ক্যাটেগরিঃ প্রশাসনিক, ফিচার পোস্ট আর্কাইভ

15086946_831814070254902_658861960_n

শিল্প আনন্দ দেয়। আর শিল্প হলো মানুষের সাংস্কৃতিক কর্মকুশলতার নিদর্শন। সামাজিক ও ঐতিহাসিক বিবর্তন ধারার মধ্য দিয়ে মানুষ আপনার অন্তরস্থ সত্যটুকুকে উপলব্ধি করে এবং সেই উপলব্ধির পথে শিল্প হলো একটি পদক্ষেপ। মানুষের বিভিন্ন ধরণের সাংস্কৃতিক কৃতিসমূহের একটি যে এই শিল্পকলা তা মানুষের অন্যান্য কর্মকুশলতাকেও প্রভাবিত করে। মানুষের নৈতিক কর্ম, তার ধর্মীয়, সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্রিয়াকলাপ ও তার শিল্প চেতনার রূপান্তর ঘটায়। এই ধরণের পারস্পরিক প্রভাবের জোয়ার ভাঁটা মনুষ্য সমাজ গঠনে আদ্যন্ত কাল জুড়ে চলেছে এবং চলবে। কার্ল মার্কসের নন্দনতত্ত্ব আলোচনায় এমনটাই বলা হয়েছে।

কিন্তু মানুষের বিকৃত সাংস্কৃতিক কর্মকুশলতার নিদর্শনে যে শিল্পবোধ গড়ে ওঠবে –তা আক্ষরিক অর্থেই বিকৃত শিল্পের নামান্তর হবে তা বোঝাই যায়। আমাদের চারপাশের প্রতিবেশ ও পরিবেশ থেকে ওঠে আসে যে শিল্প সেই শিল্প ভালো লাগে, ছবি ভালো লাগে, গান ভালোবাসি –কিন্তু কেন এই ভালোলাগাটা ঘটল, কোথা থেকে ঘটল, কেমন করে ঘটল এর ব্যাখ্যা দেবেন নন্দনতাত্ত্বিকরা। তবে যে অসুন্দর চর্চারা আমাদের সকল নন্দনকে গ্রাস করে ফেলে তার বিচার করবে কোন তাত্ত্বিকেরা?

আমাদের আজকের পাঠের বিষয় ‘নগরের সৌন্দর্য গ্রাস করছে আত্মপ্রচারের কালিমা’। প্রেক্ষিত আয়তনে বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ মহানগর ‘গাজীপুর সিটি করপোরেশন’।

গাজীপুর ও টঙ্গী পৌরসভাসহ ৩২৯ দশমিক ৯ বর্গকিলোমিটার এলাকা নিয়ে গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন গঠনের প্রস্তাব ২০১৩ সালের ৭ জানুয়ারী প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস সংক্রান্ত জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটির (নিকার) চূড়ান্ত অনুমোদন পায়। গাজীপুর সিটি করপোরেশন গেজেট প্রকাশিত হয় ১৬ জানুয়ারি। নির্বাচনী বিধিবিধান অনুযায়ী গেজেট প্রকাশের ১৮০ দিনের মধ্যে ওই বছর ৬ জুলাই নির্বাচনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থীকে বিপুল ভোটে পরাজিত করে প্রথম নির্বাচিত মেয়র হন অধ্যাপক এম এ মান্নান। কিন্তু এম এ মান্নান নাশকতার মামলায় সাজাপ্রাপ্ত হওয়ায় তাঁকে বরখাস্ত করে প্যানেল মেয়র আওয়ামী লীগ সমর্থিত আসাদুর রহমান কিরণকে ভারপ্রাপ্ত মেয়র হিসেবে দায়িত্ব দিয়ে রাখা হয়েছে।

