ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা, ফিচার পোস্ট আর্কাইভ

gazipur-militant-hideout

দেশে টেরোরিজম বা মিলিট্যান্ট নিয়ে যে রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলো কাজ করে তাদের সাফল্যে নতুন নতুন পালক যুক্ত হচ্ছে বলে তারা নিজেরা মনে করেন। সাধারণ মানুষের অবশ্য এই বিষয়ে মত, অমত বা দ্বিমতের কোনো সুযোগ নেই। এর কারণ জঙ্গিবাদ বা সন্ত্রাসবাদ এমন এক বৈশ্বিক সমস্যায় রূপ পরিগ্রহ করেছে যে এটা এখন দেশজ সাধারণ মানুষের বোধের বাইরে চলে গেছে। নিজেরা আত্মঘাতি হয়েও ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষে মানুষের প্রাণহরণটা প্রধানতম লক্ষ্যে পরিণত করেছে উগ্রবাদিরা। নাম ভাঙ্গাচ্ছে ধর্মের। কিন্তু করে চলেছে চরম অধর্মের কাজ।

হার্ড লাইনার এসব জঙ্গিগোষ্ঠীকে বাগে আনতে পুলিশের স্পেশাল উইপন্স এন্ড ট্যাকটিক্স টিম এবং কাউন্টার টেররিজম এন্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিট কাজ করছে। স্মরণকালে গেল জুলাই মাসের প্রথম সপ্তাহে গুলশানের হলি আর্টিজানে দেশি-বিদেশি ২০ জন মানুষকে হত্যা করা ছিল উগ্রবাদিদের বড় সাফল্য। এর আগে বছরব্যাপী পুরোহিত, অধ্যাপক, ব্লগার, লেখকদের বিচ্ছিন্নভাবে হত্যা করছিল এই সন্ত্রাসীরা। কিন্তু পুলিশ হন্তারকদের নাগাল পেতে খুব বেশি সচেষ্ট ছিল -এমনটা বলা যাবে না। তবে গুলশান ট্রাজেডির পর পুলিশ নড়েচরে বসে। এবং তাদের বেশ বড় মাপের সাফল্য হলো সম্প্রতি গুলশান হামলার মাস্টারমাইন্ড কানাডার নাগরিক ক্যালগ্যারি ক্লাস্টার জঙ্গি গ্রুপের তামিম চৌধুরীকে নিঃশেষ করা। যেই তামিম চৌধুরীকে মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক জঙ্গিগোষ্ঠিরা তাদের নিজস্ব এজেন্ট হিসেবে উপমহাদেশের অন্যতম প্রধান বরে স্বীকৃতি দিয়েছে। আর ঐ ক্লাস্টার গ্রুপটির বিরুদ্ধে কানাডার বাইরে বিভিন্ন হামলায় অন্তত ৭০ জনকে হত্যার জন্য দায়ী করা হয়।

পুলিশের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে তামিম চৌধুরী মারা যাওয়ার পর তার স্থলাভিষিক্ত হতে যাচ্ছিলেন আকাশ নামের জনৈক এক উগ্রবাদী। যাকে কেন্দ্র করে দেশের নব্য জেএমবি সদস্যরা সংগঠিত হতে যাচ্ছিলেন। এই আকাশ ও তার ৬ সহযোগী ০৮ অক্টোবর শনিবার দুপুরে গাজীপুর শহরের পার্শ্ববর্তী পাতারটেক এলাকার এক বাসায় পুলিশের সোয়াট টিমের ‘Spate Eight’ নামের অভিযানকালে মারা যান। একইদিন সকালে পাতারটেকের পার্শ্ববর্তী হাড়িনালে র‍্যাবের ‘শরতের তুফান’ নামের অভিযানে দুইজন এবং টাঙ্গাইলের কাগমারায় দুই জঙ্গি মারা যান। ওইদিন সন্ধ্যায় ঢাকার আশুলিয়ার গাজীরচট এলাকায় র‍্যাবের অভিযান ৩০ লাখ টাকাসহ জঙ্গিদের বড় অর্থদাতা আব্দুর রহমানকে তার তিন সহযোগীসহ গ্রেপ্তার করে র‍্যাব। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান রহমান। একদিনে জঙ্গি নিধনে এতো সাফল্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মনোবল নিশ্চয় বেশ চাঙ্গা করেছে।

