লবে বসে আয়েশ করা রঙিন প্রজাপতির কাছে, পুষ্পের পাঁপড়িতে বসা ফড়িং এর কাছে অথবা বৃষ্টিতে সদ্য স্নান করা জলে মুক্তা আগলে রাখা কোনো এক কচু পাতার কাছে।

অথবা ঈদ উৎসবের সোপান আপনাকে পৌছে দিতে পারে কোনো এক মানবহিতৈষী গ্রামীণ সেবক ব্রতচারীর কাছে। মানবীয় কল্যাণের আলোকচ্ছটায় আপনিও হতে পারেন আলোকিত মানুষ। ভাবতে বসে যেতে পারেন, স্বপ্ন দেখা শুরু করতে পারেন, পরার্থে জীবন কাটানোর এমন স্বপনই তো আপনিও আজীবন দেখে এসেছেন। কবি কামিনী রায় যেমন করে বলেছেন:

পরের কারণে স্বার্থ দিয়া বলি এ জীবন মন সকলি দাও
তার মতো সুখ কোথাও কি আছে? আপনার কথা ভুলিয়া যাও।

কোরবানির চেতনা আর ত্যাগের মহিমায় কোনো এক অনিকেত হৃদয়ধারি নিখাদ মানুষের সংস্পর্শ ধন্য হয়ে ধীর, সুস্থির, শান্ত, নির্লোভী, প্রেমময়, প্রজ্ঞাবান ও মহানুভব মানুষে রূপান্তরিত হয়ে আবার কর্মস্থলে ফিরতে পারেন। আপনার এবারের যাত্রা শুভ হবেই। করোটির ভিতর সুন্দর ও সত্য বোধে জাগ্রত হতেই তো আমরা সবাই উৎসবে-পার্বণে-আনন্দে নিজ নিজ নীড়ে ফিরি। প্রিয় মাটিতে আপনজনের সান্নিধ্যে সবার ঈদ উদযাপন শুভ হোক, কল্যাণময় ও মঙ্গলময় হোক।

লেখকঃ সংবাদকর্মী, মাছরাঙা টেলিভিশন
১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৬
twitter.com/fardeenferdous
facebook.com/fardeen.ferdous