বর্তমান ভারপ্রাপ্ত মেয়রের আমলে ‘আবর্জনার ভাগার নগরের মহাসড়ক ও শহরতলীর রাস্তা’, ‘মহানগরে ফুটপাথ বলতে কিছু নেই’, ‘তিন বছর পার করলেও কাঙ্ক্ষিত উন্নয়নের ছোঁয়া লাগেনি গাজীপুরে’, ‘যানজটে ভোগান্তিতে মহানগরের সাধারণ মানুষ’, ‘বেপরোয়া চাঁদাবাজিতে নাকাল যানবাহন চালকরা’, ‘ড্রেনেজ ব্যবস্থা না থাকায় বিভিন্ন ওয়ার্ডে স্থায়ী জলাবদ্ধতা’ এবং ‘হরিলুটের গাজীপুরে নাগরিক বঞ্চনা’ জাতীয় বিবিধ সংবাদ গণমাধ্যমে এসেছে।
??????????????

কিন্তু সবকিছু ছাপিয়ে আমাদের দৃষ্টিতে এগিয়ে থাকবে ‘নগরের সৌন্দর্য গ্রাস করছে আত্মপ্রচারের কালিমা’। রাজধানী ঢাকা শহর কিংবা ঢাকা-টাঙ্গাইল ও ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের যেদিক দিয়েই গাজীপুরের প্রবেশ করুন না কেন –প্রথমেই নজরে পড়বে রাস্তার দু’পাশে আত্মপ্রচারের বাহারি বিলবোর্ড, ব্যানার আর ফেস্টুন। এসব বিলবোর্ডের কিছু অংশ বিভিন্ন বহুজাতিক কোম্পানির পণ্য প্রচারের জন ব্যবহৃত হলেও বেশিরভাগই ক্ষমতাসীন নেতাকর্মীদের নিজেদের গুণকীর্তনে ভরা।

‘জাগ্রত চৌরঙ্গী’ মুক্তিযুদ্ধের মহান শহীদদের অসামান্য আত্মত্যাগের স্মরণে নির্মিত দেশের প্রথম ভাস্কর্য যা ১৯৭৩ সালে ভাস্কর আব্দুর রাজ্জাক নির্মাণ করেন। ডান হাতে গ্রেনেড, বাঁ হাতে রাইফেল। লুঙ্গি পরা, খালি গা, খালি পা আর পেশিবহুল এ ভাস্কর্যটি গাজীপুর জেলার জয়দেবপুর চান্দনা চৌরাস্তার ঠিক মাঝখানে সড়কদ্বীপে স্থাপন করা হয়েছে। হোয়াইট সিমেন্ট দিয়ে ঢালাই করে নির্মিত ৪২ ফুট ২ ইঞ্চি উচ্চতার ‘জাগ্রত চৌরঙ্গী’তে ১৬ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের ৩ নম্বর সেক্টরের ১০০ জন ও ১১ নম্বর সেক্টরের ১০৭ জন বীর শহীদের নাম উৎকীর্ন করা আছে। এই ভাস্কর্যটি গাজীপুরের পরিচয়বাহী। কিন্তু রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের ব্যানার ফেস্টুনে সারাবছর ঢাকা পড়ে থাকে স্বাধীনতার এই অমূল্য স্মারক। ফলে এই পথের যাত্রীদের এর শিল্পসৌন্দর্য উপভোগ করার কোনো উপায় থাকে না।

এমনিভাবেই গাজীপুর শহর ও মহাসড়কের দুইপাশে ছেয়ে গেছে অবৈধ বিলবোর্ডে। এতে মহানগরের সৌন্দর্য বিনষ্ট হওয়ার পাশাপাশি সড়ক যোগাযোগে মারাত্মক প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে। যদিও বিলবোর্ড সংস্কৃতিকে অপরাজনীতি বলে উল্লেখ করছেন স্থানীয় নেতৃবৃন্দরা। মহানগরের অলিগলি ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে ঢাকা-টাঙ্গাইল এবং ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের বিভিন্ন পয়েন্টে স্থাপন করা হয়েছে অসংখ্য বিলবোর্ড ও ব্যানার। বিশাল আকৃতির এসব বিলবোর্ড ব্যানারে শোভা পাচ্ছে বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের আত্মপ্রচারণা। এতে একদিকে যেমন মহানগরের সৌন্দর্য বিনষ্ট হচ্ছে, অন্য দিকে সড়ক যোগাযোগে সৃষ্টি করছে মারাত্মক প্রতিবন্ধকতা। যার বিরুপ প্রভাব পড়ছে জনমনে। একজন ব্যক্তিকে নেতা হয়ে ওঠবার জন্য যে মাপের ত্যাগ ও সচেতনতা থাকা দরকার তা এখনকার কোনো রাজনৈতিক কর্মীর মধ্যে নেই। তারা মানবসেবায় মন না দিয়ে নগরের সৌন্দর্যবিনাশী আত্মপ্রচারনা নিয়ে ব্যস্ত থাকেন বলে সাধারণ মানুষেরও অভিযোগ।