কিন্তু এসব অভিযান কৌশল সমালোচনার বাইরে রাখা যাচ্ছে না। পরিসংখ্যান বলছে, গেল ১০ মাসে পুলিশ ও র‍্যাবের অভিযানকালে অন্তত ৪৬ সন্দেহভাজন জঙ্গি প্রাণ হারিয়েছেন। পুলিশের কর্মকর্তারাও জঙ্গিদের হাতে প্রাণ হারিয়েছেন। ইদানিং অব্যাহত জঙ্গি নিধন প্রসঙ্গে কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের প্রধান মনিরুল ইসলাম বলেছেন, জঙ্গিদের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ শক্তি ক্ষয় হয়েছে। কিন্তু সমালোচকরা বলছেন, প্রত্যেক অপারেশনের পর দাবি করা হয়, বড় ধরণের নাশকতা থেকে দেশ ও মানুষকে রক্ষার জন্য অপারেশনের মাধ্যমে উগ্রবাদিদের নির্মূল করাটা জরুরি ছিল। কিন্তু নাশকতাটা আসলে কি ছিল সে ব্যাপারে বরাবর সুচতুর গোপনীয়তা রক্ষা করা হয়।

হাড়িনালের আতাউর রহমানের বাসায় অভিযানকালে শোনা গেল সকালে দুই জঙ্গি মারা গেছে। কিন্তু সারাদিন অভিযান পরিচালনাকারীরা রাখঢাক করে দুপুরে জানান দুইজন মারা গেছে। জানানো হয় জঙ্গিরা র‍্যাবের দিকে উপুর্যুপরি গুলি এবং গ্রেণেড ছুড়ছিল, উপায়ন্তর না পেয়ে জীবিত ধরার আশা বাদ দিয়ে র‍্যাব সদস্যরা আত্মরক্ষার্থে গুলি চালালে জঙ্গিরা প্রাণ হারান।

পাতারটেকেও দেখা গেল সেই সকাল দশটায় অভিযান শুরু হলেও বেলা পশ্চিমে আকাশে হেলে পড়া পর্যন্ত উভয়পক্ষে গোলাগুলি চলল। জঙ্গিদের আত্মসমর্পণের আবেদন নিবেদন করেও কোনো সাড়া না পেয়ে সাঁড়াশি অভিযানে ৭ জন প্রাণ হারালেন।

সরকারের বাইরে থাকা রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দরা এইখানেই আপত্তি করছেন। তাদের দাবি, জঙ্গিদের অবশ্যই জীবিত ধরতে হবে যাতে তাদের কাছ থেকে আরও তথ্য পাওয়া যায়। কেউ কেউ আরেকটু বাড়িয়ে বলছেন, সন্ত্রাসীদের জীবিত ধরা হয় না কারণ সরকারপন্থিদের সংশ্লিষ্টতার থলের বিড়াল বের হয়ে যেতে পারে। হতে পারে এসব রাজনৈতিক বক্তব্য। আমরা মনে করি সমালোচনার মুখ বন্ধ করতে এসব কথাতেও পাত্তা দেয়ার এক ধরণের জরুরত আছে বৈকি। এই অর্থেই আছে যে, জঙ্গিবাদ মোকাবেলাই শুধুমাত্র অভিযান পরিচালনায় কাঙ্ক্ষিত দীর্ঘস্থায়ী সাফল্য নাও আসতে পারে।
20161008_162118_resized

জঙ্গিবাদের শিকড়ে প্রোথিত রয়েছে রাজনৈতিক ও আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কের অশুভ ছত্রছায়া। ওদের আছে অর্থনৈতিক সুদৃঢ় ভিত্তি। সেই রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে ওদের উগ্রবাদী মতাদর্শকে পুরোমাত্রায় পর্যুদস্তু করা না গেলে জঙ্গিবাদের ভাইরাসীয় পুনর্জন্ম ঠেকানো অসম্ভব হতে পারে। পুলিশি আক্রমণের প্রভাবটা সাময়িক বলে উগ্রবাদ নির্মূলে রাজনৈতিক ও সামাজিক জাগরণটা আগে জরুরি। ঠিক এইখানেই রাজনৈতিক মতাদর্শীদের একজোট বা একমত হওয়া ছাড়া গতি আছে বলে মনে করবার কোনো কারণ নেই।