২০১৫ সালে আগস্টের মধ্যেই মহাসড়কের পাশ থেকে সকল অবৈধ বিলবোর্ড অপসারণের নির্দেশ দিয়েছিলেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। কিন্তু দেড় বছরেও তাঁর নির্দেশনার কোনোরূপ বাস্তবায়ন দেখা যায়নি গাজীপুর সিটিতে।

??????????????
হালের আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের ২০১৫ সালের ৮ অগাস্টে গাজীপুরের চান্দনা চৌরাস্তায় ‘জাগ্রত চৌরঙ্গী’র পাদদেশে দাঁড়িয়ে মিডিয়াকর্মীদের বলেছিলেন, আমি সম্প্রতি বিশ্বের ১৫টি খুব বড় বড় শহর ভিজিট করেছি। কোথাও রাস্তার পাশে বা হাইওয়ের পাশে বিলবোর্ড দেখিনি। বড় বড় ছবি ব্যবহার করে এই বিলবোর্ড যারা লাগায়, এই ছবি দেখে কি তাদেরকে কেউ ভোট দেবে? চেহারা দেখে ভোট দেবে না, ভোট দেবে কাজ দেখে আর আচরণ দেখে। গাজীপুরের রাস্তার মতো এত বিলবোর্ড আর কোথাও নেই। সব রাজনৈতিক বিলবোর্ড। আমি রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দকে বলেছি, অগাস্ট মাস শেষ সময়। এর মধ্যেই বিলবোর্ড নামিয়ে ফেলুন। হাইওয়ের পাশে সারাদেশে যে অপ্রয়োজনীয় বিলবোর্ড ও ব্যানার আছে সবগুলো নামিয়ে ফেলতে হবে। যদি না নামিয়ে ফেলেন, সেপ্টেম্বর থেকে আমি নিজেই এই অভিযানে নামব। বিলবোর্ড দেখিয়ে জনগণের মন জয় করা যায় না। জনগণের মন জয় করতে হবে আচরণ দিয়ে, উন্নয়ন দিয়ে।

কিন্তু দুঃখের কথা হলো, ওবায়দুল কাদেরের সেই সেপ্টেম্বর মাস আর আসেনি। এই বক্তব্যের সাক্ষি জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মদ হারুণ রশীদ জানিয়েছিলেন, অবৈধ বিলবোর্ড, ব্যানার ও ফেস্টুন অপসারণে সিটি করপোরেশন পুলিশি সহায়তা চাইলে তা দিতে সার্বক্ষণিক প্রস্তুত তারা। কিন্তু গাজীপুর মহানগরের ভারপ্রাপ্ত মেয়র কোনোদিন পুলিশের সহায়তা চাননি। কারণ গাজীপুর মহানগরের বিভিন্ন ভবনের দেয়াল, অফিসের ফটক, হাইওয়ের পার্শ্ববর্তী এলাকা বা সড়কদ্বীপে তাঁর নামেও বিস্তর বিলবোর্ড-ব্যানার সাঁটানো আছে। অবস্থাটা এমন যে নগরের নিজস্ব সৌন্দর্য দেখবার অধিকার কারও নেই, দেখবেন শুধু নেতা বা পাতি নেতাদের মুখ।

অবশ্য বিলবোর্ড সংস্কৃতির এমনধারাকে রাজনীতির কদর্য দিক বলে উল্লেখ করেন স্থানীয় রাজনৈতিক নেতারা। মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি এডভোকেট আজমত উল্লা খান জানান, ‘একসেস অব এনিথিং ইজ ব্যাড। যখনই বেশি কিছু হবে তা খারাপ নজির স্থাপন করবে। পবিত্র এই নগরের স্বাভাবিক সৌন্দর্য যাতে ব্যাহত না হয়, সে ব্যাপারে নেতৃবৃন্দকে সতর্ক থাকতে হবে। প্রায়শঃ দেখা যায় জাতির পিতা বা দেশের প্রধানমন্ত্রীর ছবি ক্ষুদ্রাকারে ব্যবহার করে প্রচারকারীর ছবিটা বিশালাকারে রাখা হয়। এসব অপপ্রচারসর্বস্ব রাজনীতির অনুমোদন কোনো দলেই নেই। তৃণমূলের অতি উৎসাহীরা যারা এসবের সাথে জড়িত হবেন, তাদের বিরুদ্ধে দলীয় শৃঙ্খলা বিধি মোতাবেক সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

??????????????
কিন্তু আবারও অতি দুঃখের সাথে বলতে হয়, কোনোদিন নগরের সৌন্দর্যবিনাশী কারো বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করবার নজির দেখা যায়নি। বাস্তবতা হলো, এই নেতার শিষ্যসাবুদেরাও বিলবোর্ড-ব্যানারে নিজের প্রিয় এই নেতাকেও সযত্নে রাখেন এনং যত্রতত্র নগরবাসিকে দেখতে বাধ্য করেন।
বিলবোর্ডের এমনধারার অপরাজনীতি থেকে সরে এসে সড়ক-মহাসড়কের পাশ থেকে অবৈধ বিলবোর্ড অপসারণের মাধ্যমে মহানগরের স্বাভাবিক প্রতিবেশ ও সৌন্দর্য ফিরিয়ে আনার দাবি নগরবাসির।

কিন্তু কবে আমরা দেখতে পাবো নগরের আসল শিল্পরূপ? যে শিল্প সত্যিকার অর্থেই আমাদেরকে আনন্দে ভাসাবে। নেতার মুখশ্রী সম্বলিত বিলবোর্ড দেখতে দেখতে নাগরিকের চোখ বড় বিরক্ত, ক্লান্ত। নাগরিক অধিকার বিষয়ে সচেতন একজন প্রাজ্ঞ নগরপিতা পারতেন এই অবস্থা থেকে নগরবাসিকে রেহাই দিতে। দেখাতে পারতেন সবুজ শ্যামল বৃক্ষশোভায় সাজানো আর পুষ্পরাজিতে ভরা স্বপ্নের শহর। বাজে প্রচারবিলাসিতামুক্ত একজন ন্যায়নিষ্ঠ, জনকল্যাণকামী ও আদর্শ নগরপিতা আমরা কোথায় পাব, যিনি আমাদের মতো নাগরিকের ভাবনাকে ধারণ করে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গীতাঞ্জলিতেও মনটা নিবদ্ধ করবেনঃ
আমার মাথা নত করে দাও হে তোমার চরণধুলার তলে।
সকল অহঙ্কার হে আমার ডুবাও চোখের জলে॥
নিজেরে করিতে গৌরব দান নিজেরে কেবলই করি অপমান,
আপনারে শুধু ঘেরিয়া ঘেরিয়া ঘুরে মরি পলে পলে।
সকল অহঙ্কার হে আমার ডুবাও চোখের জলে॥
আমারে না যেন করি প্রচার আমার আপন কাজে,
তোমারি ইচ্ছা করো হে পূর্ণ আমার জীবনমাঝে।
যাচি হে তোমার চরমশান্তি পরানে তোমার পরমকান্তি–
আমারে আড়াল করিয়া দাঁড়াও হৃদয়পদ্মদলে।
সকল অহঙ্কার হে আমার ডুবাও চোখের জলে॥

লেখকঃ সাংবাদিক, মাছরাঙা টেলিভিশন
২২ নভেম্বর ২০১৬
twitter.com/fardeenferdous
facebook.com/fardeen.ferdous
bdnews24.com/author/fardeenferdous