দেশে অব্যাহত জঙ্গি নিধনে বড় ভূমিকা পালনকারী সোয়াট টিমের কর্মকর্তা ও ডিএমপি’র অতিরিক্ত উপ কমিশনার ছানোয়ার হোসেন পাতারটেক অপারেশনের পর জানান, তাদের প্রধান টার্গেটই থাকে অপারেশনের ক্যাপাসিটি নিয়ে রেডি আছে এরকম জেএমবি সদস্য বা তরুণ ছেলেপুলে, যারা যেকোনো সময় যেকোনো মুহুর্তে লিডারের নির্দেশ পাওয়া মাত্র একটা আক্রমণ করে থ্রেট লেভেলটা ইনক্রিজ করবে। এসব অভিযানে প্রথমেই তাদের অবজেক্ট থাকে থ্রেট লেভেলটা রিডিউস করা। সেটা করতে প্রথম কাজ অপারেশনাল ক্যাপাসিটি বা লিডারশিপে যারা থাকে তাদের অ্যারেস্ট করা এবং দ্বিতীয়ত তাদের আর্মস অ্যান্ড অ্যামুনিশন সাপ্লাই চেইন ধ্বংস করে দেয়া।

কিন্তু প্রায় অপারেশনেই দেখা যাচ্ছে থ্রেট লেভেল রিডিউস করতে গিয়ে প্রথম কাজটির দিকে বেশি মনোযোগী না হয়ে আর্মস অ্যান্ড অ্যামুনিশন সাপ্লাই চেইন ডেমোলিশ করার দিকেই মূল লক্ষ্য থাকছে। এবং এটা করতে গিয়েই মূলত জঙ্গিদের নির্বাক বডি পাওয়া যাচ্ছে কিন্তু জীবিত তথ্য ভাণ্ডারের সন্ধান পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করাই হচ্ছে না।

চিন্তাদর্শীদের দাবি, জঙ্গি নিধনে সাময়িক সাফল্যের উত্তেজনা নয়, দীর্ঘস্থায়ী ফল পেতে হলে মূলে কুঠারাঘাত করতে হবে। কোন সে বড় ইবলিশ প্রেরণা দিয়ে কোমলমতি কিশোর যুবকদের ধর্মের ক্যাপ্টাগন খাইয়ে বিপথে নিয়ে আসছে তার সন্ধান করার জন্যই বিপথে পা রাখা যুবকদের কথা শোনাটা দরকার। শিকড় না কেটে উপরে পানি ঢালায় জঙ্গিবাদের বিশ্বাসের ভাইরাসটাকে না কমিয়ে বরং জ্যামিতিক হারে বাড়িয়েই দিতে পারে।
আমাদের সন্তানদের সুনিশ্চিত ও নির্ভয় ভবিষ্যতের জন্য যা মোটেও কাম্য হতে পারে না। অপারেশনে জঙ্গি নির্মূলের আগে এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজাটা খুর জরুরি যে, কেন কীসের লোভে বনেদি ঘরের অল্পবয়সী সুশিক্ষিত সন্তানেরা জঙ্গি হয়ে মারা পড়তে চায়?

কাজেই জঙ্গিবাদ বা সন্ত্রাসবাদের একই ঘটনা নিয়ে সরকারের বিভিন্ন এসেন্সির চতুর্মুখী বাহাস নয়, জঙ্গিবাদের পুনর্জন্ম রোধে সকল পক্ষের সম্মতির ভিত্তিতে আরও বেশি সতর্কতা, জোরদার কৌশল ও কার্যকরি কর্মপন্থা নির্ধারণ এই সময়েরই দাবি।

লেখক: সংবাদকর্মী, মাছরাঙা টেলিভিশন
০৯.অক্টোবর ২০১৬
facebook.com/fardeen.ferdous
twitter.com/fardeenferdous